ফন্ট:100%
থিম:

১.১ ওহী কি? ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে ওহীর সংজ্ঞা, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

১.১ ওহী কি? ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে ওহীর সংজ্ঞা, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও পরম সত্তা আল্লাহ তাআলা যখন তাঁর সৃষ্টির মাঝে নির্দিষ্ট কিছু মানবকে মনোনীত করে এবং তাঁদের মাধ্যমে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য বিশেষ জ্ঞান বা বার্তা প্রেরণ করেন, তখন সেই প্রক্রিয়াটিকেই ইসলামি পরিভাষায় 'ওহী' বলা হয়। ওহী কেবল একটি তথ্য আদান-প্রদান নয়, বরং এটি স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার একটি অতিপ্রাকৃত ও মহিমান্বিত সংযোগস্থল। ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে (Epistemology) ওহীর অবস্থান অত্যন্ত সুউচ্চ; কারণ মানুষের সীমিত বুদ্ধিবৃত্তিক ও ইন্দ্রিয়জ জ্ঞান যেখানে সমাপ্ত হয়, ওহীর আলোকবর্তিকা সেখান থেকেই শুরু হয়। ওহী হলো সেই পরম সত্যের উৎস, যা মানুষের নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

ওহীর ভাষাগত ও পারিভাষিক বিশ্লেষণ: একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা

ওহীর স্বরূপ অনুধাবন করার জন্য এর ভাষাগত (Linguistic) ও পারিভাষিক (Technical) উভয় দিক বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। আরবি অভিধান ও ভাষাতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে 'ওহী' (الوحي) শব্দটির মূল অর্থ অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্ম। ওহীর আভিধানিক অর্থ হলো অত্যন্ত দ্রুত এবং গোপন কোনো সংকেত বা বার্তা প্রদান করা। এটি এমন এক প্রকার যোগাযোগ যা সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে থাকে এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হয়।

أصل الوحي لغة: الإشارة السريعة، وقيل: إنه الإعلام الخفي السريع الخاص بمن يوحى إليه بحيث يخفى على غيره. [1] ভাষাতাত্ত্বিক এই সংজ্ঞায় 'দ্রুততা' (Speed) এবং 'গোপনীয়তা' (Secrecy/Hiddenness) দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ, ওহী এমন এক প্রকার সংবাদ যা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এবং এমনভাবে প্রদান করা হয় যা সাধারণ মানুষের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ক্ষমতার বাইরে থাকে। ইসলামি পণ্ডিতগণ ওহীর এই ভাষাগত বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করেই এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। ওহী কেবল সাধারণ কোনো সংকেত নয়, বরং এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মনোনীত বান্দাদের প্রতি তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত বিশেষ ও গোপন সংবাদ।

পারিভাষিক বা শরীয়তের দৃষ্টিতে ওহীর সংজ্ঞা আরও সুনির্দিষ্ট। ওহী হলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর নবি ও রাসুলগণের নিকট প্রেরিত এমন এক বিশেষ জ্ঞান বা বার্তা, যা মানুষের সাধারণ জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার (Reasoning or Sensory perception) ঊর্ধ্বে। ওহীর এই প্রক্রিয়াটি বিভিন্নভাবে হতে পারে, তবে এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের হেদায়েতের জন্য ঐশী নির্দেশ প্রদান করা। আল-তাবারী (রহ.) ওহীর এই বিশেষত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে একে ঐশী প্রেরণের (Divine Sending) একটি মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

فالوحي من معانيه العامة أنه الإعلام الخفي السريع، الخاص بمن يُوجَّه إليه، بحيث يخفى عن غيره، ومنه الإلهام الغريزي كالوحي إلى النحل، وإلهام الخواطر. [2] এখানে লক্ষ্যণীয় যে, ওহীর একটি ব্যাপক অর্থ রয়েছে যা এমনকি প্রাকৃতিক জগতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যেমন মৌমাছির প্রতি আল্লাহর সহজাত প্রেষণা (Instinctual Inspiration)। তবে নবি ও রাসুলগণের ক্ষেত্রে ওহী হলো একটি সুনির্দিষ্ট ও আইনগত বিধান, যা মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত ও অকাট্য সত্য হিসেবে গণ্য। ওহীর এই দ্বিমুখী প্রকৃতি—ভাষাগত ও পারিভাষিক—এটি প্রমাণ করে যে, ওহী কেবল একটি শব্দ নয়, বরং এটি একটি মহাজাগতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা যা স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয়।

ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে ওহীর স্বরূপ ও জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান

ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব বা Epistemology-তে জ্ঞানের উৎস হিসেবে ওহীর অবস্থান হলো সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত। মানুষের জ্ঞান অর্জনের প্রধানত তিনটি মাধ্যম রয়েছে: ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান (Sensory perception), যুক্তিনির্ভর জ্ঞান (Rational reasoning) এবং ওহী বা ঐশী জ্ঞান (Divine revelation)। যদিও মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তি অনেক ক্ষেত্রে সত্যের সন্ধান দিতে পারে, কিন্তু তা সর্বদা সীমাবদ্ধ এবং পরিবর্তনশীল। যুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান অনেক সময় ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি বা সামাজিক প্রেক্ষাপটের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, যা পরম সত্যের (Absolute Truth) নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম নয়।

ওহী হলো সেই জ্ঞান যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে। ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান হলো 'ইলমুল ইয়াকিন' বা নিশ্চিত জ্ঞান। ওহী কোনো অনুমান বা তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং এটি সরাসরি স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসা সত্য। ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোতে ওহীকে 'খবর' বা সংবাদ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। যখন মানুষের যুক্তি কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম হয় বা দ্বন্দ্বে পড়ে, তখন ওহী সেই দ্বন্দ্বে চূড়ান্ত সমাধান প্রদান করে।

ويكاد المفسرون يتفقون في تعريفهم للوحي من حيث المفهوم الشرعي القرآني له... فالطبري أبو جعفر محمد بن جرير يفهم من الوحي أنه الإرسال الإلهي بالنبوة. [3] ইমাম তাবারী (রহ.)-এর এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝা যায় যে, ওহী কেবল তথ্য নয়, বরং এটি নবুওয়াতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ওহী ছাড়া নবুওয়াত অসম্ভব এবং নবুওয়াত ছাড়া মানুষের কাছে ঐশী বিধান পৌঁছানো সম্ভব নয়। সুতরাং, ওহী হলো সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি যার ওপর দাঁড়িয়ে ইসলামি শরিয়ত ও আকীদা প্রতিষ্ঠিত। ওহী মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে ধ্বংস করে না, বরং বুদ্ধিবৃত্তিকে সঠিক ও সুশৃঙ্খল পথে পরিচালিত করে। এটি মানুষের চিন্তাশক্তিকে একটি নির্দিষ্ট ও অকাট্য মানদণ্ডের (Criterion/Furqan) ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়, যার মাধ্যমে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা সম্ভব হয়।

জ্ঞানতাত্ত্বিক দিক থেকে ওহীর গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এটি মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য (Purpose of existence) এবং পরকালীন জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা প্রদান করে। মানুষের বুদ্ধি দিয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হলেও, স্রষ্টার সন্তুষ্টির উপায় এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান অর্জন করা বুদ্ধির সাধ্যাতীত। এই শূন্যস্থানটি পূরণ করার জন্যই ওহীর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

মানবসভ্যতা ও নৈতিক কাঠামোর জন্য ওহীর অপরিহার্যতা ও প্রয়োজনীয়তা

মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানুষের নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা প্রায়শই পরিবর্তনশীল এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের মূল্যবোধ পরিবর্তিত হয়, যা অনেক সময় বিশৃঙ্খলা ও অন্যায়ের জন্ম দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ওহী একটি চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় নৈতিক মানদণ্ড (Universal Moral Standard) হিসেবে কাজ করে। ওহী ছাড়া মানুষের নৈতিকতা কেবল সামাজিক চুক্তি বা ব্যক্তিগত অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা অত্যন্ত ভঙ্গুর।

ওহী মানবসভ্যতাকে একটি সুসংহত ও ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো প্রদান করে। এটি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা এবং সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রদান করে। ওহীর নির্দেশিত জীবনব্যবস্থা মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার (Justice), সাম্য (Equality) এবং ভ্রাতৃত্বের (Brotherhood) চেতনা জাগ্রত করে। ওহী না থাকলে সমাজ কেবল 'জোর যার মুল্লুক তার'—এই নীতিতে পরিচালিত হতো, যেখানে দুর্বলরা শোষিত হতো এবং শক্তিশালীরা অন্যায়ের আশ্রয় নিত।

ওহীর প্রভাব যে কেবল তাত্ত্বিক বা দার্শনিক, তা ঐতিহাসিক বাস্তবতার মাধ্যমেও প্রমাণিত। ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জীবনদর্শন কীভাবে একটি অবাধ্য ও অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে একটি উন্নত ও সুশৃঙ্খল সভ্যতায় রূপান্তরিত করতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো নবি সা.-এর জীবন ও তাঁর সাহাবিদের চরিত্র। ওহীর আলোয় আলোকিত হয়ে মানুষের অন্তরে যে পরিবর্তন আসে, তা কেবল বাহ্যিক নিয়মকানুন দিয়ে সম্ভব নয়।

إن الإسلام يغري الناس بالدخول فيه بتحريك العواطف الشهوانية... وعلى هؤلاء أن يفكروا قليلا كم يكون الدين الذي يحرم الخمر شديدا في محاربته للعواطف الشهوانية. [4] ওহীর নির্দেশিত নৈতিকতা মানুষের প্রবৃত্তিকে (Desires) নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। যেমন, ইসলামে মদ্যপান বা অন্যান্য অনৈতিক কাজ নিষিদ্ধ করার পেছনে যে গভীর নৈতিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে, তা ওহীর নির্দেশনার মাধ্যমেই মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক হয়ে ওঠে। ওহী মানুষের প্রবৃত্তিকে দমন করে না, বরং তাকে একটি উচ্চতর ও পবিত্র স্তরে উন্নীত করে।

ওহীর এই রূপান্তরমূলক ক্ষমতার একটি বাস্তব উদাহরণ হলো থুমামা বিন উসাল (রা.)-এর ঘটনা। থুমামা (রা.) ছিলেন একজন কঠোর শত্রু, যার হৃদয়ে ইসলামের প্রতি তীব্র ঘৃণা ছিল। কিন্তু নবি সা.-এর ওহী-নির্দেশিত মহানুভবতা এবং তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য থুমামার হৃদয়ে এমন এক প্রভাব ফেলেছিল যে, মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে তিনি ইসলামের প্রতি অনুগত হয়ে পড়েন।

فأصبح دينك أحب الدين إلي، والله ما كان من بلد أبغض إلي من بلدك فأصبح بلدك أحب البلاد إلي. [5] থুমামা (রা.)-এর এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, ওহী কেবল একটি আইনি দলিল নয়, বরং এটি মানুষের হৃদয়ের অন্ধকার দূর করার এক জ্যোতির্ময় শক্তি। ওহী মানুষের অন্তরে সত্যের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করে এবং মানুষের আচরণের মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজ গঠনের পথ প্রশস্ত করে। সুতরাং, মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষা, নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ওহীর প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতা অপরিসীম। ওহী ছাড়া মানবসভ্যতা কেবল একটি লক্ষ্যহীন ও বিশৃঙ্খল যাত্রার নামান্তর মাত্র।

""
১.১ ওহী কি? ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে ওহীর সংজ্ঞা, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১.১ ওহী কি? ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে ওহীর সংজ্ঞা, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা কুইজ

1 / 5

আরবি অভিধান অনুযায়ী 'ওহী' শব্দের মূল অর্থ কী?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...