খণ্ড 87
ফন্ট:100%
থিম:

১৪.৬ পরিশিষ্ট ৫: যুদ্ধকালীন পরিবেশ সংরক্ষণের (Laws of Armed Conflict) ওপর প্রথম ইসলামি কনস্টিটিউশনাল ড্রাফট

১. ইসলামি যুদ্ধবিদ্যার তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং পরিবেশগত সুরক্ষার সাংবিধানিক রূপরেখা


প্রাক-ইসলামি আরব সমাজে যুদ্ধ ছিল একটি অনিয়ন্ত্রিত, ধ্বংসাত্মক এবং গোত্রীয় প্রতিশোধস্পৃহার বহিঃপ্রকাশ। জাহিলিয়াত আমলের যুদ্ধবিগ্রহে কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো বা মানবিক মূল্যবোধের অস্তিত্ব ছিল না। শত্রু গোত্রকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করা, তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে আবাদি জমি ধ্বংস করা, ফলবান বৃক্ষ কর্তন করা এবং জলাশয় বিষাক্ত বা ভরাট করা ছিল তৎকালীন যুদ্ধরীতির সাধারণ বৈশিষ্ট্য [1] । এই চরম নৈরাজ্যবাদী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধরীতির বিপরীতে রাসুলুল্লাহ সা. এক যুগান্তকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক যুদ্ধকালীন পরিবেশ সংরক্ষণ নীতিমালা (Laws of Armed Conflict - LOAC) প্রণয়ন করেন। এটি কেবল সামরিক নির্দেশনাই ছিল না, বরং এটি ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম লিখিত সাংবিধানিক প্রোটোকল, যা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান (Ecosystem) রক্ষার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।

রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক প্রবর্তিত এই যুদ্ধকালীন পরিবেশ সংরক্ষণ নীতিমালার মূল ভিত্তি ছিল তাওহিদ এবং সৃষ্টির প্রতি পরম দায়িত্বশীলতা। ইসলামি যুদ্ধবিদ্যায় যুদ্ধকে কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামরিক কৌশল হিসেবে দেখা হয় না, বরং একে একটি নৈতিক পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয় [2] । রাসুলুল্লাহ সা. এবং তাঁর প্রথম খলিফা আবু বকর রা. কর্তৃক প্রেরিত সামরিক বাহিনীগুলোর প্রতি প্রদত্ত নির্দেশনাবলীতে পরিবেশ সংরক্ষণের এই সাংবিধানিক রূপরেখা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে। ঐতিহাসিক দলিলে এই নির্দেশনাবলী যেভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, তা আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের (International Humanitarian Law) চেয়েও অনেক বেশি অগ্রগামী ও বিস্তৃত।

এই সাংবিধানিক ড্রাফটের মূল ইবারতটি নিম্নরূপ, যা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিবেশ ও বেসামরিক সম্পদের সুরক্ষাকে আইনি রূপ দান করেছে:


«إِنِّي أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللهِ... لَا تَقْطَعُنَّ شَجَرًا مُثْمِرًا، وَلَا تُخْرِبُنَّ عَامِرًا، وَلَا تَعْقِرُنَّ شَاةً وَلَا بَعِيرًا إِلَّا لِمَأْكَلَةٍ، وَلَا تُحْرِقُنَّ نَخْلًا وَلَا تُغَرِّقُنَّهُ»

অর্থাৎ: "আমি তোমাদের আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি... তোমরা কোনো ফলবান বৃক্ষ কর্তন করবে না, কোনো জনবসতি ধ্বংস করবে না, আহারের প্রয়োজন ব্যতীত কোনো ছাগল বা উট জবাই করবে না এবং কোনো খেজুর বাগান পুড়িয়ে দেবে না কিংবা তা পানিতে ডুবিয়ে নষ্ট করবে না।" [3] । এই ঐতিহাসিক নির্দেশনাটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি যুদ্ধনীতিতে শত্রুর সামরিক শক্তিকে পরাস্ত করার লক্ষ্য থাকলেও, প্রকৃতির ওপর প্রতিশোধমূলক আচরণ বা পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

২. মদিনার সনদ ও সামরিক নির্দেশনাবলীতে পরিবেশ ও নাগরিক সুরক্ষার মেলবন্ধন


মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাসুলুল্লাহ সা. যে ঐতিহাসিক 'মদিনার সনদ' (Constitution of Medina) প্রণয়ন করেন, তা ছিল যূথবদ্ধ নিরাপত্তা (Collective Security) এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার এক অনন্য দলিল [4] । এই সনদের মাধ্যমে মদিনা ও এর আশেপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে একটি 'পবিত্র ও সুরক্ষিত অঞ্চল' (Haram) হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যেখানে কোনো গাছ কাটা বা রক্তপাত করা নিষিদ্ধ ছিল। এই সাংবিধানিক ঘোষণাটি যুদ্ধকালীন পরিবেশ সংরক্ষণের ধারণাকে একটি স্থায়ী আইনি ভিত্তি প্রদান করে। মদিনার এই অভ্যন্তরীণ পরিবেশগত সুরক্ষার নীতিটিই পরবর্তীতে বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করা হয়।

ইসলামি সামরিক নীতিমালায় পরিবেশগত সুরক্ষাকে কেবল একটি নৈতিক উপদেশ হিসেবে রাখা হয়নি, বরং একে সামরিক শৃঙ্খলার (Military Discipline) একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা. যখনই কোনো যুদ্ধ বা অভিযানের সিদ্ধান্ত নিতেন, তিনি সাহাবিদের সাথে বিস্তারিত পরামর্শ (Shura) করতেন এবং যুদ্ধের নৈতিক ও পরিবেশগত সীমা নির্ধারণ করে দিতেন [5] । প্রাক-ইসলামি আরবের 'দারুন নদওয়া' বা গোত্রীয় পরামর্শ সভায় যেখানে কেবল যুদ্ধ জয়ের জন্য যেকোনো ধ্বংসাত্মক পথ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, সেখানে ইসলামি শুরার মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধকে ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা [6]

এই সাংবিধানিক ড্রাফটের মাধ্যমে ইসলাম প্রথম এই নীতি প্রতিষ্ঠা করে যে, যুদ্ধ কেবল যুদ্ধরত সৈন্যদের (Combatants) মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে; বেসামরিক নাগরিক, নারী, শিশু, ধর্মযাজক এবং সর্বোপরি প্রাকৃতিক পরিবেশ এই যুদ্ধের আওতামুক্ত থাকবে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে 'Principle of Distinction' বা পার্থক্যকরণের নীতি বলা হয়। রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, শত্রুপক্ষের কৃষি ব্যবস্থা, গবাদি পশু এবং পানির উৎসগুলোর কোনো ক্ষতি করা যাবে না, কারণ এগুলো মানবজাতির যৌথ উত্তরাধিকার এবং পৃথিবীর বাস্তুসংস্থানের মূল ভিত্তি [7]

৩. যুদ্ধকালীন শৃঙ্খলা এবং পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা: উহুদ ও বদরের তুলনামূলক পাঠ


যুদ্ধকালীন পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবিক আইনের সফল বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সামরিক বাহিনীর কঠোর শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণের ওপর। বদর এবং উহুদ যুদ্ধের কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ সা. কীভাবে চরম সংকটের মুহূর্তেও সামরিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে পরিবেশ ও বেসামরিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছিলেন [8] । বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয় এবং উহুদ যুদ্ধে সাময়িক বিপর্যয়—উভয় ক্ষেত্রেই রাসুলুল্লাহ সা.-এর নেতৃত্বাধীন বাহিনী কখনোই শত্রুর প্রাকৃতিক সম্পদ বা পরিবেশের ওপর কোনো প্রতিশোধমূলক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়নি [9]

উহুদ যুদ্ধের কঠিনতম মুহূর্তে, যখন মুসলিম বাহিনী চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল এবং সত্তরজন সাহাবি শাহাদাত বরণ করেছিলেন, তখনও রাসুলুল্লাহ সা. বা সাহাবিগণ উহুদ পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ, গাছপালা বা বন্যপ্রাণীর কোনো ক্ষতি করেননি [10] । সামরিক ইতিহাসবিদ মাহমুদ শিত খাত্তাব তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, উহুদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সাময়িক বিপর্যয় ঘটলেও তারা নৈতিক ও পরিবেশগত দিক থেকে সম্পূর্ণ বিজয়ী ছিলেন, কারণ তারা যুদ্ধের চরম মুহূর্তেও কোনো যুদ্ধাপরাধ বা পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত হননি [11]

ইসলামি যুদ্ধনীতিতে 'পোড়ামাটি নীতি' (Scorched Earth Policy) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শত্রুকে পরাস্ত করার জন্য তাদের বনভূমি পুড়িয়ে দেওয়া, ফসল নষ্ট করা বা পানির উৎস দূষিত করার যে কৌশল আধুনিক যুগেও দেখা যায়, তা ইসলাম সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। উহুদ যুদ্ধের পর রাসুলুল্লাহ সা. যখন 'হামরাউল আসাদ' অভিযানে বের হন, তখনও তিনি পরিবেশগত সুরক্ষার এই সাংবিধানিক প্রোটোকল কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেন, যা প্রমাণ করে যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ইসলামি সামরিক বাহিনী তার পরিবেশগত ও নৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয় না [12]

৪. আন্তর্জাতিক আইন (LOAC) এবং আধুনিক ভূরাজনীতিতে ইসলামি পরিবেশবাদী যুদ্ধনীতির প্রভাব


রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক প্রণীত যুদ্ধকালীন পরিবেশ সংরক্ষণের এই সাংবিধানিক ড্রাফটটি কেবল তৎকালীন আরবের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ আইনের (Jus in bello) বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মক্কার পবিত্র সীমানার (Haram) যে ধারণা প্রাক-ইসলামি যুগে কেবল একটি আঞ্চলিক প্রথা ছিল, ইসলাম তাকে একটি বৈশ্বিক পরিবেশগত ও মানবিক যুদ্ধনীতিতে রূপান্তরিত করে [13] । এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের ধ্বংসলীলা থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসন ও শান্তি প্রক্রিয়াকে সহজতর করা [14]

পরবর্তীকালে মুসলিম সেনাপতি ও খলিফাগণ এই প্রোটোকল অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, আন্দালুসের (স্পেন) ঐতিহাসিক 'জালাকার যুদ্ধ' (Battle of Al-Zallaqah)-এর পূর্বে ইউসুফ ইবনে তাশফিন খ্রিস্টান রাজা ষষ্ঠ আলফনসোর সাথে যে কূটনৈতিক পত্রবিনিময় করেছিলেন, তাতেও ইসলামের এই যুদ্ধকালীন নৈতিকতা ও পরিবেশগত সুরক্ষার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছিল [15] । যুদ্ধের পূর্বে শান্তি ও সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া এবং যুদ্ধকালীন সময়ে অপ্রয়োজনীয় ধ্বংসযজ্ঞ এড়িয়ে চলা ছিল রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহর সরাসরি বাস্তবায়ন [16]

আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে ১৯৭৭ সালের জেনেভা কনভেনশনের অতিরিক্ত প্রোটোকল-১ (Protocol I) এর ৩৫ ও ৫৫ অনুচ্ছেদে যুদ্ধকালীন পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদী ও মারাত্মক ক্ষতিসাধন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ এই আধুনিক আইনি কাঠামোর বহু শতাব্দী পূর্বে রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ভাষায় যুদ্ধকালীন পরিবেশ সংরক্ষণের এই সাংবিধানিক ড্রাফট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের যুদ্ধকালীন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত, বৈজ্ঞানিক এবং কালজয়ী আইনি দলিল, যা আধুনিক বিশ্বকে যুদ্ধকালীন পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষার পথ দেখাতে পারে।

""
১৪.৬ পরিশিষ্ট ৫: যুদ্ধকালীন পরিবেশ সংরক্ষণের (Laws of Armed Conflict) ওপর প্রথম ইসলামি কনস্টিটিউশনাল ড্রাফট
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১৪.৬ যুদ্ধকালীন পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি কুইজ

1 / 5

প্রাক-ইসলামি যুগে যুদ্ধবিগ্রহের সাধারণ বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...