খণ্ড 100
ফন্ট:100%
থিম:

১২.২.১ মূল সন্ধিপত্রের ডিকনস্ট্রাকশন (Deconstruction) এবং এক্সট্রাডিশন ক্লজ (Extradition Clause)-এর বিশ্লেষণ

১. হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রের ঐতিহাসিক পটভূমি ও কূটনৈতিক উপক্রমণিকা


হিজরি ষষ্ঠ সনের জিলকদ মাসে সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধি কেবল ইসলামের ইতিহাসের একটি সাধারণ যুদ্ধবিরতি চুক্তি নয়, বরং এটি ছিল তৎকালীন আরবের ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) প্রেক্ষাপটে মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের এক যুগান্তকারী দলিল। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে মক্কার কুরাইশরা মদিনার নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য সামরিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা করে আসছিল। এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ও সংঘাতের পর, রাসুলুল্লাহ সা. যখন চৌদ্দশত সাহাবি নিয়ে উমরার উদ্দেশ্যে মক্কার অভিমুখে রওনা হন, তখন কুরাইশরা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে তাঁদের হুদায়বিয়া নামক স্থানে বাধা প্রদান করে [1] । এই সংকটকালীন মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ সা.-এর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সাহাবিদের "বাইআতুর রিদওয়ান" বা মৃত্যুর আনুগত্যের শপথ কুরাইশদের বাধ্য করে আলোচনার টেবিলে বসতে।


কুরাইশদের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত আলোচনার জন্য প্রেরিত হন সুহাইল ইবনে আমর, যিনি ছিলেন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাগ্মী ও ঝানু কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সুহাইল ইবনে আমরের আগমনের সাথে সাথেই রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর নামের অর্থ (সহজ বা শিথিলতা) থেকে শুভলক্ষণ গ্রহণ করে বলেছিলেন যে, কুরাইশরা এখন শান্তি ও সমঝোতা কামনা করছে। এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উভয় পক্ষের মধ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তা বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর এবং কুরাইশদের অনুকূলে মনে হলেও, এর গভীরে নিহিত ছিল এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিজয়। এই চুক্তির প্রতিটি শব্দ, বাক্য এবং ধারাকে বিনির্মাণ (Deconstruct) করলে তৎকালীন আরবের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর অলৌকিক কূটনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ মেলে [2]


হুদায়বিয়ার এই প্রাঙ্গণটি ছিল মক্কার হারাম সীমানার ঠিক বাইরে অবস্থিত একটি কৌশলগত বাফার জোন (Buffer Zone)। এখানে বসে সম্পাদিত চুক্তিটি মদিনা রাষ্ট্রকে প্রথমবারের মতো কুরাইশদের সমকক্ষ এক আন্তর্জাতিক পক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর আগে কুরাইশরা মদিনার মুসলমানদের কেবল বিদ্রোহী বা দস্যু হিসেবে বিবেচনা করত। কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে তারা মদিনাকে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়, যা আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় "ডি জুর" (De Jure) স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য করা যায় [3]

২. মূল সন্ধিপত্রের টেক্সচুয়াল ডিকনস্ট্রাকশন: শব্দার্থিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব


হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রটি যখন লিখিত হচ্ছিল, তখন শব্দচয়ন এবং পরিভাষা নির্ধারণ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। রাসুলুল্লাহ সা. আলি রা.-কে চুক্তিপত্রটি লেখার নির্দেশ দেন। এই লেখার প্রতিটি ধাপে সুহাইল ইবনে আমর কুরাইশদের অহমিকা ও আদর্শিক অনমনীয়তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, যা রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত ধৈর্য ও কৌশলগত নমনীয়তার সাথে মোকাবিলা করেন। চুক্তির সূচনাতেই যখন আলি রা. লিখলেন "বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম" (পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে), তখন সুহাইল তাৎক্ষণিক আপত্তি জানিয়ে বলল, "আমরা রহমান ও রাহিম কী তা জানি না; বরং আরবের ঐতিহ্য অনুযায়ী লিখুন 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' (হে আল্লাহ, আপনার নামে)" [4]


রাসুলুল্লাহ সা. এই শব্দার্থিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত না হয়ে বৃহত্তর শান্তির স্বার্থে সুহাইলের দাবি মেনে নেন এবং আলি রা.-কে "বিসমিকা আল্লাহুম্মা" লেখার নির্দেশ দেন। এরপর যখন চুক্তির মূল বয়ানে লেখা হলো:


«هذا ما قاضى عليه محمد رسول الله»

অনুবাদ: "এটি সেই চুক্তি যা আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ সম্পাদন করছেন।" [5]


তখন সুহাইল ইবনে আমর পুনরায় তীব্র আপত্তি উত্থাপন করে বলল, "আমরা যদি আপনাকে আল্লাহর রাসুল বলেই স্বীকার করতাম, তবে তো আপনার সাথে আমাদের কোনো বিরোধই থাকত না, আমরা আপনাকে কাবা গৃহে বাধা দিতাম না এবং আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধও করতাম না। অতএব, চুক্তিতে আপনার নাম এবং আপনার পিতার নাম লিখতে হবে— মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ।" আলি রা. রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে তাঁর নামের পাশ থেকে "রাসুলুল্লাহ" শব্দটি মুছে ফেলতে অস্বীকৃতি জানান। তখন রাসুলুল্লাহ সা. নিজেই সেই শব্দটি নির্দেশ করতে বলেন এবং নিজ হাতে তা মুছে দিয়ে সেখানে "মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ" প্রতিস্থাপন করেন [6]


এই শব্দার্থিক বিনির্মাণ (Semantic Deconstruction) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ সা. রূপক বা আলংকারিক স্বীকৃতির চেয়ে বাস্তব ও কৌশলগত অর্জনকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন যে, কাগজে "রাসুলুল্লাহ" শব্দটি মুছে দিলেই তাঁর নবুয়ত বাতিল হয়ে যায় না, কিন্তু এই সামান্য ছাড়ের বিনিময়ে যে দশ বছরের যুদ্ধবিরতি অর্জিত হচ্ছিল, তা ইসলামি দাওয়াতের প্রসারে এক অভূতপূর্ব দিগন্ত উন্মোচন করবে। এটি ছিল আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের "রিয়েলপলিটিক" (Realpolitik) বা বাস্তবসম্মত রাজনীতির এক অনন্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত [7]

৩. এক্সট্রাডিশন ক্লজ (প্রত্যর্পণ ধারা): একটি অসম চুক্তির ব্যবচ্ছেদ


হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রের সবচেয়ে বিতর্কিত, সংবেদনশীল এবং বাহ্যিকভাবে অসম ধারাটি ছিল এর প্রত্যর্পণ ধারা বা "এক্সট্রাডিশন ক্লজ" (Extradition Clause)। চুক্তির এই ধারায় উল্লেখ করা হয়েছিল:


«على أنه لا يأتيك منا رجلوإن كان على دينكإلا رددته إلينا، ومن جاءنا ممن معك لم نردّه عليك»

অনুবাদ: "আমাদের (কুরাইশদের) মধ্য থেকে কোনো ব্যক্তি যদি আপনার (মুহাম্মাদের) কাছে চলে যায়— এমনকি সে যদি আপনার দ্বীনের অনুসারীও হয়— তবে তাকে আমাদের কাছে ফেরত পাঠাতে হবে। পক্ষান্তরে, আপনার সঙ্গীদের মধ্য থেকে কেউ যদি আমাদের কাছে চলে আসে, তবে আমরা তাকে আপনার কাছে ফেরত পাঠাতে বাধ্য থাকব না।" [8]


এই ধারাটি ছিল সম্পূর্ণ একপাক্ষিক এবং আপাতদৃষ্টিতে চরম বৈষম্যমূলক। সাহাবিদের কাছে এটি ছিল অত্যন্ত অপমানজনক, কারণ এটি মুসলিমদের আত্মমর্যাদায় আঘাত করেছিল। কুরাইশরা এই ধারাটি যুক্ত করেছিল মূলত তাদের যুবসমাজ ও শ্রমশক্তির মদিনায় হিজরত রোধ করার জন্য, কারণ মদিনায় মুসলিমদের সংখ্যাবৃদ্ধি তাদের জন্য একটি বড় ধরনের জনসংখ্যাগত ও সামরিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্যদিকে, মদিনা থেকে কেউ মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে মক্কায় ফিরে গেলে তাকে ফেরত না পাওয়ার শর্তটি কুরাইশদের মনস্তাত্ত্বিক সান্ত্বনা প্রদান করেছিল [9]


রাসুলুল্লাহ সা. এই অসম ধারাটি কেন মেনে নিয়েছিলেন, তার গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, তিনি জানতেন যে, কোনো প্রকৃত মুমিন কখনো ইসলাম ত্যাগ করে মক্কায় ফিরে যাবে না; আর যদি কেউ ফিরে যায়ও, তবে মদিনা রাষ্ট্রের জন্য এমন কপট বা দুর্বল ঈমানদার ব্যক্তির কোনো প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়ত, মক্কা থেকে যেসকল নির্যাতিত মুসলিম মদিনায় আশ্রয় নিতে চাইবে, তাদের সাময়িকভাবে ফেরত দিতে হলেও আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য অন্য কোনো মুক্তির পথ উন্মুক্ত করবেন— এই ঐশী আত্মবিশ্বাস রাসুলুল্লাহ সা.-এর ছিল। এই প্রত্যর্পণ ধারাটি মেনে নেওয়ার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. কুরাইশদের এই ধারণা দিতে সক্ষম হন যে, মদিনা রাষ্ট্র তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না, যা কুরাইশদের প্রতিরক্ষামূলক মনোভাবকে শিথিল করে দেয় [10]

৪. আবু জানদাল (রা.)-এর ট্র্যাজেডি এবং মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাত


হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রটি যখন চূড়ান্তভাবে লেখা হচ্ছিল, ঠিক তখনই এই প্রত্যর্পণ ধারার প্রথম এবং সবচেয়ে নাটকীয় পরীক্ষাটি সংঘটিত হয়। সুহাইল ইবনে আমরের নিজের ছেলে আবু জানদাল রা., যিনি মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করার কারণে দীর্ঘদিন ধরে শিকলবদ্ধ অবস্থায় অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন, তিনি কোনোভাবে মক্কার বন্দিশালা থেকে পালিয়ে হুদায়বিয়ার মুসলিম শিবিরে এসে উপস্থিত হন। তাঁর সারা শরীরে ছিল নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন এবং পায়ে ছিল ভারী লোহার শিকল। তিনি মুসলিমদের কাছে এসে আর্তনাদ করে আশ্রয় প্রার্থনা করেন [11]


আবু জানদাল রা.-কে দেখামাত্রই সুহাইল ইবনে আমর অত্যন্ত কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করে এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর জামার কলার ধরে বলে, "হে মুহাম্মাদ! এই চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে এটিই প্রথম ব্যক্তি, যাকে আমার কাছে ফেরত দিতে হবে।" রাসুলুল্লাহ সা. সুহাইলকে অনুরোধ করেন, "আমরা তো এখনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করিনি, অতএব একে আমার স্বার্থে ছেড়ে দাও।" কিন্তু সুহাইল ছিল অনড়। সে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, আবু জানদালকে ফেরত না দিলে কোনো চুক্তিই স্বাক্ষরিত হবে না। এই দৃশ্য দেখে সাহাবিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বেদনার সঞ্চার হয়। উমর ইবনে আল-খাত্তাব রা. এই ঘটনায় এতটাই উত্তেজিত ও মর্মাহত হয়েছিলেন যে, তিনি রাসুলুল্লাহ সা. এবং আবু বকর রা.-এর কাছে গিয়ে চুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন [12]


রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত ভারী হৃদয়ে কিন্তু চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করতে আবু জানদাল রা.-কে তাঁর পিতার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আবু জানদাল রা.-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন:


«يا أبا جندل اصبر واحتسب، فإن الله جاعل لك ولمن معك من المستضعفين فرجاً ومخرجاً، إنا قد عقدنا بيننا وبين القوم صلحاً، وأعطيناهم على ذلك وأعطونا عهد الله، وإنا لا نغدر بهم»

অনুবাদ: "হে আবু জানদাল! ধৈর্য ধারণ করো এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা রাখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমার এবং তোমার মতো অন্যান্য দুর্বল ও নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য অতিসত্বর কোনো মুক্তির পথ ও উপায় বের করে দেবেন। আমরা এই সম্প্রদায়ের সাথে একটি চুক্তি সম্পাদন করেছি এবং আল্লাহর নামে তাদের অঙ্গীকার দিয়েছি; আর আমরা কখনো অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারি না।" [13]


আবু জানদাল রা.-এর এই প্রত্যর্পণ ছিল মুসলিমদের জন্য এক চরম মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। এটি একদিকে যেমন রাসুলুল্লাহ সা.-এর চুক্তি রক্ষার অনন্য বিশ্বস্ততাকে আরবের বুকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, অন্যদিকে মক্কার নির্যাতিত মুসলিমদের মনে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল যে, মদিনা রাষ্ট্র চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের সরাসরি গ্রহণ করতে না পারলেও, তাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী। এই ঘটনাটি কুরাইশদের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং তাদের নিজেদের সমাজেই এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি নীরব অসন্তোষের জন্ম দেয় [14]

৫. আন্তর্জাতিক আইন ও আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে হুদায়বিয়ার সন্ধি


আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন (Modern International Law) এবং কূটনৈতিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং এর প্রত্যর্পণ ধারাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো "প্যাকটা সুন্ট সারভান্ডা" (Pacta sunt servanda), যার অর্থ হলো সম্পাদিত চুক্তি অবশ্যই উভয় পক্ষকে মেনে চলতে হবে। রাসুলুল্লাহ সা. আবু জানদাল রা.-কে ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে এই আন্তর্জাতিক আইনি নীতিটির সর্বোত্তম বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিলেন, যা মদিনা রাষ্ট্রকে একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক পক্ষ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে [15]


সাধারণত আধুনিক রাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ চুক্তি বা "Extradition Treaty" সম্পাদিত হয় পারস্পরিক সমতার (Reciprocity) ভিত্তিতে। কিন্তু হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রত্যর্পণ ধারাটি ছিল সম্পূর্ণ অসম বা "Asymmetrical"। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন কোনো উদীয়মান বা দুর্বল রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি করে, তখন তারা প্রায়শই এমন অসম শর্ত চাপিয়ে দেয়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. এই অসম শর্তটি মেনে নিয়েছিলেন একটি বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য, যাকে আধুনিক সামরিক পরিভাষায় "Strategic Retreat" বা কৌশলগত পিছু হটা বলা হয়। তিনি সাময়িক আইনি পরাজয় মেনে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিজয়ের পথ সুগম করেছিলেন [16] [17]


এছাড়াও, এই চুক্তির মাধ্যমে মদিনা রাষ্ট্র কুরাইশদের সমকক্ষ হিসেবে আরবের অন্যান্য গোত্রগুলোর সাথে স্বাধীনভাবে জোট গঠনের অধিকার লাভ করে। চুক্তির একটি ধারা ছিল:


«أنه من أحب أن يدخل في عقد محمد وعهده دخل فيه، ومن أحب أن يدخل في عقد قريش وعهدهم دخل فيه»

অনুবাদ: "যে ব্যক্তি মুহাম্মাদের চুক্তি ও জোটে প্রবেশ করতে চায়, সে তাতে প্রবেশ করতে পারবে; আর যে কুরাইশদের চুক্তি ও জোটে প্রবেশ করতে চায়, সে তাদের সাথে যোগ দিতে পারবে।" [18]


এর ফলে খুজাআ গোত্র তৎক্ষণাৎ মুসলিমদের সাথে এবং বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সাথে জোটবদ্ধ হয়। এই জোট গঠনের স্বাধীনতা মদিনার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং কুরাইশদের একচেটিয়া আঞ্চলিক আধিপত্যের অবসান ঘটায় [19]

৬. আবু বাসির (রা.)-এর প্রতিরোধ এবং প্রত্যর্পণ ধারার অকার্যকারিতা


হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রত্যর্পণ ধারাটি যে কুরাইশদের জন্য একটি বুমেরাং বা আত্মঘাতী ফাঁদে পরিণত হবে, তা চুক্তি স্বাক্ষরের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্রমাণিত হয়। মক্কার বনু ছাকিফ গোত্রের এক যুবক আবু বাসির উতবাহ ইবনে আসিদ রা. ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় পালিয়ে আসেন। কুরাইশরা চুক্তির শর্তানুযায়ী তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য খুনায়েস ও তার এক গোলামকে মদিনায় প্রেরণ করে। রাসুলুল্লাহ সা. চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে আবু বাসির রা.-কে তাদের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, "হে আবু বাসির! তুমি জানো আমরা এই সম্প্রদায়ের সাথে চুক্তি করেছি, আর আমাদের দ্বীনে বিশ্বাসঘাতকতা বৈধ নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমার জন্য মুক্তির পথ তৈরি করবেন" [20]


আবু বাসির রা. যখন কুরাইশদের সেই দুই প্রতিনিধির সাথে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন পথিমধ্যে জুল-হুলাইফা নামক স্থানে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে খুনায়েসের তলোয়ারটি দেখতে চান এবং সুযোগ বুঝে তাকে হত্যা করেন। অন্য প্রতিনিধিটি ভয়ে মদিনায় পালিয়ে এসে রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে আশ্রয় চায়। আবু বাসির রা.-ও সেখানে উপস্থিত হয়ে বলেন, "হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ আপনার চুক্তি পূর্ণ করেছেন। আপনি আমাকে তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, কিন্তু আল্লাহ আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।" রাসুলুল্লাহ সা. তখন মন্তব্য করেছিলেন:


«ويل أمه مسعر حرب، لو كان له أحد»

অনুবাদ: "তার মায়ের দুর্ভোগ হোক! সে তো যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলনকারী, যদি তার সাথে আরও কিছু লোক থাকত!" [21]


রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই প্রাজ্ঞোচিত মন্তব্য থেকে আবু বাসির রা. বুঝতে পারলেন যে, মদিনায় থাকলে চুক্তির কারণে তাঁকে আবারও ফেরত দেওয়া হতে পারে। তাই তিনি মদিনা ত্যাগ করে লোহিত সাগরের উপকূলে সিরিয়াগামী বাণিজ্য পথের ওপর অবস্থিত "আল-আইস" (Al-Ais) নামক একটি কৌশলগত স্থানে অবস্থান নেন। এই খবর মক্কায় ছড়িয়ে পড়লে, আবু জানদাল রা.-সহ মক্কার প্রায় সত্তরজন নির্যাতিত মুসলিম বন্দিশালা থেকে পালিয়ে আল-আইসে আবু বাসির রা.-এর সাথে যোগ দেন। তাঁরা সেখানে একটি স্বাধীন গেরিলা বাহিনী গঠন করেন, যা মদিনা রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা ও আইনি এক্তিয়ারের বাইরে ছিল [22]


আবু বাসির রা.-এর নেতৃত্বাধীন এই বাহিনী কুরাইশদের সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলাগুলোর ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ (Economic Blockade) আরোপ করে। কুরাইশদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। তারা বুঝতে পারে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির যে প্রত্যর্পণ ধারাটিকে তারা নিজেদের বিজয় মনে করেছিল, সেটিই এখন তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এই ধারাটির কারণে মক্কার মুসলিমরা মদিনায় যেতে না পেরে এক অনিয়ন্ত্রিত ও বিপজ্জনক গেরিলা বাহিনীতে পরিণত হয়েছে, যাদের ওপর মদিনা রাষ্ট্রের কোনো আইনি নিয়ন্ত্রণ নেই। অবশেষে নিরুপায় হয়ে কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে দূত পাঠিয়ে আল্লাহর দোহাই দিয়ে অনুরোধ করে, তিনি যেন আল-আইসের মুসলিমদের মদিনায় ডেকে নেন এবং চুক্তির প্রত্যর্পণ ধারাটি চিরতরে বাতিল ঘোষণা করেন [23]


এই ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রত্যর্পণ ধারাটি ছিল রাসুলুল্লাহ সা.-এর এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাল। তিনি কুরাইশদের নিজেদের জালেই তাদের বন্দি করেছিলেন। যে ধারাটি মুসলিমদের জন্য অপমানজনক মনে হয়েছিল, তা-ই শেষ পর্যন্ত কুরাইশদের নিজেদের অনুরোধে এবং লিখিত আবেদনের মাধ্যমে বাতিল হয়। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কূটনৈতিক বিজয়, যা মদিনা রাষ্ট্রকে আরবের একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথ সুগম করেছিল [24]

""
১২.২.১ মূল সন্ধিপত্রের ডিকনস্ট্রাকশন (Deconstruction) এবং এক্সট্রাডিশন ক্লজ (Extradition Clause)-এর বিশ্লেষণ
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১২.২.১ মূল সন্ধিপত্রের ডিকনস্ট্রাকশন (Deconstruction) এবং এক্সট্রাডিশন ক্লজ (Extradition Clause)-এর বিশ্লেষণ কুইজ

1 / 5

হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রের সবচেয়ে বিতর্কিত ধারাটি কোনটি ছিল?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...