১১.১ 'জাহেলিয়াত'-এর সংজ্ঞায় প্রাচ্যবিদদের বায়াস (Bias): ইগনাজ গোল্ডজিহার এবং ফিলিপ হিট্রির রিভিশনিস্ট (Revisionist) দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে 'জাহেলিয়াত' (Jahiliyyah) শব্দটি কেবল একটি ঐতিহাসিক কালখণ্ডকে নির্দেশ করে না, বরং এটি একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক অবস্থার বহিঃপ্রকাশ। প্রাক-ইসলামি আরবের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ, যেখানে উপাসনা ছিল বহুবিধ, সামাজিক কাঠামো ছিল গোত্রীয় সংঘাতের ওপর নির্ভরশীল এবং নৈতিকতা ছিল চরম বিশৃঙ্খল—এই সামগ্রিক অবস্থাকেই কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে 'জাহেলিয়াত' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে আধুনিক প্রাচ্যতত্ত্ব বা ওরিয়েন্টালিজম (Orientalism) চর্চায় এই শব্দটির সংজ্ঞায়ন এবং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিয়ে এক সুগভীর ও পদ্ধতিগত বিচ্যুতি বা 'বায়াস' (Bias) পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে ইগনাজ গোল্ডজিহার (Ignaz Goldziher) এবং ফিলিপ হিট্রির (Philip Hitti) মতো প্রখ্যাত পণ্ডিতদের গবেষণায় একটি 'রিভিশনিস্ট' (Revisionist) বা সংশোধনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়, যা প্রথাগত ইসলামি ঐতিহাসিক আখ্যানকে চ্যালেঞ্জ করার প্রয়াস চালায়।
প্রাচ্যবিদদের এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো 'জাহেলিয়াত' শব্দটিকে কেবল 'অজ্ঞতা' (Ignorance) বা 'শিক্ষার অভাব' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা। তারা এই শব্দটির তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক গভীরতাকে উপেক্ষা করে একে কেবল একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। অথচ ইসলামি পরিভাষায়, জাহেলিয়াত মানে কেবল তথ্য বা জ্ঞানের অভাব নয়, বরং এটি হলো সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে না পারার এক প্রকার আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব এবং চরম নৈতিক অবক্ষয়। এই সংজ্ঞাগত পার্থক্যটিই প্রাচ্যবিদদের গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের 'মেথডলজিক্যাল বায়াস' বা পদ্ধতিগত পক্ষপাতিত্বের জন্ম দেয়।
জাহেলিয়াত শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক বিচ্যুতি: একটি বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা
প্রাচ্যবিদদের গবেষণায় প্রথম যে বিচ্যুতিটি পরিলক্ষিত হয়, তা হলো 'জাহেলিয়াত' শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক ও দার্শনিক অর্থের সংকোচন। তারা 'জাহল' (Jahl) শব্দটিকে কেবল 'অজ্ঞতা' বা 'Unawareness' হিসেবে গ্রহণ করে, যা মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে। কিন্তু ইসলামি তাত্ত্বিকদের মতে, জাহেলিয়াত হলো একটি মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থা, যেখানে মানুষ তার স্রষ্টার বিধান ও নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন থাকে। এই অবস্থার কারণে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা ও অন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা কেবল জ্ঞানের অভাবে নয়, বরং সত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতার কারণে ঘটেছিল।
আরবি ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই শব্দের গভীরতা অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে 'জাহেল' বা 'জাহিল' শব্দটিকে অস্বীকারকারী বা সত্য প্রত্যাখ্যানকারীর অর্থেও ব্যবহার করা হয়েছে। যেমনটি বলা হয়েছে:
وقوله في الّذي يليه (الجاحد) في الأصل الجاهل। অর্থাৎ, এখানে 'জাহিল' বা অজ্ঞতা শব্দটি কেবল জ্ঞানহীনতাকে নয়, বরং সত্যকে অস্বীকারকারী বা 'জাহিদ' (Denier) হিসেবেও কাজ করে। প্রাচ্যবিদরা যখন এই শব্দটিকে কেবল 'অজ্ঞতা' হিসেবে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন, তখন তারা প্রাক-ইসলামি আরবের সেই আধ্যাত্মিক শূন্যতাকে আড়াল করে ফেলেন, যা নবি সা.-এর আগমনের মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছিল।
এই সংজ্ঞাগত সংকোচন প্রাচ্যবিদদের জন্য একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। যদি জাহেলিয়াতকে কেবল 'অজ্ঞতা' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়, তবে প্রাক-ইসলামি আরব সমাজকে একটি 'অসভ্য' বা 'অপ্রস্তুত' সমাজ হিসেবে দেখানো সহজ হয়, যা পরবর্তীতে ইসলামের দ্রুত বিস্তারকে একটি 'সাংস্কৃতিক বিপ্লব' হিসেবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করে। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, জাহেলিয়াত ছিল একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকট, যা কেবল জ্ঞান বা শিক্ষা দিয়ে সমাধান করা সম্ভব ছিল না; এর জন্য প্রয়োজন ছিল ওহীর মাধ্যমে আসা ঐশী নির্দেশনা।
ইগনাজ গোল্ডজিহার এবং ঐতিহ্যের বিনির্মাণ: রিভিশনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব
ইগনাজ গোল্ডজিহার (Ignaz Goldziher) ছিলেন আধুনিক প্রাচ্যতত্ত্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যার গবেষণার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সমালোচনামূলক। গোল্ডজিহারের মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামি ঐতিহ্য (Tradition), বিশেষ করে হাদিস ও সীরাতকে একটি ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারায় দেখা। তার রিভিশনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি জাহেলিয়াত এবং ইসলামের উত্থানের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলকে একটি ধারাবাহিক বিবর্তন হিসেবে দেখার চেষ্টা করে, যা প্রথাগত ইসলামি আখ্যানের সাথে সাংঘর্ষিক।
গোল্ডজিহারের মতে, ইসলামের প্রাথমিক যুগের অনেক নীতি ও বিশ্বাস মূলত জাহেলিয়াত যুগের বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর একটি বিবর্তিত রূপ মাত্র। তিনি দাবি করেন যে, ইসলামের অনেক বিধান প্রাক-ইসলামি আরবের গোত্রীয় প্রথা বা বিদ্যমান সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, জাহেলিয়াত কোনো সম্পূর্ণ ভিন্ন বা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ ছিল না, বরং এটি ছিল ইসলামের জন্য একটি 'প্রস্তুতিমূলক ক্ষেত্র'। গোল্ডজিহারের এই বিশ্লেষণটি মূলত ইসলামের 'বিপ্লবী' (Revolutionary) চরিত্রটিকে খর্ব করার একটি প্রচেষ্টা। তিনি বোঝাতে চান যে, ইসলাম কোনো আকস্মিক ও আমূল পরিবর্তন আনেনি, বরং এটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক বিবর্তন।
গোল্ডজিহারের এই পদ্ধতিগত সংশয়বাদ (Skepticism) মূলত ইসলামি ইতিহাসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটি কৌশল। তিনি যখন জাহেলিয়াত যুগের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে ইসলামের সাথে সংযুক্ত করার চেষ্টা করেন, তখন তিনি মূলত ইসলামের সেই অনন্য বৈশিষ্ট্যটিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেন যা প্রাক-ইসলামি আরবের সমস্ত কুসংস্কার ও অন্যায়কে সমূলে বিনাশ করেছিল। তার এই দৃষ্টিভঙ্গিটি একটি 'Geopolitical' প্রেক্ষাপট তৈরি করে, যেখানে ইসলামকে একটি ধর্মীয় বিপ্লব হিসেবে না দেখে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ফিলিপ হিট্রির সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও জাহেলিয়াত শব্দের অবমূল্যায়ন
ফিলিপ হিট্রির (Philip Hitti) কাজ মূলত আরবের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর আলোকপাত করে। যদিও তার কাজ অনেক ক্ষেত্রে তথ্যসমৃদ্ধ, তবুও তার বর্ণনায় জাহেলিয়াত যুগের একটি বিশেষ ধরনের 'সাংস্কৃতিক বায়াস' পরিলক্ষিত হয়। হিট্রির দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রাক-ইসলামি আরব ছিল একটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত, কাব্যিক এবং বাণিজ্যকেন্দ্রিক সমাজ। তিনি জাহেলিয়াত যুগের আরবের ওপর গুরুত্বারোপ করার সময় তাদের সাহিত্য, কবিতা এবং বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের ওপর অত্যধিক আলোকপাত করেছেন।
হিট্রির এই দৃষ্টিভঙ্গিটি পরোক্ষভাবে জাহেলিয়াত শব্দটির মূল আধ্যাত্মিক ও নৈতিক তাৎপর্যকে অবমূল্যায়ন করে। যখন একজন ঐতিহাসিক প্রাক-ইসলামি আরবের কাব্যিক উৎকর্ষতা এবং বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির কথা বারবার বর্ণনা করেন, তখন পাঠক বা গবেষকের মনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে, এই সমাজটি মোটেও 'অন্ধকারাচ্ছন্ন' বা 'জাহেল' ছিল না। হিট্রির এই 'সাংস্কৃতিক কেন্দ্রিকতা' (Cultural Centricity) জাহেলিয়াতকে একটি 'সভ্য' যুগের প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করে, যা ইসলামের আগমনের ফলে সৃষ্ট সেই বিশাল নৈতিক শূন্যতাকে আড়াল করে ফেলে।
হিট্রির এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি সমস্যা হলো, এটি জাহেলিয়াতকে একটি 'ইতিবাচক' বা অন্ততপক্ষে 'নিরপেক্ষ' ঐতিহাসিক কালখণ্ড হিসেবে চিত্রিত করে। তিনি প্রাক-ইসলামি আরবের সামাজিক কাঠামোকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন তা একটি সুসংগঠিত সভ্যতা ছিল। কিন্তু তিনি সেই সামাজিক ও নৈতিক বিশৃঙ্খলাকে উপেক্ষা করেন যা কুরআন বারবার উল্লেখ করেছে। প্রাক-ইসলামি আরবের সেই গোত্রীয় সংঘাত, কন্যা শিশু হত্যা এবং মূর্তিপূজার মাধ্যমে সৃষ্ট আধ্যাত্মিক পতনকে হিট্রির বর্ণনায় একটি 'সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য' হিসেবে দেখা হয়, যা মূলত একটি ঐতিহাসিক বিচ্যুতি।
রিভিশনিস্ট প্যারাডাইম এবং ঐতিহাসিক সত্যের বিনির্মাণ
গোল্ডজিহার এবং হিট্রির মতো পণ্ডিতদের এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো একত্রে মিলে একটি বৃহত্তর 'রিভিশনিস্ট প্যারাডাইম' (Revisionist Paradigm) তৈরি করেছে। এই প্যারাডাইমের মূল লক্ষ্য হলো ইসলামের উত্থানকে একটি 'বিপ্লবী ঘটনা' (Revolutionary Event) হিসেবে না দেখে একটি 'প্রাকৃতিক বিবর্তন' (Natural Evolution) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। তারা জাহেলিয়াতকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চান যা ইসলামের আমূল পরিবর্তনকারী চরিত্রটিকে দুর্বল করে দেয়।
এই রিভিশনিস্ট স্কুলটি মূলত দুটি প্রধান কৌশলের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে: প্রথমত, জাহেলিয়াতকে কেবল একটি 'সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্তর' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা; এবং দ্বিতীয়ত, ইসলামের প্রাক-ইসলামি যুগের সাথে একটি নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক যোগসূত্র স্থাপন করা। এই কৌশলের মাধ্যমে তারা ইসলামের সেই 'বিচ্ছেদকারী' (Rupture) বৈশিষ্ট্যটিকে অস্বীকার করতে চান, যা জাহেলিয়াত ও ইসলামের মধ্যবর্তী সীমারেখা হিসেবে কাজ করে। ইসলামের আগমনের ফলে যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল, রিভিশনিস্টরা তাকে একটি 'বিপ্লব' না বলে একটি 'পরিবর্তন' হিসেবে অভিহিত করতে পছন্দ করেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) প্রভাব রয়েছে। যদি জাহেলিয়াতকে একটি উন্নত ও স্থিতিশীল সভ্যতা হিসেবে দেখানো যায়, তবে ইসলামের দ্রুত বিস্তারকে একটি 'ধর্মীয় বিজয়' হিসেবে না দেখে কেবল একটি 'রাজনৈতিক সম্প্রসারণ' হিসেবে ব্যাখ্যা করা সহজ হয়। এটি ইসলামের সেই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বকে খর্ব করার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা। প্রাচ্যবিদদের এই পক্ষপাতিত্ব বুঝতে হলে আমাদের অবশ্যই তাদের ব্যবহৃত শব্দচয়ন এবং ঐতিহাসিক বর্ণনার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, জাহেলিয়াত শব্দটির সংজ্ঞায় প্রাচ্যবিদদের এই পক্ষপাতিত্ব কেবল একটি ভাষাগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গভীর তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিচ্যুতি। ইগনাজ গোল্ডজিহারের পদ্ধতিগত সংশয়বাদ এবং ফিলিপ হিট্রির সাংস্কৃতিক কেন্দ্রিকতা—উভয়ই জাহেলিয়াতের সেই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অন্ধকারকে আড়াল করার চেষ্টা করে যা নবি সা.-এর আগমনের মাধ্যমে দূর করা হয়েছিল। একজন গবেষক হিসেবে এই রিভিশনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে চিহ্নিত করা এবং ইসলামের প্রকৃত ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী জাহেলিয়াতকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা অপরিহার্য।