খণ্ড 92
ফন্ট:100%
থিম:

অধ্যায় ৩: বিবর্তনবাদ, বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজি এবং মানব উৎপত্তি (Theory of Evolution, Biological Anthropology, and Human Origins)

মানবজাতির উৎপত্তি, তার অস্তিত্বের মৌলিক ভিত্তি এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষের অবস্থান সম্পর্কিত প্রশ্নটি আদিকাল থেকেই দর্শনের মূল উপজীব্য এবং আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম জটিল অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। উনিশ শতকে আধুনিক বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজি এবং প্রাকৃতিক বিবর্তনবাদের বৈজ্ঞানিক উত্থানের পর মানব উৎপত্তি সম্পর্কিত আলোচনা কেবল একটি নিছক প্রজাতিগত অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা বস্তুবাদী দর্শন ও তৌহিদী আকিদাহর মধ্যকার এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। ইসলামের অভ্রান্ত উৎস—পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য অনুযায়ী, মানবজাতি কোনো দৈব ঘটনা বা প্রাকৃতিক অন্ধ নির্বাচনের উপজাত নয়; বরং মানবজাতির প্রথম পুরুষ আদম সা. কে মহান আল্লাহ তাআলা সরাসরি নিজ কুদরতে বিশেষ প্রজ্ঞায় সৃষ্টি করেছেন। অপরদিকে, আধুনিক বস্তুবাদী বিবর্তনীয় অ্যানথ্রোপলজি দাবি করে যে, পৃথিবীর সমস্ত জীবকূল এবং মানবজাতি একক আদিমতম সত্তা বা কোষীয় পুঞ্জ থেকে প্রাকৃতিক পরিবর্তন, মিউটেশন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বহু দীর্ঘ সময় পর পর্যায়ক্রমে বিকশিত হয়েছে। এই অধ্যায়ে বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজির তাত্ত্বিক ভিত্তি, পশ্চিমা আলোকিত যুগের বস্তুবাদী চিন্তার দার্শনিক পটভূমি এবং ইসলামের বিশ্বদৃষ্টির সাপেক্ষে এর অ্যাকাডেমিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হলো।

১. বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি, বস্তুবাদী দর্শনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও অধ্যাত্মচিন্তার সংঘাত

উনবিংশ শতাব্দীতে চার্লস ডারউইনের জীবপ্রজাতির উদ্ভব সংক্রান্ত তত্ত্ব প্রকাশের বহু পূর্ব থেকেই ইউরোপীয় আলোকিত যুগে (Age of Enlightenment) বস্তুবাদী দার্শনিকরা জীবজগতের প্রাকৃতিক বিবর্তনীয় ব্যাখ্যার একটি তাত্ত্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক পটভূমি তৈরি করছিলেন। ফরাসি দার্শনিক ডেনিস ডিডেরো (Denis Diderot) ১৭৭৪ সালে তাঁর প্রণীত "এলিমেন্টস অব ফিজিওলজি" গ্রন্থে জীব সৃষ্টির প্রাকৃতিক ধারাবাহিকতা ও অন্তর্বর্তীকালীন "নিখোঁজ লিঙ্ক" (Missing Link) অনুসন্ধানের প্রাথমিক রূপরেখা পেশ করেন। তিনি ঈশ্বরকেন্দ্রিক সৃষ্টিতত্ত্বের পরিবর্তে জড় থেকে চেতনার উদগম এবং নিম্নশ্রেণীর প্রাণী থেকে উচ্চশ্রেণীর প্রাণীতে রূপান্তরের অনৈশ্বরিক সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করেন। ডিডেরোর এই দর্শন পরবর্তীতে বিবর্তনীয় প্রাকৃতিকতাবাদের শক্ত ঐতিহাসিক ভিত্তি গঠন করে, যা পরবর্তীকালে জৈব অ্যানথ্রোপলজির মূল দর্শন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ডিডেরোর মূল রচনায় উল্লেখ রয়েছে:


"وفي مبادئ الفسيولوجيا صاغ ديدرو نظريته في التطور، متأملاً في الحلقة المفقودة، فهو يقول: من الضروري أن نبدأ بتصنيف الكائنات، إبتداء من الجزئ الخامل غير الفعال إلى الجزيء النشيط الفعال، إلى الحيوانات الدقيقة... إلى النبات، وإلى الحيوان، وإلى الإنسان"

অনুবাদ: "এবং 'ফিজিওলজির নীতিসমূহ' গ্রন্থে ডিডেরো বিবর্তন সম্পর্কিত তাঁর তত্ত্ব প্রণয়ন করেন, যেখানে তিনি রূপান্তরের হারানো লিংকের ওপর চিন্তাভাবনা করেন। তিনি বলেন: অক্রিয় জড় কণা থেকে সক্রিয় কণা, অনুজীব... উদ্ভিদ, প্রাণী এবং পরিশেষে মানুষ পর্যন্ত জীবজগতের শ্রেণীবিন্যাস করা অত্যন্ত জরুরি।" [1]

ডিডেরো ও তাঁর সমসাময়িক বস্তুবাদী দার্শনিকরা স্রষ্টার প্রত্যক্ষ পরিচালনা ও ঐশ্বরিক অনুকম্পা (Divine Providence) অস্বীকার করে মহাবিশ্বকে একটি স্বয়ংক্রিয় প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হিসেবে রূপায়িত করতে চেয়েছিলেন। ডিডেরো তাঁর ব্যক্তিগত সংশয়বাদ ও আস্তিকতার দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে স্বীকার করেছিলেন যে, জড়াতিশায়ী বিশ্বভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে জীব সৃষ্টির অণুপরমাণুর যোগসূত্র স্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন। তবে তাঁর এই দর্শন ইউরোপীয় সমাজ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব নির্মূল করতে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। কিসসাতুল হাদারাহ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে:


"وظل ديدرو في العلن ربوبياً متمسكاً بأن الله هو المحرك الرئيسي فقط، منكراً العناية الإلهية والتخطيط والتدبير الإلهي... وأقر في سنيه الأخيرة بعد ذلك صعوبة اشتقاق العضوي من غير العضوي أو الفكر من الأحساس"

অনুবাদ: "ডিডেরো প্রকাশ্যে একজন ডিইস্ট (ঈশ্বরবিশ্বাসী কিন্তু ধর্মীয় ব্যবস্থার বিরোধী) হিসেবে অবস্থান নেন এবং বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর কেবল প্রাথমিক চালিকাশক্তি; তিনি ঐশ্বরিক পরিকল্পনা, পরিচালনা ও বিধানকে অস্বীকার করেন... তবে জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, জড় বস্তু থেকে জৈব সত্তা কিংবা নিছক অনুভূতি থেকে জটিল চিন্তাশক্তির উদ্ভব ঘটানো অত্যন্ত কঠিন।" [2]

বিজ্ঞানের বিবর্তনীয় রূপরেখা পরবর্তীতে বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজির মূল ভিত্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে মানুষের দৈহিক গঠন, মস্তিষ্কের আকৃতি ও কঙ্কালীয় বিবর্তনকে প্রাইমেট বর্গের (Primate) অন্যান্য প্রাণীর সাথে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। ফলে ইউরোপের এই দার্শনিক উত্থান আধুনিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পরিমণ্ডলে ঈশ্বরহীন সৃষ্টির একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলে। বস্তুবাদী বৈজ্ঞানিক ধারার এই বিপ্লব পশ্চিমা সমাজকে ক্রমান্বয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রথাগত ধর্মীয় ধারণার বাইরে নিয়ে আসে, যা আধুনিক যুগের বহু বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের রূপায়নে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। [3]

২. প্রাকৃতিক বিবর্তন বনাম ঐশ্বরিক সৃষ্টিতত্ত্ব: ইসলামি আকিদাহ ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

ইসলামি আকিদাহ ও আকায়েদের মূল নীতি অনুযায়ী মানবজাতির উৎপত্তি সম্পর্কিত বিবর্তনীয় মডেল, যা দাবি করে যে মানুষ অন্য কোনো নিম্নতর প্রাণী (যেমন অ্যানথ্রোপয়েড বা বানরজাতীয় প্রাণী) থেকে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে বাবাতিল ও কুরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট দলিলের পরিপন্থী। ইসলামি শরিয়তের আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) অনুযায়ী, মানবজাতির আদি পিতা আদম সা. কে আল্লাহ তাআলা কোনো অন্তর্বর্তীকালীন প্রাণী রূপান্তর ব্যতিরেকেই সরাসরি মাটি থেকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র এক প্রজাতি হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সুষম অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। আধুনিক যুগের সর্বোচ্চ ফতোয়া পরিষদ 'আল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ' থেকে প্রকাশিত ফতোয়ায় এই বিষয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে:


"إن نظرية التطور المعروفة بنظرية (داروين) مخالفة لكتاب الله وسنة رسوله صلى الله عليه وسلم ولإجماع أهل العلم والإيمان، فقد ثبت في القرآن والسنة ما يدل على خلق آدم عليه السلام على الصورة التي خلقه الله عليها"

অনুবাদ: "ডারউইনের তত্ত্ব নামে পরিচিত বিবর্তনবাদ তত্ত্বটি আল্লাহর কিতাব, তাঁর রাসুল সা.-এর সুন্নাহ এবং ঈমানদার ও উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত ইজমার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। নিশ্চিতভাবে কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা আদম আলাইহিস সালামকে সেই সুনির্দিষ্ট আকৃতিতেই সৃষ্টি করেছেন যে আকৃতিতে তিনি তাঁকে গঠন করতে চেয়েছেন।" [4]

ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষকগণ ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটি প্রমাণ করেছেন যে, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর অভ্যন্তরীণ বা দৈহিক কিছু গাঠনিক সাদৃশ্য থাকলেই তা থেকে প্রমাণ হয় না যে একটি প্রজাতি অপর প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়েছে। বরং শরিয়ত নির্ধারিত মৌলিক তত্ত্ব হলো, একই স্রষ্টা কর্তৃক সৃষ্টির কারণে জীবকূলের মাঝে এই শারীরিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের সামঞ্জস্য বিদ্যমান থাকা স্বাভাবিক। প্রখ্যাত গবেষকগণ বিবর্তনবাদের এই মূল দাবিকে কুরআন, সুন্নাহ এবং মানব যুক্তির সুস্পষ্ট পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেছেন। 'আল-আলমানিয়্যাহ ওয়া মাওকিফুল ইসলামি মিনহা' গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে:


"والنظرية الداروينية باطلة بكتاب الله تعالى وبسنة رسوله صلى الله عليه وسلم، وباطلة بجميع الكتب السماوية، وباطلة بإجماع المسلمين في كل زمان ومكان، وباطلة بالعقل"

অনুবাদ: "এবং ডারউইনীয় তত্ত্বটি মহান আল্লাহর কিতাব, তাঁর রাসুল সা.-এর সুন্নাহ, পূর্ববর্তী সমস্ত ঐশ্বরিক আসমানী গ্রন্থ, যুগে যুগে সমস্ত মুসলিমদের সর্বসম্মত ইজমা এবং সুস্থ মানব বুদ্ধিবৃত্তির নিরিখে সম্পূর্ণ বাতিল ও অকার্যকর।" [5]

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই তত্ত্বের প্রভাব গভীর। সমাজবিজ্ঞান ও নৃতত্ত্ববিদদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ডারউইনের বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজির ভিত্তি কেবল গবেষণাগার থেকে উৎসারিত হয়নি; বরং তা তৎকালীন বিংশ শতাব্দীর জনসংখ্যাতত্ত্ব (Population Dynamics) এবং ইউরোপীয় সামাজিক কাঠামোর গতিপ্রকৃতি দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। মানব প্রজাতিকে নিছক প্রাণিজগতের একটি পর্যায় হিসেবে রূপায়িত করার এই প্রক্রিয়া মানব অস্তিত্বের নৈতিক মূল্য ও আত্মিক মর্যাদাকে আঘাত হানে, যার ফলে সামাজিক ডারউইনবাদ এবং বর্ণবাদী ধারণার ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল। [6]

৩. ইবনে খালদুনের সামাজিক-প্রাকৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভ্রূণতাত্ত্বিক ক্রমবিকাশের ইসলামি ব্যাখ্যা

ইসলামি চিন্তার ইতিহাসে কোনো কোনো আধুনিক গবেষক ইবনে খালদুন রহ.-এর 'আল-মুকাদ্দিমা' গ্রন্থে বর্ণিত সামাজিক ও প্রাকৃতিক কাঠামোর ক্রমবিকাশসংক্রান্ত পর্যবেক্ষণকে ভুলবশত ডারউইনীয় প্রজাতির রূপান্তরের সাথে গুলিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গভীর অ্যাকাডেমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইবনে খালদুন যা বর্ণনা করেছেন তা হলো জীবজগতের বস্তুগত স্তরবিন্যাস (Hierarchy of Existence) এবং একটি জীবদেহের স্বকীয় জীবনচক্রে বা প্রাকৃতিক উপাদানসমূহের মধ্যে পরিবর্তনশীল অবস্থা। তিনি কোনো অবস্থায়ই এক প্রজাতি বিবর্তিত হয়ে অন্য প্রজাতিতে রূপান্তরিত হওয়ার কথা বলেননি; বরং তিনি ব্যক্তিসত্তার ভ্রূণতাত্ত্বিক বিকাশ (Embryological Development) এবং উপাদানের মিশ্রণ প্রক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। ইবনে খালদুন রহ. তাঁর বিশ্বখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন:


"وانظر شأن الإنسان في طور النطفة ثم العلقة ثم المضغة ثم التصوير ثم الجنين ثم المولود ثم الرضيع ثم إلى نهايته... ونسب الأجزاء في كل طور تختلف في مقاديرها وكيفياتها"

অনুবাদ: "মানুষের অবস্থার দিকে লক্ষ করুন—সে কীভাবে শুক্রবিন্দু (নুৎফাহ) থেকে রক্তপিণ্ড (আলাক্বাহ), অতঃপর মাংসপিণ্ড (মুদগাহ), রূপদান, ভ্রূণ অবস্থা, নবজাতক, দুগ্ধপোষ্য শিশু এবং পরিশেষে তার জীবনসীমার শেষ প্রান্তে উপনীত হয়... প্রতি পর্যায়ে উপাদানের অনুপাত ও বৈশিষ্ট্যসমূহে গুণগত বৈচিত্র্য সাধিত হয়।" [7]

ইবনে খালদুন রহ. মানুষের এই অভ্যন্তরীণ বিকাশকে মহান আল্লাহর নির্ধারিত প্রজ্ঞাপূর্ণ একক সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার নিদর্শন হিসেবে পেশ করেছেন। কুরআনের সূক্ষ্ম ভ্রূণতাত্ত্বিক নির্দেশনার সাথে তাঁর এই বিবরণ হুবহু মিলে যায়। ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্ব এটি স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করে যে, একক জীবদেহের ভেতরের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন (Ontogeny) আল্লাহর নির্ধারিত জৈবিক নিয়ম মেনে চলে, কিন্তু এর সাথে প্রজাতির মৌলিক বিবর্তন বা এক জীব অন্য জীবে বদলে যাওয়ার ধারণার (Phylogeny) কোনো সম্পর্ক নেই। মহান আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিজগতের সার্বভৌম ক্ষমতার একক মালিক হিসেবে সমস্ত কিছু পরিচালনা করছেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:


"أَمَّنْ يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَمَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَإِلَهٌ مَعَ اللَّهِ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ"

অনুবাদ: "বলুন তো, কে প্রথমবার সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনেন, অতঃপর তা পুনঃসৃষ্টি করবেন এবং কে তোমাদের আসমান ও জমিন থেকে রিজিক দান করেন? আল্লাহর সাথে কি অন্য কোনো ইলাহ আছে? বলুন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ করো।" (সূরা আন-নামল: ৬৪) [8]

ইসলামি আলেমগণ দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেন যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বৈচিত্র্য এবং মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নিছক প্রাকৃতিক কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার আকস্মিক ফল নয়। মানুষের নৈতিক চেতনা, বোধশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা প্রমাণ করে যে, মানুষের উৎপত্তি বস্তুজগতের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এক মহান ঐশ্বরিক আদেশের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। আদম সা.-কে সৃষ্টির সময় মহান আল্লাহ তাআলা তাকে বিশেষ সম্মান ও সর্ববিদ্যার জ্ঞান দান করেছিলেন, যা তাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করে। [9]

৪. আধুনিক সংশয়বাদ, এনথ্রোপোলজিক্যাল শূন্যতা ও সত্যের দিগন্ত

বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজির আধুনিক গবেষণায় মানুষের উৎপত্তির ভৌগোলিক ও দৈহিক প্রমাণপঞ্জি উপস্থাপন করা হলেও তা সম্পূর্ণ নির্দ্বিধ ও নিশ্ছিদ্র বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তথাকথিত বানর থেকে মানবে রূপান্তরের তত্ত্বে অজস্র ভৌগোলিক ও জীবকঙ্কালীয় শূন্যতা (Anthropological Gaps) রয়ে গেছে, যাকে আধুনিক বিজ্ঞান "মিসিং লিঙ্ক" বলে অভিহিত করে। যেসকল আধুনিক প্রাকৃতিকতাবাদী ও দেহসর্বস্ব বস্তুবাদী (الطبائعيون والدهريون) দাবি করেন যে প্রাকৃতিক নির্বাচন ও অন্ধ প্রকৃতির প্রভাবে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রূপ লাভ করেছে, তাদের এই তত্ত্বের অসারতা ইসলামি আলেমগণ কুরআন ও যুক্তির আলোকে উন্মোচন করেছেন। 'আল-হাদী ওয়াল মুহতাদী' গ্রন্থে এসকল দেহার্থবাদী ও প্রকৃতিবাদীদের বিভ্রান্তির জবাব দিয়ে বলা হয়েছে:


"الركيزة الأولى تصان من أفكار الطبائعيين، والدهريين، الذين يزعمون أن لا إله، وأن الطبيعة هي الفاعلة في الحياة، حتى زعموا أن الإنسان كان أصله قردا، فتطور بالطبيعة شيئا فشيئا حتى وصل إلى ما هو عليه، ولكن نسألهم وهم الخاسرون، لِمَ لم تتطور الشمس، وكذلك القمر وغيرهما من الكواكب؟ ولِمَ لم يتطور الإنسان عن صورته هذه، منذ أن خلق الله آدم إلى أن تقوم الساعة؟!"

অনুবাদ: "ঈমানের প্রথম স্তম্ভকে সেইসকল প্রকৃতিবাদী ও বস্তুবাদীদের চিন্তাধারা থেকে রক্ষা করতে হবে, যারা দাবি করে কোনো ঈশ্বর নেই এবং প্রকৃতিই জীবনের মূল চালিকাশক্তি। এমনকি তারা এও দাবি করে যে মানুষের মূল উৎস ছিল বানর, যা প্রকৃতির প্রভাবে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে! কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্দেশ্যে আমাদের প্রশ্ন: সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্র কেন বিবর্তিত হলো না? এবং আদম সা. থেকে শুরু করে কেয়ামত পর্যন্ত মানুষ কেন তার এই সুনির্দিষ্ট মানবিক আকৃতি থেকে অন্য কোনো রূপে বিবর্তিত হচ্ছে না?!" [10]

বস্তুবাদী দার্শনিকরা ঈশ্বরহীন বিবর্তনীয় মডেল দিয়ে জীবজগতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কেবল বিজ্ঞানের কাঠামোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিক অনুভূতির উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গভীর সংকটে পড়েছেন। ডিডেরোর ন্যায় প্রখ্যাত মুক্তচিন্তক ও দার্শনিকরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, পরম ঐশ্বরিক সত্তার অস্তিত্ব ও নৈতিক বিধানকে অস্বীকার করলে মানব সমাজে চরম নৈরাজ্য ও নৈতিক শূন্যতা নেমে আসে। ফরাসি দার্শনিক ডিডেরো তাঁর লেখনীতে ঈশ্বরহীন দর্শনের আত্মসংঘাত ও মানবিক অনুভূতির গভীর সংকট নিয়ে আক্ষেপ করে লিখেছেন:


"لقد جن جنوني لأني حائر متورط في فلسفة شيطانية لا أملك إلا أن يقرها ذهني وينبذها قلبي... وأقر في سنيه الأخيرة بعد ذلك صعوبة اشتقاق العضوي من غير العضوي أو الفكر من الأحساس"

অনুবাদ: "আমি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি, কারণ আমি এমন এক শয়তানি দর্শনের গোলকধাঁধায় জড়িয়ে পড়েছি যা আমার মস্তিষ্ক মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে কিন্তু আমার হৃদয় তাকে ধিক্কার জানাচ্ছে... এবং তিনি তাঁর শেষ বয়সে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে নির্জীব বস্তু থেকে জৈব সত্তা কিংবা চেতনা থেকে উচ্চতর চিন্তার উৎপত্তি ব্যাখ্যা করা দুঃসাধ্য।" [11]

এভাবেই প্রাকৃতিকতাবাদী বিবর্তনবাদ যখন মানুষকে একটি আত্মাহীন জৈবিক যন্ত্রে পরিণত করতে চায়, তখন তা মানব ইতিহাসের গভীরতম সত্যকে অস্বীকার করে। সাইদ বিন মিসফির তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, কীভাবে এই তত্ত্বসমূহকে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে যাতে মানুষের ঈমানি চেতনা ধ্বংস করা যায়। [12] । তদুপরি, সাহাবি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. আমাদের সতর্ক করে দিয়ে গেছেন যে, বিভ্রান্তিকর দর্শনের মোকাবিলায় সুন্নাহ ও ওহির সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সত্যকে তুলে ধরতে হবে। মানুষের সৃষ্টি ও অস্তিত্বের মূল সত্য কেবল বৈজ্ঞানিক অনুমানের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা আসমানী হিদায়াত ও স্রষ্টার অভ্রান্ত বাণীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রজাতি হিসেবে মানুষের মর্যাদা, বুদ্ধি ও দায়িত্ববোধ এই সত্যকেই সপ্রমাণ করে যে, মানুষ কোনো অন্ধ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ফসল নয়; বরং সে নিখিল বিশ্বের এক মহান স্রষ্টার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি (আশরাফুল মাখলুকাত)।

""
অধ্যায় ৩: বিবর্তনবাদ, বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজি এবং মানব উৎপত্তি (Theory of Evolution, Biological Anthropology, and Human Origins)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

অধ্যায় ৩: বিবর্তনবাদ, বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজি এবং মানব উৎপত্তি (Theory of Evolution, Biological Anthropology, and Human Origins) কুইজ

1 / 5

মানব উৎপত্তির আলোচনায় বিবর্তনবাদ কোন বিষয়টিকে মূল ভিত্তি মনে করে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...