খণ্ড 91
ফন্ট:100%
থিম:

১০.৩ সূরা আল-বাকারাহ (২:১৪৬): 'তারা তাঁকে এমনভাবে চেনে যেমন তাদের সন্তানদের চেনে'— ইহুদি স্কলারদের কগনিটিভ রিকগনিশন (Cognitive Recognition)

কুরআনুল কারীমের জ্ঞানতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বয়ানসমূহের মধ্যে সূরা আল-বাকারার ১৪৬ নম্বর আয়াতটি এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) জটিলতাকে উন্মোচিত করে। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইহুদি পণ্ডিত ও স্কলারদের সম্পর্কে এক বিস্ময়কর সত্য প্রকাশ করেছেন। তাঁদের কাছে নবি সা.-এর পরিচয় কেবল কোনো অনুমান বা তাত্ত্বিক ধারণা ছিল না, বরং তা ছিল এক অবিসংবাদিত ও সহজাত সত্য। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ

[1]

এই আয়াতের মূল উপজীব্য হলো 'কগনিটিভ রিকগনিশন' বা 'জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বীকৃতি'। এখানে 'চেনা' বা 'পরিচয় লাভ' বলতে কেবল বাহ্যিক অবয়ব বা নাম জানা বোঝানো হয়নি, বরং এটি ছিল একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও শাস্ত্রীয় প্রমাণের সমন্বয়। ইহুদি স্কলাররা যখন নবি সা.-এর গুণাবলি, তাঁর আগমনের সময়কাল এবং তাঁর বংশীয় পরিচয় পর্যবেক্ষণ করতেন, তখন তাঁদের হৃদয়ে এক প্রবল নিশ্চয়তা তৈরি হতো। এই নিশ্চয়তা এতটাই সুদৃঢ় ছিল যে, আল্লাহ তাআলা একে তাঁদের নিজ সন্তানদের চেনার সাথে তুলনা করেছেন। একজন পিতা যেমন তাঁর সন্তানকে চেনার ক্ষেত্রে কোনো সংশয় বা তাত্ত্বিক বিতর্কে লিপ্ত হন না, বরং একটি সহজাত ও অকাট্য বোধের মাধ্যমে তাঁকে চিনে ফেলেন, ইহুদি পণ্ডিতদের ক্ষেত্রেও নবি সা.-এর সত্যতা উপলব্ধি করা ছিল ঠিক তেমনই এক অবিরত ও নিশ্চিত অভিজ্ঞতা।

কগনিটিভ রিকগনিশন ও শাস্ত্রীয় প্রামাণ্যতা

ইহুদি স্কলারদের এই 'কগনিটিভ রিকগনিশন' বা জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বীকৃতি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল তাঁদের নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ ও শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের তাওরাত ও অন্যান্য প্রামাণ্য গ্রন্থে শেষ নবির আগমনের যে সুনির্দিষ্ট লক্ষণ ও সংকেতসমূহ বর্ণিত ছিল, তা ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত। ফলে যখন নবি সা.-এর জীবন ও তাঁর দাওয়াত তাঁদের সামনে উপস্থাপিত হলো, তখন তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও শাস্ত্রীয় জ্ঞান (Scriptural Knowledge) সরাসরি সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, বর্ণিত বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং নবি সা.-এর বাস্তব সত্তার মধ্যে কোনো প্রকার বৈসাদৃশ্য নেই।

তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই স্বীকৃতি ছিল মূলত 'ইলম' (জ্ঞান) এবং 'ইয়াকিন' (নিশ্চয়তা)-এর একটি সংমিশ্রণ। তাঁদের কাছে নবি সা.-এর পরিচয় ছিল একটি 'Cognitive Certainty'। তাঁরা জানতেন যে, আসমানী কিতাবের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী একজন নবি আসবেন, এবং সেই নবির শারীরিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ নবি সা.-এর মধ্যেই পূর্ণতা পেয়েছে। [2] । এই জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তরে পৌঁছানোর পরও তাঁদের অস্বীকৃতি ছিল বিস্ময়কর। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের ক্ষেত্রে কেবল জ্ঞান থাকলেই তা ঈমানে রূপান্তরিত হয় না; বরং অহংকার ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ অনেক সময় সত্যের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, মদিনার ইহুদি পণ্ডিতরা যখন নবি সা.-এর দাওয়াত শুনতেন, তখন তাঁদের অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্ব ও শাস্ত্রীয় জ্ঞান এক প্রবল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতো। একদিকে তাঁদের শাস্ত্রীয় প্রামাণ্য দলিলসমূহ নবি সা.-এর সত্যতাকে নিশ্চিত করছিল, অন্যদিকে তাঁদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বীকৃতি বা Cognitive Recognition ছিল তাঁদের জন্য একটি মানসিক বোঝা, কারণ সত্যকে স্বীকার করার অর্থ ছিল তাঁদের প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। [3]

'সন্তান চেনার' রূপক: একটি মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্বতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

কুরআনের এই রূপকটি—'যেমন তারা তাদের সন্তানদের চেনে'—অত্যন্ত গভীর মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য বহন করে। পিতৃত্বের সম্পর্কটি মানুষের অস্তিত্বের একটি মৌলিক ও সহজাত অংশ। একজন পিতা যখন তাঁর সন্তানকে দেখেন, তখন সেখানে কোনো যুক্তি বা প্রমাণের প্রয়োজন হয় না; বরং একটি প্রাক-যৌক্তিক (Pre-logical) ও সহজাত বোধ কাজ করে। ইহুদি স্কলারদের ক্ষেত্রে নবি সা.-এর পরিচয়ও ছিল ঠিক তেমনই এক অবিরত ও অকাট্য সত্য। এটি কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি অস্তিত্বতাত্ত্বিক উপলব্ধি (Ontological Realization)।

মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই রূপকটি দিয়ে আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের জ্ঞানতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং একই সাথে তাঁদের নৈতিক পতনকে নির্দেশ করেছেন। তাঁরা সত্যকে চিনতে পারতেন, কিন্তু সত্যকে গ্রহণ করতে পারতেন না। এই যে 'চেনা' এবং 'স্বীকার করা'-র মধ্যে ব্যবধান, এটিই হলো মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তাঁদের কাছে নবি সা.-এর সত্যতা ছিল একটি 'Intuitive Truth', যা তাঁদের শাস্ত্রীয় জ্ঞানের মাধ্যমে বারবার নিশ্চিত করা হতো। [4]

অস্তিত্বতাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে, এই রূপকটি নির্দেশ করে যে, নবি সা.-এর সত্যতা ছিল তাঁদের কাছে এতটাই নিকটবর্তী এবং পরিচিত যে, তা অস্বীকার করা ছিল প্রকৃতির নিয়মের পরিপন্থী। কিন্তু তাঁদের 'Ethnocentrism' বা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এই সহজাত সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। তাঁরা সত্যকে চিনতেন ঠিকই, কিন্তু সেই সত্যকে নিজেদের অস্তিত্বের সাথে একীভূত করতে পারছিলেন না, কারণ তা তাঁদের বংশগত ও গোষ্ঠীগত পরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। [5]

ধর্মতাত্ত্বিক সংকীর্ণতা ও বিশ্বজনীনতার অভাব

ইহুদি স্কলারদের এই জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বীকৃতির বিপরীতে তাঁদের অস্বীকৃতির মূল কারণ ছিল তাঁদের ধর্মের প্রকৃতিগত সংকীর্ণতা। ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, ইহুদি ধর্ম মূলত একটি জাতিগত ও গোষ্ঠীগত ধর্ম হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। তাঁদের ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা মূলত 'বনী ইসরাঈলের ঈশ্বর' (God of Israel) হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের ধর্মগ্রন্থসমূহে আল্লাহ তাআলাকে বিশ্বজগতের অধিপতি বা 'রব্বুল আলামিন' হিসেবে উপস্থাপন করার চেয়ে বনী ইসরাঈলের রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা ছিল প্রবল। [6]

এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নবি সা.-এর বিশ্বজনীন (Universal) দাওয়াতকে গ্রহণ করতে তাঁদের প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করেছিল। নবি সা.-এর বার্তা ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত এবং সমতার বাণী, যা কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা বংশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। কিন্তু ইহুদি স্কলারদের কাছে ধর্ম ছিল একটি বিশেষ জাতিগত পরিচয়ের অংশ। তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে, আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ কেবল তাঁদের বংশধরদের জন্যই সংরক্ষিত। [7] । ফলে যখন নবি সা.- একটি সর্বজনীন সত্য নিয়ে আবির্ভূত হলেন, তখন তাঁদের শাস্ত্রীয় জ্ঞান তাঁদের সত্যতা চিনিয়ে দিলেও, তাঁদের ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো সেই সত্যকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করল।

এই ধর্মতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ছিল অত্যন্ত প্রকট। যেমনটি বলা হয়েছে, ইহুদি ধর্মের অনেক পর্যায়েই এটি একটি জাতিগত বা বর্ণবাদী (Racial/Ethnic) কাঠামোয় পর্যবসিত হয়েছিল, যা মানবজাতির জন্য রহমত ও সমতার বার্তা প্রদান করেনি। [8] । এই প্রেক্ষাপটে, নবি সা.-এর সত্যতা চিনেও তাঁরা কেন পিছিয়ে ছিলেন, তার উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁদের এই 'Exclusive' বা একচেটিয়া ধর্মীয় দর্শনের মধ্যে। তাঁরা জানতেন নবি সা.- সত্য, কিন্তু সেই সত্য যদি তাঁদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে খর্ব করে ফেলে, তবে সেই সত্যকে গ্রহণ করা তাঁদের কাছে ছিল অস্তিত্বের সংকট।

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও জ্ঞান ও আনুগত্যের ব্যবধান

ইহুদি স্কলারদের এই জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বীকৃতি এবং বাস্তব আনুগত্যের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান ছিল, তার পেছনে ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মদিনার তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ইহুদি সম্প্রদায় একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী হিসেবে অবস্থান করছিল। তাঁদের ধর্মীয় কর্তৃত্ব ছিল তাঁদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের মূল ভিত্তি। নবি সা.-এর আগমনের ফলে এই প্রচলিত ক্ষমতার ভারসাম্য ও সামাজিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

যখন কোনো গোষ্ঠী তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বকে একটি নির্দিষ্ট বংশীয় বা জাতিগত পরিচয়ের সাথে গেঁথে ফেলে, তখন সেই পরিচয়ের বাইরে কোনো সত্য বা নতুন আদর্শের আগমন তাদের জন্য রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে গণ্য হয়। ইহুদি স্কলাররা বুঝতে পেরেছিলেন যে, নবি সা.-এর সত্যতা স্বীকার করলে তাঁদের বংশগত ও গোষ্ঠীগত আধিপত্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে। [9] । ফলে তাঁদের 'Cognitive Recognition' বা জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বীকৃতি কেবল একটি তাত্ত্বিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, যা বাস্তবে কোনো আনুগত্যে (Obedience) রূপান্তরিত হতে পারেনি।

এই পরিস্থিতিটি জ্ঞান ও আনুগত্যের (Knowledge vs. Submission) এক চরম বৈপরীত্য তৈরি করেছিল। জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত উন্নত ও প্রজ্ঞাবান, কিন্তু নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তাঁরা ছিলেন অন্ধ। তাঁদের এই দ্বিচারিতা মূলত একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ছিল, যেখানে সত্যের চেয়ে নিজেদের গোষ্ঠীগত স্বার্থ ও আধিপত্য বজায় রাখাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাটিই সূরা আল-বাকারার সেই আয়াতের মর্মার্থকে আরও স্পষ্ট করে তোলে—যেখানে সত্যকে চেনার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ না করার এক করুণ ও জটিল চিত্র ফুটে উঠেছে।

""
১০.৩ সূরা আল-বাকারাহ (২:১৪৬): 'তারা তাঁকে এমনভাবে চেনে যেমন তাদের সন্তানদের চেনে'— ইহুদি স্কলারদের কগনিটিভ রিকগনিশন (Cognitive Recognition)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১১.৭ ওহীর (Revelation) সত্যতা প্রমাণের ক্ষেত্রে সাইকোলজিক্যাল ফ্যাক্টরস (Psychological Factors) কুইজ

1 / 5

ওহীর সত্যতা অনুধাবনে কোন মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...