মানব সভ্যতার ইতিহাসে দাসত্ব বা দাসপ্রথা একটি অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং সুদূরপ্রসারী সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যমান ছিল। তবে আধুনিক জ্ঞানতাত্ত্বিক ডিসকোর্সে এবং পশ্চিমা উপনিবেশবাদী ইতিহাসতত্ত্বে প্রায়শই সমস্ত প্রকার দাসত্বকে একটি একক ও অভিন্ন কাঠামোর অধীনে বিচার করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষত, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের চরম অমানবিক রূপ ‘কলোনিয়াল চ্যাটেল স্লেভারি’ (Colonial Chattel Slavery)-এর সাথে ইসলামের যুদ্ধবন্দী ও পারিবারিক সেবা সংক্রান্ত ‘ডমেস্টিক স্লেভারি’ বা ‘পারিবারিক সেবা’ (Domestic Servitude)-কে একীভূত করে দেখার বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা আধুনিক একাডেমিক অঙ্গনে দীর্ঘকাল ধরে চর্চিত হয়ে আসছে। এই দুই ব্যবস্থার মধ্যকার মৌলিক, কাঠামোগত, আইনি এবং মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য নিরূপণ করা কেবল ঐতিহাসিক সত্য উদ্ঘাটনের জন্যই প্রয়োজনীয় নয়, বরং ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রকৃত রূপটি অনুধাবনের জন্যও অপরিহার্য।
ইউরোপীয় কলোনিয়াল চ্যাটেল স্লেভারি ছিল মূলত একটি পুঁজিবাদী ও বর্ণবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে একজন মানুষকে সম্পূর্ণভাবে ‘পণ্য’ বা ‘স্থাবর সম্পত্তি’ (Chattel) হিসেবে গণ্য করা হতো। এর বিপরীতে, ইসলামি শরিয়তের অধীনে যুদ্ধবন্দী বা পারিবারিক সেবার যে রূপটি আমরা দেখতে পাই, তা ছিল মূলত একটি সামাজিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সামরিক উপযোগিতার (Reciprocal Military Utility) অংশ। ইসলামি ব্যবস্থায় যুদ্ধবন্দী বা সেবকদের আইনি ব্যক্তিত্ব (Legal Personhood), আধ্যাত্মিক সমতা এবং সামাজিক গতিশীলতা (Social Mobility) নিশ্চিত করা হয়েছিল, যা কলোনিয়াল চ্যাটেল স্লেভারিতে সম্পূর্ণ অসম্ভব এবং অকল্পনীয় ছিল। এই দুই ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের তাদের দার্শনিক ভিত্তি, আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য এবং সামাজিক পরিণতির গভীর তলদেশে প্রবেশ করতে হবে।
ইসলামি ইতিহাসের উজ্জ্বল ও গৌরবময় অধ্যায়গুলোকে আড়াল করে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো যেভাবে মুসলিম যুবসমাজের মনস্তত্ত্বে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি করতে চেয়েছে, তা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে মুসলিম বিশ্বের অনেক বুদ্ধিজীবীও ইসলামের এই মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ যুদ্ধবন্দী নীতিকে পশ্চিমা চ্যাটেল স্লেভারির সমান্তরালে রেখে রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। অথচ, ঐতিহাসিক দলিল ও মূল আরবি উৎসগুলোর গভীর বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, ইসলামি ডমেস্টিক স্লেভারি বা যুদ্ধবন্দী ব্যবস্থাপনা ছিল সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে মানবিক ও প্রগতিশীল ব্যবস্থা, যা দাসত্ব প্রথার সমূলে বিলোপ সাধনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছিল।
কলোনিয়াল চ্যাটেল স্লেভারি: মানবতাকে পণ্যকরণের চরম রূপ
কলোনিয়াল চ্যাটেল স্লেভারি বা ঔপনিবেশিক দাসপ্রথা ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারতম অধ্যায়গুলোর একটি, যার ভিত্তি ছিল রোমান আইনের ‘ডমিনিয়াম’ (Dominium) বা বস্তুর ওপর পরম মালিকানার ধারণা। এই ব্যবস্থায় একজন আফ্রিকান বা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে আইনগতভাবে কোনো ‘ব্যক্তি’ (Person) হিসেবে নয়, বরং ‘বস্তু’ (Thing) বা ‘পণ্য’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হতো। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যে দাস ব্যবসা (Transatlantic Slave Trade) পরিচালিত হয়েছিল, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল ইউরোপীয় পুঁজিবাদ এবং বর্ণবাদী শ্রেষ্ঠত্ববাদ। এই ব্যবস্থায় দাসের কোনো আইনি অধিকার ছিল না; সে বিয়ে করতে পারত না, নিজের সন্তানের ওপর তার কোনো অধিকার ছিল না, এবং তার বংশধরেরা চিরকালের জন্য জন্মসূত্রে দাসে পরিণত হতো। এটি ছিল একটি বংশানুক্রমিক ও অপরিবর্তনীয় নিয়তি, যা থেকে মুক্তির কোনো আইনি বা সামাজিক পথ খোলা রাখা হয়নি।
এর বিপরীতে, ইসলামি শরিয়ত মানব ইতিহাসের প্রচলিত সমস্ত দাসত্বের উৎসকে চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছিল। ইসলাম-পূর্ব যুগে ঋণগ্রস্ততা, অপহরণ, দারিদ্র্যের কারণে সন্তান বিক্রি বা অপরাধের শাস্তি হিসেবে মানুষকে দাসে পরিণত করার যে বৈশ্বিক প্রথা ছিল, ইসলাম তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে। ইসলাম কেবল একটিমাত্র উৎসকে সাময়িকভাবে উন্মুক্ত রেখেছিল, তা হলো ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক যুদ্ধে (Just War) বন্দী হওয়া শত্রুসেনা বা তাদের সহযোগী, যা ছিল সমকালীন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে একটি পারস্পরিক সামরিক নীতি (Reciprocal Military Measure)। এই বিষয়ে ঐতিহাসিক উৎসে উল্লেখ করা হয়েছে:
"وأن هذا الدين قد جاء لتحرير البشرية فردم جميع منابع الرق المتعارف عليها في العالم آن ذاك، ولم يبق إلا على الرق الحربى كعملية عسكرية مقابلة."অনুবাদ: “এবং নিশ্চয়ই এই দ্বীন (ইসলাম) এসেছে মানবজাতির মুক্তির জন্য। ফলে এটি তৎকালীন বিশ্বে প্রচলিত দাসত্বের সমস্ত উৎসকে বন্ধ করে দিয়েছে এবং পারস্পরিক সামরিক প্রক্রিয়া হিসেবে কেবল যুদ্ধকালীন দাসত্বকেই অবশিষ্ট রেখেছে।” [1]
কলোনিয়াল চ্যাটেল স্লেভারিতে দাসের শ্রমকে চরমভাবে শোষণ করে শ্বেতাঙ্গ মালিকদের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হতো। সেখানে চাবুকের আঘাত, অঙ্গচ্ছেদ এবং অমানবিক খাটুনি ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। কিন্তু ইসলামি ব্যবস্থায় যুদ্ধবন্দী বা সেবকদের সাথে এই ধরনের আচরণকে কেবল নিষিদ্ধই করা হয়নি, বরং তা ছিল কাফফারা বা শাস্তির যোগ্য অপরাধ। পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা তাদের এই চরম অমানবিক ইতিহাসকে আড়াল করতে এবং মুসলিমদের মধ্যে সাংস্কৃতিক হীনম্মন্যতা তৈরি করতে ইসলামি ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে থাকে। তারা ইসলামের যুদ্ধবন্দী নীতিকে চ্যাটেল স্লেভারির সাথে গুলিয়ে ফেলে, যা মূলত তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব এবং ঔপনিবেশিক এজেন্ডারই অংশ [2] ।
ঔপনিবেশিক দাসপ্রথার আরেকটি ভয়াবহ দিক ছিল এর বর্ণবাদী চরিত্র। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ হওয়াটাই ছিল দাসত্বের প্রধান যোগ্যতা এবং শ্বেতাঙ্গ হওয়াটাই ছিল প্রভুত্বের প্রতীক। কিন্তু ইসলামে বর্ণবাদের কোনো স্থান ছিল না। রাসুলুল্লাহ সা. বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের বা শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। ইসলামি ব্যবস্থায় একজন আবিসিনীয় কৃষ্ণাঙ্গ বিলাল রা. বা পারস্যের সালমান রা. যে সামাজিক মর্যাদা ও নেতৃত্ব লাভ করেছিলেন, তা কলোনিয়াল চ্যাটেল স্লেভারির অধীনে থাকা কোনো কৃষ্ণাঙ্গের পক্ষে কল্পনা করাও ছিল অসম্ভব। কলোনিয়াল স্লেভারি মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে এনেছিল, আর ইসলাম যুদ্ধবন্দীকেও পরিবারের সদস্যের মর্যাদা দিয়ে মানবিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছিল [3] ।
ইসলামি ডমেস্টিক স্লেভারি বা পারিবারিক সেবা: একটি তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণ
ইসলামি পরিভাষায় যাকে ‘রীক’ (الرق) বা দাসত্ব বলা হয়, তা মূলত পশ্চিমা ‘Slavery’ শব্দের সমার্থক নয়। এটি ছিল এক ধরনের ‘পারিবারিক সেবা’ বা ‘ডমেস্টিক সার্ভিটিউড’ (Domestic Servitude), যেখানে বন্দীদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে একীভূত করে নেওয়া হতো। ইসলামি আইনের মূল লক্ষ্যই ছিল এই বন্দীদের ধীরে ধীরে মুক্ত করে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা। রাসুলুল্লাহ সা. এবং তাঁর সাহাবিগণের রা. যুগে যুদ্ধবন্দীদের সাথে যে আচরণ করা হতো, তা সমকালীন বিশ্বের যুদ্ধবন্দী আইনের চেয়ে হাজার বছর এগিয়ে ছিল। ইসলামি ব্যবস্থায় বন্দীদের ওপর কোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল এবং তাদের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মান মালিকের নিজস্ব জীবনযাত্রার মানের সমান হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল।
হুনাইনের যুদ্ধের পর হাওয়াজিন গোত্রের যুদ্ধবন্দীদের সাথে রাসুলুল্লাহ সা. যে আচরণ করেছিলেন, তা ইসলামি ডমেস্টিক স্লেভারির মানবিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তির সবচেয়ে বড় প্রায়োগিক প্রমাণ। হাওয়াজিন গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল যখন রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাদের বন্দীদের মুক্তির আবেদন জানায়, তখন রাসুলুল্লাহ সা. তাদের অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে গ্রহণ করেন। এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন রাসুলুল্লাহ সা.-এর দুধ-চাচা আবু সুরাদ জুহাইর বিন সুরাদ রা.। ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:
"وقدم على رسول الله صلى الله عليه وسلم أربعة عشر رجلًا من هوازن مسلمين، وجاءوا بإسلام من وراءهم من قومهم، فكان رأس القوم والمتكلم أبو صرد زهير بن صرد..."অনুবাদ: “এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর নিকট হাওয়াজিন গোত্রের চৌদ্দজন মুসলিম প্রতিনিধি আগমন করলেন, এবং তারা তাদের পেছনে থাকা অবশিষ্ট কওমের ইসলাম গ্রহণের বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। তাদের প্রধান ও মুখপাত্র ছিলেন আবু সুরাদ জুহাইর বিন সুরাদ...” [4]
এই প্রতিনিধি দল রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে অত্যন্ত আবেগঘন আবেদন পেশ করে। তারা রাসুলুল্লাহ সা.-এর শৈশবের দুধ-মাতা হালিমা সাদিয়া রা. এবং তাঁর বংশের নারীদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলে যে, এই বন্দিশালাগুলোতে আপনার ফুফু, খালা এবং লালনকারিনীরাই রয়েছেন, যারা আপনাকে শৈশবে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছেন। তারা আবৃত্তি করে:
"يا رسول الله، إنما في هذه الحظائر عمّاتك وخالاتك وحواضنك اللاتى كن يكفلنك..."অনুবাদ: “হে আল্লাহর রাসুল! নিশ্চয়ই এই বন্দিশালাগুলোতে আপনার ফুফু, খালা এবং লালনকারিনীরাই রয়েছেন যারা আপনার দেখাশোনা করেছিলেন...” [5]
রাসুলুল্লাহ সা. এই আবেগপূর্ণ আবেদনে গভীরভাবে সাড়া দেন। যদিও ততক্ষণে যুদ্ধলব্ধ গনিমত হিসেবে এই বন্দীদের সাধারণ সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছিল, যা তৎকালীন যুদ্ধনিয়ম অনুযায়ী সৈন্যদের আইনি প্রাপ্য ছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত চমৎকার কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপায়ে এই জটিল সমস্যার সমাধান করেন। তিনি নিজের এবং বনু আব্দুল মুত্তালিবের অংশের সমস্ত বন্দী তৎক্ষণাৎ মুক্ত করে দেন এবং সাধারণ মুসলিমদেরও তাদের নিজ নিজ বন্দী মুক্ত করে দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। এর ফলে সাহাবিগণ রা. স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভাগের বন্দীদের মুক্ত করে দেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলামে যুদ্ধবন্দী বা দাসত্ব কোনো স্থায়ী অর্থনৈতিক শোষণের হাতিয়ার ছিল না, বরং তা ছিল একটি সাময়িক অবস্থা যা অত্যন্ত সহজেই মানবিক ও সামাজিক কারণে বিলুপ্ত করা যেত [6] ।
আইনি ও সামাজিক গতিশীলতা: অধিকার, মর্যাদা এবং সামাজিকীকরণ
কলোনিয়াল চ্যাটেল স্লেভারি এবং ইসলামি ডমেস্টিক স্লেভারির মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য ছিল সামাজিক গতিশীলতা (Social Mobility) এবং আইনি অধিকারের ক্ষেত্রে। কলোনিয়াল ব্যবস্থায় একজন দাসের সামাজিক অবস্থান ছিল স্থবির এবং বংশানুক্রমিক। কিন্তু ইসলামি ব্যবস্থায় একজন যুদ্ধবন্দী বা সেবক কেবল মুক্তই হতে পারত না, বরং সে সমাজের সর্বোচ্চ স্তরে আরোহণ করতে পারত। ইসলামি আইন বা শরিয়ত দাসমুক্তির বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। ভুলবশত নরহত্যা, কসম ভঙ্গ, রমজানের রোজা ভাঙা ইত্যাদির কাফফারা হিসেবে দাসমুক্তির বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ‘মুকাতাবাহ’ (Mukatabah) চুক্তির মাধ্যমে একজন সেবক নিজের উপার্জনের মাধ্যমে মুক্তি ক্রয়ের আইনি অধিকার লাভ করত, যা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার মালিকের ছিল না।
হুনাইনের যুদ্ধের পর রাসুলুল্লাহ সা. যে ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা আরবের প্রচলিত দাসত্ব ব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করেছিল। মুয়াজ বিন জাবাল রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সা. সেদিন বলেছিলেন:
"لو كان ثابتًا على أحد من العرب ولاء أو رق لثبت اليوم، ولكن إنما هو إسار وفدية."অনুবাদ: “যদি আরবদের কারো ওপর দাসত্ব বা আনুগত্যের স্থায়ী অধিকার সাব্যস্ত থাকত, তবে আজ তা সাব্যস্ত হতো। কিন্তু এটি কেবলই যুদ্ধবন্দীত্ব এবং মুক্তিপণ (এর বেশি কিছু নয়)।” [7]
এই ঘোষণার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. স্পষ্ট করে দেন যে, ইসলামে আরবের বা অন্য কোনো মুক্ত মানুষকে স্থায়ীভাবে দাসে পরিণত করার কোনো সুযোগ নেই। এটি ছিল কেবলই যুদ্ধের একটি সাময়িক পরিণতি, যা মুক্তিপণ বা অনুগ্রহের মাধ্যমে সমাপ্ত হতে বাধ্য। তাছাড়া, বন্দীদের মুক্তির প্রক্রিয়াটি যাতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং জোরজুলুমহীন হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের নিয়োগ করেছিলেন। তিনি মুহাজিরদের কাছে উমর বিন খাত্তাব রা.-কে এবং আনসারদের কাছে জায়েদ বিন সাবিত রা.-কে প্রেরণ করেন যাতে তারা প্রতিটি সাহাবির সম্মতি যাচাই করতে পারেন। ঐতিহাসিক ওয়াকিদি এবং ইবনে সাদ বর্ণনা করেছেন যে, এই প্রতিনিধিরা প্রতিটি তাঁবুতে গিয়ে সাহাবিদের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করেছিলেন:
"فكان زيد بن ثابت يطوف على الأنصار يسألهم: هل سلموا ورضوا؟ فخبّروه أنهم سلموا ورضوا."অনুবাদ: “অতঃপর জায়েদ বিন সাবিত আনসারদের মাঝে ঘুরে ঘুরে জিজ্ঞাসা করছিলেন: তারা কি (বন্দী মুক্ত করতে) সম্মত এবং সন্তুষ্ট হয়েছেন? তারা তাকে জানালেন যে তারা সম্মত এবং সন্তুষ্ট হয়েছেন।” [8]
এই আইনি ও সামাজিক গতিশীলতার কারণেই ইসলামি ইতিহাসে আমরা ‘মামলুক সালতানাত’ বা ‘দাস রাজবংশ’-এর মতো অভূতপূর্ব ঘটনা দেখতে পাই, যেখানে প্রাক্তন দাসেরা একটি বিশাল সাম্রাজ্যের সুলতান ও সেনাপতি হয়েছিলেন। কলোনিয়াল আমেরিকায় বা ইউরোপে একজন কৃষ্ণাঙ্গ দাসের পক্ষে দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধান সেনাপতি হওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ নাগরিক অধিকার পাওয়াও ছিল অসম্ভব। ইসলামি আইন যুদ্ধবন্দীদের কেবল সামাজিক নিরাপত্তাই দেয়নি, বরং তাদের আইনি ব্যক্তিত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সমাজের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছিল। এটিই হলো ইসলামি ডমেস্টিক স্লেভারির প্রকৃত রূপ, যা কলোনিয়াল চ্যাটেল স্লেভারির সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে [9] ।
কাঠামোগত বৈসাদৃশ্য: অর্থনৈতিক শোষণ বনাম মানবিক পুনর্বাসন
কলোনিয়াল চ্যাটেল স্লেভারি এবং ইসলামি ডমেস্টিক স্লেভারির কাঠামোগত বৈসাদৃশ্য তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্যের মধ্যে নিহিত ছিল। কলোনিয়াল দাসপ্রথা ছিল সম্পূর্ণভাবে পুঁজিবাদী শোষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে দাসের শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus Value) শ্বেতাঙ্গ মালিকেরা আত্মসাৎ করত এবং দাসের নিজের কোনো অর্থনৈতিক সত্তা বা সম্পত্তি রাখার অধিকার ছিল না। অন্যদিকে, ইসলামি ডমেস্টিক স্লেভারি বা যুদ্ধবন্দী ব্যবস্থা ছিল মূলত একটি সামাজিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন শত্রুপক্ষের পুরুষেরা নিহত বা বন্দী হতো, তখন তাদের পরিবার ও নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা তৎকালীন বিশ্বে ছিল না। ইসলাম তাদের রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক তত্ত্বাবধানে এনে সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করে এবং তাদের মুক্তির পথকে সহজতর করে।
হুনাইনের যুদ্ধে যখন কিছু বেদুইন নেতা (যেমন আকরা বিন হাবিস, উয়াইনা বিন হিসন এবং আব্বাস বিন মিরদাস) তাদের ভাগের বন্দী বিনামূল্যে মুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন রাসুলুল্লাহ সা. তাদের ওপর জোরজুলুম করেননি। কারণ ইসলামে ব্যক্তিগত মালিকানা ও আইনের শাসন অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। এর পরিবর্তে রাসুলুল্লাহ সা. রাষ্ট্রীয় কোষাগার (বায়তুল মাল) থেকে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন যে, যারা এখন তাদের বন্দী মুক্ত করতে চাচ্ছে না, তাদের প্রতিটি বন্দীর বিনিময়ে প্রথম রাষ্ট্রীয় গনিমত থেকে ছয়টি করে উট প্রদান করা হবে:
"فمن كان عنده منهن شيء فطابت نفسه فليرسل ومن أبي منكم تمسك بحقه فليرد عليهم، وليكن فرضًا علينا ست فرائض من أول ما يفئ الله به علينا."অনুবাদ: “অতএব তোমাদের মধ্যে যার মন সায় দেয় সে যেন তার বন্দীকে মুক্ত করে দেয়। আর যে তার অধিকার ধরে রাখতে চায়, সে যেন তাদের ফিরিয়ে দেয়; এবং আমাদের ওপর ওয়াজিব হবে প্রথম যে গনিমত আল্লাহ আমাদের দান করবেন তা থেকে তাকে ছয়টি করে উট প্রদান করা।” [10]
এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। রাসুলুল্লাহ সা. প্রতিটি বন্দীর ফদিয়া বা মুক্তিপণ হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন “ثلاث حقاق وثلاث جذاع” (তিনটি চার বছর বয়সী উট এবং তিনটি পাঁচ বছর বয়সী উট) [11] । এই রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. প্রমাণ করেছেন যে, ইসলামি রাষ্ট্র যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করার জন্য আর্থিক দায়ভার বহন করতে প্রস্তুত ছিল। কলোনিয়াল রাষ্ট্রগুলো যেখানে দাসপ্রথাকে টিকিয়ে রাখার জন্য আইন প্রণয়ন করত এবং দাস ব্যবসায়ীদের কর মওকুফ করত, সেখানে ইসলামি রাষ্ট্র বায়তুল মালের অর্থ ব্যয় করে দাসত্ব মোচনকে ত্বরান্বিত করত।
এরই ফলশ্রুতিতে হুনাইনের যুদ্ধের পর মাত্র একদিনের ব্যবধানে হাওয়াজিন গোত্রের প্রায় ছয় হাজার (৬,০০০) যুদ্ধবন্দী সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন হয়ে তাদের পরিবারের কাছে ফিরে যায়। মানব ইতিহাসের কোনো যুদ্ধ বা দাসপ্রথার ইতিহাসে এত বিপুল সংখ্যক বন্দীকে একদিনে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এবং স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে মুক্ত করার দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটিই প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট যে, ইসলামি ডমেস্টিক স্লেভারি বা যুদ্ধবন্দী ব্যবস্থা কোনো শোষণমূলক দাসপ্রথা ছিল না, বরং তা ছিল একটি অত্যন্ত মানবিক, আইনি এবং পুনর্বাসনমূলক সামাজিক প্রক্রিয়া, যা কলোনিয়াল চ্যাটেল স্লেভারির মতো অমানবিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত ও প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করেছিল [12] ।