৯.১ প্রাক-ইসলামিক মক্কার যৌবন: আসক্তি (Addiction), নারীবিলাস এবং বীরত্বের নামে সহিংসতা (Toxic Masculinity)
প্রাক-ইসলামিক মক্কার সমাজব্যবস্থা ছিল এক জটিল বৈপরীত্যের সংমিশ্রণ। একদিকে সেখানে ছিল কঠোর গোত্রীয় সংহতি, অন্যদিকে উদীয়মান বাণিজ্যিক পুঁজিবাদের প্রভাবে জন্ম নেওয়া চরম ব্যক্তিবাদ। এই রূপান্তরটি কেবল অর্থনৈতিক ছিল না, বরং এটি ছিল মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক। মক্কার ভৌগোলিক অবস্থান এবং বাণিজ্যিক গুরুত্ব একে আরবের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন এক রূপ দিয়েছিল। এই পরিবেশেই গড়ে উঠেছিল এক বিশেষ ধরণের যৌবন সংস্কৃতি, যেখানে আসক্তি, নারীবিলাস এবং তথাকথিত বীরত্বের নামে সহিংসতা এক অবিচ্ছেদ্য সূত্রে গাঁথা ছিল। এই অধ্যায়ে আমরা মক্কার সেই অন্ধকার সামাজিক বাস্তবতাকে গবেষণাধর্মী দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করব।
অর্থনৈতিক ব্যক্তিবাদ এবং ভোগবাদের মনস্তত্ত্ব
মক্কার বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি আরবের প্রচলিত যাযাবর জীবনধারাকে আমূল বদলে দিয়েছিল। যখন মক্কা একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হলো, তখন সেখানে গোত্রীয় সংহতির চেয়ে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেল। এই অর্থনৈতিক রূপান্তরটি সমাজে এক ধরণের 'পুঁজিবাদী ব্যক্তিবাদ' (Commercial Individualism) তৈরি করেছিল, যেখানে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হতো তার সম্পদের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। এই ব্যক্তিবাদ কেবল আর্থিক সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক আসক্তিতে পরিণত হয়েছিল। সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা এবং তা প্রদর্শনের মাধ্যমে সামাজিক আধিপত্য বিস্তার করাই হয়ে উঠেছিল তৎকালীন মক্কী অভিজাত শ্রেণির প্রধান লক্ষ্য।
এই ব্যক্তিবাদ এবং সম্পদের প্রতি আসক্তির ফলে সামাজিক সংহতি ভেঙে পড়তে শুরু করে। মক্কার বাণিজ্যিক জীবন এমন এক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করেছিল যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতার চেয়ে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল ছিল। এই পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, সম্পদের এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা কেবল ব্যক্তিগত লোভ ছিল না, বরং এটি ছিল সামাজিক মর্যাদার এক অসুস্থ মাপকাঠি। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মক্কার এই অর্থনৈতিক কাঠামোর ফলে এক ধরণের একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থা (Monopoly) গড়ে উঠেছিল, যা সাধারণ মানুষের সুযোগ-সুবিধাকে সংকুচিত করে দিয়েছিল।
وكان هذا هو الوضع فى مكة خاصة، ذلك لأن الحياة التجارية فى مكة قد أسرعت بظهور الفرديه حيث المصالح الماليه والماديه هى أساس المشاركة، مثلها فى ذلك- غالبا- مثل العلاقات القبلية والعشائرية blood relationship. فجمع الثروات الضخام- وهو ما اشار اليه القران الكريم على أنه الشغل الشاغل لكثير من أهل مكة- يعد علامة على هذه الفردية. [1] এই অর্থনৈতিক আসক্তির প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। যখন সম্পদই হয়ে উঠল একমাত্র লক্ষ্য, তখন নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধগুলো গৌণ হয়ে পড়ল। মক্কার অভিজাত শ্রেণির মধ্যে এক ধরণের 'ম্যাটেরিয়ালিস্টিক অ্যাডিকশন' বা বস্তুগত আসক্তি তৈরি হয়েছিল, যা তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের প্রতি অন্ধ করে দিয়েছিল। এই আসক্তি কেবল স্বর্ণ বা রত্ন সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল ক্ষমতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। এই পরিস্থিতিটি পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কলমের 'আসহাবুল জান্নাহ' বা বাগানের মালিকদের গল্পের মাধ্যমে রূপকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেখানে সম্পদের একচেটিয়া অধিকার এবং প্রতিযোগিতার ফলে মানবিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল [2] ।
নারীবিলাস এবং যৌনতার সামাজিক পণ্যকরণ
মক্কার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং ব্যক্তিবাদী মানসিকতা নারী ও যৌনতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে এক চরম অবক্ষয় নিয়ে এসেছিল। তৎকালীন মক্কী সমাজে নারীবিলাস কেবল ব্যক্তিগত রুচির বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল আভিজাত্য এবং পুরুষত্বের এক প্রদর্শনী। সম্পদের প্রাচুর্য যখন পুরুষদের হাতে এল, তখন তারা নারীবিলাসকে তাদের সামাজিক মর্যাদার অংশ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করল। এই সংস্কৃতিতে নারীদের প্রায়শই পণ্য হিসেবে দেখা হতো, যাদের মাধ্যমে পুরুষরা তাদের ক্ষমতা এবং প্রভাব প্রদর্শন করত। যৌবনের উন্মাদনা এবং নৈতিক সীমাবদ্ধতার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল।
তৎকালীন আরবে নারীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং বৈষম্যমূলক। যদিও কিছু প্রভাবশালী নারী উচ্চ মর্যাদা ভোগ করতেন, তবে সাধারণ নারীদের জীবন ছিল চরম অবহেলিত। পুরুষদের জন্য বহুবিবাহ এবং অবাধ যৌন সম্পর্ক ছিল এক ধরণের সামাজিক স্বীকৃতি। এই নারীবিলাস কেবল শারীরিক তৃপ্তির জন্য ছিল না, বরং এটি ছিল এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যম। মক্কার অভিজাত যুবকদের মধ্যে এই প্রবণতা ছিল প্রবল, যেখানে তারা নিজেদের বীরত্ব এবং আভিজাত্য প্রমাণের জন্য নারীবিলাসকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত।
এই ভোগবাদী সংস্কৃতির পেছনে ছিল এক গভীর শূন্যতা। মক্কার মানুষ যখন জাগতিক সুখের চরম সীমায় পৌঁছেছিল, তখন তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক দিক থেকে এক চরম খরা দেখা দিয়েছিল। এই শূন্যতা পূরণের জন্য তারা আরও বেশি আসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। নারীবিলাস এবং মদ্যপান ছিল সেই সময়ের যুবসমাজের প্রধান আকর্ষণ। এই আসক্তি তাদের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল এবং তারা এক ধরণের নৈতিক অন্ধত্বের শিকার হয়েছিল। এই পরিবেশটি ছিল চরম বিশৃঙ্খল, যেখানে পারিবারিক মূল্যবোধের চেয়ে ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা এবং সামাজিক প্রদর্শনীকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো।
টক্সিক মাসকুলিনিটি: বীরত্বের নামে সহিংসতা ও দম্ভ
প্রাক-ইসলামিক মক্কার সমাজে 'বীরত্ব' বা 'মুরুয়াহ' (Muru'ah) শব্দটির একটি বিকৃত অর্থ প্রচলিত ছিল। বীরত্ব বলতে কেবল সাহসকে বোঝানো হতো না, বরং অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার, বংশীয় দম্ভ এবং প্রয়োজনে চরম সহিংসতাকে বীরত্বের লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হতো। এই মানসিকতাকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় 'টক্সিক মাসকুলিনিটি' (Toxic Masculinity) বলা যেতে পারে। এখানে পুরুষত্বের সংজ্ঞা ছিল অন্যের ওপর প্রভুত্ব করা এবং নিজের গোত্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা। এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই প্রায়শই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিত।
বংশীয় দম্ভ বা 'আল-ফখর' (Al-Fakhr) ছিল মক্কী সমাজের এক মারাত্মক ব্যাধি। নিজের বংশের গৌরবগান করা এবং অন্য বংশকে তুচ্ছজ্ঞান করা ছিল তৎকালীন যুবকদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই দম্ভ কেবল মৌখিক ছিল না, বরং এটি ছিল সহিংসতা উসকে দেওয়ার প্রধান কারণ। সামান্য বংশীয় অপমান বা তুচ্ছ কারণে গোত্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হতো, যা বছরের পর বছর ধরে চলত। এই সহিংসতাকে তারা বীরত্বের নাম দিয়ে বৈধতা দিত।
قال عليه الصلاة والسلام: (أربع من أمر الجاهلية في أمتي لا يدعونهن: الطعن في الأنساب، والفخر بالأحساب، والاستسقاء بالنجوم، والنياحة...) [3] এই উদ্ধৃতিটি থেকে স্পষ্ট হয় যে, বংশের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং অন্যের বংশকে আক্রমণ করা (الطعن في الأنساب) ছিল জাহেলি সমাজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম অংশ। এই মানসিকতা যুবকদের মধ্যে এক ধরণের উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং গোত্রীয় অন্ধত্ব তৈরি করেছিল। তারা মনে করত, তাদের গোত্রের জন্য যেকোনো অপরাধ করা বীরত্বের লক্ষণ। এই ভ্রান্ত ধারণার ফলে মক্কার রাস্তায় এবং মরুপ্রান্তরে প্রতিনিয়ত রক্তপাত ঘটত। বীরত্বের এই সংজ্ঞায় করুণা, ক্ষমা বা সহনশীলতার কোনো স্থান ছিল না; বরং কঠোরতা এবং নিষ্ঠুরতাকেই প্রকৃত পুরুষত্বের মাপকাঠি ধরা হতো।
বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা এবং কবিতার মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা
মক্কার এই সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে একটি বড় কারণ ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা। তৎকালীন আরবরা কোনো সুসংগত দর্শন বা যুক্তিবিদ্যার চর্চা করত না। তাদের জ্ঞান ছিল মূলত অভিজ্ঞতামূলক এবং ঐতিহ্যগত। তারা বিজ্ঞান বা দর্শনের পরিবর্তে সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকেছিল, বিশেষ করে কবিতা এবং বাগ্মিতার প্রতি। তবে এই সাহিত্যিক প্রতিভা ব্যবহৃত হতো মূলত গোত্রীয় দম্ভ এবং শত্রুর প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর জন্য। কবিতা ছিল সেই সময়ের মিডিয়া, যার মাধ্যমে এক গোত্রের বীরত্বকে অতিরঞ্জিত করা হতো এবং অন্য গোত্রকে অপমান করা হতো।
فالعربي الجاهلي لم يمارس العلم، ولم تكن له فلسفة ولا منطق، إنما تميزت ثقافته بالفنون الأدبية من خطابة ونثر وأمثال وشعر، تنثال عليه المعاني انثيالًا دون تكلف. [4] এই বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতা মক্কার যুবকদের আরও বেশি আবেগপ্রবণ এবং সহিংস করে তুলেছিল। যেহেতু তাদের কোনো নৈতিক বা দার্শনিক মাপকাঠি ছিল না, তাই তারা তাদের গোত্রের প্রথা এবং প্রবীণদের অন্ধ অনুসরণ করত। কবিতার মাধ্যমে যখন কোনো যুবকের বীরত্বের প্রশংসা করা হতো, তখন সে নিজেকে অপরাজেয় মনে করত এবং আরও বেশি সহিংস হয়ে উঠত। এই সাহিত্যিক সংস্কৃতিটি পরোক্ষভাবে টক্সিক মাসকুলিনিটিকে উৎসাহিত করত। কবিতার পঙ্ক্তিগুলো ছিল যুদ্ধের দামামা, যা যুবকদের রক্তপিপাসু করে তুলত।
মক্কার এই সামগ্রিক পরিবেশটি ছিল এক ধরণের সামাজিক অন্ধকারের। একদিকে সম্পদের প্রতি তীব্র আসক্তি, অন্যদিকে নারীবিলাসের চরম সীমালঙ্ঘন এবং বীরত্বের নামে অকারণে রক্তপাত—এই তিনটি বিষয় মিলে মক্কার যৌবনকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছিল। এই সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ইগো এবং গোত্রীয় অহংকারই ছিল সর্বোচ্চ আইন। মানুষের জীবন ছিল তুচ্ছ, আর আভিজাত্যের দম্ভ ছিল পাহাড়প্রমাণ। এই চরম বিশৃঙ্খলা এবং নৈতিক পতনই মক্কার সমাজকে এক আমূল পরিবর্তনের মুখে দাঁড় করিয়েছিল, যেখানে জাগতিক সুখের মোহ এবং সহিংসতার উন্মাদনা মানুষকে কেবল ধ্বংসের দিকেই নিয়ে যাচ্ছিল।