খণ্ড 49
ফন্ট:100%
থিম:

৩.১.১ উটের পিঠে বসেই ধনুক দিয়ে হাজরে আসওয়াদ (Black Stone) স্পর্শ করা এবং সাত চক্কর সম্পন্ন করা

৩.১.১ উটের পিঠে বসেই ধনুক দিয়ে হাজরে আসওয়াদ (Black Stone) স্পর্শ করা এবং সাত চক্কর সম্পন্ন করা

ইসলামি ইতিহাসের স্বর্ণালী অধ্যায়সমূহের মধ্যে রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিদায় হজের ঘটনাপ্রবাহ এক অনন্য তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত। হজের এই মহিমান্বিত সময়ে কাবা শরিফের তাওয়াফ বা সাত চক্কর সম্পন্ন করার প্রক্রিয়াটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন আরবের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য ও তাওহীদের সুনিশ্চিত বহিঃপ্রকাশ। হাজরে আসওয়াদ বা কৃষ্ণপাথর স্পর্শ করার বিষয়টি (Istilam) ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। তৎকালীন সময়ে কাবা শরিফের চারপাশ ছিল জনাকীর্ণ, এবং হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার জন্য যে ভিড় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো, তা সামাল দেওয়া ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে রাসুলুল্লাহ সা.-এর উটের পিঠে আরোহণ করে এবং ধনুকের প্রান্ত ব্যবহার করে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার ঘটনাটি কেবল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল ধর্মীয় বিধানের প্রয়োগ ও পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য বিধানের এক অনন্য উদাহরণ।

তৎকালীন মক্কার ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে হাজরে আসওয়াদ ছিল আরবের উপজাতীয় অহংকারের কেন্দ্রবিন্দু। হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার অধিকার বা এর সম্মান রক্ষা করা ছিল বিভিন্ন গোত্রের পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একটি মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ সা.-এর আগমনে এই প্রথাগত আধিপত্যের ধারণাটি আমূল পরিবর্তিত হয়ে যায়। তিনি যখন উটের পিঠে চড়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার মাধ্যমে তাওয়াফ সম্পন্ন করেন, তখন তিনি মূলত এটি প্রমাণ করেছিলেন যে, ইবাদতের মূল লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা উপজাতীয় মর্যাদার প্রদর্শন নয়। এই ঘটনাটি ইসলামের 'সামাজিক সমতা' ও 'ব্যক্তিগত ইবাদতের নমনীয়তা'র একটি বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে গণ্য হয়।

ইস্তিলামের কারিগরি ও পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ: ধনুক ও উটের পিঠের ব্যবহার

ইসলামি ফিকহ ও সীরাত শাস্ত্রের আলোকে 'ইস্তিলাম' (Istilam) শব্দের অর্থ হলো হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করা। শাস্ত্রীয় সংজ্ঞায়,

استلام الحجر الأسود: لمسه باليد

অর্থাৎ হাজরে আসওয়াদকে হাত দিয়ে স্পর্শ করা [1] । তবে হাজরের সময় যখন জনসমাগম অত্যন্ত প্রবল থাকে এবং হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন শরীয়তের বিধান অনুযায়ী বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করার অবকাশ থাকে। রাসুলুল্লাহ সা.-এর ক্ষেত্রে এই বিশেষ পরিস্থিতিতে উটের পিঠে আরোহণ এবং ধনুকের প্রান্ত ব্যবহার করার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে 'সিয়াতে কউস' (سية القوس) বা ধনুকের প্রান্ত ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, যা মূলত ধনুকের সেই অংশকে নির্দেশ করে যা ধনুর্বিদ্যায় বা তীরের সংযোগস্থলে ব্যবহৃত হয় [2]

এই পদ্ধতিটি ব্যবহারের পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ ছিল: প্রথমত, জনাকীর্ণ ভিড়ের কারণে সরাসরি হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত পৌঁছানো শারীরিক ও নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। দ্বিতীয়ত, উটের পিঠে চড়ে থাকা অবস্থায় ধনুকের প্রান্ত দিয়ে পাথরটিকে স্পর্শ করা ছিল একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি, যা ভিড়ের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করেই ইবাদত সম্পন্ন করতে সাহায্য করেছিল। এটি নির্দেশ করে যে, ইসলামের বিধানসমূহ কেবল কঠোর নিয়মাবলির সমষ্টি নয়, বরং তা মানুষের সামর্থ্য ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত নমনীয় ও বাস্তবসম্মত। এই কারিগরি দিকটি আধুনিক 'ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট' বা জনসমাগম ব্যবস্থাপনার একটি আদিম ও কার্যকর উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে ধর্মীয় রীতিনীতি বজায় রেখেও বিশৃঙ্খলা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উটের পিঠে চড়ে এই কাজ সম্পন্ন করার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নির্দেশ পালন করা, আর সেই নির্দেশ পালনের জন্য যে কোনো বৈধ ও সহজতর মাধ্যম ব্যবহার করা জায়েজ। ধনুকের প্রান্ত ব্যবহার করা ছিল একটি 'প্রতীকী স্পর্শ' (Symbolic Touch), যা হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করার ধর্মীয় গুরুত্ব বজায় রেখেছিল অথচ ভিড়ের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য শারীরিক আঘাত বা বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করেছিল। এই পদ্ধতিটি পরবর্তীকালে ফিকহবিদদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করেছে, যা প্রমাণ করে যে বিশেষ পরিস্থিতিতে ইবাদতের পদ্ধতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা সম্ভব যদি তা মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়।

তাওহীদ ও শিরকের মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্য: উমর (রা.) ও আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা

হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার বিষয়টি ইসলামের ইতিহাসে তাওহীদ (একেশ্বরবাদ) এবং শিরকের (বহুঈশ্বরবাদ) মধ্যকার একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা হিসেবে কাজ করে। প্রাক-ইসলামি যুগে আরবরা হাজরে আসওয়াদকে একটি উপাস্য হিসেবে গণ্য করত। রাসুলুল্লাহ সা.-এর আগমনের পর এই ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়। হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করা বা চুম্বন করা কেবল একটি সুন্নাহ বা রাসুলুল্লাহ সা.-এর অনুসৃত পদ্ধতি হিসেবে গণ্য হয়, কোনো উপাসনা হিসেবে নয়। এই তাত্ত্বিক পার্থক্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে হযরত উমর (রা.)-এর একটি বিখ্যাত বর্ণনায়। তিনি হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করার সময় বলেছিলেন:

واللَّهِ، إنِّي لأُقَبِّلُكَ، وإنِّي أعلَمُ أنَّكَ حَجرٌ، وأنَّكَ لا تَضُرُّ ولا تَنفَعُ، ولَولا أنِّي رَأيتُ رَسولَ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم ... يُقبِّلُك ما قبَّلتُك

অর্থাৎ, "আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে চুম্বন করছি, অথচ আমি জানি যে তুমি কেবল একটি পাথর এবং তুমি কারো কোনো উপকার বা অপকার করতে সক্ষম নও। যদি আমি রাসুলুল্লাহ সা.-কে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তবে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না" [3]

উমর (রা.)-এর এই বক্তব্যটি ইসলামের তাওহীদ দর্শনের একটি চূড়ান্ত দলিল। তিনি স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন যে, পাথরটির নিজস্ব কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই। তাঁর এই কাজ ছিল সম্পূর্ণভাবে 'ইত্তিবা' বা রাসুলুল্লাহ সা.-এর অনুসরণের উদ্দেশ্যে। এটি প্রমাণ করে যে, মুসলিমদের কাছে হাজরে আসওয়াদ কোনো উপাস্য নয়, বরং এটি রাসুলুল্লাহ সা.-এর একটি সুন্নাহর অংশ মাত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি তৎকালীন আরবের শিরকবাদী মানসিকতাকে সম্পূর্ণভাবে রদ করে দেয়। হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার মাধ্যমে একজন মুমিন কেবল আল্লাহর প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করে, পাথরের প্রতি নয়।

একইভাবে, হযরত আয়েশা (রা.)-এর মাধ্যমে বর্ণিত একটি হাদিস এই বিষয়ে আরও গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রদান করে। রাসুলুল্লাহ সা. হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার বিষয়ে যে সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন, তা ছিল উম্মতের শিরকের প্রতি ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা রোধ করা। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছিলেন:

لولا حَدَثَانُ قومِكِ بالكفرِ لفعلتُ

অর্থাৎ, "যদি তোমার জাতির কুফরিতে (শিরকে) নতুন কোনো প্রবণতা না আসত, তবে আমি (হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার জন্য) অন্য কিছু করতাম" [4] । এই বর্ণনাটি নির্দেশ করে যে, রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত সচেতন ছিলেন যে, সাধারণ মানুষ যেন হাজরে আসওয়াদকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ না করে। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল উম্মতকে শিরকের অন্ধকার থেকে রক্ষা করে তাওহীদের আলোতে রাখার জন্য সুপরিকল্পিত।

হাজরে আসওয়াদ: একটি সাক্ষী ও আধ্যাত্মিক বাস্তবতা

হাজরে আসওয়াদ কেবল একটি ভৌগোলিক বা ঐতিহাসিক বস্তু নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবেও পরিচিত। রাসুলুল্লাহ সা. এই পাথরের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যা এর তাত্ত্বিক ও পরকালীন গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। তিনি বলেছেন:

والله ليبعثنه الله يوم القيامة، له عينان يبصر بهما، ولسان ينطق به، يشهد على من استلمه بحق

অর্থাৎ, "আল্লাহর শপথ! কিয়ামতের দিন আল্লাহ অবশ্যই একে পুনরুত্থিত করবেন; এর দুটি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখবে এবং একটি জিহ্বা থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে, এবং যে ব্যক্তি সত্যের সাথে একে স্পর্শ করবে, সে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে" [5]

এই হাদিসটি হাজরে আসওয়াদকে একটি 'সাক্ষী' (Witness) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি নির্দেশ করে যে, হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার প্রতিটি মুহূর্ত এবং প্রতিটি মানুষের নিয়ত কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে উপস্থাপিত হবে। এই ধারণাটি মুমিনদের মধ্যে এক ধরণের আধ্যাত্মিক সতর্কতা বা 'তাকওয়া' সৃষ্টি করে। যখন একজন ব্যক্তি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করেন, তখন তিনি কেবল একটি পাথর স্পর্শ করছেন না, বরং তিনি এমন একটি সত্তার মুখোমুখি হচ্ছেন যা কিয়ামতের দিন তাঁর ইবাদতের সত্যতা বা মিথ্যাতা প্রকাশ করে দেবে। এটি হাজরে আসওয়াদকে একটি জড় বস্তু থেকে একটি জীবন্ত ও আধ্যাত্মিক সাক্ষ্যে রূপান্তরিত করে।

পরিশেষে, উটের পিঠে চড়ে ধনুকের প্রান্ত দিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার ঘটনাটি ইসলামের বহুমুখী বৈশিষ্ট্যের একটি সমন্বিত রূপ। এটি একদিকে যেমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইবাদতের সহজতর ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি (Fiqh of Necessity) প্রদর্শন করে, অন্যদিকে এটি তাওহীদের কঠোরতা ও শিরকের প্রতি চরম অনীহাকেও নিশ্চিত করে। রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই কর্মপদ্ধতি প্রমাণ করে যে, ইসলামের বিধানসমূহ মানুষের সামর্থ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এর প্রতিটি রীতির পেছনে গভীর তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার এই প্রক্রিয়াটি কেবল একটি শারীরিক কাজ নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, রাসুলুল্লাহ সা.-এর অনুসরণ এবং কিয়ামতের দিনের জবাবদিহিতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

""
৩.১.১ উটের পিঠে বসেই ধনুক দিয়ে হাজরে আসওয়াদ (Black Stone) স্পর্শ করা এবং সাত চক্কর সম্পন্ন করা
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৩.১.১ উটের পিঠে বসেই ধনুক দিয়ে হাজরে আসওয়াদ (Black Stone) স্পর্শ করা এবং সাত চক্কর সম্পন্ন করা কুইজ

1 / 5

মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা.) কাবার তাওয়াফ কীভাবে সম্পন্ন করেছিলেন?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...