আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় তথ্য ও সংবাদমাধ্যম কেবল সত্য প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং তা ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, জনমত গঠন এবং রাষ্ট্রীয় নীতিকে বৈধতা দেওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বিশেষ করে পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমগুলো যখন বৈশ্বিক কোনো সংকট বা মানবিক বিপর্যয় কভার করে, তখন তাদের বস্তুনিষ্ঠতার দাবি প্রায়শই মুখ থুবড়ে পড়ে। গাজা, ফিলিস্তিন এবং চীনের উইঘুর মুসলিমদের সংকটের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে মূলধারার সাংবাদিকতার এই দ্বিমুখী নীতি (Double Standards), প্রাতিষ্ঠানিক সেন্সরশিপ এবং সুক্ষ্ম 'ল্যাঙ্গুয়েজ পলিটিক্স' বা ভাষার রাজনীতি অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকটের স্বরূপ বুঝতে হলে আমাদের একদিকে যেমন ইতিহাসের রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে হবে, অন্যদিকে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে ইসলামি ঐতিহ্যের মুহাদ্দিসগণের অনুসৃত কঠোর বৈজ্ঞানিক ও তুলনামূলক পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটাতে হবে।
১. রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা: নেপোলিয়নীয় যুগ থেকে আধুনিক কর্পোরেট মিডিয়া
সংবাদ ও চিন্তার স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এবং সেন্সরশিপ কোনো আধুনিক আবিষ্কার নয়, বরং এর শিকড় ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। ফরাসি বিপ্লব-উত্তর ইউরোপে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্র কীভাবে তার নিজের স্বার্থে তথ্য প্রবাহকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত করত। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, নেপোলিয়নীয় ফ্রান্সে মুদ্রণ ও প্রকাশনার ওপর কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তৎকালীন ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে:
"انه لمن المهم جداً ألاَّ يُسمح بالنشر إلاَّ لمن تثق بهم الحكومة. فمن يُخاطب الجماهير من خلال مطبوعات هو كمن يتحدث إليهم في اجتماع عام، في مقدوره أن يعرض موادَّ مثيرة ولا بد من مراقبته"অনুবাদ: "এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, সরকার যাদের বিশ্বাস করে তারা ছাড়া অন্য কাউকে প্রকাশের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। কারণ যে ব্যক্তি প্রকাশনার মাধ্যমে জনসাধারণের উদ্দেশ্যে কথা বলে, সে যেন কোনো জনসভায় তাদের সাথে কথা বলছে; সে উত্তেজনাপূর্ণ উপাদান প্রদর্শন করতে সক্ষম এবং অবশ্যই তাকে নজরদারিতে রাখতে হবে।" [1]
নেপোলিয়নের এই নীতি স্পষ্ট করে যে, রাষ্ট্রীয় বয়ানের বাইরে যেকোনো স্বাধীন মত প্রকাশকে রাষ্ট্রদ্রোহ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হতো। এমনকি কোনো বই বা পত্রিকা প্রকাশের পূর্বে তা সেন্সরের কাছে পেশ করা বাধ্যতামূলক ছিল এবং সরকারের আপত্তিজনক অংশ বাদ দিতে প্রকাশক বাধ্য থাকতেন। প্রকাশনার পরেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (وزير الشرطة) যেকোনো মুহূর্তে তা বাজেয়াপ্ত বা ধ্বংস করতে পারতেন [2] । এই দমনমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মাদাম ডি স্টেল (Madame de Stael)-এর মতো বুদ্ধিজীবীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, যিনি বিশ্বাস করতেন যে "বিজয়ের চেয়ে স্বাধীনতাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ" (إن الحرية أهم من النصر) [3] ।
নেপোলিয়নীয় যুগের এই রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপই আমরা আজ পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমে দেখতে পাই। গাজা ও ফিলিস্তিন সংকটের ক্ষেত্রে এই সেন্সরশিপ আরও সূক্ষ্ম ও পদ্ধতিগত রূপ ধারণ করেছে। পশ্চিমা কর্পোরেট মিডিয়াগুলো (যেমন- CNN, BBC, বা New York Times) ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর (IDF) বয়ানকে বিনা দ্বিধায় প্রচার করে, অথচ ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের খবরগুলোকে হয় ধামাচাপা দেয়, না হয় অত্যন্ত সংকুচিত করে প্রকাশ করে। কোনো সাংবাদিক বা বুদ্ধিজীবী যদি ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে বা ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন, তবে তাকে চাকরিচ্যুতি, সামাজিক বয়কট বা 'অ্যান্টি-সেমিটিজম'-এর তকমা দিয়ে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। এটি মূলত নেপোলিয়নের সেই প্রাচীন সেন্সরশিপেরই একটি আধুনিক কর্পোরেট সংস্করণ, যেখানে তথ্যের অবাধ প্রবাহকে কেবল তখনই অনুমতি দেওয়া হয় যখন তা সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শক্তির স্বার্থের অনুকূলে থাকে।
২. ল্যাঙ্গুয়েজ পলিটিক্স (Language Politics) এবং বয়ানের দ্বিমুখী নীতি: গাজা বনাম উইঘুর সংকট
সাংবাদিকতায় ভাষার ব্যবহার কখনোই নিরপেক্ষ নয়; এটি অত্যন্ত সচেতনভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ডিজাইন করা হয়। গাজা এবং উইঘুর সংকটের ক্ষেত্রে পশ্চিমা মিডিয়ার ব্যবহৃত শব্দচয়ন বা 'ল্যাঙ্গুয়েজ পলিটিক্স' বিশ্লেষণ করলে এই দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের ওপর দমনপীড়নের ঘটনা ঘটে, তখন পশ্চিমা মিডিয়া অত্যন্ত আক্রমণাত্মক, নৈতিকভাবে সংবেদনশীল এবং স্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করে। সেখানে "গণহত্যা" (Genocide), "কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প" (Concentration Camps), "পদ্ধতিগত নির্যাতন" (Systematic Torture) এবং "মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন"-এর মতো শব্দগুলো অকাতরে ব্যবহৃত হয়। কারণ, চীনের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উত্থানকে প্রতিহত করা এবং বেইজিংয়ের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা পশ্চিমা পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বিপরীতভাবে, যখন গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী বিমান হামলা চালিয়ে হাজার হাজার নিরীহ শিশু ও বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে, তখন পশ্চিমা মিডিয়ার ভাষা সম্পূর্ণ বদলে যায়। সেখানে ফিলিস্তিনিরা "নিহত হয় না" বা তাদের "হত্যা করা হয় না", বরং তারা "মারা যায়" (Die/Pass away) যেন এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা! ইসরায়েলি হামলাকে বর্ণনা করা হয় "আত্মরক্ষা" (Self-defense), "পাল্টা জবাব" (Retaliation) বা "সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান" হিসেবে। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ঢালাওভাবে "সন্ত্রাসী" (Terrorists) বলা হলেও, ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও যুদ্ধাপরাধকে আড়াল করতে "সংঘর্ষ" (Clashes) বা "উত্তেজনা" (Tensions)-র মতো হালকা ও অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়।
এই ল্যাঙ্গুয়েজ পলিটিক্স মূলত শ্রোতা ও পাঠকের মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। উইঘুর সংকটের ক্ষেত্রে উইঘুরদের সম্পূর্ণ "নির্দোষ ভিকটিম" এবং চীনকে "একচ্ছত্র খলনায়ক" হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়, যা পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সাথে সংগতিপূর্ণ। কিন্তু ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে ইসরায়েলকে চিরন্তন "ভিকটিম" এবং ফিলিস্তিনিদের "সহিংস উগ্রবাদী" হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে ইসরায়েলের যেকোনো বর্বরতাকে বিশ্ববাসীর কাছে বৈধতা দেওয়া যায়। এই দ্বিমুখী নীতি প্রমাণ করে যে, পশ্চিমা মিডিয়ার কাছে মানবাধিকারের সংজ্ঞা ভৌগোলিক সীমানা এবং ভূ-রাজনৈতিক মিত্রতার ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হয়।
৩. তথ্য যাচাই ও সংবাদ বিশ্লেষণে মুহাদ্দিসগণের 'তুলনামূলক পদ্ধতি' (Muqaranah) এবং আধুনিক মিডিয়ার অপপ্রচার রোধ
পশ্চিমা মিডিয়ার এই পদ্ধতিগত মিথ্যাচার, প্রোপাগান্ডা এবং পক্ষপাতদুষ্ট বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগত কাঠামো প্রয়োজন। ইসলামি ইতিহাসের সোনালী যুগে মুহাদ্দিসগণ (Hadith Scholars) তথ্যের সত্যতা যাচাই, বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা এবং বয়ানের তুলনামূলক বিশ্লেষণের যে অনন্য পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, তা আধুনিক সংবাদ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর প্রতিষেধক হতে পারে। পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা যেখানে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে ঐতিহাসিক সমালোচনা পদ্ধতি (Historical Criticism) বিকাশ করেছেন, সেখানে মুসলিম মুহাদ্দিসগণ তার তেরোশত বছর আগেই একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি মানবজাতিকে উপহার দিয়েছিলেন [4] ।
মুহাদ্দিসগণের এই সমালোচনামূলক পদ্ধতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল "মুক্বারানাহ" বা তুলনামূলক বিশ্লেষণ (Comparison)। ইমাম মুসলিম (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেছেন:
"فبجمع هذه الروايات ومقابلة بعضها ببعض يتميز صحيحها من سقيمها، ويتبين رواة ضعاف الأخبار من أضدادهم من الحفاظ"অনুবাদ: "এই বর্ণনাগুলোকে একত্রিত করার মাধ্যমে এবং একটির সাথে অন্যটির তুলনা করার দ্বারাই কেবল সহিহ (সঠিক) ও সাকিম (ত্রুটিযুক্ত) বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হয় এবং দুর্বল বর্ণনাকারী ও হাফেজদের (নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী) পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।" [5]
একইভাবে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেছেন, "যদি তুমি হাদিসের সত্যতা নিশ্চিত করতে চাও, তবে একটির সাথে অন্যটির তুলনা করো" (إذا أردت أن يصح لك الحديث فاضرب بعضه ببعض) [6] ।
আধুনিক সাংবাদিকতার ডাবল স্ট্যান্ডার্ড এবং ফেক নিউজ (Fake News) বা ভুয়া খবরের যুগে এই 'মুক্বারানাহ' পদ্ধতির প্রয়োগ অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, গাজা সংকটের সময় পশ্চিমা মিডিয়া যখন কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার (যেমন- আল-আহলি হাসপাতালে হামলা বা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার ঘটনা) জন্য ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের দায়ী করে প্রোপাগান্ডা ছড়ায়, তখন আমাদের কেবল একটি সূত্রের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন স্বাধীন গণমাধ্যম, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, স্যাটেলাইট চিত্র এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাথে তুলনা করতে হবে। মুহাদ্দিসগণ যেভাবে বর্ণনাকারীদের জীবনবৃত্তান্ত (علم الرجال) এবং তাদের সততা ও স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করতেন, ঠিক সেভাবে আমাদেরও আধুনিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মালিকানা, তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা এবং পূর্ববর্তী পক্ষপাতিত্বের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হবে।
তাছাড়া, মুহাদ্দিসগণ কেবল সনদের (Chain of Narrators) ওপর নির্ভর করতেন না, বরং তারা "নখদ আল-মাতন" বা পাঠ্যের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণও করতেন। যদি কোনো বর্ণনার পাঠ্য বা অর্থ কুরআন, সুন্নাহ, প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য বা সুস্থ বুদ্ধির পরিপন্থী হতো, তবে তারা তা প্রত্যাখ্যান করতেন [7] । যেমন, খায়বারের ইহুদিদের কর মওকুফ সংক্রান্ত একটি জাল দলিল যখন প্রকাশ করা হয়েছিল, তখন ইবনুল কাইয়িম (রহ.) সহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম তার পাঠ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন যে, সেই দলিলে সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)-এর সাক্ষ্য রয়েছে, অথচ তিনি খায়বার যুদ্ধের পূর্বেই খন্দকের যুদ্ধে ইন্তেকাল করেছিলেন [8] । ঠিক একইভাবে, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর "৪০টি শিশুর শিরশ্ছেদ"-এর মতো জঘন্য মিথ্যা প্রোপাগান্ডা যখন পশ্চিমা মিডিয়া প্রচার করেছিল, তখন যদি আমরা 'নখদ আল-মাতন' বা পাঠ্য ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োগ করতাম, তবে শুরুতেই এই মিথ্যাচার ধরা পড়ে যেত। কারণ এই দাবির পক্ষে কোনো বাস্তব প্রমাণ বা ফরেনসিক রিপোর্ট ছিল না, যা ছিল সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও বাস্তবতাবিরোধী।
৪. মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য ও 'ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট': ফিলিস্তিন সংকটে পশ্চিমা মিডিয়ার ভূমিকা
পশ্চিমা মিডিয়ার এই সেন্সরশিপ এবং ল্যাঙ্গুয়েজ পলিটিক্সের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বিশ্বজুড়ে একটি নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য (Psychological Hegemony) প্রতিষ্ঠা করা এবং নোয়াম চমস্কির ভাষায় 'ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট' বা সম্মতি উৎপাদন করা। অর্থাৎ, এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তৈরি করা যেখানে সাধারণ মানুষ অবচেতনভাবেই শোষক ও অত্যাচারী শক্তির পক্ষে অবস্থান নেয় এবং মজলুমের প্রতিরোধকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।
এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের গুরুত্ব অপরিসীম। মাদাম ডি স্টেলের সেলুন বা বুদ্ধিবৃত্তিক সমাবেশগুলো যেভাবে নেপোলিয়নের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি "অস্ত্রাগার" (ترسانة) হিসেবে কাজ করেছিল, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে এবং সত্যকে উন্মোচন করতে শিখত [9] , ঠিক তেমনিভাবে বর্তমান মুসলিম উম্মাহ ও মুক্তিকামী বিশ্বকে পশ্চিমা মিডিয়ার একচেটিয়া বয়ানের বিরুদ্ধে নিজস্ব বিকল্প মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক ডিসকোর্স গড়ে তুলতে হবে।
পশ্চিমা মিডিয়া উইঘুর সংকটের মানবিক দিকগুলোকে যেভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখায় (নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে), ঠিক একইভাবে গাজার ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান নির্মম গণহত্যাকে আড়াল করে। এই চরম বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, আধুনিক সাংবাদিকতা নৈতিকতার ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হয়ে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতার সমীকরণে রূপান্তরিত হয়েছে। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের নিজস্ব বয়ান (Narrative) তৈরি করতে হবে, যা হবে সত্যনিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ এবং ইসলামি ঐতিহ্যের কঠোর তথ্য-যাচাই পদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।