একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিগত বিপ্লব মানবসভ্যতাকে এক অভূতপূর্ব মোড় এনে দিয়েছে, যেখানে তথ্যের প্রবাহ এবং উপাত্তের (Data) নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব রাজনীতির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় একটি নতুন ও অত্যন্ত জটিল অর্থনৈতিক মডেলের উদ্ভব ঘটেছে, যাকে সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদরা 'সার্ভিল্যান্স ক্যাপিটালিজম' বা নজরদারি-পুঁজিবাদের আখ্যা দিয়েছেন। এই ব্যবস্থায় মানুষের ব্যক্তিগত আচরণ, পছন্দ-অপছন্দ এবং ডিজিটাল পদচিহ্নসমূহকে (Digital Footprints) কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে বিশাল মুনাফা অর্জিত হচ্ছে। ডেটা মাইনিং বা উপাত্ত খনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের অবচেতন মনকেও প্রভাবিত করার এক সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ডিজিটাল প্রাইভেসিকে এক অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের ধারণাটি ভূখণ্ড বা সম্পদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতো। কিন্তু বর্তমান যুগে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু স্থানান্তরিত হয়েছে ভার্চুয়াল স্পেস বা ডিজিটাল জগতের দিকে। যেখানে রাষ্ট্র বা বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো (Big Tech) মানুষের প্রতিটি মুহূর্তের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের আচরণের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। তথ্যের এই একচেটিয়া আধিপত্য বা ডেটা মনোপলি (Data Monopoly) আধুনিক বিশ্বের নতুন এক সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে পরোক্ষভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিবর্তন ও ডিজিটাল দাসত্বের উদ্ভব
রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল বা চক্রাকার বিবর্তন একটি চিরন্তন সত্য। প্লেটোর দর্শনে বর্ণিত রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, গণতন্ত্র এবং একনায়কতন্ত্রের চক্রাকার বিবর্তন আজ ডিজিটাল যুগে এক নতুন ও বিচিত্র রূপ ধারণ করেছে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানী উইল ডিউরান্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক ব্যবস্থার এই পরিবর্তনের ধারায় একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমা সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার নামে প্রচারিত আধুনিক জীবনধারা আজ এক প্রকারের 'স্বেচ্ছায় দাসত্ব' বা 'ভলান্টিয়ারি বন্ডেজ'-এর দিকে ধাবিত হচ্ছে।
يرتد قبيل من أبناء الغرب وثقافة الحريات إلى ظاهرة العبودية؛ يروجون لها، وينشرونها، ويطلبون لها الشرعية؛ في الدورين: سادة وعبيد، لتتحول إلى تجارة رائجة تجد لها مسوّقيها وعملاءها وبضاعتها وطقوسها، وهي تقوم على التفاهم بين الطرفين، لا الإكراه، في كثير من الأحيان!!!
[1]
ডিউরান্টের এই বিশ্লেষণটি বর্তমান সার্ভিল্যান্স ক্যাপিটালিজমের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এখানে দাসত্ব বা বন্ডেজ কোনো বাহ্যিক বলপ্রয়োগ বা শিকল দিয়ে করা হচ্ছে না, বরং এটি একটি পারস্পরিক সমঝোতার (Mutual Understanding) মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ব্যবহারকারীরা যখন তাদের ব্যক্তিগত তথ্য, অবস্থান এবং ব্যক্তিগত পছন্দসমূহ বিনামূল্যে কোনো অ্যাপ বা পরিষেবার বিনিময়ে প্রদান করেন, তখন তারা অজান্তেই একটি ডিজিটাল দাসত্বের চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এই ব্যবস্থায় 'মালিক' বা 'প্রভু' হলো সেই অ্যালগরিদম ও ডেটা-মালিক প্রতিষ্ঠানগুলো, আর 'দাস' হলো সেই ব্যবহারকারীরা যারা তাদের তথ্যের বিনিময়ে ডিজিটাল সুবিধা ভোগ করছেন। এটি এমন এক বাণিজ্য যা কোনো জোরজবরদস্তি ছাড়াই, বরং প্রলোভন ও সুবিধার মোড়কে পরিচালিত হচ্ছে [2] ।
এই ডিজিটাল বন্ডেজ বা দাসত্বের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর। যখন মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ ডেটা মাইনিংয়ের মাধ্যমে ট্র্যাক করা হয়, তখন তার আচরণের স্বাভাবিকতা বা spontaneity হারিয়ে যায়। মানুষ অবচেতনভাবে এমনভাবে আচরণ করতে শুরু করে যা তাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। এই প্রক্রিয়াটি মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে (Individuality) ধূলিসাৎ করে একটি সমজাতীয় বা homogenized ভোক্তা শ্রেণিতে রূপান্তরিত করে। ফলে, স্বাধীনতার নামে যে ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা প্রকৃতপক্ষে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ও গোপনীয়তাকে খর্ব করার এক সূক্ষ্ম ও আধুনিক কৌশল হিসেবে কাজ করছে।
ডেটা মাইনিং ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব: সম্পদের নতুন ভূ-রাজনীতি
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, যে রাষ্ট্র বা শক্তি প্রাকৃতিক সম্পদ, ব্যাংকিং খাত এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, তারাই বিশ্ব রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। আলজেরিয়ার আধুনিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি পেতে এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল অপরিহার্য। ব্যাংকিং এবং বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা ছিল জাতীয় তদারকি বা নজরদারির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা ঔপনিবেশিক শোষণ রোধে সহায়তা করত।
تأميم البنوك والتجارة الخارجية، لأن السيطرة على هذين القطاعين ضروري لممارسة الرقابة الوطنية وللتمكن من توجيهها في الاتجاه الذي يضمن القضاء على النظام الامتيازي بين فرنسا والجزائر ويسمح للدولة بالإشراف المباشر على التصدير والاستيراد وبمراقبة الأسعار على جميع المستويات.
[3]
বর্তমান যুগে এই 'সম্পদ' বা 'রিসোর্স' আর কেবল খনিজ বা মুদ্রা নয়, বরং 'ডেটা' বা উপাত্ত। ডেটা মাইনিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত বিশাল তথ্যভাণ্ডার এখন আধুনিক বিশ্বের 'নতুন তেল' বা 'নতুন খনিজ সম্পদ'। যে প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের কাছে এই তথ্যের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তারাই বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। আলজেরিয়ার প্রেক্ষাপটে যেমন ব্যাংকিং ও বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ [4] , তেমনি বর্তমান ডিজিটাল যুগে ডেটা সার্বভৌমত্ব (Data Sovereignty) রক্ষা করা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। যদি কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ডেটা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তবে সেই রাষ্ট্রটি কার্যত একটি ডিজিটাল উপনিবেশে পরিণত হয়।
সার্ভিল্যান্স ক্যাপিটালিজম মূলত এই ডেটা সম্পদের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের একটি প্রক্রিয়া। বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা মাইনিংয়ের মাধ্যমে এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যেখানে তথ্যের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কেবল মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে কুক্ষিগত। এটি একটি নতুন ধরনের সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism), যা সরাসরি ভূখণ্ড দখল না করেও একটি জাতির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আলজেরিয়ার বিপ্লবীরা যেমন সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল [5] , তেমনি বর্তমান বিশ্বে ডেটা মাইনিং ও ডিজিটাল নজরদারির বিরুদ্ধে লড়াইটি মূলত তথ্যের ওপর মানুষের মৌলিক অধিকার ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই।
বাজার তদারকি ও ডেটা মনোপলি: হিসবাহ্ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইসলামি ইতিহাসে বাজার তদারকি বা 'হিসবাহ্' (Hisbah) ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও ন্যায়বিচারভিত্তিক কাঠামো বিদ্যমান ছিল। নবি সা.-এর যুগ থেকে শুরু করে খলিফা রাবিদের শাসনামলে বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে কঠোর তদারকি করা হতো। বিশেষ করে খলিফা উমর রা.-এর শাসনামলে বাজার তদারকি ছিল অত্যন্ত সক্রিয় ও কার্যকর। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বাজারে পরিভ্রমণ করতেন এবং কোনো প্রকার অনিয়ম বা প্রতারণা দেখলে তা কঠোরভাবে দমন করতেন।
আধুনিক ডেটা মনোপলি বা তথ্যের একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থার সাথে ইসলামের এই বাজার তদারকি ব্যবস্থার একটি গভীর বৈপরীত্য রয়েছে। বর্তমান ডিজিটাল বাজারে বড় কোম্পানিগুলো তথ্যের মাধ্যমে এক বিশাল মনোপলি বা একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করে, যা অনেকটা 'ইহতিকার' বা মজুদদারির (Monopoly/Hoarding) মতো। ইসলামে ইহতিকার বা কৃত্রিমভাবে পণ্যের সরবরাহ কমিয়ে দাম বৃদ্ধি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
وقد ظهرت الرقابة على الأسواق في عهد النبوة لمنع وقوع الغش في البضائع (2). ولاشك أن هذه الرقابة استمرت في خلافة أبي بكر رضي الله عنه... وكثيراً ما تجول عمر رضي الله عنه بنفسه في الأسواق واطلع على أساليب التعامل، ومنع المخالفات الشرعية، سواء بالغش في السلع، أو بيع سلعة محرمة، أو الإضرار بالآخرين من الباعة بعدم التزام سعر السوق، أو احتكار البضائع...
[6]
খলিফা উমর রা. কেবল বাজার তদারকিই করতেন না, বরং তিনি নিশ্চিত করতেন যেন কোনো ব্যবসায়ী অন্য ব্যবসায়ীর ক্ষতি করতে না পারে বা ভোক্তাদের ঠকাতে না পারে [7] । বর্তমান ডিজিটাল যুগে ডেটা মাইনিংয়ের মাধ্যমে যখন কোম্পানিগুলো মানুষের আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং কৃত্রিমভাবে তথ্যের অসমতা তৈরি করে, তখন তা অনেকটা আধুনিক যুগের 'ডিজিটাল ইহতিকার'। তারা তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার ব্যবহার করে প্রতিযোগিতাকে নষ্ট করে দেয় এবং ভোক্তাদের ওপর একতরফা আধিপত্য বিস্তার করে। ইসলামের হিসবাহ্ ব্যবস্থা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যেকোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য।
উমর রা.-এর শাসনামলে বাজারের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে 'উরাফা' (Urafa) বা তদারককারী কর্মকর্তাদের একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা ছিল, যারা বিভিন্ন স্তরে মানুষের দায়িত্ব ও তদারকি নিশ্চিত করত [8] । এই ঐতিহাসিক কাঠামোটি বর্তমান ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে। যদি ডেটা বা তথ্যের ক্ষেত্রেও এমন একটি বৈশ্বিক ও নৈতিক তদারকি ব্যবস্থা থাকত, যা ডেটা মনোপলি রোধ করতে পারত এবং তথ্যের অপব্যবহার বা ডিজিটাল প্রতারণা (Digital Fraud) রুখতে পারত, তবে সার্ভিল্যান্স ক্যাপিটালিজমের এই ভয়াবহতা অনেকাংশে হ্রাস পেত। তথ্যের এই বিশাল সমুদ্রকে কেবল মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে না দেখে, মানুষের কল্যাণ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করাই ছিল ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের মূল লক্ষ্য।