১.২ জাহেলি জ্ঞানতত্ত্ব (Jahili Epistemology): ওহীর অনুপস্থিতিতে মানবিয় বুদ্ধিবৃত্তির সীমাবদ্ধতা
মানব সভ্যতার ইতিহাসের প্রতিটি স্তরে জ্ঞানতত্ত্ব বা 'Epistemology' একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। কোনো সমাজ কীভাবে সত্যকে চেনে, কীভাবে জ্ঞান আহরণ করে এবং কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে সে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করে—তা সেই সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর পরিচয় দেয়। প্রাক-ইসলামি আরবের প্রেক্ষাপটে 'জাহেলিয়া' শব্দটি কেবল অজ্ঞতা বা মূর্খতা অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, বরং এটি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট। ওহীর বা ঐশী বাণীর অনুপস্থিতিতে জাহেলি সমাজ যে জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তা ছিল মূলত মানবিয় বুদ্ধিবৃত্তির (Human Intellect) সীমাবদ্ধতা, প্রথাগত অনুমানের ওপর নির্ভরশীলতা এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার সংকীর্ণতার সমষ্টি। এই অধ্যায়ে আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে ওহীর আলোকবর্তিকা ব্যতীত জাহেলি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টাগুলো সত্যের পরম শিখরে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং কীভাবে তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত।
জাহেলি শব্দটির জ্ঞানতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সংজ্ঞা
জাহেলিয়া বা জাহেলী যুগ বলতে কী বোঝায়, তা নিয়ে ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ বিদ্যমান। সাধারণভাবে একে 'অজ্ঞতার যুগ' বলা হলেও, এর গভীরতর অর্থ হলো একটি বিশেষ মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থা। মুসলিম পণ্ডিতগণ এই শব্দটিকে কেবল তথ্যের অভাব হিসেবে দেখেননি, বরং একে দেখেছেন সত্যের উপলব্ধিতে মানুষের অক্ষমতা এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় পরিচালিত জীবনধারা হিসেবে [1] । জাহেলি জ্ঞানতত্ত্বের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল এর কেন্দ্রবিন্দুতে কোনো পরম বা ধ্রুব সত্যের (Absolute Truth) অনুপস্থিতি।
তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, জাহেলি সমাজ কোনো একটি নির্দিষ্ট জ্ঞানতাত্ত্বিক শূন্যতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে জ্ঞান আহরণের কোনো সুসংহত পদ্ধতি বা বৈজ্ঞানিক প্রোটোকল ছিল না। তাদের জ্ঞান ছিল মূলত বিচ্ছিন্ন, যা ছিল বংশমর্যাদা, উপজাতীয় প্রথা এবং লোকজ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা। গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন যে, জাহেলি যুগের এই অবস্থা ছিল মূলত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অস্থিরতা, যেখানে মানুষের জ্ঞান ছিল মূলত মানুষের নিজস্ব মতামত ও প্রথার ওপর নির্ভরশীল [2] । এই জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোটি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর, কারণ এর কোনো ঐশী ভিত্তি বা অকাট্য যুক্তি ছিল না যা সময়ের বিবর্তনে বা সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে টিকে থাকতে পারে।
জাহেলি যুগের জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতাকে বুঝতে হলে আমাদের বুঝতে হবে যে, তারা সত্যকে চেনার জন্য কোনো 'Metaphysical' বা অতিপ্রাকৃত মানদণ্ড ব্যবহার করত না, বরং তারা যা দেখত এবং যা তাদের পূর্বপুরুষরা বলত, তাকেই সত্য বলে মেনে নিত। এই সীমাবদ্ধতা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথে একটি বিশাল অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছিল। ওহীর অনুপস্থিতিতে তাদের এই জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোটি ছিল মূলত একটি বৃত্তাকার প্রক্রিয়া, যেখানে তারা নিজেদের তৈরি করা ধারণাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং কোনো নতুন বা পরম সত্যের সন্ধান করতে ব্যর্থ হচ্ছিল [3] ।
মানবিয় বুদ্ধিবৃত্তির (Aql) স্বরূপ ও তার সহজাত সীমাবদ্ধতা
ইসলামি দর্শনে 'আকল' বা বুদ্ধিবৃত্তির একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও উচ্চতর সংজ্ঞা রয়েছে। জাহেলি যুগেও মানুষের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা বা 'আকল' বিদ্যমান ছিল, কিন্তু তা ছিল ওহীর নির্দেশনার বাইরে এবং এর কার্যকারিতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। বুদ্ধিবৃত্তির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে:
উপরোক্ত আরবি ইবারতটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বুদ্ধিবৃত্তি বা 'আকল' হলো এমন একটি মানসিক শক্তি যা মানুষের মধ্যে ভালো ও মন্দ, সুন্দর ও কুৎসিত, এবং পূর্ণতা ও অপূর্ণতার মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা তৈরি করে। এটি মানুষের আচরণের মধ্যে একটি প্রশংসনীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে জাহেলি প্রেক্ষাপটে এই 'আকল' বা বুদ্ধিবৃত্তির একটি বড় সমস্যা ছিল এর 'Subjectivity' বা ব্যক্তিনিষ্ঠতা। ওহীর অনুপস্থিতিতে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি কেবল তার ইন্দ্রিয় এবং সামাজিক প্রথার ওপর ভিত্তি করে কাজ করত, ফলে এটি কোনো সার্বজনীন বা অবরোহী (Deductive) সত্যে পৌঁছাতে পারত না।
বুদ্ধিবৃত্তির এই সীমাবদ্ধতা ছিল মূলত এর 'Epistemological Scope' বা জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিধির কারণে। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি কেবল 'Necessary Knowledge' (ضرورية) বা প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং 'Theoretical Knowledge' (نظرية) বা তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারত, কিন্তু তা যখন মহাজাগতিক বা অতিপ্রাকৃত সত্যের সন্ধানে যেত, তখন তা দিশেহারা হয়ে পড়ত। বুদ্ধিবৃত্তি মানুষের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ আইন (Internal Law) হিসেবে কাজ করতে পারত, যা মানুষের কামনাবাসাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করত, কিন্তু এটি কোনো পরম নৈতিক বা মহাজাগতিক মানদণ্ড প্রদান করতে পারত না [4] ।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাহেলি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ছিল মূলত 'Survival-oriented' বা জীবনধারণকেন্দ্রিক। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টাগুলো ছিল মূলত তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানো এবং উপজাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। যখন বুদ্ধিবৃত্তি কোনো উচ্চতর সত্য বা মহাজাগতিক রহস্যের সন্ধান করতে চাইত, তখন তা কেবল অনুমান (Speculation) এবং মিথ্যার (Fallacy) জালে জড়িয়ে পড়ত। ওহীর অনুপস্থিতিতে বুদ্ধিবৃত্তি ছিল একটি কম্পাসহীন নৌকার মতো, যা সমুদ্রের বিশালতায় দিক হারিয়ে ফেলে কেবল ঢেউয়ের টানে ভেসে বেড়াত।
জ্ঞানতাত্ত্বিক অনিশ্চয়তা ও মতামতের আধিপত্য
জাহেলি জ্ঞানতত্ত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সত্যের পরিবর্তে 'মতামত' বা 'Opinions'-এর আধিপত্য। মানুষের জ্ঞান যখন কোনো ঐশী বা অকাট্য ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে না, তখন তা কেবল মানুষের ব্যক্তিগত ধারণা বা সামাজিক প্রথার সমষ্টিতে পরিণত হয়। এই অবস্থাটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এখানে সত্য কোনো স্থির বিন্দু নয়, বরং এটি একটি পরিবর্তনশীল ধারণা। এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত গভীর পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়:
এই ইবারতটি জাহেলি জ্ঞানতত্ত্বের মূল সংকটকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। মানুষের অর্জিত জ্ঞান বা বিজ্ঞান মূলত মানুষের তৈরি করা নিয়ম এবং তাদের নিজস্ব মতামত মাত্র। এই জ্ঞানগুলো কোনোভাবেই পূর্ণতা বা 'Perfection' অর্জন করতে পারে না; বরং এগুলো সন্দেহজনক এবং ভুল ও মতভেদে পরিপূর্ণ। জাহেলি সমাজে যখন কোনো জ্ঞান বা তত্ত্ব উপস্থাপন করা হতো, তখন তার ভিত্তি ছিল কোনো অকাট্য প্রমাণ নয়, বরং ছিল বংশমর্যাদা বা প্রথাগত বিশ্বাস। ফলে একটি তত্ত্বের সত্যতা অন্য একটি তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারত এবং সেখানে কোনো মীমাংসাকারী কর্তৃপক্ষ (Arbitrator) ছিল না।
এই জ্ঞানতাত্ত্বিক অস্থিরতা জাহেলি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোকে অত্যন্ত দুর্বল করে তুলেছিল। যেহেতু জ্ঞান ছিল মূলত মানুষের মতামতের ওপর নির্ভরশীল, তাই সেখানে কোনো 'Objective Truth' বা বস্তুনিষ্ঠ সত্যের স্থান ছিল না। একটি উপজাতি যা সত্য বলে মনে করত, অন্য উপজাতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত কিছুকে সত্য বলে গ্রহণ করত। এই মতভেদ বা 'Disagreement' ছিল চিরস্থায়ী, কারণ তাদের কাছে সত্যের কোনো মাপকাঠি ছিল না যা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এই পরিস্থিতিটি ছিল মূলত একটি 'Intellectual Chaos' বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিশৃঙ্খলা, যেখানে জ্ঞান ছিল কেবল ক্ষমতার হাতিয়ার বা প্রথার অনুগামী [5] ।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই মতামতের আধিপত্য মানুষকে সত্যের সন্ধান থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তার জ্ঞান কেবল তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, তখন সে সত্যের অনুসন্ধানের পরিবর্তে নিজের মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। জাহেলি সমাজে এই প্রবণতা ছিল প্রবল, যা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক প্রগতির পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সাহিত্য ও মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে জ্ঞানের সীমাবদ্ধ সঞ্চালন
জাহেলি সমাজে জ্ঞানের প্রধান বাহক ছিল সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা। তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোটি ছিল মূলত মৌখিক (Oral Tradition), যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কবিতার মাধ্যমে সঞ্চারিত হতো। যদিও জাহেলি সাহিত্য ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং শৈল্পিক দিক থেকে উন্নত, তবুও জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর ব্যাপক সীমাবদ্ধতা ছিল। কবিতার মাধ্যমে যে জ্ঞান সঞ্চারিত হতো, তা ছিল মূলত মানুষের অভিজ্ঞতা, আবেগ এবং উপজাতীয় বীরত্বগাথার সংমিশ্রণ [6] ।
কবিতা ছিল তাদের ইতিহাসের দলিল এবং জ্ঞানের ভাণ্ডার। কিন্তু এই জ্ঞান ছিল মূলত 'Subjective' বা ব্যক্তিনিষ্ঠ। একজন কবির কল্পনা বা তার উপজাতীয় দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল সেই জ্ঞানের সত্যতা মাপার মানদণ্ড। এতে কোনো বৈজ্ঞানিক বা তাত্ত্বিক গভীরতা ছিল না যা মহাজাগতিক সত্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। জাহেলি সাহিত্য বা কবিতা ছিল মূলত মানুষের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ, যা সত্যের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিত সৌন্দর্যের (Aesthetics) ওপর। যদিও এই সাহিত্যিক সৃজনশীলতা ছিল অত্যন্ত উচ্চমানের, তবুও এটি কোনো সুসংহত জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করতে পারেনি [7] ।
মৌখিক ঐতিহ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা জ্ঞানের বিশুদ্ধতাকেও হুমকির মুখে ফেলত। যেহেতু জ্ঞান ছিল মানুষের স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভরশীল, তাই সময়ের সাথে সাথে তথ্যের বিকৃতি বা পরিবর্তন ঘটা ছিল অনিবার্য। কোনো একটি ঘটনা বা সত্য কীভাবে বর্ণিত হবে, তা নির্ভর করত সেই সময়ের কবির দক্ষতা বা তার উপজাতীয় স্বার্থের ওপর। ফলে জাহেলি সমাজ একটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, যেখানে সত্য ছিল পরিবর্তনশীল এবং মানুষের কল্পনার অধীন।
সভ্যতার উপাদান ও জাহেলি বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা
সভ্যতার বিকাশের জন্য কিছু মৌলিক উপাদানের প্রয়োজন হয়, যেমন—নৈতিকতা, ধর্ম, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য এবং শিল্প। উইল ডিউরান্টের মতে, সভ্যতা গড়ে তোলার জন্য নৈতিকতা হলো একটি অভ্যন্তরীণ আইন যা মানুষের মধ্যে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য তৈরি করে [8] । কিন্তু জাহেলি সমাজে এই নৈতিকতা বা 'Morality' ছিল কোনো ঐশী বা সার্বজনীন আইনের পরিবর্তে কেবল সামাজিক প্রথা বা উপজাতীয় রীতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাদের নৈতিক জ্ঞানতত্ত্ব ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং স্বার্থকেন্দ্রিক।
একইভাবে, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, প্রাচীন মিশর বা ব্যাবিলনে বিজ্ঞান ও গণিতের যে অগ্রগতি ছিল, জাহেলি আরবের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোতে তেমন কোনো সুসংহত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা 'Scientific Method' ছিল না। তাদের জ্ঞান ছিল মূলত পর্যবেক্ষণমূলক এবং অভিজ্ঞতামূলক, যা কোনো তাত্ত্বিক বা গাণিতিক কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ছিল না [9] । দর্শন বা 'Philosophy'-র ক্ষেত্রেও তারা ছিল মূলত অস্পষ্ট ধারণার জালে আবদ্ধ। তারা অস্তিত্ব বা মহাবিশ্বের মূল কারণ (First Causes) সম্পর্কে চিন্তা করার চেষ্টা করলেও তা ছিল মূলত পৌরাণিক কাহিনী বা মিথ (Mythology) দ্বারা প্রভাবিত [10] ।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাহেলি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোটি ছিল একটি অসম্পূর্ণ সভ্যতা। তাদের সাহিত্য ও শিল্প ছিল উন্নত, কিন্তু তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল শূন্য। ওহীর অনুপস্থিতিতে তাদের বুদ্ধিবৃত্তি কেবল মানুষের জাগতিক প্রয়োজন এবং উপজাতীয় অহংবোধ পূরণে সক্ষম ছিল, কিন্তু তা মানুষকে মহাজাগতিক সত্য, পরম ন্যায়বিচার বা ঐশী বিধানের উচ্চতর স্তরে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছিল। এই বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতাই ছিল জাহেলি যুগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যা পরবর্তীতে ইসলামের আগমনে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও সুসংহত জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লবের মাধ্যমে সমাধান করা হয়।