খণ্ড 94
ফন্ট:100%
থিম:

১১.২৯ সোশ্যাল কম্পারিজন থিওরি (Social Comparison Theory): 'উপরের দিকে না তাকিয়ে নিচের দিকে তাকানোর' নববী আদেশের মনস্তাত্ত্বিক ডেটা

মানব সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের ইতিহাসে ব্যক্তির মানসিক প্রশান্তি, আত্মতুষ্টি এবং সামাজিক স্থায়িত্ব রক্ষার স্বার্থে তুলনামূলক আচরণের প্রভাব একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। আধুনিক সামাজিক মনস্তত্ত্বের প্রখ্যাত গবেষক লিওন ফেস্টিঙ্গার (Leon Festinger) ১৯৫৪ সালে তাঁর বিখ্যাত "সোশ্যাল কম্পারিজন থিওরি" (Social Comparison Theory) উপস্থাপন করে দেখান যে, মানুষ স্বভাবগতভাবেই নিজের দক্ষতা, সামাজিক অবস্থান এবং পার্থিব প্রাপ্তি মূল্যায়ন করার জন্য অন্যদের সাথে তুলনা করে। এই তুলনা প্রধানত দুই প্রকার—ঊর্ধ্বমুখী তুলনা (Upward Social Comparison) এবং নিম্নমুখী তুলনা (Downward Social Comparison)। আধুনিক মনোবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বমুখী তুলনা মানুষের মনে আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ (Relative Deprivation), তীব্র বিষণ্নতা, ঈর্ষা এবং আত্মমর্যাদাবোধের চরম অবক্ষয় ঘটায়। অন্যদিকে, নিম্নমুখী তুলনা মানুষের অন্তরে সন্তুষ্টি, কৃতজ্ঞতাবোধ এবং মনস্তাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা অর্জনে প্রধান অণুঘটক হিসেবে কাজ করে [1] , [2] । রাসুলুল্লাহ সা. আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে আধুনিক মনস্তত্ত্বের এই জটিল তত্ত্বটিকে এক অমূল্য নীতিবাক্যে রূপদান করেছিলেন। তিনি বিশ্বমানবতাকে লক্ষ্য করে নির্দেশ দিয়েছিলেন পার্থিব বিষয়ে নিজের চেয়ে নিম্নস্তরের মানুষের দিকে তাকাতে, যাতে আল্লাহর নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা বা অবমূল্যায়ন সৃষ্টি না হয় [3]

নবুয়তী মনস্তত্ত্বের এই কালজয়ী নির্দেশনা কেবল কোনো নীতিগত উপদেশ ছিল না, বরং তা ছিল একটি গভীর বৈজ্ঞানিক ও সমাজ-প্রকৌশলগত সমাধান। রাসুলুল্লাহ সা. মানব রূপান্তরের যে মহত্তম অভিযান পরিচালনা করেছিলেন, তার মূলে ছিল মানুষের কগনিটিভ বা জ্ঞানীয় কাঠামোর পুনর্গঠন। তৎকালীন বৈষম্যপীড়িত ও বস্তুপূজারি জাহেলি সমাজে মানুষের আত্মমর্যাদা নির্ধারিত হতো ধন-সম্পদ, অভিজাত বংশপরিচয় এবং দাস-দাসী কিংবা অশ্বারোহী বাহিনীর প্রাচুর্য দ্বারা। ফলে সাধারণ মানুষ ও শোষিত শ্রেণী অনবরত উচ্চবিত্তের দিকে তাকিয়ে মানসিক হীনমন্যতা ও ক্ষোভে দগ্ধ হতো [4] । রাসুলুল্লাহ সা. এই মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধির মুলোৎপাটন করতে গিয়ে পার্থিব প্রাপ্তির ঊর্ধ্বমুখী তুলনাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আত্মিক প্রসন্নতার মূল চাবিকাঠি হিসেবে নিম্নমুখী তুলনাকে সার্বজনীন মানসিক চর্চায় পরিণত করার নির্দেশ দেন। এই প্রজ্ঞাপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক নীতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োগ গভীর গবেষণার দাবি রাখে [5]

১. সামাজিক তুলনা তত্ত্ব (Social Comparison Theory) এবং নববী নির্দেশনার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি

সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের তাত্ত্বিক পরিসরে ব্যক্তিত্বের ইতিবাচক বিকাশ এবং প্রক্ষোভিক ভারসাম্যের (Emotional Balance) জন্য নিম্নমুখী সামাজিক তুলনার গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ সা. নবুয়তী প্রজ্ঞার মাধ্যমে মানবমনস্তত্ত্বের এই সূক্ষ্মতম গলিগুলো উন্মোচন করে যে নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন, তা মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের মাধ্যমে বিশুদ্ধ সনদে সংরক্ষিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা. এর বাণীটি নিম্নরূপ:

«انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلاَ تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لاَ تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ»

রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন: "তোমরা তোমাদের চেয়ে নিম্নস্তরের মানুষের দিকে তাকাও এবং যে তোমাদের চেয়ে উচ্চস্তরের তার দিকে তাকিও না। কারণ এটি আল্লাহ তাআলার নিয়ামতকে তোমাদের নিকট তুচ্ছ মনে না হওয়ার জন্য সর্বাধিক উপযুক্ত" [6] । এই হাদিসে উল্লেখিত 'লা তাজদারু' (لاَ تَزْدَرُوا) শব্দটি ভাষাগত ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আরবি 'ইজদিরা' (ازدراء) শব্দের অর্থ হলো কোনো কিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করা, অবমূল্যায়ন করা কিংবা তাচ্ছিল্য করা। আধুনিক সাইকোলজিতে একে বলা হয় 'ডিভাল্যুয়েশন অফ পার্সোনাল অ্যাসেটস' (Devaluation of Personal Assets)। মানুষ যখন ক্রমাগত তার চেয়ে অর্থনৈতিক বা সামাজিকভাবে উন্নত ব্যক্তিবর্গের দিকে তাকায়, তখন তার নিজস্ব প্রাপ্তি, সুস্থতা এবং নিরাপত্তা তার নিজের চোখেই অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর ও তুচ্ছ মনে হতে শুরু করে। ফলে তার মনে জন্ম নেয় চিরন্তন অসন্তোষ, যা পরবর্তীতে তীব্র বিষণ্নতা (Clinical Depression) এবং দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তায় (Chronic Anxiety) পর্যবসিত হয় [7]

ইসলামি জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি হলো স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা বা 'শুকর'। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, অকৃতজ্ঞতা কোনো কেবল নৈতিক ত্রুটি নয়, বরং এটি মানুষের মানসিক সুস্থতা বিনষ্টকারী একটি গুরুতর জ্ঞানীয় বিকৃতি (Cognitive Distortion)। যখন একজন ব্যক্তি নিজের জীবনকে তার চেয়েও কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া মানুষের পরিস্থিতির সাথে তুলনা করে, তখন তার মস্তিষ্কে একটি কগনিটিভ রিফ্রেলিং (Cognitive Reframing) ঘটে [8] । যে অভাবকে সে বিশাল মনে করছিল, তা অতি ক্ষুদ্র হিসেবে প্রতিভাত হয়। ফলে তার মানসিক চাপ হ্রাস পায় এবং অভ্যন্তরীণ স্বস্তি ও প্রসন্নতা বৃদ্ধি পায়। নববী নির্দেশনার এই অমূল্য ডেটা প্রমাণ করে যে, মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় নিম্নমুখী সামাজিক তুলনা কেবল একটি পছন্দনীয় আচরণ নয়, বরং এটি আত্মিক স্থায়িত্বের পরম পূর্বশর্ত [9]

এই প্রজ্ঞাপূর্ণ সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক নীতির কার্যকর প্রয়োগ কেবল ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা একটি আদর্শ সামাজিক শৃঙ্খলা বিনির্মাণেও মৌলিক ভূমিকা পালন করেছিল। রাসুলুল্লাহ সা. সাহাবিদের মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ প্রদান করার সময় বারবার এই নীতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন যে, পার্থিব ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বমুখী তুলনা শয়তানি কুমন্ত্রণা ও প্রবৃত্তি তাড়িত চাহিদাকে উসকে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত সমাজে লোভ, অবৈধ উপার্জনের প্রতিযোগিতা এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দেয়। নবুয়তী এই শিক্ষার ফলে প্রাথমিক যুগের মুসলিম সমাজ এক অভূতপূর্ব মানসিক তৃপ্তি ও বৈষয়িক সদ্ব্যবহারের আদর্শ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল, যা তৎকালীন রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের বস্তুবাদী অস্থিরতার পুরোপুরি বিপরীত ছিল [10] , [11]

২. সোশ্যাল কম্পারিজন থিওরি এবং ম্যাকডুগালের সামাজিক মনস্তত্ত্বের আলোকে নববী বাণীর বিশ্লেষণ

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রখ্যাত সমাজ-মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম ম্যাকডুগাল (William McDougall) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ An Introduction to Social Psychology-তে মানুষের সহজাত সামাজিক প্রবণতা, শ্রেণী-সংঘাত এবং সামাজিক স্তরীভবনের (Social Stratification) মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন [12] । ম্যাকডুগালের মতে, সামাজিক জীবনের মৌলিক প্রবৃত্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আত্ম-প্রতিষ্ঠা (Self-assertion) এবং সামাজিক তুলনা। মানবসমাজ যখন চরম শ্রেণীভেদে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং নিচের স্তরের মানুষের জন্য সামাজিক গতিশীলতার (Social Mobility) দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সমাজের শোষিত ও নিম্নস্তরের মানুষের মানসিক সংহতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে [13] , [14]

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ সা. যে যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন, সে যুগে বিশ্বের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি পারস্যের সাসনীয় সাম্রাজ্য এবং রোমান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে অত্যন্ত কঠোর ও অমানবিক সামাজিক স্তরীভবন বিদ্যমান ছিল। সাসনীয় সাম্রাজ্যের সামাজিক কাঠামোর বর্ণনা দিতে গিয়ে ঐতিহাসিক নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়:

«تتفاوت الطبقات الاجتماعية في النسب والمنزلة، ويبدو التمييز بينها واضحًا في المركب، والملبس والمسكن والنساء والخدم، فلكل فرد منزلته ومرتبته... أفقدت هذه الأوضاع الشاذة ثقة الفارسي بمجتمعه ووطنه»

অর্থাৎ, "সাসনীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে বংশ মর্যাদা ও অবস্থানের ভিত্তিতে চরম বৈষম্য বিদ্যমান ছিল। তাদের যানবাহন, পোশাক-পরিচ্ছদ, বাসস্থান, নারী ও সেবকদের ক্ষেত্রে এই তফাত অত্যন্ত সুস্পষ্ট ছিল। প্রতিটি ব্যক্তির স্থান ও মর্যাদা সমাজে সুনির্দিষ্ট ছিল এবং এক শ্রেণী থেকে উচ্চতর শ্রেণীতে উত্তরণ একপ্রকার নিষিদ্ধ ছিল... এই অস্বাভাবিক ও নিপীড়নমূলক সামাজিক পরিস্থিতি পারস্যের সাধারণ নাগরিককে তার সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি সম্পূর্ণ হতাশ ও আস্থাভেদে পরিণত করেছিল" [15]

সাসনীয় সাম্রাজ্যের এই মানসিক ও সামাজিক দূরবস্থার মূল কারণ ছিল অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বমুখী তুলনা এবং সামাজিক গতিশীলতার অভাব। সাধারণ কৃষক, কারিগর ও প্রজারা ধনাঢ্য শ্রেণী, ধর্মযাজক এবং সামরিক অভিজাতদের অঢেল সম্পদ ও বিলাসিতা দেখে ক্রমাগত ক্ষোভ ও হীনমন্যতায় ভুগতো [16] । সমাজে সমতা ও ন্যায়বিচারের কোনো অবকাশ ছিল না। এই শোষিত জনগণ যখন ইসলাম ও নববী নীতিমালার সংস্পর্শে এলো, তখন তারা দেখতে পেল রাসুলুল্লাহ সা. সমাজের প্রচলিত বস্তুবাদী মানদণ্ডকে সম্পূর্ণ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সা. ঘোষিত 'নিচের দিকে তাকানোর' নির্দেশ মানসিক পঙ্গুত্ব থেকে জনগণকে মুক্ত করেছিল। তিনি বুঝিয়েছিলেন যে, বাহ্যিক চাকচিক্য মানুষের প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড হতে পারে না। এই মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লবই পারস্য ও রোমান প্রজাদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল, কারণ তারা ইসলামে লাভ করেছিল মানসিক মুক্তি ও সাম্য [17] , [18]

ম্যাকডুগালের সামাজিক মনস্তত্ত্বের আলোকে এটি স্পষ্ট হয় যে, বস্তুগত সম্পদের ঊর্ধ্বমুখী তুলনা যখন কোনো সমাজে মহামারী রূপ ধারণ করে, তখন সেখানে চরম সামাজিক অস্থিরতা (Social Turbulence) তৈরি হয় [19] । পারস্যের সাধারণ মানুষ তাদের সন্তানদের লালন-পালন করতো চরম কষ্টে, অথচ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া মাত্র অভিজাতরা তাদের ধরে নিয়ে সম্রাটের ক্ষমতার যুদ্ধে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতো [20] । এই অবিচারের ফলে প্রজাদের অন্তরে যে তীব্র বঞ্চনাবোধ জন্ম নিয়েছিল, রাসুলুল্লাহ সা. এর সামাজিক তুলনা তত্ত্ব ও সাম্যের বাণী তা নিরাময় করেছিল। রাসুলুল্লাহ সা. শেখালেন যে, পার্থিব প্রাপ্তিতে নিজের চেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্তদের দেখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং আত্মিক ও নৈতিক বিচারে উচ্চতর অবস্থান অর্জনের প্রতিযোগিতা করাই মানবজীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য [21]

৩. জ্ঞানীয় ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া: আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে নিম্নমুখী তুলনা

আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো 'আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ তত্ত্ব' (Relative Deprivation Theory)। এই তত্ত্বানুসারে, মানুষ বস্তুত কতটা দরিদ্র বা সুবিধাবঞ্চিত তা দ্বারা তার কষ্ট নির্ধারিত হয় না; বরং সে নিজেকে কার সাথে তুলনা করছে তার ওপরই তার মানসিক কষ্ট বা সন্তুষ্টি নির্ভর করে। একজন মানুষ অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও যদি তার চেয়ে অধিকতর ধনী কারো সাথে নিজের তুলনা করে, তবে সে নিজেকে দরিদ্র ও বঞ্চিত মনে করবে। এই মানসিক বঞ্চনাবোধ মানব মস্তিষ্কের ডোপামিন ও কর্টিসল হরমোনের ভারসাম্য বিনষ্ট করে অবিরত মানসিক চাপের জন্ম দেয়। থমাস উইলসের (Thomas A. Wills, 1981) "ডাউনওয়ার্ড সোশ্যাল কম্পারিজন থিওরি" নির্দেশ করে যে, জটিল সংকটময় পরিস্থিতিতে মানুষ যখন তার চেয়েও প্রতিকূল অবস্থায় থাকা ব্যক্তির দিকে দৃষ্টিপাত করে, তখন তার ভেতরে একটি প্রক্ষোভিক স্বস্তি ও মনস্তাত্ত্বিক পুনরুদ্ধার (Psychological Recovery) ঘটে [22]

সাসনীয় সাম্রাজ্যের কৃষক ও নিম্নে অবস্থিত পদাতিক সৈন্যদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধের ভয়াবহ রূপ দেখা যায়। সাসনীয় সামরিক ব্যবস্থায় পদাতিক বাহিনীর বর্ণনা দিতে গিয়ে ঐতিহাসিক আকর গ্রন্থে বলা হয়েছে:

«شكل المشاة مؤخرة الجيش، وهم من أهل القرى، يستدعون إلى الحرب دون أجر أو حافز، إنهم الحراثون الخاضعون للنظام الإقطاعي، يلبسون دروعًا من الخيزران المتشابك المغطى بجلد غير مدبوغ»

অর্থাৎ, "সাসনীয় সেনাবাহিনীর পদাতিক অংশটি গঠিত হতো গ্রাম্য কৃষক ও প্রজাদের সমন্বয়ে। তাদেরকে কোনো বেতন বা উদ্দীপনা ছাড়াই জোরপূর্বক যুদ্ধে ডেকে আনা হতো। তারা ছিল সামন্তপ্রথার অধীনে শোষিত কৃষক, যাদের বর্ম বলতে ছিল কেবল কাঁচা চামড়া দিয়ে ঢাকা বাঁশের চটাই" [23] । এই শোষিত কৃষকরা যখন সাসনীয় অশ্বারোহী অভিজাতদের অলঙ্কৃত লৌহবর্ম ও স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত পদস্থ সৈন্যদের দেখতো, তখন তাদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ জেগে উঠতো। এর ফলে যুদ্ধে বিপদের মুখোমুখি হওয়া মাত্রই তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যেত [24]

রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর অনুসারীদের জ্ঞানীয় কাঠামোকে (Cognitive Structure) এমনভাবে পুনর্গঠিত করেছিলেন যেন তারা আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধের ফাঁদে কখনো পতিত না হয়। তিনি শিক্ষা দেন যে, কোনো বিশ্ববাসী যদি দৈনিক খাদ্য, নিরাপত্তা ও শারীরিক সুস্থতা লাভ করে, তবে যেন সে মনে করে সমগ্র পৃথিবীটাই তাকে প্রদান করা হয়েছে। সাহাবিগণ অতি সাধারণ জীবনযাপন করেও আত্মিক দিক থেকে ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী জাতি। কারণ তারা পার্থিব প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সর্বদা তাদের চেয়ে দরিদ্র, অসুস্থ ও নিপীড়িতদের দিকে তাকাতেন [25] । এই জ্ঞানীয় ঢাল তাদের মানসিক দৃঢ়তা (Mental Resilience) এতদূর বৃদ্ধি করেছিল যে, রোমান ও পারস্যের মতো মহাশক্তিধর সেনাবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তারা কখনো ভীত বা হীনমন্যতায় ভোগেননি [26]

সুতরাং, নিম্নমুখী তুলনা কেবল একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল নয়, বরং তা মানুষের কগনিটিভ বাসনা পুনর্নির্ধারণের একটি শক্তিশালী প্রক্রিয়া। এটি মানুষকে অহেতুক প্রতিযোগিতা থেকে বিরত রাখে এবং তার অভ্যন্তরীণ শক্তিসমূহকে ইতিবাচক কাজে প্রয়োগ করতে সাহায্য করে। বাইজেন্টাইন ও সাসনীয় সমাজে যেখানে অনিয়ন্ত্রিত আভিজাত্যের প্রদর্শনী সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দিয়েছিল, সেখানে নববী সমাজ গঠিত হয়েছিল পারস্পরিক সহানুভূতি, সন্তুষ্টি ও মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে [27] , [28]

৪. বস্তুবাদের সামাজিক বিস্তার ও মানসিক বিষণ্নতা প্রতিরোধে নববী সমাজ প্রকৌশল

পার্থিব সম্পদের প্রতিযোগিতা সমাজে ছড়িয়ে পড়লে তা কেবল ব্যক্তি মনস্তত্ত্বকেই ধ্বংস করে না, বরং সামাজিক সংহতিকেও বিষাক্ত করে তোলে। আধুনিক ধনতান্ত্রিক বিশ্বে অনিয়ন্ত্রিত ভোগবাদ ও ঊর্ধ্বমুখী সামাজিক তুলনার ফলে ডিপ্রেশন ও সুইসাইডাল অ্যাংজাইটি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মনস্তাত্ত্বিক ডেটা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চরম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও যেসকল সমাজে বৈষম্য ও কৃত্রিম তুলনার হার বেশি, সেসকল সমাজের মানুষের সার্বিক সুখের সূচক (Subjective Well-being) অতি নিম্নমুখী। রাসুলুল্লাহ সা. এর সমাজ প্রকৌশল (Social Engineering) এই মানসিক বিপর্যয় থেকে মানবজাতিকে সুরক্ষার বাস্তবমুখী রূপরেখা প্রদান করেছিল [29]

ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে বাইজেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্যের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলোর মূল চালিকাশক্তি ছিল বাণিজ্যিক পথ ও রেশম বাণিজ্যের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার [30] । ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত রয়েছে:

«وبرزت في القرن السادس ظاهرة السيطرة على طرق القوافل التجارية بين الشرق والغرب... فكان الاصطدام ضرورة سياسية واقتصادية»

অর্থাৎ, "ষষ্ঠ শতাব্দীতে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোর পথ নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা তীব্র হয়ে ওঠে... যার ফলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল" [31] । রাজন্যবর্গের এই অনিয়ন্ত্রিত বস্তুগত ক্ষুধা ও সম্পদের প্রতিযোগিতা দুই সাম্রাজ্যের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে চরম দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ঐতিহাসিক তাবারীর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, সাসনীয় সম্রাট খসরু পারভেজ ও রোমান সম্রাটদের বস্তুগত অহংকার ও অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ অর্জনের লোভ প্রজাদের ওপর অতিরিক্ত করারোপে বাধ্য করেছিল, যা সমগ্র অঞ্চলের অর্থনীতি ও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে চরম ধস নামিয়েছিল [32] , [33]

এর বিপরীতে, রাসুলুল্লাহ সা. মদিনায় এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে ধনের প্রাচুর্য নয়, বরং 'আত্মার তুষ্টি' (গিনান নফস) ছিল সমৃদ্ধির মাপকাঠি। রাসুলুল্লাহ সা. সামাজিক স্তরীভবনের মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিলেন দুটি মৌলিক নির্দেশের মাধ্যমে: প্রথমত, আখেরাত বা পারলৌকিক কল্যাণের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বমুখী তুলনা করা—অর্থাৎ দ্বীনদারী ও সৎকর্মে নিজের চেয়ে উন্নত ব্যক্তিদের অনুসরণ করা; দ্বিতীয়ত, পার্থিব বিষয়াবলীতে নিম্নমুখী তুলনা করা—অর্থাৎ ধন-সম্পদ ও দৈহিক সৌন্দর্যে নিজের চেয়ে নিম্নস্তরের মানুষের দিকে তাকিয়ে স্রষ্টার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা [34]

নববী এই সমাজ প্রকৌশলের ফলে মুসলিম সমাজের প্রতিটি সদস্য মানসিক দিক থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও স্থিতিশীল হয়ে উঠেছিলেন। সাহাবিগণ চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও নিজেদের ধন্য মনে করতেন, কারণ তারা সর্বদা তাদের চেয়ে বেশি কষ্ট সহ্য করা মানুষের দিকে দৃষ্টিপাত করতেন। এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর কারণেই ইসলামি রাষ্ট্র অতি দ্রুত একটি বিশ্বশক্তিতে পরিণত হতে পেরেছিল, কারণ এর নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক ভিত ছিল অত্যন্ত মজবুত ও অবিচল [35] । রাসুলুল্লাহ সা. এর এই নির্দেশনা প্রমাণ করে যে, সার্বিক মানসিক সুস্থতা এবং বস্তুবাদের অভিশাপ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো নবুয়তী প্রজ্ঞার আলোকে নিজেদের জ্ঞানীয় ও সামাজিক তুলনার মানদণ্ডকে সংশোধন করা [36]

""
১১.২৯ সোশ্যাল কম্পারিজন থিওরি (Social Comparison Theory): 'উপরের দিকে না তাকিয়ে নিচের দিকে তাকানোর' নববী আদেশের মনস্তাত্ত্বিক ডেটা
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১১.২৯ সোশ্যাল কম্পারিজন থিওরি (Social Comparison Theory) কুইজ

1 / 5

সোশ্যাল কম্পারিজন থিওরির প্রবক্তা কে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...