২.৩.১ উপঢৌকনের (Gifts) আশায় ধাত্রীদের ধনী পরিবার খোঁজার মনস্তত্ত্ব বনাম হালিমার শূন্য হাতে ফেরার ভয়
প্রাক-ইসলামিক আরবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল শিশুদের লালন-পালনের জন্য মরুপ্রান্তরের ধাত্রীদের ওপর নির্ভরতা। মক্কার অভিজাত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষা এবং মরুভূমির মুক্ত বাতাসে বেড়ে ওঠার লক্ষ্যে বনু সাদ বা বনু হিললের মতো বেদুইন গোত্রের ধাত্রীদের কাছে প্রেরণ করত। এই প্রথাটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক রীতি ছিল না, বরং এটি ছিল এক জটিল আর্থ-সামাজিক লেনদেনের অংশ। ধাত্রীরা যখন মক্কায় আসত, তখন তাদের মূল লক্ষ্য থাকত এমন একটি পরিবার খুঁজে পাওয়া, যারা তাদের সন্তানের যত্ন নেওয়ার বিনিময়ে পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক এবং আকর্ষণীয় উপঢৌকন প্রদান করতে সক্ষম। এই প্রক্রিয়ায় ধাত্রীদের মনস্তত্ত্ব ছিল মূলত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদার সংমিশ্রণ, যেখানে বিত্তবান পরিবারের সন্তান গ্রহণ করা ছিল তাদের জন্য এক প্রকার অর্থনৈতিক বিনিয়োগ।
ধাত্রীদের অর্থনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও বিত্তবান পরিবারের প্রতি আকর্ষণ
মরুভূমির ধাত্রীদের জন্য মক্কায় আসা ছিল একটি নির্দিষ্ট মৌসুমী পেশার মতো। তারা জানত যে, কুরাইশ বংশের প্রভাবশালী এবং ধনী পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের ধাত্রীদের হাতে সোপর্দ করার সময় কেবল প্রাথমিক পারিশ্রমিকই দেয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদী উপঢৌকন এবং উপহারের প্রতিশ্রুতিও প্রদান করে। এই উপঢৌকনগুলো ছিল তাদের পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের প্রধান উৎস। ফলে, ধাত্রীদের মধ্যে এক ধরণের প্রতিযোগিতামূলক মনস্তত্ত্ব তৈরি হতো, যেখানে তারা সর্বোচ্চ বিত্তবান পরিবারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করত। এই প্রবণতাকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় 'Economic Incentive' বা অর্থনৈতিক প্রেষণা হিসেবে অভিহিত করা যায়, যা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করত।
আরবদের এই প্রথার মূল ভিত্তি ছিল মরুভূমির পরিবেশের প্রতি তাদের অগাধ বিশ্বাস। যেমনটি আবু হাসান আল-নাদভী রহ. উল্লেখ করেছেন:
وكان العرب يؤثرون البادية لرضاعة الأطفال ونشأتهم الأولى، لما في هواء البادية من... [1] । এই বিশ্বাসের পাশাপাশি অর্থনৈতিক লাভ তাদের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। ধাত্রীরা বিশ্বাস করত যে, ধনী পরিবারের সন্তান লালন-পালন করলে তারা কেবল অর্থই পাবে না, বরং সেই পরিবারের সাথে একটি সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে, যা ভবিষ্যতে তাদের গোত্রের জন্য রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। ফলে, তারা শিশুদের গুণাবলির চেয়ে তাদের পিতার আর্থিক সামর্থ্যের দিকে অধিক দৃষ্টি নিবদ্ধ করত।
এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ফলে মক্কার বাজারে এক ধরণের 'শ্রেণীবিন্যাস' তৈরি হয়েছিল। ধাত্রীরা প্রথমে সর্বোচ্চ ধনী পরিবারগুলোর দরজায় কড়া নাড়ত এবং সেখানে প্রত্যাখ্যাত হলে ক্রমান্বয়ে নিম্নবিত্ত পরিবারের দিকে অগ্রসর হতো। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল একটি বাণিজ্যিক লেনদেনের মতো, যেখানে শিশুর পরিচয় ছিল গৌণ এবং তার পরিবারের সম্পদ ছিল মুখ্য। এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের কারণে অনেক সময় যোগ্য ধাত্রীরাও কেবল অর্থের লোভে অযোগ্য পরিবারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতো, যা তৎকালীন আরবের সামাজিক বৈষম্যের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। [2] পিতৃহীনতার সামাজিক প্রভাব ও নবির সা. প্রতি ধাত্রীদের অনীহা
মুহাম্মাদ সা. যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন তিনি ছিলেন একজন অনাথ। তাঁর পিতা আবদুল্লাহর অনুপস্থিতি কেবল একটি আবেগীয় শূন্যতা ছিল না, বরং তৎকালীন আরবের কঠোর বাস্তবতায় এটি ছিল একটি বড় অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। ধাত্রীরা যখন মক্কায় আসলেন, তখন তারা দেখলেন যে এই নবজাতকটি অত্যন্ত সুন্দর এবং পবিত্র, কিন্তু তাঁর কোনো অভিভাবক নেই যিনি তাকে লালন-পালনের জন্য আকর্ষণীয় উপঢৌকন বা উচ্চ পারিশ্রমিক প্রদান করতে পারবেন। এই বাস্তবতায় ধাত্রীদের মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক সংকুচিততা তৈরি হয়। তারা ভাবছিলেন, একজন অনাথ শিশুকে গ্রহণ করলে তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক লাভ হবে না, যা একজন বিত্তবান পিতার সন্তান থেকে পাওয়া সম্ভব।
তৎকালীন আরবে 'ইয়াতীম' বা অনাথ হওয়া ছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ধাত্রীদের কাছে এই শিশুটি ছিলেন একজন 'ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ'। তারা জানতেন যে, উপঢৌকনের আশা এখানে শূন্য, কারণ তাঁর দাদামহোদয় আবদুল মুত্তালিব রহ. অত্যন্ত সম্মানিত হলেও, তিনি হয়তো সেই প্রথাগত বিলাসবহুল উপঢৌকন প্রদান করবেন না যা ধনী ব্যবসায়ীরা করে থাকেন। এই মনস্তাত্ত্বিক বাধাটি এতটাই প্রবল ছিল যে, একের পর এক ধাত্রী মুহাম্মাদ সা.-কে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তাদের এই অনীহা কেবল অর্থের প্রতি লোভ ছিল না, বরং এটি ছিল তাদের জীবনসংগ্রামের এক বাস্তব প্রতিফলন, যেখানে প্রতিটি পয়সা ছিল তাদের পরিবারের টিকে থাকার লড়াই। [3] এই পরিস্থিতিটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এখানে একটি চরম বৈপরীত্য বিদ্যমান ছিল। একদিকে ছিল নবির সা. ঐশ্বরিক নূর এবং পবিত্রতা, আর অন্যদিকে ছিল ধাত্রীদের জাগতিক ও বস্তুগত চিন্তা। ধাত্রীরা কেবল বাহ্যিক সম্পদ দেখছিলেন, কিন্তু তারা বুঝতে পারেননি যে এই অনাথ শিশুটিই হবেন পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বরকতের উৎস। এই মনস্তাত্ত্বিক অন্ধত্ব তাদের এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছিল। ইবনে হিশাম রহ. তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন যে, ধাত্রীরা অনাথ শিশুকে গ্রহণ করতে ভয় পাচ্ছিল কারণ তারা মনে করেছিল এর পেছনে কোনো আর্থিক নিরাপত্তা নেই। [4] হালিমার চরম দারিদ্র্য ও শূন্য হাতে ফেরার মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক
হালিমা রা. যখন মক্কায় আসলেন, তখন তাঁর জীবন ছিল চরম দারিদ্র্য এবং সংকটের মধ্য দিয়ে। তাঁর গোত্রে তখন ভয়াবহ খরা দেখা দিয়েছিল, যার ফলে গবাদি পশুগুলো খাদ্যের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং তাঁর নিজের সন্তানটিও অপুষ্টিতে ভুগছিল। এই চরম অভাবের মুহূর্তে তাঁর জন্য একটি শিশুকে গ্রহণ করা ছিল কেবল একটি দায়িত্ব নয়, বরং এটি ছিল তাঁর পরিবারের অর্থনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার শেষ চেষ্টা। তবে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল 'শূন্য হাতে ফিরে যাওয়া'। যদি তিনি কোনো শিশুকে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হতেন, তবে তাঁকে তাঁর গোত্রে ফিরে যেতে হতো চরম অপমান এবং চরম দারিদ্র্যের সাথে, যা তাঁর জন্য ছিল অসহনীয়।
হালিমার এই মানসিক অবস্থাকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় 'Survival Anxiety' বা টিকে থাকার আতঙ্ক বলা যেতে পারে। তিনি জানতেন যে, যদি তিনি কোনো শিশুকে গ্রহণ না করেন, তবে তাঁর স্বামী এবং সন্তান আরও বেশি কষ্টের সম্মুখীন হবে। তাঁর মনে এই দ্বন্দ্ব চলছিল যে, একদিকে তিনি বিত্তবান পরিবার খুঁজছেন যাতে দ্রুত দারিদ্র্য দূর হয়, কিন্তু অন্যদিকে সময় ফুরিয়ে আসছে এবং অন্য সব ধাত্রীরা ইতিমধ্যে ভালো পরিবারগুলো দখল করে নিয়েছে। এই অনিশ্চয়তা তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। [5] হালিমার এই ভয়টি কেবল আর্থিক ছিল না, বরং এটি ছিল সামাজিক মর্যাদার সাথে জড়িত। বেদুইন সমাজে একজন ধাত্রীর সাফল্য পরিমাপ করা হতো তিনি কতটুকু সম্পদ নিয়ে ফিরে এসেছেন তার ওপর ভিত্তি করে। শূন্য হাতে ফিরে আসা মানে ছিল নিজের অযোগ্যতা এবং ব্যর্থতাকে স্বীকার করে নেওয়া। তাঁর এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ তাঁকে এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। তিনি যখন দেখলেন যে আর কোনো বিকল্প নেই এবং সব ধাত্রীরাই চলে গেছে, তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয় যে, "অন্তত একজন অনাথ শিশুকে গ্রহণ করে কিছু না কিছু তো পাওয়া যাবে, তার চেয়ে শূন্য হাতে ফিরে যাওয়া অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক।" [6] বাস্তবতা বনাম আকাঙ্ক্ষা: হালিমার চূড়ান্ত মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর
হালিমার মনস্তত্ত্বের এই রূপান্তরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শুরুতে তাঁর লক্ষ্য ছিল উপঢৌকনের আশা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে তাঁর লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়াল কেবল 'টিকে থাকা'র লড়াইয়ে। যখন তিনি দেখলেন যে বিত্তবান পরিবারের সব সুযোগ শেষ হয়ে গেছে, তখন তাঁর ভেতরে থাকা মানবিক অনুকম্পা এবং চরম দারিদ্র্যের তাড়না একীভূত হয়ে গেল। তিনি উপলব্ধি করলেন যে, এই অনাথ শিশুটি কেবল তাঁর জন্য একটি অর্থনৈতিক সুযোগ নয়, বরং এটি হতে পারে তাঁর ভাগ্যের পরিবর্তনের একটি মাধ্যম। এই পর্যায়ে তাঁর ভয়টি 'উপঢৌকনের অভাব' থেকে পরিবর্তিত হয়ে 'সম্পূর্ণ শূন্যতার ভয়ে' রূপ নিল।
এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি মুহাম্মাদ সা.-কে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিল এক ধরণের 'Desperation' বা চরম নিরুপায় অবস্থার সিদ্ধান্ত। তিনি তাঁর স্বামীকে বললেন যে, তিনি কোনো শিশুকে ছেড়ে দিয়ে ফিরে যেতে পারবেন না, কারণ তা হবে চরম লজ্জাজনক। এখানে তাঁর ব্যক্তিগত ইগো এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধের এক সংঘাত দেখা যায়। তিনি জানতেন যে অনাথ শিশুর পেছনে কোনো বড় সম্পদ নেই, কিন্তু তাঁর অন্তরে এক ধরণের অস্পষ্ট বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল যে, এই শিশুটি হয়তো বিশেষ কেউ। [7] হালিমার এই সিদ্ধান্তটি তৎকালীন আরবের সামাজিক বাস্তবতায় এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ছিল। যেখানে অন্য ধাত্রীরা কেবল সম্পদের হিসাব নিচ্ছিল, সেখানে হালিমা রা. চরম দারিদ্র্যের তাড়নায় এবং মানবিক তাড়নায় এক অনাথ শিশুকে গ্রহণ করলেন। এই সিদ্ধান্তটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজন ছিল না, বরং এটি ছিল এক মহান ইতিহাসের সূচনা। তাঁর এই শূন্য হাতে ফেরার ভয়টিই শেষ পর্যন্ত তাঁকে সেই মহান ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে নিয়ে এল, যা তাঁর জীবনের সমস্ত অভাব এবং দুঃখকে চিরতরে মুছে দিল। [8]