ইসলামি যুদ্ধনীতি বা 'সিয়ার' (Siyar) এর মূল ভিত্তি হলো মানবতা এবং ন্যায়বিচার। যুদ্ধের চরম উত্তেজনা এবং সংঘাতের মধ্যেও বেসামরিক জীবন এবং জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা ইসলামি শরীয়তের একটি মৌলিক এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা 'সিভিলিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার' বা বেসামরিক অবকাঠামো বলি, ইসলামি ফিকহ শাস্ত্রের প্রাচীন সংজ্ঞায় তা ছিল জনকল্যাণমূলক সম্পদ এবং জীবনধারণের মৌলিক উৎসসমূহ। যুদ্ধের ময়দানে কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে আক্রমণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, আর বেসামরিক জনপদ এবং তাদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ধ্বংস করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নীতিটি কেবল নৈতিকতা নয়, বরং এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা যা যুদ্ধের ভয়াবহতাকে সীমিত করে এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে সহজতর করে।
বেসামরিক অবকাঠামো বলতে এখানে রাস্তাঘাট, সেতু, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, খাদ্য গুদাম, চিকিৎসা কেন্দ্র এবং আবাসিক এলাকাগুলোকে বোঝানো হয়েছে। ইসলামি যুদ্ধনীতিতে এই অবকাঠামোসমূহকে 'আমানত' হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এগুলো কেবল বর্তমান প্রজন্মের নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনধারণের সাথে সম্পৃক্ত। যখন কোনো রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী যুদ্ধের ঘোষণা দেয়, তখন তাদের লক্ষ্য থাকে শত্রুর সামরিক সক্ষমতা হ্রাস করা, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করা নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law) এবং জেনেভা কনভেনশনের অনেক আগেই ইসলামি শরীয়ত প্রবর্তন করেছিল। এই বিধিনিষেধের মূল উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধের ধ্বংসলীলাকে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে রাখা, যাতে যুদ্ধের পর সমাজ পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।
বেসামরিক অবকাঠামোর সংজ্ঞা এবং শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি আইনশাস্ত্রের আলোকে বেসামরিক অবকাঠামো বা 'আল-বুনিয়া আল-তাহতিয়্যাহ' (البنية التحتية) বলতে সেই সকল ভৌত সম্পদকে বোঝায় যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে এবং মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়। আধুনিক অর্থনৈতিক ও আইনি গবেষণায় দেখা যায় যে, এই অবকাঠামোসমূহ রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং জনকল্যাণের বহিঃপ্রকাশ। যেমন, আধুনিক বি.ও.টি (B.O.T) চুক্তির আলোচনায় দেখা যায় যে, অবকাঠামো নির্মাণ মূলত রাষ্ট্রের সেই প্রয়োজনীয়তা যা জনকল্যাণের জন্য অপরিহার্য
لا جدال في أن أكثر التمويل بأسلوب B.O.T كان - ولم يزل- وليد التجاء الدولة إلى طلب التمويل لإقامة مشروعات البنية التحتية [1] । এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝা যায় যে, অবকাঠামো কেবল ইট-পাথরের স্তূপ নয়, বরং এটি একটি সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মেরুদণ্ড। সুতরাং, যুদ্ধের সময় এই মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া মানে হলো একটি পুরো সভ্যতার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলা।শরীয়তের দৃষ্টিতে, যুদ্ধের সময় বেসামরিক এবং সামরিক সম্পদের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন থাকা আবশ্যক। একে আধুনিক সামরিক পরিভাষায় 'ডিস্টিংগুইশমেন্ট' (Distinction) বলা হয়। ইসলামি নীতি অনুযায়ী, যে সম্পদ সরাসরি যুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না, তা আক্রমণ করা হারাম। বেসামরিক নাগরিকদের জীবন এবং তাদের ব্যবহৃত পরিকাঠামোকে রক্ষা করা কেবল একটি পছন্দ নয়, বরং এটি একটি শরয়ী নির্দেশ। যখন আমরা 'সিভিলিয়ান ডিসকোর্স' বা বেসামরিক সংলাপের কথা বলি, তখন সেখানে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর কথা উঠে আসে যা সাধারণ মানুষের অধিকার এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করে
بنية فوقية معلنة تخفي الدوافع التحتية الحقيقية [2] । এই কাঠামোগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই যুদ্ধের ভয়াবহতা হ্রাস পায় এবং যুদ্ধের লক্ষ্য কেবল শত্রুর সামরিক পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সাধারণ মানুষের বিনাশে নয়।ঐতিহাসিকভাবে, রাসুলুল্লাহ সা. যুদ্ধের ময়দানে তাঁর সেনাপতিদের কঠোর নির্দেশ দিতেন যেন তারা বেসামরিক জনপদ এবং তাদের জীবনধারণের উপাদানের কোনো ক্ষতি না করে। এই নীতিটি কেবল যুদ্ধের কৌশল ছিল না, বরং এটি ছিল একটি উচ্চতর নৈতিক মানদণ্ড। যখন কোনো অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়, তখন তার প্রভাব কেবল তাৎক্ষণিক হয় না, বরং তা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মন্দা এবং মানবিক সংকটের জন্ম দেয়। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, এমন কোনো কাজ করা নিষিদ্ধ যা সাধারণ মানুষের জন্য চরম কষ্টদায়ক হয় এবং যার কোনো সরাসরি সামরিক প্রয়োজনীয়তা নেই। সুতরাং, বেসামরিক অবকাঠামো রক্ষা করা ইসলামি যুদ্ধনীতির একটি অপরিহার্য স্তম্ভ, যা মানবতাকে যুদ্ধের চরম নৃশংসতা থেকে রক্ষা করে।
পানি সরবরাহ ও জীবনধারণের অপরিহার্য উৎসসমূহের সুরক্ষা
পানি জীবন এবং সভ্যতার মূল ভিত্তি। যুদ্ধের সময় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, যেমন—কূপ, ঝরনা, বাঁধ এবং সেচ ব্যবস্থা ধ্বংস করা ইসলামি শরীয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পানি কেবল মানুষের জন্য নয়, বরং পশুপাখি এবং উদ্ভিদের জন্যও অপরিহার্য। যুদ্ধের কৌশল হিসেবে শত্রুকে তৃষ্ণার্ত করে পরাজিত করার প্রথা অনেক প্রাচীন সংস্কৃতিতে ছিল, কিন্তু ইসলাম এই অমানবিক পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ বর্জন করেছে। পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ধ্বংসকরণকে 'ফাসাদ ফিল আরদ' বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার শামিল মনে করা হয়। এই পরিকাঠামোসমূহ ধ্বংস করলে তা কেবল শত্রুর সামরিক বাহিনীকে নয়, বরং নিরপরাধ শিশু, নারী এবং বৃদ্ধদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, যা ইসলামি নৈতিকতার পরিপন্থী।
বেসামরিক অবকাঠামোর পুনর্গঠন এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ ইসলামি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যখন আমরা অবকাঠামোর কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলি, তখন তা মূলত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য হয়
إعادة هيكلة البنية التحتية وعلاقات الإنتاج للزراعات والصناعات [3] । যুদ্ধের সময় এই উৎপাদনশীল পরিকাঠামো ধ্বংস করা মানে হলো একটি জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করা। পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করলে কৃষি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই ধরণের পরোক্ষ আক্রমণকে ইসলামি আইনশাস্ত্র অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। রাসুলুল্লাহ সা. এর নির্দেশিত যুদ্ধনীতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যুদ্ধের সময় পানির উৎসগুলো বিষাক্ত করা বা সেগুলো ধ্বংস করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, পানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ইসলামি শরীয়ত এই ধরণের 'রিসোর্স ওয়ারফেয়ার' (Resource Warfare) এর বিপক্ষে। পানিকে একটি সাধারণ মানব সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের একচেটিয়া অধিকার হতে পারে না। যুদ্ধের সময়ও পানির উৎসগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয় যাতে বেসামরিক মানুষ এবং প্রাণিকুল জীবনধারণ করতে পারে। এই নীতিটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম যুদ্ধের সময়ও জীবন রক্ষার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ইসলাম যুদ্ধের ধ্বংসলীলাকে সীমিত করে এবং মানবিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখে।
আবাসিক এলাকা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসের নিষেধাজ্ঞা
বেসামরিক আবাসিক এলাকা এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্রসমূহ যেমন—বাজার, গুদাম এবং কারখানাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো ইসলামি যুদ্ধনীতিতে নিষিদ্ধ। আবাসিক এলাকা হলো সাধারণ মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যুদ্ধের সময় ঘরবাড়ি ধ্বংস করা মানে হলো মানুষকে গৃহহীন করা এবং তাদের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলা। ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো বাড়ি বা ভবন সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহৃত না হচ্ছে, ততক্ষণ তা ধ্বংস করার কোনো বৈধতা নেই। এই নীতিটি বেসামরিক নাগরিকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করার ফলে যে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয়, তা যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক বছর পর পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে। ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদের সুরক্ষা এবং তার সঠিক ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন, অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে যে আর্থিক বিনিয়োগ এবং শ্রম ব্যয় হয়, তা জনকল্যাণের জন্য নির্ধারিত থাকে
أن يكون مستحقا على وجه البدل، كأرزاق الجند، وأثمان الكراع والسلاح [4] । যখন এই সম্পদগুলো ধ্বংস করা হয়, তখন তা কেবল বর্তমানের ক্ষতি করে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বাজার বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র ধ্বংস করলে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি এবং চরম দারিদ্র্য দেখা দেয়। এই ধরণের অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ ইসলামি শরীয়তের সম্পূর্ণ বিরোধী।রাসুলুল্লাহ সা. এর সময়ে যুদ্ধের পর যখন কোনো এলাকা বিজিত হতো, তখন সেখানে বিদ্যমান অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হতো। বিজিত এলাকার বাজার এবং আবাসিক এলাকাগুলোকে অক্ষত রাখা হতো যাতে সেখানকার মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, ইসলামের লক্ষ্য ছিল বিজিত অঞ্চলের মানুষের মনে ভালোবাসা এবং নিরাপত্তা তৈরি করা, ভয় এবং ঘৃণা নয়। আবাসিক এলাকা ধ্বংস না করার এই নীতিটি যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকেও নিয়ন্ত্রণ করে। যখন সাধারণ মানুষ দেখে যে তাদের ঘরবাড়ি এবং জীবন নিরাপদ, তখন তারা নতুন শাসনব্যবস্থার প্রতি অধিকতর ইতিবাচক হয়, যা দীর্ঘমেয়াদী শান্তি স্থাপনে সহায়ক হয়।
সামরিক প্রয়োজনীয়তা বনাম বেসামরিক সুরক্ষা: একটি আইনি বিশ্লেষণ
ইসলামি আইনশাস্ত্রে 'জরুরত' (Necessity) এবং 'মাসলাহা' (Public Interest) এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। অনেক সময় সামরিক প্রয়োজনীয়তার দোহাই দিয়ে বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়। তবে ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, 'জরুরত' তখনই কার্যকর হয় যখন তা জীবন বাঁচানোর জন্য অপরিহার্য হয় এবং তার কোনো বিকল্প না থাকে। যদি কোনো বেসামরিক ভবনকে শত্রু পক্ষ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে, তবে সেই নির্দিষ্ট ভবনটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, পুরো আবাসিক এলাকা বা পুরো শহরটি ধ্বংস করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এখানে 'প্রোপোরশনালাইটি' (Proportionality) বা আনুপাতিকতার নীতি প্রয়োগ করা হয়।
বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের ক্ষেত্রে ইসলামি আইনশাস্ত্রের কঠোর শর্ত হলো—ক্ষতির পরিমাণ যেন উপকারের চেয়ে বেশি না হয়। যদি একটি সেতু ধ্বংস করে শত্রুর অগ্রযাত্রা থামানো যায়, কিন্তু সেই সেতুটি ধ্বংস করার ফলে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যায়, তবে সেই সেতু ধ্বংস করা শরয়ীভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এই ধরণের বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, ইসলামি যুদ্ধনীতি কেবল জয়লাভের কথা ভাবে না, বরং জয়ের নৈতিক মূল্য এবং মানবিক পরিণতির কথা বিবেচনা করে। অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং এর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার গুরুত্ব এখানে স্পষ্ট হয়
إعادة هيكلة البنية التحتية وعلاقات الإنتاج للزراعات والصناعات [5] । অর্থাৎ, ধ্বংসের চেয়ে গড়ার গুরুত্ব এখানে অনেক বেশি।আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের সাথে ইসলামি শরীয়তের এই নীতির এক বিস্ময়কর মিল দেখা যায়। বর্তমানের 'International Humanitarian Law' এর মূল কথা হলো বেসামরিক এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা। ইসলাম এই নীতিটি ১৪০০ বছর আগেই প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সামরিক প্রয়োজনীয়তার দোহাই দিয়ে বেসামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস করাকে ইসলাম 'জুলুম' বা অন্যায় হিসেবে গণ্য করে। এই আইনি কাঠামোটি নিশ্চিত করে যে, যুদ্ধ যেন একটি বন্য ধ্বংসলীলায় পরিণত না হয়। বরং যুদ্ধ যেন হয় একটি নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া, যেখানে কেবল অপরাধী এবং আক্রমণকারী সামরিক শক্তিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়, আর সাধারণ মানুষ এবং তাদের জীবনধারণের পরিকাঠামো সুরক্ষিত থাকে।
পরিশেষে, সিভিলিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা বেসামরিক অবকাঠামো রক্ষা করার এই শরয়ী বিধিমালা কেবল যুদ্ধের নিয়ম নয়, বরং এটি ইসলামের সামগ্রিক মানবতাবাদী দর্শনের প্রতিফলন। অবকাঠামো ধ্বংস করা মানে হলো একটি সমাজের স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং জীবনধারণের সক্ষমতাকে মুছে ফেলা। ইসলামি শরীয়ত এই ধ্বংসাত্মক মানসিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং যুদ্ধের চরম মুহূর্তেও দয়া, করুণা এবং ন্যায়বিচারের কথা বলে। এই নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়নই পারে যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে, যেখানে মানুষ পুনরায় তাদের হারানো জীবন এবং পরিকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ পায়।