আরব উপদ্বীপের ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অথচ মেধাবী ব্যক্তিত্ব আমর ইবনুল আস রা. এর জীবনচরিত কেবল একজন সামরিক সেনাপতির কাহিনী নয়, বরং এটি এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনের উপাখ্যান। তাঁর জীবনের শুরুর দিকের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, বিশেষ করে আবিসিনিয়ার নেগুসের দরবারে মুসলমানদের প্রত্যাবাসনের ব্যর্থ মিশন, তাঁর রাজনৈতিক চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে কাজ করেছিল। একজন দক্ষ কূটনীতিবিদ হিসেবে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল শক্তির দাপটে নয়, বরং প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্ব এবং সামাজিক কাঠামোর গভীরে প্রবেশ করেই প্রকৃত বিজয় অর্জন সম্ভব। এই প্রাথমিক অভিজ্ঞতা তাঁকে পরবর্তীকালে ইসলামের একজন অপরাজেয় রণকৌশলী এবং মিশরের বিজেতা হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
আমর ইবনুল আস রা. এর ব্যক্তিত্বে বিদ্যমান 'রিয়েলপলিটিক' বা বাস্তববাদী রাজনীতির প্রভাব তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে পরিলক্ষিত হয়। তিনি জানতেন কখন নমনীয় হতে হয় এবং কখন কঠোর হতে হয়। আবিসিনিয়ার সেই কূটনৈতিক ধাক্কাটি তাঁর জন্য একটি শিক্ষা ছিল যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদর্শিক লড়াইয়ের চেয়ে কৌশলগত অবস্থান অনেক বেশি কার্যকর। এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরটি তাঁকে কেবল একজন যোদ্ধা হিসেবে নয়, বরং একজন রাষ্ট্রনায়ক এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তাঁর এই যাত্রাটি ছিল এক অন্ধকার গলি থেকে আলোর পথে উত্তরণ, যেখানে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং খোদায়ী আনুগত্যের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল।
ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিতে, আমর ইবনুল আস রা. এর সামরিক প্রতিভা ছিল সহজাত, কিন্তু তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল অর্জিত। তিনি যখন ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন, তখন তাঁর পূর্বের সমস্ত অভিজ্ঞতা—তা সে কুরাইশদের হয়ে করা হোক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে—সবই ইসলামি রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত হলো। তাঁর এই রূপান্তরটি কেবল ধর্মীয় পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন। তাঁর জীবনের এই পরিক্রমা আমাদের শেখায় যে, ব্যর্থতা কীভাবে অভিজ্ঞতায় পরিণত হয় এবং সেই অভিজ্ঞতা কীভাবে এক বিশাল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করে।
আবিসিনিয়ার কূটনৈতিক মিশন এবং মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা
আবিসিনিয়ার নেগুসের দরবারে আমর ইবনুল আস রা. এর মিশনটি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। কুরাইশদের পক্ষ থেকে প্রেরিত এই মিশনে তাঁর লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট—মুহাজিরদের প্ররোচিত করে মক্কায় ফিরিয়ে আনা। তিনি নেগুসের দরবারে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উপহার প্রদান এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছিলেন, যাতে খ্রিস্টান সম্রাটটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তবে যখন তিনি দেখলেন যে, সত্যের সামনে নেগুস অবিচল এবং মুসলমানদের যুক্তিগুলো অধিকতর শক্তিশালী, তখন তাঁর ভেতরে এক ধরণের বৌদ্ধিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই মিশনটি বাহ্যিকভাবে ব্যর্থ মনে হলেও, মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি আমর রা. এর জন্য এক বিশাল শিক্ষা ছিল।
এই ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল নেগুসের ন্যায়বিচার এবং মুসলমানদের দৃঢ় বিশ্বাস। আমর রা. উপলব্ধি করেছিলেন যে, সত্যের বিপরীতে কোনো কূটনীতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাঁর এই উপলব্ধিটি তাঁর অহংকারে এক ধরণের ফাটল তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীতে তাঁকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার এক গোপন বীজ হিসেবে কাজ করে। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, ইসলামের যে সাম্য এবং ভ্রাতৃত্বের কথা সাহাবায়ে কেরাম বর্ণনা করছেন, তা তৎকালীন আরবের গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি উন্নত এবং টেকসই। এই মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কাটি তাঁকে ভাবতে বাধ্য করেছিল যে, ক্ষমতার উৎস কেবল বংশমর্যাদা বা ধন-সম্পদ নয়, বরং তা সত্য এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায়, এই মিশনটি ছিল একটি 'ফেইলড ডিপ্লোম্যাটিক এনগেজমেন্ট', যা আমর রা. এর জন্য একটি লার্নিং কার্ভ হিসেবে কাজ করেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, প্রতিপক্ষের ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে কোনো লক্ষ্য অর্জন করা অসম্ভব। আবিসিনিয়ার সেই রাজদরবারের পরিবেশ, সেখানে মুসলমানদের আত্মমর্যাদাপূর্ণ অবস্থান এবং নেগুসের নিরপেক্ষতা তাঁকে শিখিয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে 'সফট পাওয়ার' বা সাংস্কৃতিক প্রভাবের গুরুত্ব কতখানি। এই অভিজ্ঞতাটিই তাঁকে পরবর্তীকালে মিশরের কপটিক খ্রিস্টানদের সাথে সমঝোতা করতে এবং তাদের মন জয় করতে সাহায্য করেছিল। [1]
ইসলাম গ্রহণ এবং রণকৌশলগত দক্ষতার পুনঃবিন্যাস
আমর ইবনুল আস রা. এর ইসলাম গ্রহণ ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। তাঁর এই রূপান্তরটি কেবল একটি ধর্মীয় সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার এক নতুন দিকনির্দেশনা। যখন তিনি মদিনায় এসে রাসুল সা. এর সামনে আত্মসমর্পণ করলেন, তখন তাঁর ভেতরে থাকা কূটনীতিবিদের সত্তাটি ইসলামের আদর্শের সাথে একীভূত হয়ে গেল। রাসুল সা. তাঁর মেধা এবং দূরদর্শিতার প্রশংসা করেছিলেন এবং তাঁকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিশনে নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর পূর্বের অভিজ্ঞতাগুলো এখন আর কুরাইশদের স্বার্থে নয়, বরং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যবহৃত হতে শুরু করল।
ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর রণকৌশলগত চিন্তাধারায় এক আমূল পরিবর্তন আসে। তিনি বুঝতে পারলেন যে, যুদ্ধের লক্ষ্য কেবল জয়লাভ নয়, বরং মানুষের হৃদয় জয় করা। তাঁর সামরিক নেতৃত্বে এখন যুক্ত হলো নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচার। তিনি যখন ওমানের শাসনভার গ্রহণ করেন, তখন তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানুষের সাথে আচরণের মাধুর্য তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। তাঁর এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল 'কৌশলগত নমনীয়তা' (Strategic Flexibility), যেখানে তিনি পরিস্থিতির প্রয়োজনে কঠোরতা এবং কোমলতার ভারসাম্য বজায় রাখতেন। তাঁর এই দক্ষতা রাসুল সা. এর সামরিক পরিকল্পনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
তাঁর এই রূপান্তরটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। একজন ব্যক্তি যিনি একসময় ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তিনি এখন ইসলামের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঢাল হয়ে উঠলেন। এই পরিবর্তনটি প্রমাণ করে যে, সঠিক আদর্শের সংস্পর্শে এলে মানুষের সহজাত প্রতিভা কীভাবে গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত হতে পারে। তাঁর রণকৌশল এখন আর কেবল শত্রুকে পরাজিত করার জন্য ছিল না, বরং তা ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। তাঁর এই মানসিক পরিপক্কতা তাঁকে পরবর্তীকালে সিরিয়া এবং মিশরের মতো কঠিন ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলে। [2]
সিরিয়া অভিযান এবং সামরিক পরিপক্কতা
সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে আমর ইবনুল আস রা. এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এর অধীনে কাজ করার সময় তিনি যুদ্ধের আধুনিক কলাকৌশল এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সামরিক দুর্বলতাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। সিরিয়ার ভূ-প্রকৃতি এবং সেখানকার রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁকে শিখিয়েছিল যে, একটি বিশাল সাম্রাজ্যকে পরাজিত করতে হলে কেবল সম্মুখযুদ্ধ যথেষ্ট নয়, বরং গেরিলা যুদ্ধ এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগ করা প্রয়োজন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, বাইজেন্টাইনদের শাসনব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং স্থানীয় জনগণের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল তিক্ত।
আমর রা. এর সামরিক পরিপক্কতা ফুটে ওঠে যখন তিনি ছোট ছোট দল গঠন করে শত্রুর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতেন। তাঁর এই 'অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল' (Asymmetric Warfare) বাইজেন্টাইনদের জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। তিনি জানতেন যে, শত্রুর মনোবল ভেঙে দেওয়া মানেই অর্ধেক বিজয়। সিরিয়ার প্রতিটি যুদ্ধে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি কেবল একজন সাহসী যোদ্ধা নন, বরং একজন ঠান্ডা মাথার রণকৌশলী। তাঁর এই অভিজ্ঞতা তাঁকে এই শিক্ষায় সমৃদ্ধ করেছিল যে, বড় কোনো বিজয় অর্জনের জন্য ধৈর্য এবং সঠিক সময়ের অপেক্ষা করা অপরিহার্য।
সিরিয়ার বিজয়ের পর যখন মুসলিম বাহিনী স্থিতিশীল হলো, তখন আমর রা. এর দৃষ্টি প্রসারিত হলো পশ্চিম দিকে—মিশরের দিকে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, সিরিয়াকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ রাখতে হলে মিশরের নিয়ন্ত্রণ থাকা আবশ্যক। কারণ মিশর ছিল বাইজেন্টাইনদের জন্য একটি বিশাল খাদ্যভাণ্ডার এবং সামরিক ঘাঁটি। যদি মিশর মুসলিমদের অধীনে আসে, তবে সিরিয়ার ওপর বাইজেন্টাইনদের চাপ বহুগুণ কমে যাবে। এই ভূ-রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কেবল একজন সাধারণ সেনাপতির পক্ষে সম্ভব ছিল না; এটি ছিল একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ এবং রণকৌশলীর সমন্বিত চিন্তা। [3]
মিশর বিজয়ের ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও কৌশলগত দূরদর্শিতা
মিশর বিজয়ের পরিকল্পনাটি ছিল আমর ইবনুল আস রা. এর জীবনের শ্রেষ্ঠতম কৌশলগত পদক্ষেপ। তিনি খলিফা উমর রা. এর কাছে যখন মিশরের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন, তখন তিনি কেবল ধর্মীয় প্রসারের কথা বলেননি, বরং তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, মিশর যদি রোমানদের হাতে থাকে, তবে তারা যেকোনো সময় সিরিয়া আক্রমণ করতে পারে। এই 'প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক' বা আগাম আক্রমণের ধারণাটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক। তিনি চেয়েছিলেন মিশরের কৌশলগত অবস্থানকে মুসলিম সাম্রাজ্যের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে।
মিশরে প্রবেশের পর তাঁর প্রথম লক্ষ্য ছিল স্থানীয় জনগণের মনস্তত্ত্ব বোঝা। তিনি জানতেন যে, মিশরের কপটিক খ্রিস্টানরা বাইজেন্টাইনদের ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার। তাই তিনি তাদের সাথে এমন এক চুক্তির প্রস্তাব দিলেন, যা তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করত। এটি ছিল তাঁর আবিসিনিয়ার অভিজ্ঞতার এক বাস্তব প্রয়োগ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, স্থানীয় জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো ভূখণ্ড দীর্ঘকাল শাসন করা সম্ভব নয়। তাঁর এই 'ইনক্লুসিভ পলিসি' বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি মিশরের সাধারণ মানুষের মনে ইসলামের প্রতি এক ইতিবাচক ধারণা তৈরি করল।
সামরিক দিক থেকে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তিনি প্রথমে ছোট একটি বাহিনী নিয়ে প্রবেশ করেন এবং ধীরে ধীরে শক্তি বৃদ্ধি করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সরাসরি বড় সংঘাত এড়িয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো দখল করা। যখন তিনি বাবেল দুর্গের সামনে পৌঁছালেন, তখন তাঁর ধৈর্য এবং রণকৌশল বাইজেন্টাইনদের দিশেহারা করে দিয়েছিল। তাঁর এই পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সুসংগত, যেখানে সামরিক বিজয় এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছিল। [4]
আলেকজান্দ্রিয়ার পতন এবং প্রশাসনিক দূরদর্শিতা
মিশর বিজয়ের চূড়ান্ত পর্যায় ছিল আলেকজান্দ্রিয়া শহরের পতন। এই শহরটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। আমর ইবনুল আস রা. জানতেন যে, আলেকজান্দ্রিয়ার পতন মানেই পুরো মিশরের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। তিনি শহরের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য দীর্ঘ অবরোধের কৌশল গ্রহণ করেন এবং একই সাথে শহরের ভেতরে থাকা অস্থিতিশীল উপাদানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তাঁর এই দ্বিমুখী কৌশল—সামরিক চাপ এবং কূটনৈতিক আলোচনা—আলেকজান্দ্রিয়ার পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
আলেকজান্দ্রিয়ার পতনের পর তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি শহরের অবকাঠামো ধ্বংস না করে বরং সেটিকে আরও উন্নত করার পরিকল্পনা করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি শহরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বজায় রাখলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তিনি স্থানীয় কর্মকর্তাদের বহাল রাখলেন এবং কেবল উচ্চপর্যায়ের রোমান প্রভাব দূর করলেন। এই পদক্ষেপটি ছিল অত্যন্ত বাস্তববাদী, কারণ নতুন একটি প্রশাসনিক কাঠামো রাতারাতি গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না।
তৎকালীন আলেকজান্দ্রিয়ার শাসকের সাথে তাঁর কথোপকথনটি ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। তারিখ আল-তাবারীর বর্ণনা অনুযায়ী, আলেকজান্দ্রিয়ার শাসক আমর রা. এর কাছে জিজিয়া প্রদানের প্রস্তাব দেন এবং স্বীকার করেন যে, রোমানদের চেয়ে আরবদের শাসন অনেক বেশি সহজ এবং ন্যায়সঙ্গত।
إني قد كنت أخرج الجزية إلى من هو أبغض إلي منكم معشر العرب لفارس والروم، فإن أحببت أن أعطيك
[5] । এই উক্তিটি প্রমাণ করে যে, আমর রা. এর শাসনব্যবস্থা এবং তাঁর আচরণ স্থানীয়দের মনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি কেবল একজন বিজেতা হিসেবে নয়, বরং একজন মুক্তিদাতা হিসেবে মিশরে পরিচিতি লাভ করেন।কূটনৈতিক বিবর্তন এবং নেতৃত্বের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
আমর ইবনুল আস রা. এর জীবনপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর নেতৃত্ব ছিল এক নিরন্তর বিবর্তনের প্রক্রিয়া। আবিসিনিয়ার সেই ব্যর্থ মিশনটি তাঁকে শিখিয়েছিল যে, সত্যের শক্তি এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের গুরুত্ব কতখানি। সিরিয়ার যুদ্ধগুলো তাঁকে শিখিয়েছিল সামরিক কৌশলের সূক্ষ্মতা। আর মিশরের বিজয় তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করল একজন প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। তাঁর এই যাত্রাটি ছিল 'ব্যর্থতা থেকে শ্রেষ্ঠত্বের' এক অনন্য উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা এবং কৌশলগত দূরদর্শিতার সমন্বয় ঘটলে যেকোনো কঠিন লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে, আমর রা. ছিলেন একজন 'অ্যাডাপ্টিভ লিডার' বা অভিযোজনক্ষম নেতা। তিনি পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারতেন। যখন তিনি মক্কায় ছিলেন, তখন তিনি ছিলেন কুরাইশদের শ্রেষ্ঠ কূটনীতিবিদ; যখন তিনি মদিনায় এলেন, তখন তিনি হয়ে উঠলেন ইসলামের একনিষ্ঠ সেবক। তাঁর এই পরিবর্তনটি কোনো সুযোগসন্ধানী আচরণ ছিল না, বরং এটি ছিল সত্যের প্রতি তাঁর অন্তরের টান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সততার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর নেতৃত্বের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল আত্মবিশ্বাস এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, যা তাঁকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও অবিচল রেখেছিল।
তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় সাধন। মিশরের মতো একটি বহুজাতিক এবং বহুধর্মীয় ভূখণ্ডে শান্তি বজায় রাখা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তাঁর উদারতা এবং ন্যায়বিচার সেই চ্যালেঞ্জকে সহজ করে দিয়েছিল। তিনি কেবল একটি ভূখণ্ড জয় করেননি, বরং তিনি একটি নতুন সভ্যতার বীজ বপন করেছিলেন। তাঁর এই মনস্তাত্ত্বিক পরিপক্কতা এবং কৌশলগত প্রজ্ঞা তাঁকে ইসলামের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, অতীত ভুলগুলো যখন শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা ভবিষ্যতের সাফল্যের সিঁড়ি হয়ে দাঁড়ায়। [6]