১.৩ ট্রাইবাল ন্যাশনালিজম (Tribal Nationalism) থেকে সেন্ট্রাল ফেডারেলিজমে (Central Federalism) উত্তরণের তাত্ত্বিক রূপরেখা
প্রাক-ইসলামি আরবের ভূ-রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট ছিল মূলত একটি খণ্ডবিখণ্ড ও অস্থির ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। সেখানে কোনো সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো বা কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল না; বরং সমগ্র উপদ্বীপটি ছিল অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্রীয় এককের সমষ্টি। এই গোত্রীয় ব্যবস্থা কেবল একটি সামাজিক ইউনিট ছিল না, বরং এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ও অস্তিত্ববাদী সত্তা। এই ব্যবস্থাকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় 'ট্রাইবাল ন্যাশনালিজম' বা 'গোত্রীয় জাতীয়তাবাদ' হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে, যেখানে ব্যক্তির প্রাথমিক ও চূড়ান্ত আনুগত্য ছিল তার রক্তসম্পর্কীয় গোত্রের প্রতি। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে ইসলাম এই সংকীর্ণ গোত্রীয় সংহতি বা 'আসাবিয়্যাহ' (Asabiyyah)-কে অতিক্রম করে একটি সুসংগঠিত 'সেন্ট্রাল ফেডারেলিজম' বা কেন্দ্রীয় উম্মাহর ধারণায় রূপান্তরিত করেছিল।
গোত্রীয় জাতীয়তাবাদ ও 'আসাবিয়্যাহ' (Asabiyyah)-এর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
প্রাক-ইসলামি আরবের সামাজিক কাঠামোর মূল ভিত্তি ছিল 'গোত্র' বা 'ক্বাবিলা' (Qabila)। গোত্র ছিল এমন একটি সামাজিক একক যা কার্যত একটি রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করত। এই গোত্রীয় ব্যবস্থায় কোনো লিখিত সংবিধান বা বিধিবদ্ধ আইন ছিল না; বরং এটি পরিচালিত হতো বংশানুক্রমিক ঐতিহ্য এবং পূর্বপুরুষদের প্রথাগত রীতিনীতির ওপর ভিত্তি করে [1] । এই ব্যবস্থায় গোত্রের সদস্যদের মধ্যে যে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন বিদ্যমান ছিল, তাকেই বলা হতো 'আসাবিয়্যাহ' (العصبية القبلية), যা আধুনিক অর্থে গোত্রীয় জাতীয়তাবাদ বা উগ্র গোষ্ঠীগত সংহতিকে নির্দেশ করে। এই সংহতি মূলত রক্ত ও বংশীয় সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যা সদস্যদের মধ্যে এক ধরণের অন্ধ আনুগত্য তৈরি করত [2] ।
এই 'আসাবিয়্যাহ' বা গোত্রীয় জাতীয়তাবাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর সম্প্রসারণ ক্ষমতা। গোত্রসমূহ কেবল রক্তসম্পর্কীয় সদস্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত না, বরং বিভিন্ন মিত্রতা বা 'হিলফ' (Hilf)-এর মাধ্যমে প্রতিবেশী গোত্র বা নতুন অন্তর্ভুক্ত সদস্যদেরও নিজেদের বলয়ে নিয়ে আসত [3] । তবে এই সংহতি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ ও আত্মকেন্দ্রিক। একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচিতি ছিল কেবল তার গোত্রের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রাক-ইসলামি আরবের মানুষের কাছে 'দেশপ্রেম' বা 'স্বদেশ' বলে কোনো বিস্তৃত ধারণা ছিল না; বরং তাদের 'স্বদেশ' ছিল একটি ভ্রাম্যমাণ ধারণা, যা তাদের গোত্র যেখানে অবস্থান করত সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিল। গোত্র যখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হতো, তাদের স্বদেশও পরিবর্তিত হতো [4] ।
এই গোত্রীয় জাতীয়তাবাদের ফলে উপদ্বীপজুড়ে এক ধরণের নিরন্তর অস্থিরতা ও সংঘাত বিরাজ করত। সম্পদের সীমাবদ্ধতা, বিশেষ করে পানি ও চারণভূমির জন্য গোত্রগুলোর মধ্যে যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল, তা প্রায়শই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নিত। এই অবস্থাকে 'শরিয়ত আল-গাব' বা 'জঙ্গলের আইন' (شريعة الغاب) হিসেবে অভিহিত করা যায়, যেখানে শক্তিই ছিল একমাত্র মাপকাঠি [5] । এই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল প্রাচীন মুসনাদ লিপিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন শব্দে, যেমন— 'কাইদ' (كيد) যা বিদ্রোহ বা অবাধ্যতাকে নির্দেশ করে, এবং 'হারজ' (هرج) যা বিশৃঙ্খলা ও হত্যাকাণ্ডকে বোঝায় [6] ।
প্রাক-ইসলামি নেতৃত্ব ও ভঙ্গুর রাজনৈতিক জোটের প্রকৃতি
গোত্রীয় ব্যবস্থায় নেতৃত্বের কাঠামো ছিল মূলত কারিশম্যাটিক ও কার্যকারিতা-ভিত্তিক। প্রতিটি গোত্রের একজন প্রধান বা 'শেখ' (Sheikh) নির্বাচিত হতেন, যার মধ্যে সাহস, সম্পদ, উদারতা, প্রজ্ঞা এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতা থাকা অপরিহার্য ছিল [7] । এই নেতৃত্ব ছিল মূলত গোত্রের স্বার্থ রক্ষায় এবং যুদ্ধের সময় নেতৃত্ব প্রদানের জন্য। একজন শেখের প্রধান দায়িত্ব ছিল তার গোত্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশে গোত্রের সদস্যদের খাদ্যের অভাব বা দুর্ভিক্ষের সময় শেখের উদারতা ও সম্পদ বণ্টন করার ক্ষমতা তার রাজনৈতিক বৈধতা নির্ধারণ করত [8] ।
তবে প্রাক-ইসলামি আরবের এই রাজনৈতিক কাঠামোটি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। তৎকালীন সময়ে যে সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য বা সাম্রাজ্য গঠিত হয়েছিল, সেগুলো কোনো নাগরিকত্ব বা রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বরং সেগুলো ছিল বিভিন্ন গোত্রের একটি সাময়িক ও স্বার্থান্বেষী জোট মাত্র। এই জোটগুলো কেবল ততক্ষণই টিকে থাকত, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধা বিদ্যমান থাকত [9] । যখনই কোনো গোত্র তার নিজস্ব স্বার্থের কারণে জোট থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাইত, তখনই সেই রাজনৈতিক কাঠামোটি ভেঙে পড়ত। এই 'স্বার্থান্বেষী বিচ্ছিন্নতাবাদ' বা 'গোত্রীয় স্বার্থপরতা' (Tribal Egoism) একটি বৃহৎ ও স্থায়ী রাষ্ট্র গঠনের পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করত [10] ।
এই রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি অন্যতম কারণ ছিল নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের অভাব। প্রাক-ইসলামি যুগে গোত্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান ছিল একটি সাধারণ ঘটনা। গোত্রীয় নেতাদের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং গোত্রীয় নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ের ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ত [11] । এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব প্রাক-ইসলামি আরবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির পথে এক বিশাল বাধা হিসেবে কাজ করেছিল, যা মূলত একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় সত্তা গঠনে ব্যর্থ হয়েছিল [12] ।
ইসলামি আমূল পরিবর্তন: আসাবিয়্যাহ থেকে উম্মাহর ধারণা ও কেন্দ্রীয় ফেডারেলিজম
ইসলামের আবির্ভাব প্রাক-ইসলামি আরবের এই খণ্ডবিখণ্ড ও সংঘাতময় গোত্রীয় কাঠামোতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে। ইসলাম কেবল একটি ধর্মীয় সংস্কার নয়, বরং এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক আমূল পরিবর্তন (Paradigm Shift)। ইসলাম 'আসাবিয়্যাহ' বা অন্ধ গোত্রীয় জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে 'উম্মাহ' (Ummah) বা একটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের ধারণা প্রবর্তন করে। যেখানে প্রাক-ইসলামি ব্যবস্থায় আনুগত্য ছিল রক্তের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে, সেখানে ইসলাম আনুগত্যের ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করে 'ঈমান' বা বিশ্বাসকে। এটি মানুষের পরিচয়কে গোত্রীয় সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে একটি বৃহত্তর ও সমন্বিত পরিচয়ে উন্নীত করে [13] ।
ইসলামের এই নতুন রাজনৈতিক দর্শনটি মূলত একটি 'সেন্ট্রাল ফেডারেলিজম' বা কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এখানে 'জামাআহ' (Jama'ah) বা সমষ্টিগত ঐক্যের ধারণাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবি সা.-এর নির্দেশিত এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত বা গোত্রীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে সমষ্টিগত কল্যাণ ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই পরিবর্তনের গুরুত্ব বোঝাতে একটি হাদিসে বলা হয়েছে:
অর্থাৎ, "যে ব্যক্তি আনুগত্য ত্যাগ করল এবং জামাআহ বা সমষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল এবং অতঃপর মৃত্যুবরণ করল, সে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের মৃত্যু বরণ করল" [14] । এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, ইসলামে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বা গোত্রীয় বিচ্ছিন্নতাবাদকে কেবল একটি সামাজিক অপরাধ নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক পতন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রাক-ইসলামি 'শরিয়ত আল-গাব' বা জঙ্গলের আইনকে প্রতিস্থাপন করে 'শরীয়াহ' বা বিধিবদ্ধ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। এটি গোত্রীয় নেতাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা প্রথাগত রীতিনীতির পরিবর্তে একটি সুসংগঠিত ও কেন্দ্রীয় আইনি কাঠামো প্রদান করে। এই রূপান্তরটি ছিল মূলত একটি 'ট্রাইবাল নেশনালিজম' থেকে 'সেন্ট্রাল ফেডারেলিজম'-এ উত্তরণ। এই নতুন ব্যবস্থায় বিভিন্ন গোত্র বা গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব সামাজিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেও একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে ঐক্যবদ্ধ হতে সক্ষম হয়, যেখানে নাগরিকত্ব ও আনুগত্যের ভিত্তি ছিল ধর্মীয় ও নৈতিক আদর্শ [15] । এই সমন্বিত কাঠামোটিই পরবর্তীতে একটি বিশাল সাম্রাজ্য ও সভ্যতা গড়ে তোলার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল, যা প্রাক-ইসলামি আরবের বিচ্ছিন্ন ও অস্থির গোত্রীয় ব্যবস্থায় অসম্ভব ছিল।