খণ্ড 87
ফন্ট:100%
থিম:

১৪.২৬ এথিক্যাল কন্সিডারেশনস (Ethical Considerations): জেনেটিক মোডিফিকেশন (GMO) এবং বায়ো-এথিকসে কুরআনিক 'ফিতরাত' কনসেপ্টের প্রয়োগ

ভূমিকা ও ফিতরাতের তাত্ত্বিক রূপরেখা: সৃষ্টিতাত্ত্বিক অখণ্ডতা (Ontological Integrity)


ইসলামি জীবনদর্শনে 'ফিতরাত' (فطرة) কেবল একটি ধর্মতাত্ত্বিক পরিভাষা নয়, বরং এটি সৃষ্টির আদি ও অকৃত্রিম সত্তাগত নকশা বা সৃষ্টিতাত্ত্বিক অখণ্ডতার (Ontological Integrity) এক চিরন্তন ঘোষণা। মহান আল্লাহ প্রতিটি সৃষ্টিকে একটি নির্দিষ্ট স্বভাব, ভারসাম্য ও অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যা তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য ও উপযোগিতাকে নির্ধারণ করে। আধুনিক জৈব-প্রযুক্তি (Biotechnology) এবং জেনেটিক মোডিফিকেশনের (GMO) যুগে এই ফিতরাতের ধারণাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। মানুষের স্বভাবগত চরিত্র এবং সৃষ্টির আদি রূপের মধ্যে যে গভীর যোগসূত্র রয়েছে, তা সীরাতগ্রন্থের তাত্ত্বিক আলোচনা থেকে স্পষ্ট অনুমেয়। মানুষের নৈতিক গুণাবলী কি অর্জিত (Acquired) নাকি তা জন্মগত বা ফিতরাতগত (Innate)—এই বিতর্কের মীমাংসা করতে গিয়ে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইসলামি চিন্তাবিদগণ ফিতরাতের ধারণাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে মূল আরবি ইবারতটি প্রণিধানযোগ্য:

"مما سلف من القول يتضح لنا أن الأخلاق منها ما هو كسبي، ومنها ما هو جبِلِّي طبعي، وإن الكسبي إنما هو لأخلاق معلومة ظاهرة في الواقع يحاول الإنسان أن يتخلق بها بالتدرب عليها، ورياضة النفس بها..."

অনুবাদ ও সূত্র: "পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে আমাদের নিকট স্পষ্ট হয় যে, চরিত্র বা নৈতিকতার কিছু অংশ অর্জিত এবং কিছু অংশ জন্মগত বা স্বভাবজাত। আর অর্জিত চরিত্র হলো বাস্তব জীবনে দৃশ্যমান এমন কিছু নৈতিক গুণাবলী, যা মানুষ অনুশীলনের মাধ্যমে এবং আত্মিক সাধনার দ্বারা অর্জন করার চেষ্টা করে..." [1]

এই স্বভাবজাত বা জন্মগত চরিত্রই হলো ফিতরাতের বহিঃপ্রকাশ, যা মানুষের জৈবিক ও আত্মিক কাঠামোর মূল ভিত্তি। পাশ্চাত্য দর্শনে মানুষের এই আদি স্বভাব বা 'State of Nature' (حالة الطبيعة) নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। ফরাসি দার্শনিক হেলভেটিয়াস (Helvetius) মনে করতেন, মানুষ স্বভাবগতভাবে ভালো বা মন্দ কোনোটিই নয়, বরং সে কেবল আত্মরক্ষার তাগিদে চালিত একটি সত্তা [2] । কিন্তু এই যান্ত্রিক ও বস্তুগত ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ডেনিস দিদেরো (Denis Diderot) যুক্তি দিয়েছিলেন যে, মানুষ শূন্য স্লেট বা 'Tabula Rasa' নিয়ে জন্মায় না, বরং তার মধ্যে জন্মগতভাবেই কিছু প্রবণতা ও সম্ভাবনা নিহিত থাকে:

"لا يولد الإنسان غفلاً أو خالياً من كل شيء، حقاً أنه يولد بدون أفكار أو انفعالات موجهة، ولكنه منذ اللحظة الأولى يوهب استعداد أو ميلاً..."

অনুবাদ ও সূত্র: "মানুষ সম্পূর্ণ শূন্য বা অবিন্যস্ত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে না। এটি সত্য যে সে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা বা পরিচালিত আবেগ ছাড়াই জন্মায়, কিন্তু প্রথম মুহূর্ত থেকেই সে একটি বিশেষ যোগ্যতা বা প্রবণতা প্রাপ্ত হয়..." [3]

ইসলামি দর্শনে এই জন্মগত যোগ্যতা বা প্রবণতাই হলো ফিতরাত। যখন আমরা এই ফিতরাতকে জৈব-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করি, তখন এটি সৃষ্টির প্রাকৃতিক ও জিনগত নকশাকে অক্ষুণ্ণ রাখার এক অলঙ্ঘনীয় নৈতিক প্রাচীর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সৃষ্টির এই আদি নকশায় যেকোনো অনধিকার চর্চা বা কৃত্রিম পরিবর্তন ফিতরাতের মৌলিক নীতির পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হয়।

জেনেটিক মোডিফিকেশন (GMO) এবং 'তাকয়ীরু খালকিল্লাহ' (সৃষ্টির বিকৃতি)


আধুনিক জিন প্রকৌশল বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ জগতের জিনগত বিন্যাস পরিবর্তন করে নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীব বা ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে, যা সাধারণভাবে জিএমও (GMO) নামে পরিচিত। ইসলামি বায়ো-এথিকসের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রযুক্তির নৈতিকতা বিচার করতে গেলে কুরআনে বর্ণিত 'তাকয়ীরু খালকিল্লাহ' (تغيير خلق الله) বা আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি সাধনের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সামনে আসে। শয়তানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে প্ররোচিত করে আল্লাহর সৃষ্টির স্বাভাবিক রূপ ও ফিতরাতকে বিকৃত করা। জেনেটিক মোডিফিকেশন যদি সৃষ্টির প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে এবং জীবের নিজস্ব সত্তাগত বৈশিষ্ট্যকে চিরতরে বিলুপ্ত করে দেয়, তবে তা ফিতরাতের ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।

পাশ্চাত্য দর্শনে প্রকৃতির এই রূপান্তরকে অনেক সময় কেবল উপযোগবাদী (Utilitarian) দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, যেখানে মানুষের তাৎক্ষণিক লাভ-ক্ষতিই একমাত্র বিবেচ্য। কিন্তু দিদেরো যেমনটি উল্লেখ করেছেন, প্রকৃতির নিজস্ব একটি সীমা রয়েছে যা অতিক্রম করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব এবং ক্ষতিকর:

"إننا لا نستطيع أن نعطي ما رفضته الطبيعة، وربما نقضي على ما تهبه الطبيعة .. إن التعليم يعمل على تحسين ما تهبه لنا"

অনুবাদ ও সূত্র: "প্রকৃতি যা প্রত্যাখ্যান করেছে তা আমরা প্রদান করতে পারি না, এবং সম্ভবত প্রকৃতি যা দান করেছে তা আমরা ধ্বংস করে ফেলি... শিক্ষা কেবল প্রকৃতি আমাদের যা দিয়েছে তার উন্নতি সাধন করতে পারে" [4]

এই দার্শনিক সত্যটি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা যদি কোনো জীবের ফিতরাত বা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে এমনভাবে বদলে দিই যা তার নিজস্ব অস্তিত্বের জন্য ক্ষতিকর, তবে তা হবে ফিতরাতের লঙ্ঘন। উদাহরণস্বরূপ, ফসলের ফলন বাড়ানোর জন্য জিনগত পরিবর্তন যদি পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে বা মানবদেহে নতুন কোনো রোগের সৃষ্টি করে, তবে তা ইসলামি শরীয়াহর 'লা জারারা ওয়া লা জিরার' (ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না) নীতির পরিপন্থী হবে। রাসুলুল্লাহ সা. সৃষ্টির স্বাভাবিক বিকাশ ও ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন, যা তাঁর সীরাতের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়েছে [5] । অতএব, জেনেটিক মোডিফিকেশন কেবল তখনই বৈধ হতে পারে যখন তা সৃষ্টির ফিতরাতকে ধ্বংস না করে, বরং তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি বা মানব কল্যাণে কোনো অনভিপ্রেত ক্ষতি ছাড়াই ব্যবহৃত হয়।

বায়ো-এথিকস এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে ফিতরাতের প্রায়োগিক নীতি


চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বায়ো-এথিকসের ক্ষেত্রে ফিতরাতের ধারণাটি একটি দিকনির্দেশক নীতি হিসেবে কাজ করে। মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা মূলত তার ফিতরাতের ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর নির্ভরশীল। যখনই এই ফিতরাত বা প্রাকৃতিক নিয়মে কোনো কৃত্রিম হস্তক্ষেপ করা হয়, তখনই জৈবিক ও নৈতিক বিপর্যয় নেমে আসে। ইসলামি বায়ো-এথিকস কেবল বস্তুগত উপযোগিতাকে প্রাধান্য দেয় না, বরং এটি মানুষের আত্মিক ও ফিতরাতগত মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দেয়। এই মর্যাদা ও গাম্ভীর্য মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্যের অংশ, যা কোনো কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা যায় না। এই প্রসঙ্গে 'খাতামুন নাবিয়্যীন' গ্রন্থে মানুষের ফিতরাতগত মর্যাদা ও গাম্ভীর্যের চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়:

"والمهابة الفطرية التكوينية المستمدة من العلم والخلق والفضيلة هى والتواضع صنوان ينبعان من معين واحد، فهما لا يفترقان..."

অনুবাদ ও সূত্র: "জ্ঞান, চরিত্র ও পুণ্য থেকে উৎসারিত ফিতরাতগত ও সৃষ্টিগত গাম্ভীর্য এবং বিনয় হলো একই উৎসের দুটি সহোদর রূপ, যা কখনো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না..." [6]

এই ফিতরাতগত গাম্ভীর্য ও মর্যাদা মানুষের জিনগত কাঠামোর মধ্যেও নিহিত রয়েছে। ক্লোনিং (Cloning), জিন এডিটিং (CRISPR) বা মানব ভ্রূণের জিনগত পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই ফিতরাতগত মর্যাদাকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। মানুষকে কেবল একটি জৈবিক উপাদান বা গবেষণাগারের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা ফিতরাতের চরম অবমাননা। কুরআনের সূরা আল-আরাফের ১৯৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:

"خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ"

অনুবাদ ও সূত্র: "আপনি ক্ষমাশীলতা অবলম্বন করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন" [7]

আল্লামা তাহের ইবনে আশুর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, এখানে 'উর্ফ' বা সৎকাজ বলতে এমন বিষয়গুলোকে বোঝানো হয়েছে যা মানুষের সুস্থ ফিতরাত ও বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা স্বীকৃত [8] । চিকিৎসা বিজ্ঞানে যেকোনো নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ অবশ্যই এই 'উর্ফ' এবং সুস্থ ফিতরাতের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। যদি কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি বা জিনগত হস্তক্ষেপ মানুষের ফিতরাতকে কলুষিত করে বা মানব বংশগতির স্বাভাবিক ধারাকে বিনষ্ট করে, তবে তা ইসলামি বায়ো-এথিকসের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হবে।

পাশ্চাত্য দর্শন বনাম ইসলামি ফিতরাত তত্ত্ব: একটি তুলনামূলক বায়ো-এথিক্যাল বিশ্লেষণ


পাশ্চাত্য বায়ো-এথিকস মূলত ধর্মনিরপেক্ষ উপযোগবাদ (Secular Utilitarianism) এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের (Individualism) ওপর প্রতিষ্ঠিত। হেলভেটিয়াসের মতো দার্শনিকগণ মনে করতেন যে, মানুষের সমস্ত নৈতিকতা ও সামাজিক নিয়মাবলী কেবল পারস্পরিক স্বার্থ ও সুখের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে:

"إن لفظتي الخير والشر في تطبيقها على الناس ليس لهما معنى إلا في مجتمع، وكل الطيبة فضيلة اجتماعية وهي نتاج التدريب أو التعليم الاجتماعي..."

অনুবাদ ও সূত্র: "মানুষের ক্ষেত্রে ভালো এবং মন্দ শব্দ দুটির সমাজ ছাড়া কোনো অর্থ নেই। সমস্ত কল্যাণই হলো একটি সামাজিক গুণ, যা সামাজিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের ফল..." [9]

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, যদি জেনেটিক মোডিফিকেশন বা বায়ো-টেকনোলজির মাধ্যমে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কোনো বস্তুগত লাভ বা সুখ অর্জিত হয়, তবে তা নৈতিকভাবে বৈধ বলে গণ্য হতে পারে—তাতে সৃষ্টির আদি ফিতরাত যতই লঙ্ঘিত হোক না কেন। কিন্তু ইসলামি ফিতরাত তত্ত্ব এই সংকীর্ণ উপযোগবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। ইসলাম মনে করে, ভালো ও মন্দের ধারণা কেবল সামাজিক চুক্তি বা বস্তুগত উপযোগিতার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা মানুষের ফিতরাতের মধ্যে আল্লাহ কর্তৃক স্থায়ীভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। ইবনে রজব আল-হাম্বলী তাঁর 'লাতায়েফুল মাআরিফ' গ্রন্থে রাসুলুল্লাহ সা. এর স্বভাবজাত চরিত্র ও উদারতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন:

"ولما كان الله عز وجل قد جَبَلَ نبيه صلى الله عليه وسلم على أكمل الأخلاق وأشرفها..."

অনুবাদ ও সূত্র: "যেহেতু মহান আল্লাহ তাঁর নবি সা. কে সবচেয়ে নিখুঁত ও সম্মানিত চরিত্রের ওপর সৃষ্টিগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন..." [10]

রাসুলুল্লাহ সা. এর এই ফিতরাতগত বা সৃষ্টিগত পূর্ণতা প্রমাণ করে যে, নৈতিকতার একটি পরম ও ঐশ্বরিক মানদণ্ড রয়েছে যা মানুষের জিনগত ও আত্মিক কাঠামোর সাথে সম্পৃক্ত। পাশ্চাত্য বায়ো-এথিকস যেখানে মানুষের জিনকে কেবল একটি বস্তুগত সম্পদ হিসেবে দেখে যা প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তনযোগ্য, সেখানে ইসলামি বায়ো-এথিকস মানুষের জিনগত নকশাকে আল্লাহর এক পবিত্র আমানত হিসেবে গণ্য করে। এই আমানতের সংরক্ষণই হলো ফিতরাতের দাবি। মানুষের স্বার্থপরতা বা কৃত্রিম সুখের জন্য এই ফিতরাতকে পরিবর্তন করার অধিকার মানুষের নেই, কারণ মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ এবং এই সীমাবদ্ধ জ্ঞান নিয়ে সৃষ্টির আদি নকশায় হস্তক্ষেপ করলে তা সমগ্র মানবজাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে [11]

সংশ্লেষণ ও সমকালীন জৈব-প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের সমাধানকল্পে ফিতরাতের ভূমিকা


সমকালীন জৈব-প্রযুক্তি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্রুত বিকাশ মানবজাতিকে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে যেখানে বিজ্ঞানের ক্ষমতা এবং নৈতিকতার সীমানা পরস্পর মুখোমুখি। এই জটিল পরিস্থিতিতে কুরআনিক ফিতরাতের ধারণাটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থী সমাধান প্রদান করে। ফিতরাত বিজ্ঞানকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে না, বরং এটি বিজ্ঞানকে একটি নৈতিক ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে পরিচালিত করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ফিতরাতের পুনরুদ্ধার (Restoration of Fitrah), ফিতরাতের বিকৃতি (Alteration of Fitrah) নয়। অর্থাৎ, কোনো জিনগত ত্রুটি বা রোগ নিরাময়ের জন্য যদি জেনেটিক থেরাপি ব্যবহার করা হয় যা মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাতকে ফিরিয়ে আনে, তবে তা ইসলামি শরীয়াহর দৃষ্টিতে কেবল বৈধই নয়, বরং প্রশংসনীয়। কিন্তু যদি এই প্রযুক্তি মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাতকে পরিবর্তন করে কোনো 'সুপার-হিউম্যান' বা কৃত্রিম প্রজাতি তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তবে তা হবে ফিতরাতের চরম লঙ্ঘন।

রাসুলুল্লাহ সা. এর সীরাত থেকে আমরা জানতে পারি যে, তিনি সর্বদা মানুষের স্বাভাবিক ও ফিতরাতগত আবেগকে সম্মান করতেন এবং কোনো কৃত্রিম বা জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া নিয়মকে পছন্দ করতেন না। হযরত আনাস বিন মালিক রা. এর দীর্ঘ দশ বছরের খিদমতের বিবরণ থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর স্বাভাবিক আচরণে কখনো কোনো কৃত্রিমতা বা কঠোরতা দেখাননি [12] । সৃষ্টির স্বাভাবিক গতি ও ফিতরাতের প্রতি এই যে পরম শ্রদ্ধা, এটিই আধুনিক বায়ো-এথিকসের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। বিজ্ঞান যখন ফিতরাতের এই সীমানাকে শ্রদ্ধা করে পরিচালিত হবে, তখনই তা মানবজাতির জন্য প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনতে সক্ষম হবে। অন্যথায়, ফিতরাতহীন বিজ্ঞান কেবল সৃষ্টির বিপর্যয় ও মানব অস্তিত্বের সংকটকেই ত্বরান্বিত করবে।

""
১৪.২৬ এথিক্যাল কন্সিডারেশনস (Ethical Considerations): জেনেটিক মোডিফিকেশন (GMO) এবং বায়ো-এথিকসে কুরআনিক 'ফিতরাত' কনসেপ্টের প্রয়োগ
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১৪.২৬ এথিক্যাল কন্সিডারেশনস (Ethical Considerations): জেনেটিক মোডিফিকেশন (GMO) এবং বায়ো-এথিকসে কুরআনিক 'ফিতরাত' কনসেপ্টের প্রয়োগ কুইজ

1 / 5

ইসলামি জীবনদর্শনে 'ফিতরাত' বলতে কী বোঝায়?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...