মানব সভ্যতার ইতিহাসে নৈতিকতার উৎস, ভিত্তি এবং এর প্রয়োগিক উপযোগিতা নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে বিতর্ক চিরন্তন। জ্ঞানালোক বা ইউরোপীয় রেনেসাঁর পর থেকে পাশ্চাত্য দর্শনে নৈতিকতাকে ধর্মতাত্ত্বিক কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। এই প্রচেষ্টার দুটি প্রধান ধারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ইমানুয়েল কান্টের "কর্তব্যবাদ" (Deontology) এবং জেরেমি বেন্থামের "উপযোগবাদ" (Utilitarianism)। অন্যদিকে, ইসলামি নৈতিকতা (Islamic Ethics) বা ‘আখলাক’ কোনো একক মানবিয় বুদ্ধিবৃত্তিক চরমপন্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি; বরং তা ওহী (Divine Revelation), ফিতরাত (Innate Human Nature) এবং আকলের (Reason) এক অনুপম ও ভারসাম্যপূর্ণ সংশ্লেষণ। এই অধ্যায়ে আমরা কান্ট, বেন্থাম এবং ইসলামি নৈতিক দর্শনের গভীর তাত্ত্বিক বিতর্ক, তাদের দার্শনিক ভিত্তি এবং মানব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এদের প্রয়োগিক উপযোগিতার একটি তুলনামূলক ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করব।
কান্টের ডিওন্টোলজি বা কর্তব্যবাদী নীতিবিদ্যা (Kantian Deontology)
জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) তাঁর নৈতিক দর্শনে ফলাফল বা পরিণতির চেয়ে ‘কর্তব্য’ এবং ‘সদিচ্ছা’ (Good Will)-কে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছেন। কান্টের মতে, কোনো কাজের নৈতিক মূল্য তার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না, বরং কাজটি কোন উদ্দেশ্য বা নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে। তিনি একে "ক্যাটাগরিক্যাল ইম্পারেটিভ" (Categorical Imperative) বা ‘নিশ্চিত আদেশ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন [1] । কান্টের এই মতবাদ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Groundwork of the Metaphysics of Morals (১৭৮৫)-এ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে, যেখানে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে নৈতিক নিয়মগুলো সার্বজনীন এবং তা কোনো শর্তের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না [2] ।
কান্টের দর্শনে নৈতিকতার মূল ভিত্তি হলো মানুষের বিশুদ্ধ বুদ্ধি বা প্র্যাকটিক্যাল রিজন (Practical Reason)। তিনি মনে করতেন, মানুষের বুদ্ধি নিজেই নিজেকে নৈতিক আইন দিতে সক্ষম, যাকে তিনি ‘স্বায়ত্তশাসন’ বা Autonomy বলে উল্লেখ করেছেন। কান্টের ক্যাটাগরিক্যাল ইম্পারেটিভের প্রথম সূত্রটি হলো: "এমন নীতি অনুযায়ী কাজ করো, যা তুমি একই সাথে একটি সার্বজনীন নিয়ম হিসেবে কামনা করতে পারো" [3] । উদাহরণস্বরূপ, মিথ্যা বলা কান্টের দৃষ্টিতে সর্বদা অনৈতিক, এমনকি যদি কোনো নিরপরাধ মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্যও মিথ্যা বলতে হয়, তবুও তা বর্জনীয়। কারণ, মিথ্যা বলাকে সার্বজনীন নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করলে সমাজে বিশ্বাসের ভিত্তি ভেঙে পড়বে। কান্টের এই কঠোর কর্তব্যপরায়ণতা নৈতিকতাকে এক পরম ও অপরিবর্তনীয় রূপ দান করে, যা মানুষের আবেগ, অনুভূতি বা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে [4] ।
ইসলামি নীতিবিদ্যার সাথে কান্টের এই কর্তব্যবাদের একটি বাহ্যিক সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, বিশেষ করে নিয়ত বা উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে। ইসলামেও কাজের নৈতিক মূল্য নির্ধারণে নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে কান্টের দর্শনের বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর চরম একগুঁয়েমি এবং বাস্তববিমুখতা। কান্ট যেখানে নৈতিকতাকে সম্পূর্ণ মানবিয় বুদ্ধির স্বায়ত্তশাসনের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, সেখানে ইসলামি নীতিবিদ্যা নৈতিকতার চূড়ান্ত উৎস হিসেবে আল্লাহর ওহীকে নির্ধারণ করে, যা মানুষের বুদ্ধিকে সঠিক পথ দেখায়। ড. মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ দরাজ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Dastur al-Akhlaq fil Quran-এ উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামি নৈতিকতায় কর্তব্যবোধ কেবল বুদ্ধির বিমূর্ত আদেশ নয়, বরং তা স্রষ্টার প্রতি বান্দার আনুগত্য ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, যা মানুষের ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ [5] ।
বেন্থামের উপযোগবাদ বা ইউটিলিটারিয়ানিজম (Bentham's Utilitarianism)
ইমানুয়েল কান্টের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন ইংরেজ দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম (১৭৪৮-১৮৩২)। বেন্থাম প্রবর্তিত ‘উপযোগবাদ’ (Utilitarianism) একটি ফলাফলবাদী (Consequentialist) নৈতিক তত্ত্ব। বেন্থামের মতে, কোনো কাজের ভালো বা মন্দ হওয়া নির্ভর করে তার ফলাফলের ওপর। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ An Introduction to the Principles of Morals and Legislation (১৭৮৯)-এ তিনি ঘোষণা করেন যে, প্রকৃতি মানবজাতিকে দুটি সার্বভৌম শাসকের অধীনে রেখেছে—সুখ (Pleasure) এবং দুঃখ (Pain) [6] । অতএব, যে কাজ সুখ বৃদ্ধি করে এবং দুঃখ হ্রাস করে, তা-ই নৈতিকভাবে সঠিক। বেন্থামের এই মূলনীতিকে বলা হয় "সর্বাধিক মানুষের জন্য সর্বাধিক সুখ" (The greatest happiness of the greatest number) [7] ।
বেন্থামের এই উপযোগবাদী দর্শনের ভিত্তি মূলত ফরাসি দার্শনিক হেলভেটিয়াস (Helvetius)-এর চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। হেলভেটিয়াস মনে করতেন, মানুষের সমস্ত কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি হলো আত্মপ্রেম বা স্বার্থপরতা (Self-love) এবং নৈতিকতার কাজ হলো এই স্বার্থপরতাকে সামাজিক উপযোগিতার সাথে যুক্ত করা [8] । হেলভেটিয়াস স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন যে, পুণ্য বা নৈতিকতা ঈশ্বরের বিধানের আনুগত্যের মধ্যে নয়, বরং এমন আচরণের মধ্যে নিহিত যা সর্বাধিক মানুষের জন্য সর্বাধিক সুখ নিশ্চিত করে:
"وليست الفضيلة هي الامتثال لشرائع الله بل هي السلوك الذي يوفر أعظم اللذة لأكبر عدد من الناس."[9] [10] ।
বেন্থাম এই ধারণাকে আরও পদ্ধতিগত রূপ দেন এবং সুখ পরিমাপের জন্য "হেডোনিক ক্যালকুলাস" (Hedonic Calculus) বা সুখের গাণিতিক হিসাব প্রবর্তন করেন। তবে এই উপযোগবাদী তত্ত্বের বড় দুর্বলতা হলো, এটি কেবল বস্তুগত ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সুখকে প্রাধান্য দেয় এবং নৈতিকতাকে সংখ্যাগুরু মানুষের মর্জির ওপর ছেড়ে দেয়। এর ফলে, সমাজের বৃহত্তর অংশের সুখের জন্য কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর অন্যায় বা নিপীড়নকেও এই তত্ত্বের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া সম্ভব হয়, যা চরম অনৈতিক। তাছাড়া, মানুষের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদাকে এই তত্ত্বে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে, যা মানব প্রকৃতির একটি বড় অংশকে অস্বীকার করার শামিল [11] ।
ইসলামিক নীতিবিদ্যা (Islamic Ethics): ওহী, ফিতরাত এবং তাকলিফের সমন্বয়
পাশ্চাত্য দর্শনের এই চরমপন্থী দ্বান্দ্বিকতার বিপরীতে ইসলামি নীতিবিদ্যা বা ‘আখলাক’ এক শাশ্বত ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান পেশ করে। ইসলামি নৈতিকতা কেবল বিমূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তব্যবোধ (কান্ট) কিংবা কেবল পার্থিব বস্তুগত উপযোগিতার (বেন্থাম) ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। ইসলামের দৃষ্টিতে নৈতিকতার চূড়ান্ত উৎস হলো মহান আল্লাহর ওহী, যা মানুষের জন্মগত সৎপ্রবৃত্তি বা ‘ফিতরাত’ (Fitrah)-এর সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। মানুষের নৈতিক আচরণ কেবল সামাজিক চুক্তির ফসল নয়, বরং তা মানুষের রূহের গভীরে প্রোথিত এক স্বর্গীয় আমানত [12] ।
ইসলামি নীতিবিদ্যায় নৈতিকতাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে: ‘জিবিল্লাহ’ (Jibillah) বা জন্মগত স্বভাব এবং ‘কাসবি’ (Kasbi) বা অর্জিত নৈতিকতা। মানুষের মধ্যে কিছু নৈতিক গুণ জন্মগতভাবেই থাকে, আর কিছু গুণ মানুষ সাধনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করে [13] । রাসুলুল্লাহ সা. মানবজাতির এই নৈতিক গুণাবলিকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্যই প্রেরিত হয়েছিলেন। যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
«إنما بعثت لأتمم مكارم الأخلاق»[14] [15] ।
ইসলামি নৈতিকতার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি উদ্দেশ্য (Intention) এবং উপায় (Means) উভয়ের পবিত্রতা দাবি করে। কান্ট যেখানে উপায়ের ওপর জোর দিয়ে ফলাফলকে উপেক্ষা করেছেন, আর বেন্থাম ফলাফলের জন্য যেকোনো উপায়কে বৈধতা দিয়েছেন, সেখানে ইসলাম ঘোষণা করেছে যে—সৎ উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো ভালো কাজের নৈতিক মূল্য নেই, আবার অসৎ উপায়ে অর্জিত কোনো ভালো ফলাফলও গ্রহণযোগ্য নয়। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর জীবনে এই নৈতিকতার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি মক্কার কাফেরদের চরম শত্রুতার মুখেও আমানতদারী ও সত্যবাদিতার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। এমনকি হিজরতের রাতেও তিনি আলি রা.-কে কাফেরদের আমানতগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য রেখে গিয়েছিলেন [16] ।
তদুপরি, ইসলামি নৈতিকতা পরকালীন জবাবদিহিতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে যুক্ত। এটি মানুষকে কেবল সামাজিক আইন বা লোকলজ্জার ভয়ে সৎ হতে শেখায় না, বরং নির্জন অন্ধকারেও আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি (তাকওয়া) দ্বারা মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। ইবনে রজব আল-হাম্বলী তাঁর Lata'if al-Ma'arif গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর কন্যা ফাতিমা রা.-কে ঘরের কাজের কষ্টের জন্য একজন দাসী দেওয়ার পরিবর্তে তাসবিহ ও দোয়ার শিক্ষা দিয়েছিলেন, কারণ তিনি নিজের পরিবারের চেয়ে আহলে সুফফার দরিদ্র সাহাবিদের ক্ষুধা নিবারণকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন [17] । এই নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও নৈতিক উচ্চতা কোনো পার্থিব উপযোগবাদী দর্শন দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ চার্ট
নিচে কান্টের কর্তব্যবাদ, বেন্থামের উপযোগবাদ এবং ইসলামি নৈতিকতার মূল পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি বিস্তারিত তুলনামূলক চার্ট প্রদান করা হলো। এই চার্টটি পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ দর্শন এবং ইসলামি ঐশী দর্শনের মৌলিক তাত্ত্বিক পার্থক্যের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরে [18] :
| তুলনামূলক বিষয় (Parameters) | ইমানুয়েল কান্ট (Deontology) | জেরেমি বেন্থাম (Utilitarianism) | ইসলামিক এথিক্স (Akhlaq) |
|---|---|---|---|
| নৈতিকতার চূড়ান্ত উৎস (Source of Authority) | মানুষের বিশুদ্ধ বুদ্ধি বা প্র্যাকটিক্যাল রিজন (Autonomy of Reason) [19] | পার্থিব সুখ ও দুঃখের অনুভূতি (Empirical Sensation) [20] | ঐশী ওহী (Wahy), যা মানুষের ফিতরাত ও আকল দ্বারা সমর্থিত [21] |
| মূল নীতি (Core Principle) | ক্যাটাগরিক্যাল ইম্পারেটিভ বা ফলাফলের পরোয়া না করে কর্তব্য পালন [22] | সর্বাধিক মানুষের জন্য সর্বাধিক সুখ নিশ্চিতকরণ (Utility) [23] | আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং সৃষ্টির কল্যাণ সাধন [24] |
| উদ্দেশ্য বনাম ফলাফল (Intent vs. Consequence) | কেবল উদ্দেশ্য (Intent) গুরুত্বপূর্ণ; ফলাফল নৈতিকতার মানদণ্ড নয় [25] | কেবল ফলাফল (Consequence) গুরুত্বপূর্ণ; উদ্দেশ্য গৌণ [26] | উদ্দেশ্য (নিয়ত) এবং উপায় (মাধ্যম) উভয়কেই সৎ ও বৈধ হতে হবে [27] |
| নৈতিকতার পরিধি (Scope & Universality) | সার্বজনীন ও কঠোর; কোনো অবস্থাতেই নিয়মের ব্যতিক্রম চলে না [28] | আপেক্ষিক ও পরিস্থিতিভিত্তিক; সংখ্যাগুরু মানুষের সুবিধার্থে পরিবর্তনশীল [29] | সার্বজনীন ও চিরন্তন, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন জীবন রক্ষার্থে) নমনীয়তার বিধান রয়েছে [30] |
| মানব প্রকৃতির দৃষ্টিভঙ্গি (Human Nature) | মানুষকে কেবল যুক্তিভিত্তিক সত্তা হিসেবে দেখে; আবেগকে অস্বীকার করে [31] | মানুষকে কেবল সুখ-সন্ধানী ও স্বার্থপর প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করে [32] | মানুষকে রূহানি, বুদ্ধিবৃত্তিক ও জৈবিক চাহিদার এক ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় হিসেবে দেখে [33] |
| চূড়ান্ত লক্ষ্য (Ultimate Goal) | যুক্তিভিত্তিক কর্তব্যের মর্যাদা রক্ষা করা (Duty for Duty's sake) [34] | পার্থিব বস্তুগত সুখের সর্বোচ্চকরণ (Temporal Happiness) [35] | ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি (Falah) এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ [36] |
ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োগে ইসলামিক নীতিদর্শনের শ্রেষ্ঠত্ব
ইসলামি নৈতিক দর্শনের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বাস্তব ও ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োগ মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিল। পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিকতা যেখানে রাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতিতে এসে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে—যার প্রমাণ ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ বা আধুনিক বাস্তববাদী (Realist) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্ব—সেখানে ইসলামি নৈতিকতা যুদ্ধ, শান্তি, কূটনীতি এবং সামষ্টিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক উচ্চ নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখে। সাইয়িদ কুতুব তাঁর বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ Fi Zilal al-Quran-এ উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামের নৈতিকতা কোনো পার্থিব স্বার্থ বা ভৌগোলিক সীমানার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি; বরং তা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও পরম গুণাবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা মানবজাতিকে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে তুলে এক বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের দিকে আহ্বান করে [37] ।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, হেলভেটিয়াস বা বেন্থামের মতো পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণ যখন সম্পদের অসম বণ্টন দূর করার জন্য কেবল বস্তুগত ও আইনগত জবরদস্তির কথা ভাবছিলেন, ইসলাম তখন নৈতিক অনুশাসন ও আধ্যাত্মিক প্রেরণার মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করেছিল [38] । জাকাত, সদকা এবং মিরাসের (উত্তরাধিকার) বিধানের মাধ্যমে ইসলাম একদিকে যেমন ব্যক্তিগত মালিকানাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সমাজের দরিদ্র শ্রেণির অধিকারকেও সুরক্ষিত করেছে। এটি কোনো কৃত্রিম সমাজতান্ত্রিক জবরদস্তি নয়, বরং এটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্বের অংশ, যা সে স্বেচ্ছায় পালন করে। ইবনে রজব আল-হাম্বলী তাঁর Lata'if al-Ma'arif গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সা. রমজান মাসে বাতাসের চেয়েও দ্রুত গতিতে দান করতেন, যা ছিল তাঁর নৈতিক চরিত্রের এক অনন্য সামাজিক বহিঃপ্রকাশ [39] ।
ভূ-রাজনৈতিক ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও ইসলামি নৈতিকতার শ্রেষ্ঠত্ব অতুলনীয়। যেখানে আধুনিক পরাশক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এবং যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হয়, সেখানে ইসলাম আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে যুদ্ধের ময়দানেও কঠোর নৈতিক নিয়ম জারি করেছিল। নিরপরাধ নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং ধর্মযাজকদের হত্যা করা, গাছপালা কাটা বা উপাসনালয় ধ্বংস করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লামা তাহের ইবনে আশুর তাঁর বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ Al-Tahrir wat-Tanwir-এ সুরা আল-আরাফের ১৯৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ সা.-কে শত্রুদের সাথেও ক্ষমা ও উদারতার নীতি অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন:
{خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ}[40] [41] ।
ইবনে আশুর আরও উল্লেখ করেছেন যে, এই আয়াতটি মানব ইতিহাসের সমস্ত নৈতিক শিক্ষার এক মহাসংক্ষেপ, যা শত্রুদের বর্বরতার জবাবেও মুসলমানদের এক উচ্চতর নৈতিক অবস্থানে ধরে রাখে [42] । মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর চরম শত্রুদের, যারা তাঁকে স্বভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং তাঁর সাহাবিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল, এক সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলামি নৈতিকতা কেবল কোনো তাত্ত্বিক বিলাসিতা নয়, বরং এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বাস্তবমুখী, কল্যাণকামী এবং শাশ্বত জীবনবিধান, যা কান্টের কঠোরতা এবং বেন্থামের স্বার্থপর উপযোগবাদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাকে এক স্বর্গীয় আলোর সন্ধান দেয়।