১.৩.২ রিয়ারগার্ড (Rearguard) ধ্বংস এবং আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) সহ অবশিষ্ট তীরন্দাজদের বীরত্বপূর্ণ শাহাদাত
ইসলামি ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী ও সন্ধিক্ষণস্থায়ী অধ্যায়ে মক্কার পবিত্র ভূমিতে সংঘটিত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর প্রতিরোধ আন্দোলন কেবল একটি রাজনৈতিক বিদ্রোহ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি আদর্শিক ও অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। ৭৩ হিজরি সনের সেই ভয়াবহ অবরোধের প্রেক্ষাপটে যখন উমাইয়া বাহিনীর কঠোরতা ও আল-হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নির্মমতা চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছিল, তখন মক্কার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রিয়ারগার্ড বা পশ্চাদবর্তী প্রতিরক্ষা দল। এই রিয়ারগার্ডের মূল দায়িত্ব ছিল মক্কার অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা বলয়কে রক্ষা করা এবং প্রধান সেনাদলের জন্য একটি সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করা। তবে উমাইয়া বাহিনীর কৌশলগত অবরোধ ও মানজনিকের (Catapult) নিরবচ্ছিন্ন তাণ্ডবে এই রিয়ারগার্ডের পতন মক্কার পতনের পথ সুগম করে দেয়।
রণাঙ্গনের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে রিয়ারগার্ডের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত জটিল ও কৌশলগত। সামরিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, রিয়ারগার্ড বা পশ্চাদবর্তী দল মূলত আক্রমণকারী বাহিনীকে বিলম্বিত করার জন্য এবং মূল বাহিনীকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য গঠিত হয়। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর ক্ষেত্রে, মক্কার ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমিত সম্পদের কারণে এই রিয়ারগার্ড ছিল মূলত একটি স্থায়ী প্রতিরক্ষা প্রাচীর। যখন উমাইয়া বাহিনী মক্কার চারপাশ থেকে অবরোধ ঘনীভূত করতে শুরু করে, তখন এই রিয়ারগার্ডের অন্তর্ভুক্ত তীরন্দাজরা তাদের জীবনের বিনিময়ে মক্কার দেয়াল ও গিরিপথগুলোকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান।
রিয়ারগার্ডের কৌশলগত পতন ও মানজনিকের (Catapult) বিধ্বংসী প্রভাব
মক্কার অবরোধ কেবল স্থলপথের আক্রমণ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সমন্বিত সামরিক অভিযান যেখানে ভারী কামানের সমতুল্য 'মানজনিক' বা ক্যাটাপল্ট ব্যবহার করা হয়েছিল। আল-হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মক্কার প্রতিরক্ষা প্রাচীর ভেঙে ফেলার জন্য এই বিধ্বংসী অস্ত্রটি ব্যবহার করেন। মানজনিকের মাধ্যমে নিক্ষেপ করা বিশাল বিশাল পাথর মক্কার স্থাপত্য ও প্রতিরক্ষা কাঠামোর ওপর যে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তা রিয়ারগার্ডের অবস্থানকে অত্যন্ত নাজুক করে তোলে। এই ক্রমাগত গোলাবর্ষণের ফলে রিয়ারগার্ডের অবস্থানগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তীরন্দাজদের জন্য সুসংগত প্রতিরক্ষা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই অবরোধের তীব্রতা ও duration বা সময়কাল নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, এই অবরোধ প্রায় পাঁচ মাস স্থায়ী হয়েছিল [1] , যেখানে অন্য একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, এই অবরোধের তীব্রতা ও যুদ্ধের ব্যাপকতা বিবেচনা করলে এটি প্রায় আট মাস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল [2] । এই দীর্ঘমেয়াদী অবরোধের ফলে মক্কার রিয়ারগার্ডে থাকা যোদ্ধাদের খাদ্য ও গোলাবারুদ (তীর ও ধনুক) মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। মানজনিকের আঘাত কেবল শারীরিক ধ্বংসযজ্ঞই ঘটায়নি, বরং এটি মক্কার যোদ্ধাদের মনস্তাত্ত্বিক স্থিতিশীলতাকেও প্রচণ্ডভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
সামরিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মানজনিকের ব্যবহার ছিল একটি 'Psychological Warfare' বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশল। যখন আকাশ থেকে বিশাল পাথর বর্ষিত হচ্ছিল, তখন রিয়ারগার্ডের যোদ্ধারা কেবল শত্রুর তলোয়ারের মোকাবিলা করছিলেন না, বরং তারা প্রকৃতির এক বিধ্বংসী শক্তির বিরুদ্ধেও লড়ছিলেন। এই পরিস্থিতির কারণে রিয়ারগার্ডের সুসংগত কমান্ড কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং যোদ্ধারা বিচ্ছিন্নভাবে লড়াই করতে বাধ্য হন।
রিয়ারগার্ডের পতনের মুহূর্তেও মক্কার অবশিষ্ট তীরন্দাজরা যে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন, তা ইসলামি সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যখন উমাইয়া বাহিনীর পদাতিক বাহিনী মক্কার প্রবেশপথগুলোতে চাপ সৃষ্টি করছিল, তখন এই তীরন্দাজরা তাদের ধনুক ও তীরের মাধ্যমে শত্রুর অগ্রযাত্রাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেন। তাদের এই প্রতিরোধ ছিল মূলত একটি 'Delaying Action', যা আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-কে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মক্কার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করার সুযোগ করে দিয়েছিল।
তীরন্দাজদের এই বীরত্ব কেবল কৌশলগত ছিল না, বরং এটি ছিল ঈমানি শক্তির বহিঃপ্রকাশ। তারা জানতেন যে তাদের অবস্থান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং মানজনিকের আঘাতে যেকোনো মুহূর্তে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত। তবুও, তারা তাদের পজিশন ত্যাগ করেননি। রিয়ারগার্ডের এই যোদ্ধারা যখন একে একে শাহাদাত বরণ করতে লাগলেন, তখন মক্কার প্রতিরক্ষা বলয়টি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। তাদের এই আত্মত্যাগ মূলত মক্কার অভ্যন্তরীণ যোদ্ধাদের মনোবল ধরে রাখার শেষ চেষ্টা ছিল।
তীরন্দাজদের এই বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের ফলে উমাইয়া বাহিনীর পক্ষে মক্কার অভ্যন্তরে প্রবেশ করা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছিল। উরওয়া ইবনে আনীফ (রা.)-এর নেতৃত্বে উমাইয়া বাহিনী যখন মক্কার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন রিয়ারগার্ডের এই তীরন্দাজরা তাদের জন্য এক কঠিন প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন [4] । এই যোদ্ধাদের শাহাদাত মক্কার পতনের পূর্বাভাস দিলেও, তাদের বীরত্ব মক্কার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর চূড়ান্ত সংগ্রাম ও শাহাদাত
মক্কার রিয়ারগার্ডের পতন এবং তীরন্দাজদের শাহাদাতের পর, যুদ্ধের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে করুণ অধ্যায়টি শুরু হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) যখন বুঝতে পারলেন যে তার সমস্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং তার সাথীরা একে একে শাহাদাত বরণ করছেন, তখন তিনি কোনো আত্মসমর্পণ বা আপস করেননি। বরং তিনি একাকী এবং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে উমাইয়া বাহিনীর বিশাল বাহিনীর মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিল একজন মুমিনের চূড়ান্ত আত্মত্যাগ ও আত্মমর্যাদার বহিঃপ্রকাশ।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর শাহাদাতের তারিখটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। তিনি ৭৩ হিজরি সনের ১৫ই বা ১৭ই জমাদিউল উলা তারিখে শাহাদাত বরণ করেন তাবাকাত আল-কুবরা: ১৭ই জমাদিউল উলা, ৭৩ হিজরি">[5] । তার এই শাহাদাত কেবল একটি যুদ্ধের সমাপ্তি ছিল না, বরং এটি ছিল দ্বিতীয় ফিতনার একটি বিশাল অধ্যায়ের অবসান। উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের নির্দেশে আল-হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এই অভিযান পরিচালনা করেছিলেন [6] ।
আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর শেষ মুহূর্তগুলো ছিল অত্যন্ত মহিমান্বিত। যুদ্ধের ময়দানে যখন তিনি একা হয়ে পড়লেন, তখনও তার কণ্ঠে ছিল আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা। তার এই শাহাদাত মক্কার মানুষের হৃদয়ে এক গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল এবং উমাইয়া শাসনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করলেও, ইসলামি ইতিহাসের নৈতিক ও আদর্শিক দিক থেকে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছিল।
وتاريخ مقتل عبد الله هو يوم سبعة عشر من جمادى الأولى. فهذه أربعة أشهر وسبع عشرة ليلة من سنة ثلاث وسبعين [7] আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর শাহাদাত এবং রিয়ারগার্ডের যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ মক্কার ইতিহাসে এক অম্লমধুর স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে। একদিকে যেমন এটি একটি রাজনৈতিক শক্তির পতন নির্দেশ করে, অন্যদিকে এটি একজন সত্যনিষ্ঠ মুমিনের অটল বিশ্বাসের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। রিয়ারগার্ডের পতন এবং তীরন্দাজদের শাহাদাত মক্কার সামরিক পরাজয় নিশ্চিত করলেও, তাদের বীরত্ব ও আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর আদর্শিক বিজয় ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে আছে।