খণ্ড 86
ফন্ট:100%
থিম:

অধ্যায় ১১: ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট এবং ইমার্জেন্সি ডেপ্লয়মেন্ট (Crisis Management HR and Emergency Deployment)

রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্থায়িত্ব এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে 'ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট' বা সংকট ব্যবস্থাপনা একটি অপরিহার্য কৌশলগত হাতিয়ার। ইসলামের ইতিহাসের প্রথমদিকের পর্যায়গুলোতে, বিশেষ করে মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, নবি কারীম সা. যে প্রশাসনিক ও সামরিক নেতৃত্ব প্রদান করেছেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'ইমার্জেন্সি ডেপ্লয়মেন্ট' এবং 'হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট' (HRM)-এর এক অনন্য প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একটি নবজাত রাষ্ট্র যখন চারদিক থেকে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এবং বহিঃশত্রুর হুমকির সম্মুখীন হয়, তখন সেখানে কেবল আবেগ বা সাহসের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকা সম্ভব নয়; বরং প্রয়োজন হয় একটি সুসংহত 'সিস্টেম' বা নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর। নবি কারীম সা. মদিনার প্রতিকূল পরিবেশে জনবলের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং জরুরি অবস্থার দ্রুত মোকাবিলায় যে প্রজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় এক বিস্ময়কর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

সংকটকালীন সময়ে মানবসম্পদের সঠিক বিন্যাস এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যে কোনো নেতৃত্বের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। নবি কারীম সা. কেবল একজন আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন দক্ষ স্ট্র্যাটেজিস্ট, যিনি জানতেন কখন কোন সাহাবিকে কোন বিশেষ দায়িত্বে নিয়োজিত করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় তিনি ব্যক্তিগত যোগ্যতার পাশাপাশি পরিস্থিতির গুরুত্ব এবং ঝুঁকির মাত্রাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তাঁর এই পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্থান বা রিসোর্সের সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করা হতো। এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব কীভাবে নবি কারীম সা. সংকটের মুহূর্তে জনবল ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি ডেপ্লয়মেন্টের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষা করেছিলেন।

রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতায় নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর অপরিহার্যতা (The Architecture of System and Discipline)

যেকোনো রাষ্ট্র বা সংগঠনের উত্থান এবং পতনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো তার অভ্যন্তরীণ 'সিস্টেম' বা শৃঙ্খলা। নবি কারীম সা. মদিনায় প্রবেশের পর যে প্রথম কাজটির ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন, তা হলো একটি সুশৃঙ্খল সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিনির্মাণ। সংকটের মুহূর্তে যখন বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, তখন কেবল একটি শক্তিশালী 'সিস্টেম'ই পারে সেই বিশৃঙ্খলাকে নিয়ন্ত্রণে এনে লক্ষ্য অভিমুখী করতে। এই নিয়মতান্ত্রিকতা কেবল সামরিক ক্ষেত্রে নয়, বরং প্রশাসনিক এবং সামাজিক স্তরেও সমানভাবে কার্যকর ছিল। শৃঙ্খলাহীন কোনো শক্তি কখনোই দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য অর্জন করতে পারে না, কারণ বিশৃঙ্খলা শক্তির অপচয় ঘটায় এবং শত্রুর জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়।

এই প্রসঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্ব আলোচনা করতে গিয়ে গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন যে, মানব সভ্যতার ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্র বা জাতির সমৃদ্ধি এবং পতন মূলত তাদের নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলার ওপর নির্ভর করে। আরবিতে একে বলা হয় 'আন-নিযাম' (النظام)। এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ হলো:


ليس في هذا العالم شيء أعظم أهمية وأشد إلحاحاً وخطراً في كل حياة الإنسان بأسرها من النظام. وهل أنا في حاجة إلى ضرب مثل على ما أقول؟ إن كل من قرأ في تبصر وتدبر عن الأمم والدول لابد أن يقر على الفور بأن ازدهار المجتمعات المتحضرة واضمحلالها، وكل تحركات الأحداث البشرية وتحولاتها، إنما تروح وتجيء وكأنها على محور عجلة النظام. وأنه ليس ثمة كمال اجتماعي في هذه الدنيا، مدني أو ديني، يمكن أن يسمو فوق النظام وقواعد الانضباط.
[1]

উপরোক্ত ইবারাতটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সামাজিক বা ধর্মীয় কোনো আদর্শই ততক্ষণ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হতে পারে না, যতক্ষণ না তার পেছনে একটি সুদৃঢ় শৃঙ্খলা বা 'ডিসিপ্লিন' কাজ করে। নবি কারীম সা. মদিনার মুহাাজির এবং আনসারদের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেছিলেন, তা কেবল একটি আবেগীয় পদক্ষেপ ছিল না, বরং তা ছিল একটি সুপরিকল্পিত সামাজিক সিস্টেম। এই সিস্টেমটি মদিনার অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিরসনে এবং বহিঃশত্রুর মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী মানবসম্পদ ভিত্তি তৈরি করেছিল। যখনই কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হতো, এই সুসংহত কাঠামোর কারণে নবি কারীম সা. খুব দ্রুত জনবল একত্রিত করতে পারতেন, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'র‍্যাপিড রেসপন্স ফোর্স' (Rapid Response Force)-এর ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

নবি কারীম সা. এর এই সিস্টেমিক অ্যাপ্রোচ বা নিয়মতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সাহাবায়ে কেরাম রা. এর মধ্যে এক গভীর আনুগত্য এবং পেশাদারিত্ব তৈরি করেছিল। সংকটের মুহূর্তে যখন নির্দেশ দেওয়া হতো, তখন কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই সেই নির্দেশ পালন করা হতো, কারণ তারা জানতেন যে এই নির্দেশ একটি বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ। এই শৃঙ্খলাবোধই মদিনা রাষ্ট্রকে প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল। সুতরাং, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের প্রথম ধাপ হিসেবে নবি কারীম সা. যে 'সিস্টেম' তৈরি করেছিলেন, তা ছিল তাঁর সামগ্রিক রণকৌশলের মেরুদণ্ড। [2]

কৌশলগত সংঘাত ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক-সামরিক ভারসাম্য (Strategic Conflict Management)

সংকটকালীন সময়ে কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা যথেষ্ট নয়, বরং সামরিক শক্তির সাথে রাজনৈতিক কূটনীতির এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন। নবি কারীম সা. সংঘাত ব্যবস্থাপনায় (Conflict Management) এক অনন্য দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি জানতেন যে, প্রতিটি সংঘাতের একটি রাজনৈতিক মাত্রা থাকে এবং সামরিক বিজয় তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয় যখন তা রাজনৈতিকভাবে বৈধতা পায়। তাঁর এই কৌশলটি ছিল বহুমুখী; একদিকে তিনি শত্রুপক্ষের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের জোট ভেঙে দিতেন, অন্যদিকে মিত্রদের সাথে কৌশলগত চুক্তি করে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতেন। এটি আধুনিক ভূ-রাজনীতির 'কলেক্টিভ সিকিউরিটি' (Collective Security) এবং 'ডিপ্লোম্যাটিক লেভারেজ' (Diplomatic Leverage)-এর একটি আদি রূপ।

সংঘাত ব্যবস্থাপনার এই জটিল প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায় যে, যেকোনো বিপ্লবী বা পরিবর্তনকামী শক্তির জন্য সংঘাতকে পরিচালনা করা এবং তাকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য থাকে শত্রুর শক্তি হ্রাস করা এবং নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এই বিষয়ে একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:


وتتمثل إدارة الصراع - بالنسبة للقوى الثورية - بتفجير الصراع وتطويره، ودعمه، واكتساب الأصدقاء، وإضعاف جبهة الأعداء، والعمل باستمرار لتنمية العوامل المتشابكة في محصلة الصراع على حساب ما يتوافر للعدو من القوى والوسائط، وبكلمة أخرى: زيادة القدرة الذاتية على أنقاض ما يتم تفتيته من قدرات العدو وإمكاناته.
[3]

নবি কারীম সা. এর সংঘাত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ। তিনি কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতেন না, বরং যুদ্ধের আগে এবং পরে রাজনৈতিক চাল চালতেন। যেমন, মদিনার বিভিন্ন গোত্রের সাথে 'মদিনা সনদ' স্বাক্ষর করা ছিল একটি মাস্টারস্ট্রোক, যা তাঁকে একটি আইনি এবং রাজনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করেছিল। যখনই কোনো সংকট দেখা দিত, তিনি প্রথমে আলোচনার পথ খোলা রাখতেন, কিন্তু একই সাথে সামরিক প্রস্তুতিতে কোনো ত্রুটি রাখতেন না। এই ভারসাম্যটি নিশ্চিত করত যে, মুসলিম সমাজ যেন অপ্রয়োজনীয় রক্তক্ষয় থেকে বেঁচে থাকে এবং কেবল চরম প্রয়োজনেই অস্ত্র হাতে নেয়। এই কৌশলটি শত্রুপক্ষের মনে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করত, কারণ তারা বুঝতে পারত যে নবি কারীম সা. একই সাথে একজন দক্ষ কূটনীতিক এবং একজন অকুতোভয় সেনাপতি।

সংঘাত ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শত্রুর প্রতারণা এবং বিশ্বাসঘাতকতার সম্ভাবনাকে আগে থেকেই আঁচ করা। নবি কারীম সা. কখনোই শত্রুর মুখে বলা কথা বা তাদের প্রতিশ্রুতিতে অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করেননি, বরং তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য গোয়েন্দা ব্যবস্থা (Intelligence System) গড়ে তুলেছিলেন। এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থাটি সংঘাতের সময় আকস্মিক আক্রমণ বা বিশ্বাসঘাতকতার ঝুঁকি কমিয়ে দিয়েছিল। রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করা এবং সামরিক বিজয়কে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় রূপান্তর করার এই সমন্বিত পদ্ধতিটিই ছিল তাঁর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের মূল ভিত্তি। [4]

জরুরি জনবল বিন্যাস এবং সক্ষমতা ভিত্তিক ডেপ্লয়মেন্ট (Emergency HR Deployment)

ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং দিক হলো সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে নিয়োজিত করা। নবি কারীম সা. মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় (HR Management) অত্যন্ত সূক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতেন। তিনি প্রতিটি সাহাবির ব্যক্তিগত দক্ষতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং বিশেষ সক্ষমতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। জরুরি পরিস্থিতিতে তিনি কেবল seniority বা পদমর্যাদার ওপর ভিত্তি করে দায়িত্ব অর্পণ করতেন না, বরং 'সক্ষমতা' (Competence) এবং 'প্রয়োজনীয়তা' (Requirement)-এর ওপর ভিত্তি করে ডেপ্লয়মেন্ট করতেন। এই পদ্ধতিটি আধুনিক ম্যানেজমেন্টের 'রাইট পারসন ফর দ্য রাইট জব' (Right Person for the Right Job) নীতির সাথে হুবহু মিলে যায়।

জরুরি ডেপ্লয়মেন্টের ক্ষেত্রে নবি কারীম সা. একটি বিশেষ নমনীয়তা (Flexibility) বজায় রাখতেন। তিনি জানতেন যে, সংকটের মুহূর্তে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তাই পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন আনার সুযোগ রাখা প্রয়োজন। এই কৌশলগত নমনীয়তা সম্পর্কে বলা হয়েছে:


تحديد الهدف، وتعيين السبل المؤدية له، واختيار الوسائل الضرورية، كل ذلك بدقة تامة ووضوح كامل، مع ترك هامش للمرونة يسمح بالتحرك السياسي ضمن حدود الهدف ومن غير تجاوز له.
[5]

এই ইবারাতটি নির্দেশ করে যে, লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট হলেও সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ এবং উপায়গুলো নমনীয় হতে হবে। নবি কারীম সা. এর ডেপ্লয়মেন্ট কৌশলে এই নমনীয়তা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো বিশেষ গোত্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজন হতো, তিনি এমন ব্যক্তিকে দূত হিসেবে পাঠাতেন যার সাথে সেই গোত্রের পূর্ব পরিচিতি বা হৃদ্যতা ছিল। আবার যখন কোনো কঠিন সামরিক অভিযানের প্রয়োজন হতো, তখন তিনি এমন সাহাবিদের নেতৃত্ব দিতেন যাদের রণকৌশল এবং সাহসিকতা প্রমাণিত। এই সক্ষমতা-ভিত্তিক বিন্যাসটি নিশ্চিত করত যে, সীমিত জনবল থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ আউটপুট পাওয়া সম্ভব।

নবি কারীম সা. এর এই এইচআর স্ট্র্যাটেজিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল 'ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট'। তিনি কেবল প্রতিষ্ঠিত নেতাদের ওপর নির্ভর করেননি, বরং তরুণ এবং নতুন প্রতিভাদের সুযোগ দিয়ে তাদের নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত করেছিলেন। সংকটের মুহূর্তে যখন অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি নতুন রক্ত প্রয়োজন হতো, তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাদের দায়িত্ব অর্পণ করতেন। এই প্রক্রিয়ায় তিনি সাহাবায়ে কেরাম রা. এর মধ্যে এক ধরণের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি করেছিলেন, যেখানে প্রত্যেকেই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রদর্শনে আগ্রহী হতেন। এই সামগ্রিক ডেপ্লয়মেন্ট প্রক্রিয়ার কারণেই মদিনা রাষ্ট্র অত্যন্ত অল্প সময়ে একটি শক্তিশালী সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। [6]

সংকটকালীন নেতৃত্ব এবং মনস্তাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা (Crisis Leadership and Psychological Resilience)

যেকোনো সংকটের মুহূর্তে জনবলের দক্ষতা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা যেকোনো সুসংগঠিত বাহিনীকে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে ফেলতে পারে। নবি কারীম সা. একজন মহান নেতা হিসেবে সাহাবায়ে কেরাম রা. এর মনে আত্মবিশ্বাস এবং প্রশান্তি বজায় রাখতে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। তিনি জানতেন যে, সংকটের মুহূর্তে নেতা যদি অবিচল থাকেন, তবে অনুসারীরাও সাহস পায়। তাঁর শান্ত স্বভাব, দৃঢ় সংকল্প এবং আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস সাহাবিদের মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছিল।

নেতৃত্বের এই বিশেষ গুণটি হলো 'ঐতিহাসিক নেতৃত্ব' (Historical Leadership), যা কেবল বর্তমান পরিস্থিতি নয়, বরং ভবিষ্যতের দূরদর্শী ফলাফল বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। এই নেতৃত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো যা প্রয়োজন (Required) এবং যা সম্ভব (Possible)-এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারা। এই বিষয়ে বলা হয়েছে:


وهنا يأتي الدور الريادي للقيادة الثورية التاريخية التي تستطيع التمييز بين ما هو مطلوب، وما هو ممكن.
[7]

নবি কারীম সা. এর নেতৃত্ব ছিল এই প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অনেক সময় পরিস্থিতি এমন হতো যে, আপাতদৃষ্টিতে কোনো পথ খোলা থাকত না, কিন্তু তিনি তাঁর দূরদর্শিতার মাধ্যমে এমন এক পথ বের করতেন যা তখন অসম্ভব মনে হতো। তিনি সাহাবিদের কেবল আদেশ দিতেন না, বরং তাদের সাথে পরামর্শ (শুরা) করতেন। এই পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি সাহাবিদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে এই অনুভূতি দিতেন যে, তারা এই রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার অংশ এবং এই সংকট মোকাবিলায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব (Participatory Leadership) সংকটের সময়ে একতা এবং সংহতি বৃদ্ধি করেছিল।

সংকটকালীন সময়ে নবি কারীম সা. এর ধৈর্য এবং সহনশীলতা সাহাবিদের জন্য একটি জীবন্ত পাঠ্যবই ছিল। যখন বহিঃশত্রুর চাপ চরম পর্যায়ে পৌঁছাত, তখন তিনি তাঁর ওয়াজ এবং উপদেশের মাধ্যমে তাদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিতেন যে, বিজয় কেবল ধৈর্যশীলদের জন্য। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতিই তাদের এমন এক শক্তিতে পরিণত করেছিল যা পৃথিবীর কোনো জাগতিক শক্তি দিয়ে দমানো সম্ভব ছিল না। সুতরাং, নবি কারীম সা. এর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কেবল বাহ্যিক ডেপ্লয়মেন্ট বা কৌশলের সমষ্টি ছিল না, বরং তা ছিল ঈমান, প্রজ্ঞা এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তার এক অপূর্ব সমন্বয়। [8]

""
অধ্যায় ১১: ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট এবং ইমার্জেন্সি ডেপ্লয়মেন্ট (Crisis Management HR and Emergency Deployment)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

অধ্যায় ১১: ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট এবং ইমার্জেন্সি ডেপ্লয়মেন্ট (২য় অংশ) কুইজ

1 / 5

মদিনায় প্রবেশের পর নবি কারীম (সা.) কোন কাজটির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছিলেন?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...