৩.৩.২ ভুলবশত বনু আমেরের দুজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা এবং এর আইনি ও নৈতিক দায়
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার শৈশবকালে মদিনা সনদের মাধ্যমে যে আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, তা কেবল অভ্যন্তরীণ শান্তি শৃঙ্খলার জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছিল। বীর মাউনার (Bir Ma'una) মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পর মদিনার ইসলামি রাষ্ট্র এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। এই সংকটেরই এক অনভিপ্রেত ও জটিল আইনি উপজাত (By-product) ছিল বনু আমের গোত্রের দুজন নিরপরাধ ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনাটি কেবল একটি সামরিক ভুল ছিল না, বরং এটি ছিল সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের আইনি সততা, চুক্তির অলঙ্ঘনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের (Siyar) প্রতি দায়বদ্ধতার এক কঠিন পরীক্ষা।
১. বীর মাউনার ট্র্যাজেডি এবং কারকারাতুল কাদরে প্রতিশোধের পটভূমি
বীর মাউনার বিশ্বাসঘাতকতায় সত্তরজন বিশিষ্ট সাহাবি ও ক্বারীকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর, মদিনার মুসলিম সমাজে এক গভীর শোক ও ক্ষোভের পরিবেশ বিরাজ করছিল। এই ভয়াবহ গণহত্যা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া অন্যতম সাহাবি ছিলেন আমর ইবনে উমাইয়া আদ-দামরি রা.। তিনি যখন মদিনার অভিমুখে ফিরছিলেন, তখন তাঁর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত বিপর্যস্ত এবং প্রতিশোধের আগুনে দাহ্য। পথিমধ্যে 'কারকারাতুল কাদর' (Qarqarat al-Kadr) নামক স্থানে একটি গাছের ছায়ায় তিনি বিশ্রাম নিতে থামেন। সেখানে বনু আমের গোত্রের দুজন ব্যক্তি এসে তাঁর সাথে অবস্থান নেয়। আমর ইবনে উমাইয়া রা. তাদের গোত্রীয় পরিচয় জানতে পেরে ধরে নেন যে, এরা সেই বনু আমের গোত্রেরই লোক যারা বীর মাউনার হত্যাকাণ্ডে শরিক ছিল। কিন্তু তিনি অবগত ছিলেন না যে, এই দুই ব্যক্তির সাথে রাসুলুল্লাহ সা.-এর একটি বিশেষ নিরাপত্তা চুক্তি (Aman) বা শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল [1] ।
গভীর রাতে যখন ওই দুই ব্যক্তি ঘুমিয়ে পড়ে, তখন আমর ইবনে উমাইয়া রা. তাদের বীর মাউনার ঘাতক মনে করে এবং প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করেন। তিনি ভেবেছিলেন যে, তিনি মদিনার শত্রুদের হত্যা করে একটি বীরত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। কিন্তু মদিনায় পৌঁছে যখন তিনি রাসুলুল্লাহ সা.-কে এই ঘটনার বিবরণ দেন, তখন রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, একটি বৈধ চুক্তি থাকা অবস্থায় এই হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণ অবৈধ এবং ইসলামি আইনের পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন:
অর্থাৎ, "তুমি এমন দুজন মানুষকে হত্যা করেছ, যাদের রক্তপণ (Diyyah) পরিশোধ করা আমার জন্য অবশ্য কর্তব্য।" তাবাকাত ইবনে সাদ: ২/৫২; Source: 2700/281">[2] । এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধকালীন বা যুদ্ধোত্তর চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও ইসলাম কোনো অবস্থাতেই চুক্তিবদ্ধ বা নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা সমর্থন করে না। আমর ইবনে উমাইয়া রা.-এর এই কাজটি ছিল মূলত একটি 'ভুলবশত হত্যাকাণ্ড' (Qatl al-Khata), যা ইসলামি দণ্ডবিধিতে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত এবং এর জন্য কঠোর আইনি ক্ষতিপূরণ আবশ্যক [3] ।
২. চুক্তির অলঙ্ঘনীয়তা এবং ইসলামি আইনের শাসন
ইসলামি আন্তর্জাতিক আইনের (Islamic International Law) অন্যতম মৌলিক নীতি হলো 'প্যাক্টা সুন্ট সারভান্ডা' (Pacta sunt servanda) বা চুক্তির পবিত্রতা ও অলঙ্ঘনীয়তা। বনু আমের গোত্রের নেতা আবু বারা আমের ইবনে মালিকের সাথে রাসুলুল্লাহ সা.-এর যে চুক্তি হয়েছিল, তা ছিল একটি দ্বিপাক্ষিক অনাগ্রাসন ও নিরাপত্তা চুক্তি। যদিও বনু আমেরের একটি উপদল (আমের ইবনে তুফাইলের নেতৃত্বে) বীর মাউনার গণহত্যায় লিপ্ত হয়েছিল, তবুও মূল গোত্রের সাথে সম্পাদিত চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায়নি। ইসলামে সমষ্টিগত অপরাধের জন্য কোনো নির্দিষ্ট নিরপরাধ ব্যক্তিকে দায়ী করার প্রাক-ইসলামি জাহেলী প্রথাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে [4] ।
রাসুলুল্লাহ সা. এই হত্যাকাণ্ডের পর যে আইনি অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি আমর ইবনে উমাইয়া রা.-এর অজ্ঞতার অজুহাত দেখিয়ে এই অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেননি। যদিও আমর রা. জানতেন না যে ওই দুই ব্যক্তির সাথে চুক্তি রয়েছে, তবুও আইনের দৃষ্টিতে 'অজ্ঞতা অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দেয় না' (Ignorantia juris non excusat)—এই নীতিটি এখানে প্রতিফলিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা. স্পষ্ট করে দেন যে, ইসলামি রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক বা সৈনিক যদি ভুলবশতও কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে (Mu'ahid) হত্যা করে, তবে রাষ্ট্রকে তার পূর্ণ দায়ভার গ্রহণ করতে হবে [5] ।
এই আইনি ও নৈতিক দৃঢ়তা তৎকালীন আরবের গোত্রীয় সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। জাহেলী যুগে যেখানে এক গোত্রের অপরাধের প্রতিশোধ অন্য গোত্রের যেকোনো নিরপরাধ মানুষের ওপর নেওয়া হতো, সেখানে রাসুলুল্লাহ সা. আইনের শাসন (Rule of Law) প্রতিষ্ঠা করলেন। তিনি দেখালেন যে, চুক্তির মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে নিজের কোষাগার থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থদণ্ড দিতে হবে, তবুও নৈতিকতার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না [6] ।
৩. আইনি ও নৈতিক দায়: রক্তপণ (Diyyah) এবং মদিনার সনদের প্রয়োগ
ইসলামি আইন অনুযায়ী, ভুলবশত হত্যাকাণ্ডের (Qatl al-Khata) শাস্তি হলো রক্তপণ বা 'দিয়াত' (Diyyah) পরিশোধ করা এবং একটি মুমিন ক্রীতদাস মুক্ত করা। যেহেতু নিহত দুজন ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম ছিলেন, তাই তাদের রক্তপণের পরিমাণ ছিল স্বাধীন মুসলিম নাগরিকদের সমপরিমাণ। তৎকালীন আরবের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিজন নিহত ব্যক্তির জন্য ১০০টি করে মোট ২০০টি উট রক্তপণ হিসেবে পরিশোধ করা আবশ্যক ছিল, যা ছিল একটি সদ্য প্রতিষ্ঠিত ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিশাল আর্থিক বোঝা [7] ।
এই বিশাল আর্থিক দায় মেটানোর জন্য রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার সনদের (Constitution of Medina) একটি নির্দিষ্ট ধারার আশ্রয় নেন। মদিনা সনদের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল যে, মদিনার অন্তর্ভুক্ত সকল গোত্র—তা সে মুসলিম হোক বা ইহুদি—যৌথ নিরাপত্তা এবং রক্তপণ পরিশোধের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবে। বিশেষ করে, বনু নাজির (Banu Nadir) গোত্রের সাথে বনু আমেরের একটি প্রাচীন মিত্রতা চুক্তি ছিল। মদিনা সনদের ধারা অনুযায়ী, কোনো মিত্র গোত্রের রক্তপণ পরিশোধের ক্ষেত্রে যৌথ অংশীদারিত্বের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল [8] ।
রাসুলুল্লাহ সা. এই আইনি বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতে বনু নাজিরের কাছে রক্তপণের আংশিক দাবি করার সিদ্ধান্ত নেন। এটি কোনো দয়া বা সাহায্য প্রার্থনা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি লিখিত আন্তর্জাতিক চুক্তির আইনি প্রয়োগ (Enforcement of Treaty Obligations)। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. প্রমাণ করেন যে, মদিনা সনদ কেবল কাগজের দলিল ছিল না, বরং তা ছিল একটি কার্যকর আইনি কাঠামো, যার অধীনে মদিনার সকল নাগরিক ও গোত্র সমানভাবে অধিকার ও কর্তব্যের বন্ধনে আবদ্ধ ছিল [9] ।
৪. কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বনু নাজিরের চক্রান্তের সূচনা
রক্তপণের অর্থ সংগ্রহের জন্য রাসুলুল্লাহ সা. নিজেই একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল নিয়ে বনু নাজির গোত্রের বসতিতে গমন করেন। এই প্রতিনিধিদলে তাঁর সাথে ছিলেন আবু বকর সিদ্দিক রা., উমর ইবনুল খাত্তাব রা., আলি ইবনে আবি তালিব রা.-এর মতো শীর্ষস্থানীয় সাহাবিগণ। এই কূটনৈতিক মিশনটি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী পরিচালিত। রাসুলুল্লাহ সা. বনু নাজিরের নেতাদের সাথে বৈঠকে বসেন এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী তাদের অংশের রক্তপণ দাবি করেন [10] [11] ।
বনু নাজিরের নেতৃবৃন্দ বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত ভদ্রতা প্রদর্শন করে এবং বলে, "হে আবুল কাসিম! আপনি যা চেয়েছেন তা আমরা দেব। আপনি এখানে বসুন, আমরা অর্থ সংগ্রহ করে আনছি।" কিন্তু পর্দার আড়ালে তারা এক জঘন্য ও কাপুরুষোচিত ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করে। তারা ভাবল, মুহাম্মাদ সা. এখন অত্যন্ত অল্প কয়েকজন সঙ্গীসহ তাদের দুর্গের দেয়ালের নিচে বসে আছেন। এই সুযোগে উপর থেকে একটি ভারী পাথর বা যাঁতার পাথর ফেলে তাঁকে হত্যা করা অত্যন্ত সহজ। এই চক্রান্তের নেতৃত্ব দেয় হুয়াই ইবনে আখতাব এবং আমর ইবনে জিহাস [12] ।
এই কূটনৈতিক মিশনটি ইসলামি ইতিহাসের এক নতুন মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বনু নাজিরের এই বিশ্বাসঘাতকতা কেবল একটি ব্যক্তিগত চক্রান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল মদিনা সনদের সরাসরি লঙ্ঘন এবং মদিনা রাষ্ট্রের প্রধানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। রাসুলুল্লাহ সা. ওহীর মাধ্যমে এই চক্রান্তের কথা জানতে পেরে অত্যন্ত নীরবে সেখান থেকে উঠে মদিনায় ফিরে আসেন। বনু আমেরের দুজন নিরপরাধ ব্যক্তির ভুলবশত হত্যার আইনি দায় মেটাতে গিয়ে যে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছিল, তা বনু নাজিরের চরম বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়, যা পরবর্তীকালে মদিনার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ইহুদি গোত্রগুলোর সাথে সম্পর্কের সমীকরণকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল [13] ।