খণ্ড 93
ফন্ট:100%
থিম:

১১.১২ গাজা ও ফিলিস্তিন কনফ্লিক্টে আইডিএফ (IDF) প্রোপাগান্ডা এবং অ্যালগরিদমিক সেন্সরশিপের (Algorithmic Censorship) কেস স্টাডি

একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত কেবল রণক্ষেত্র বা ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং ডিজিটাল তথ্যপ্রবাহের এক জটিল গোলকধাঁধায় রূপান্তরিত হয়েছে। গাজা ও ফিলিস্তিন সংকটের প্রেক্ষাপটে আমরা এমন এক যুদ্ধ menyaksikan করছি, যেখানে বুলেটের শব্দের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে 'তথ্য' বা 'ন্যারেটিভ'। এই যুদ্ধক্ষেত্রে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস (IDF) কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করছে না, বরং তারা একটি সুসংগঠিত 'কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার' বা জ্ঞানীয় যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করছে। এই কৌশলের মূল ভিত্তি হলো প্রোপাগান্ডা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত 'অ্যালগরিদমিক সেন্সরশিপ'। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারসাজির মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আখ্যানকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং এর বিপরীতে সত্যের কণ্ঠস্বরকে কীভাবে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

ডিজিটাল রণক্ষেত্র ও কগনিটিভ ওয়ারফেয়ারের বিবর্তন

আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার বিবর্তন নির্দেশ করে যে, এখনকার যুদ্ধ কেবল ভূখণ্ড দখলের জন্য নয়, বরং মানুষের চিন্তাশক্তি ও বিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। গাজা উপত্যকার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এখন একটি নতুন 'রণক্ষেত্র' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এখানে প্রোপাগান্ডা কেবল মিথ্যা তথ্য ছড়ানো নয়, বরং সত্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে তা বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ক্ষমতাধর রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীগুলো সবসময়ই তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং বিরোধী মতাদর্শের বিস্তার রোধ করতে সেন্সরশিপ বা সেন্সর করার প্রক্রিয়াকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। যেমনটি বলা হয়েছে:

أظن أن خلفائي فكروا في الرقابة وسيلة لمنع انتشار الأفكار التي قد تقوض الأساس الأخلاقي للنظام الاجتماعي
[1] । অর্থাৎ, সামাজিক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে এমন ধারণা বা চিন্তার বিস্তার রোধ করতে সেন্সরশিপকে একটি কৌশলগত মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার বা জ্ঞানীয় যুদ্ধের এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এটি মানুষের অবচেতন মনকে লক্ষ্য করে কাজ করে। যখন কোনো পক্ষ প্রোপাগান্ডা চালায়, তখন তারা কেবল তথ্য প্রদান করে না, বরং তথ্যের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা 'ফ্রেমওয়ার্ক' তৈরি করে দেয়। গাজা সংকটের ক্ষেত্রে আইডিএফ-এর কৌশলগত লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনিদের মানবিক বিপর্যয়কে একটি 'নিরাপত্তা ঝুঁকি' বা 'সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান' হিসেবে চিত্রিত করা। এই প্রক্রিয়ায় সত্যের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায় সেই আখ্যানটি, যা আন্তর্জাতিক জনমতকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে মানুষের বিচারবুদ্ধি বা 'Reason' প্রায়শই আবেগ বা প্রোপাগান্ডার কাছে পরাজিত হয়। ঐতিহাসিক দার্শনিক ভলতেয়ার এবং বেনেডিক্টের মধ্যকার বিতর্ক থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, মানুষের মন বা যুক্তি অনেক সময় অত্যন্ত ভঙ্গুর হতে পারে এবং এটি সহজেই নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। ভলতেয়ার উল্লেখ করেছেন:

أنا غالباً ما سلمت بهشاشة العقل وسهولة انقياده. أنا أعلم نزوعه إلى إثبات كل ما توحي به رغباتنا
[2] । অর্থাৎ, মানুষের যুক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং এটি প্রায়শই মানুষের নিজস্ব ইচ্ছা বা প্রোপাগান্ডার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সেই সত্যকেই প্রমাণ করতে চায় যা সে দেখতে চায়।

এই ডিজিটাল রণক্ষেত্রে তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ মূলত একটি ক্ষমতার লড়াই। যে পক্ষ তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সেই পক্ষ যুদ্ধের নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা নির্ধারণ করবে। গাজায় চলমান সংঘাতের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একদিকে যখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আর্তনাদ এবং ধ্বংসস্তূপের ছবি ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে আইডিএফ-এর ডিজিটাল ইউনিটগুলো অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এমন সব ভিডিও ও তথ্য প্রচার করছে যা তাদের সামরিক পদক্ষেপকে ন্যায়সঙ্গত হিসেবে উপস্থাপন করে। এই দ্বিমুখী লড়াইয়ের ফলে সাধারণ মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে হিমশিম খাচ্ছে। এটি কেবল একটি সামরিক কৌশল নয়, বরং এটি একটি অস্তিত্ববাদী লড়াই, যেখানে তথ্যের আধিপত্যই নির্ধারণ করে দেবে ইতিহাসের পাতায় কার স্থান কোথায়।

আইডিএফ-এর প্রোপাগান্ডা কৌশল ও ন্যারেটিভ কন্ট্রোল

আইডিএফ-এর প্রোপাগান্ডা কৌশল মূলত 'ন্যারেটিভ কন্ট্রোল' বা আখ্যান নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। তাদের লক্ষ্য হলো গাজায় ঘটে যাওয়া মানবিক বিপর্যয়কে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে আবদ্ধ করা। এই কৌশলটি অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং এটি বিভিন্ন স্তরে কাজ করে। প্রথমত, তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি উপস্থিত থাকে এবং দ্রুততম সময়ে তাদের নিজস্ব সংস্করণ বা 'ভার্সন' প্রকাশ করে। দ্বিতীয়ত, তারা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে তথ্যের একটি নির্দিষ্ট প্রবাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। এই ধরনের প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মনে একটি নির্দিষ্ট ধারণা গেঁথে দেওয়া। ঐতিহাসিকভাবেও দেখা গেছে যে, নির্দিষ্ট কোনো আদর্শ বা ধারণা প্রচারের জন্য গোপন বা সুসংগঠিত সংস্থাগুলো বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে থাকে। যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে:

واستَخدمت حركاتُ التنصير -مع انتشارِ آلاتِ التسجيل على نطاقٍ واسع في العالم- طبعَ أشرطةِ "الكاسيت": واستَخدمت... حَشْوَها بما يريدون بثَّه من أفكارٍ، وتوزيعَها في مجالات أنشطتهم
[3] । যদিও এই উদাহরণটি ধর্মীয় প্রচারণার প্রেক্ষাপটে, তবে এর মূল কৌশলটি—অর্থাৎ গণমাধ্যমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ধারণা বা 'আইডিয়া' ছড়িয়ে দেওয়া—আইডিএফ-এর আধুনিক ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

আইডিএফ-এর প্রোপাগান্ডা কৌশলের একটি বড় অংশ হলো 'ডি-হিউম্যানাইজেশন' বা অমানবিকীকরণ। ফিলিস্তিনিদের জীবন ও মৃত্যুকে কেবল পরিসংখ্যান বা সামরিক লক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে তারা এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে। যখন কোনো জনগোষ্ঠীকে অমানবিক হিসেবে চিত্রিত করা হয়, তখন তাদের ওপর চালানো সহিংসতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অনেক ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য বা 'প্রয়োজনীয়' হিসেবে গণ্য হয়। এই প্রক্রিয়ায় তারা তথ্যের এমন একটি জাল তৈরি করে যা সত্যের প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করে রাখে। এই ধরনের তথ্য নিয়ন্ত্রণ বা 'ইনফরমেশন ম্যানিপুলেশন' মূলত সেইসব মানুষের জন্য করা হয় যারা কেবল সরকার বা শক্তিশালী পক্ষ দ্বারা অনুমোদিত তথ্য গ্রহণ করে। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, যারা কেবল অনুমোদিত বা নিয়ন্ত্রিত তথ্য পড়ে, তারা সমসাময়িক বিশ্বের প্রকৃত অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে:

ذلك أنه من رأيه أن الإنسان الذي لم يقرأ إلا الكتب التي صدرت بموافقة صريحة من الحكومةيكون متخلفاً عن معاصريه بنحو قرن من الزمان تقريباً
[4] । অর্থাৎ, নিয়ন্ত্রিত তথ্যের গণ্ডিতে আটকে থাকলে মানুষ প্রকৃত সত্য থেকে এক শতাব্দী পিছিয়ে যেতে পারে।

ন্যারেটিভ কন্ট্রোলের এই কৌশলটি কেবল তথ্য ছড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি তথ্যের 'ফিল্টারিং' বা ছাঁটাইয়ের মাধ্যমেও কাজ করে। আইডিএফ এবং তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো এমনভাবে কাজ করে যাতে ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে আসা সত্য ঘটনাগুলো বা ভিডিওগুলো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে না পারে। তারা তথ্যের একটি 'একপাক্ষিক প্রবাহ' তৈরি করে, যেখানে ইসরায়েলি দৃষ্টিভঙ্গিই প্রধান হয়ে ওঠে। এই কৌশলের ফলে বিশ্বব্যাপী জনমত একটি নির্দিষ্ট দিকে ধাবিত হয়, যা যুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফলকে প্রভাবিত করে। এটি একটি অত্যন্ত জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যেখানে সত্যকে মিথ্যার স্তূপের নিচে চাপা দিয়ে দেওয়া হয়।

অ্যালগরিদমিক সেন্সরশিপ: আধুনিক যুগের ডিজিটাল দমন

আধুনিক যুগে সেন্সরশিপ আর কেবল রাজকীয় আদেশ বা সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন অ্যালগরিদমের মাধ্যমে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। গাজা ও ফিলিস্তিন সংঘাতের ক্ষেত্রে আমরা 'অ্যালগরিদমিক সেন্সরশিপ' বা অ্যালগরিদমিক দমনের এক ভয়াবহ রূপ দেখতে পাচ্ছি। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে কাজ করে যে, নির্দিষ্ট কিছু কি-ওয়ার্ড, হ্যাশট্যাগ বা ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট (যেমন: ধ্বংসস্তূপ বা রক্তক্ষয়ী দৃশ্য) স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'সেন্সর' বা 'শ্যাডোব্যান' (Shadowban) হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে আসা সত্য ঘটনাগুলো মানুষের নিউজফিডে পৌঁছাতে পারছে না। এটি মূলত একটি ডিজিটাল দমননীতি, যা আধুনিক যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে।

ঐতিহাসিকভাবে সেন্সরশিপের উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এবং প্রথাগত চিন্তাধারার বাইরে কোনো ধারণা ছড়িয়ে পড়া রোধ করা। যেমনটি বলা হয়েছে:

أظن أن خلفائي فكروا في الرقابة وسيلة لمنع انتشار الأفكار التي قد تقوض الأساس الأخلاقي للنظام الاجتماعي
[5] । বর্তমান যুগে এই 'সামাজিক স্থিতিশীলতা'র ধারণাটি অনেক সময় শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। অ্যালগরিদমিক সেন্সরশিপের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠস্বরকে দমন করা হচ্ছে যাতে আন্তর্জাতিক মহলে তাদের প্রতি সহানুভূতি বা সমর্থন তৈরির পথটি রুদ্ধ হয়ে যায়। এটি একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে, যা সত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়।

অ্যালগরিদমিক সেন্সরশিপের এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বিপজ্জনক কারণ এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এটি সরাসরি কোনো পোস্ট ডিলিট না করে বরং পোস্টের 'রিচ' বা মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এর ফলে ব্যবহারকারীরা মনে করেন যে তারা যা দেখছেন তা-ই সত্য, অথচ তারা আসলে একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা তথ্যের গণ্ডির মধ্যে অবস্থান করছেন। এই অবস্থাটি অনেকটা সেই সময়ের মতো, যখন রাজকীয় লাইসেন্স বা অনুমতির বাইরে কোনো লেখা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ ছিল। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, এই ধরনের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে:

كان من رأيه أن الإنسان الذي لم يقرأ إلا الكتب التي صدرت بموافقة صريحة من الحكومةيكون متخلفاً عن معاصريه بنحو قرن من الزمان تقريباً
[6] । একইভাবে, যারা কেবল অ্যালগরিদম দ্বারা অনুমোদিত তথ্য দেখে, তারা ফিলিস্তিনের প্রকৃত বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এই ডিজিটাল দমননীতির ফলে একটি বিশাল 'ইনফরমেশন গ্যাপ' বা তথ্যের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। একদিকে যখন ইসরায়েলি প্রোপাগান্ডা অ্যালগরিদমের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের আর্তনাদ ডিজিটাল সেন্সরশিপের শিকার হয়ে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি মানবাধিকারের সংকট। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো যখন নিরপেক্ষ থাকার দাবি করে, তখন তাদের অ্যালগরিদম কীভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডার অনুগামী হয়, তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন জাগে।

সত্য ও যুক্তির লড়াই: দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

গাজা ও ফিলিস্তিন সংকটের এই তথ্যযুদ্ধ মূলত সত্য ও যুক্তির একটি গভীর দার্শনিক লড়াই। প্রোপাগান্ডা এবং অ্যালগরিদমিক সেন্সরশিপের মাধ্যমে মানুষের বিচারবুদ্ধিকে বিভ্রান্ত করার যে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তা মানুষের মৌলিক চিন্তাশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই লড়াইটি হলো 'যুক্তি' (Reason) বনাম 'প্রোপাগান্ডা দ্বারা প্রভাবিত আবেগ' (Emotion manipulated by propaganda)-এর লড়াই। ভলতেয়ার এবং বেনেডিক্টের মধ্যকার বিতর্কটি এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভলতেয়ার স্বীকার করেছেন যে মানুষের যুক্তি বা মন অনেক সময় অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং এটি সহজেই মানুষের ইচ্ছা বা প্রোপাগান্ডার দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে:

أنا غالباً ما سلمت بهشاشة العقل وسهولة انقياده. أنا أعلم نزوعه إلى إثبات كل ما توحي به رغباتنا
[7] । প্রোপাগান্ডা ঠিক এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়।

প্রোপাগান্ডা যখন কোনো মিথ্যা তথ্য বা আখ্যান প্রচার করে, তখন সেটি মানুষের মনের গভীরে থাকা কোনো ভয় বা পূর্বসংস্কারকে উসকে দেয়। গাজা সংকটের ক্ষেত্রে, ইসরায়েলি প্রোপাগান্ডা প্রায়শই ফিলিস্তিনিদের একটি 'ভয়ংকর শত্রু' হিসেবে উপস্থাপন করে, যা পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের মনে একটি অবচেতন ভয় তৈরি করে। এই ভয় যখন যুক্তির ওপর জয়ী হয়, তখন মানুষ সত্য ঘটনা বা মানবিক বিপর্যয় দেখেও তা অস্বীকার করতে শুরু করে। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ সত্যকে গ্রহণ করার চেয়ে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে নিজেকে নিরাপদ বোধ করাকে প্রাধান্য দেয়। বেনেডিক্টের মতে, মানুষের জ্ঞান বা উপলব্ধি অনেক সময় তার অভ্যন্তরীণ ইচ্ছা বা আবেগের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

এই লড়াইয়ে সত্যের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। যখন অ্যালগরিদম এবং প্রোপাগান্ডা মিলে একটি কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করে, তখন প্রকৃত সত্যকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। দার্শনিক স্পিনোজার (Spinoza) মতো চিন্তাবিদদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, যারা সত্য ও যুক্তির গভীরতা নিয়ে কাজ করেছেন। যদিও প্রোপাগান্ডা প্রবক্তারা স্পিনোজাকে অনেক সময় ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে, তবুও তার দর্শন আমাদের শেখায় যে সত্যের অনুসন্ধান একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। প্রোপাগান্ডা বা সেন্সরশিপ সত্যকে সাময়িকভাবে আড়াল করতে পারে, কিন্তু তা চিরতরে মুছে ফেলতে পারে না। তবে এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে কেবল তথ্যের প্রয়োজন নেই, বরং প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ বিচারবুদ্ধি, যা প্রোপাগান্ডার প্রলোভন বা ভয়কে অতিক্রম করতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, গাজা ও ফিলিস্তিন সংকটে আইডিএফ-এর প্রোপাগান্ডা এবং অ্যালগরিদমিক সেন্সরশিপ কেবল একটি সামরিক কৌশল নয়, বরং এটি একটি আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত যুদ্ধ। এটি মানুষের সত্য জানার অধিকার এবং বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের ক্ষমতাকে সরাসরি আক্রমণ করছে। এই ডিজিটাল অন্ধকার যুগে সত্যের আলো ছড়িয়ে দিতে হলে কেবল তথ্যের প্রবাহ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং অ্যালগরিদমের কারসাজি এবং প্রোপাগান্ডার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।

""
১১.১২ গাজা ও ফিলিস্তিন কনফ্লিক্টে আইডিএফ (IDF) প্রোপাগান্ডা এবং অ্যালগরিদমিক সেন্সরশিপের (Algorithmic Censorship) কেস স্টাডি
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১১.১২ গাজা ও ফিলিস্তিন কনফ্লিক্টে আইডিএফ প্রোপাগান্ডা কুইজ

1 / 5

গাজা সংঘাতের ক্ষেত্রে আইডিএফ (IDF) কোন ধরনের কৌশল সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...