খণ্ড 8
ফন্ট:100%
থিম:

১.৪.১ আসাবিয়্যাহ (Tribal Bigotry) এবং জাহেলি প্রাইড: গোত্রীয় অহংকারের সোসিও-পলিটিক্যাল অ্যানাটমি

১.৪.১ আসাবিয়্যাহ (Tribal Bigotry) এবং জাহেলি প্রাইড: গোত্রীয় অহংকারের সোসিও-পলিটিক্যাল অ্যানাটমি

প্রাক-ইসলামি আরবের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গেলে 'আসাবিয়্যাহ' (Asabiyyah) বা গোত্রীয় অন্ধ আনুগত্যের ধারণাটি একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এটি কেবল একটি সামাজিক প্রথা ছিল না, বরং এটি ছিল আরবের মরুপ্রান্তরের অস্তিত্ব রক্ষার একটি অপরিহার্য রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। আসাবিয়্যাহ বলতে মূলত এমন এক প্রকার গোষ্ঠীগত সংহতি বা অন্ধ গোত্রীয় উগ্রতাকে বোঝায়, যেখানে ব্যক্তির নিজস্ব বিচারবুদ্ধি, নৈতিকতা বা সত্যের অনুসন্ধানের চেয়ে তার গোত্রের মর্যাদা ও স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া হতো। এই আসাবিয়্যাহর মূলে ছিল রক্ত ও বংশীয় সম্পর্কের এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, যা ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছিল এবং যা থেকে বিচ্যুত হওয়ার অর্থ ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক মৃত্যু।

জাহেলি যুগের এই আসাবিয়্যাহ কেবল একটি সামাজিক সংহতি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি জটিল 'Socio-Political Anatomy' বা সামাজিক-রাজনৈতিক শরীরতত্ত্ব। এই ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল 'জাহেলি প্রাইড' বা বংশীয় অহংকার। এই অহংকারটি ব্যক্তির আত্মপরিচয়কে তার ব্যক্তিগত গুণাবলির পরিবর্তে তার বংশের গৌরবময় ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ করত। ফলে, সত্য বা ন্যায়ের প্রশ্নে কোনো ব্যক্তি যখন তার গোত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াত, তখন তাকে কেবল একজন ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে নয়, বরং গোত্রের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে গণ্য করা হতো। এই কাঠামোগত জটিলতাটিই পরবর্তীতে ইসলামের দাওয়াতকে মক্কার কুরাইশ অভিজাতদের কাছে একটি চরম রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল।

আসাবিয়্যাহর সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি: রক্ত ও বংশীয় সংহতির স্বরূপ

আসাবিয়্যাহর মূল ভিত্তি ছিল রক্ত সম্পর্কের অমোঘ টান। প্রাক-ইসলামি আরবের জনশূন্য ও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য গোত্রীয় সংহতি ছিল একমাত্র নিরাপত্তা কবচ। ডক্টর জাওয়াদ আলি তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, আসাবিয়্যাহর এই প্রবণতাটি অনেকটা জীবাণুর মতো (Germ) যা মানুষের রক্ত সম্পর্কের গভীরে প্রোথিত থাকে। মানুষের নিকট তার নিকটতম রক্ত সম্পর্কীয় ব্যক্তি অর্থাৎ পিতা, মাতা ও ভাইদের প্রতি যে সহজাত টান থাকে, আসাবিয়্যাহ সেই টানকে একটি উগ্র রাজনৈতিক ও সামাজিক হাতিয়ারে রূপান্তরিত করে।

"ومتى ظهرت المصالح المادية عجزت عاطفة النسب والعصبية عن التغلب عليها. وجرثومة العصبية، العصبية للدم، وأقرب دم إلى إنسان هو دم أسرته، وعلى رأسها الأبوان والإخوة ..." [1] মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আসাবিয়্যাহ ব্যক্তির 'Identity Politics' বা পরিচয় রাজনীতিকে অত্যন্ত সংকীর্ণ করে ফেলেছিল। একজন ব্যক্তির নৈতিক মানদণ্ড ছিল তার গোত্রের সিদ্ধান্ত। যদি গোত্র কোনো অন্যায় বা অবিচারের আশ্রয় নেয়, তবে আসাবিয়্যাহর অনুসারী ব্যক্তি সেই অন্যায়কেও সমর্থন করতে বাধ্য বোধ করত। এই মানসিকতাটি যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশে এক বিশাল অন্তরায় হিসেবে কাজ করত। ডক্টর জাওয়াদ আলির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যখনই কোনো বস্তুগত স্বার্থ বা 'Material Interests' আসাবিয়্যাহর সামনে উপস্থিত হতো, তখন অনেক ক্ষেত্রে বংশীয় আবেগের চেয়েও স্বার্থের প্রাধান্য দেখা যেত, যা প্রমাণ করে যে আসাবিয়্যাহ কেবল আবেগীয় নয়, বরং এটি ছিল একটি অত্যন্ত বাস্তববাদী ও স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কৌশল। [2] এই আসাবিয়্যাহর সামাজিক প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। এটি সমাজে একটি কঠোর শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করেছিল, যেখানে বংশীয় শ্রেষ্ঠত্বই ছিল সামাজিক মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি। কোনো ব্যক্তি যদি অত্যন্ত গুণী বা জ্ঞানীও হতো, কিন্তু তার গোত্র যদি নিম্নস্তরের বা দুর্বল হতো, তবে সমাজে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকতো না। এই কাঠামোগত বৈষম্যটি প্রাক-ইসলামি আরবের সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। আসাবিয়্যাহর এই 'Social Cohesion' বা সামাজিক সংহতি মূলত একটি 'Exclusionary Mechanism' বা বর্জনীয় প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করত, যা বহির্গত বা ভিন্ন গোত্রের সদস্যদের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করত। [3] জাহেলি প্রাইড ও বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ: সামাজিক বিচ্যুতি ও যুক্তিবাদী অবক্ষয়

জাহেলি প্রাইড বা বংশীয় অহংকার ছিল আসাবিয়্যাহর মনস্তাত্ত্বিক বহিঃপ্রকাশ। প্রাক-ইসলামি আরবের অভিজাত সমাজ তাদের পূর্বপুরুষদের বীরত্বগাঁথা এবং বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত ছিল। এই গর্ব কেবল আত্মতৃপ্তির জন্য ছিল না, বরং এটি ছিল সামাজিক আধিপত্য বজায় রাখার একটি কৌশল। তারা 'Fakhr' (গর্ব প্রদর্শন) এবং 'Hija' (বংশীয় উপহাস) এর মাধ্যমে একে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করত। এই প্রথাটি সমাজে একটি নিরন্তর প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করেছিল, যা প্রায়শই রক্তক্ষয়ী গোত্রীয় যুদ্ধে রূপ নিত।

এই অহংকারের কারণে সত্য ও ন্যায়ের পথে বাধা সৃষ্টি হতো। যখনই নবি সা. সত্যের বাণী নিয়ে আসলেন, তখন মক্কার কুরাইশ নেতৃবৃন্দ তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এর প্রধান কারণ ছিল তাদের বংশীয় অহংকার। তারা মনে করত, যদি তারা ইসলামের এই নতুন ও সমতাভিত্তিক আদর্শ গ্রহণ করে, তবে তাদের বংশীয় শ্রেষ্ঠত্বের যে সামাজিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত আছে, তা ভেঙে পড়বে। আবু জাহেল, আবু সুফিয়ান এবং আল-আখনাছ বিন শারিকের মতো নেতৃবৃন্দ নবি সা.-এর তিলাওয়াত শুনেও তা গ্রহণ করতে পারেননি, কারণ তাদের আসাবিয়্যাহ ও গোত্রীয় অহংকার তাদের সত্য গ্রহণের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

"ذكر الزهري: أن أبا جهل وجماعة معه وفيهم الأخنس بن شريق، وأبو سفيان، استمعوا قراءة الرسول صلى الله عليه وسلم في ..." [4] ইসলামের আগমনের ফলে এই জাহেলি প্রথাগুলোর অবসান ঘটে। ইসলাম এসে জাহেলি যুগের সেই সমস্ত মিথ্যা দাবি ও বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদকে রদবদল করে দেয়। প্রাক-ইসলামি আরবের সেই সামাজিক অবক্ষয় যেখানে বংশীয় পরিচয়ের মাধ্যমে মানুষকে ছোট করা হতো বা উপহাস করা হতো, ইসলাম সেখানে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে 'তাকওয়া' বা খোদাভীতিকে স্থাপন করে।

"لمّا جاء الإسلام قضى على كل سنن الجاهلية ودعاوياها الباطلة | دعوى الجاهلية والمفاخرة والتعيير بالآباء" [5] এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনটি ছিল অত্যন্ত বৈপ্লবিক। জাহেলি প্রাইড যেখানে মানুষকে তার বংশের শিকলে আবদ্ধ করে রেখেছিল, ইসলাম সেখানে মানুষকে তার ব্যক্তিগত আমল ও নৈতিকতার ভিত্তিতে স্বাধীন ও মর্যাদাবান করে তোলে। ফলে, আসাবিয়্যাহর মাধ্যমে যে সামাজিক বিভাজন ও যুক্তিবাদী অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছিল, তা ইসলামের তাওহীদ ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শের মাধ্যমে বিলুপ্ত হতে শুরু করে। [6] রাজনৈতিক কাঠামো ও সমষ্টিগত দায়বদ্ধতার স্বরূপ: গোত্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

প্রাক-ইসলামি আরবের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কোনো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বরং প্রতিটি গোত্র ছিল একটি ক্ষুদ্র সার্বভৌম রাষ্ট্র (Micro-state)। এই ব্যবস্থায় গোত্রীয় সার্বভৌমত্ব বা 'Tribal Sovereignty' ছিল সর্বোচ্চ। গোত্রের প্রতিটি সদস্যের প্রতি গোত্রের একটি সম্মিলিত দায়বদ্ধতা ছিল এবং একইভাবে গোত্রের প্রতি প্রতিটি সদস্যের একটি নিরঙ্কুশ আনুগত্য ছিল। এই ব্যবস্থাকে বলা যেতে পারে 'Collective Security' বা সমষ্টিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যদি কোনো গোত্রের সদস্যের ওপর আক্রমণ করা হতো, তবে পুরো গোত্রকে সেই আক্রমণের মোকাবিলা করতে হতো।

আবুল হাসান নদভী তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন যে, এই যুগটি ছিল চরম অসহিষ্ণুতার যুগ, যেখানে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের ছায়াতলে থাকা সত্ত্বেও আরবের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ছিল মূলত গোত্রীয় আসাবিয়্যাহর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই রাজনৈতিক কাঠামোটি ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল, কারণ এখানে কোনো কেন্দ্রীয় আইন বা বিচার বিভাগ ছিল না। গোত্রীয় প্রধান বা 'শাইখ'-এর সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত, যা প্রায়শই গোত্রীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্যায়ের আশ্রয় নিতে দ্বিধা করত না। [7] এই রাজনৈতিক কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল 'Blood Feud' বা রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের সংস্কৃতি। আসাবিয়্যাহর কারণে একটি গোত্রের সদস্যের মৃত্যু হলে অন্য গোত্রের সদস্যদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া ছিল একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। এই ব্যবস্থাটি সমাজে একটি নিরন্তর অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছিল। গোত্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং এটি বৃহত্তর সামাজিক সংহতির পরিবর্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন ও সংঘাতকে উসকে দিত। [8] পরিশেষে বলা যায়, আসাবিয়্যাহ এবং জাহেলি প্রাইড কেবল আরবের একটি সামাজিক বৈশিষ্ট্য ছিল না, বরং এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যবস্থা যা মানুষের বিচারবুদ্ধিকে অন্ধ করে দিয়েছিল। এই ব্যবস্থাটি একদিকে যেমন মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশে গোত্রীয় সুরক্ষা প্রদান করেছিল, অন্যদিকে এটি মানুষের নৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এক বিশাল বাধা হিসেবে কাজ করেছিল। ইসলামের আবির্ভাব এই আসাবিয়্যাহর ভিত্তিপ্রস্তর নাড়িয়ে দিয়ে একটি নতুন বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের ধারণা প্রবর্তন করে, যা গোত্রীয় সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক দিগন্ত উন্মোচন করে।

""
১.৪.১ আসাবিয়্যাহ (Tribal Bigotry) এবং জাহেলি প্রাইড: গোত্রীয় অহংকারের সোসিও-পলিটিক্যাল অ্যানাটমি
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১.৪.১ আসাবিয়্যাহ (Tribal Bigotry) এবং জাহেলি প্রাইড: গোত্রীয় অহংকারের সোসিও-পলিটিক্যাল অ্যানাটমি কুইজ

1 / 5

'আসাবিয়্যাহ' (Asabiyyah) শব্দের অর্থ কী?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...