খণ্ড 98
ফন্ট:100%
থিম:

১১.৯ কাজী আয়াজের 'আশ-শিফা' গ্রন্থে বর্ণিত ব্লাসফেমি ল' (Blasphemy Law) এবং মডার্ন ফ্রিডম অফ স্পিচ ডিবেট

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ধর্মীয় অনুভূতি এবং বাক-স্বাধীনতার (Freedom of Speech) মধ্যকার দ্বন্দ্ব একটি চিরন্তন ও জটিল তাত্ত্বিক বিতর্কের বিষয়। একদিকে যেমন আধুনিক উদারনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অবাধ অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, অন্যদিকে ইসলামি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দর্শনে 'পবিত্রতা রক্ষা' (Sanctity of the Sacred) এবং 'ধর্মীয় অবমাননা রোধ' (Prevention of Blasphemy) একটি অপরিহার্য আইনি ও নৈতিক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। কাজী আয়াজ কর্তৃক রচিত 'আশ-শিফা' গ্রন্থে নবি সা.-এর শানে বর্ণিত গুণাবলি এবং তাঁর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের যে অকৃত্রিম ভালোবাসা, তা কেবল একটি আবেগীয় বিষয় নয়, বরং এটি একটি সুসংহত আইনি ও সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি প্রদান করে। এই প্রবন্ধে আমরা ব্লাসফেমি ল' বা ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত আইনি ধারণা এবং আধুনিক বাক-স্বাধীনতার ধারণার মধ্যকার দার্শনিক ও ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) ব্যবধানটি বিশ্লেষণ করব।

হৃদয়ের কোমলতা ও শরীয়তের প্রতি শ্রদ্ধা: ব্লাসফেমি ল'-এর মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি

ইসলামি আইনশাস্ত্রে (Jurisprudence) ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননা কেবল একটি আইনি অপরাধ নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক ও সামাজিক বিপর্যয় হিসেবে গণ্য করা হয়। নবি সা.-এর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের যে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল, তা ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুযায়ী, নবি সা.-এর জীবন ও তাঁর বাণী শোনার সময় সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়ের অবস্থা ছিল অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও শ্রদ্ধাশীল।


وَكَانَ رَقِيقَ الْقَلْبِ سَرِيعَ الدَّمْعَةِ عِنْدَ سماع الحديث، وكان كثير التعظيم لشرائع الدين.

উপরোক্ত ইবারতটি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নবি সা.-এর বাণী বা হাদিস শোনার সময় হৃদয়ের কোমলতা (Soft-heartedness) এবং দ্রুত অশ্রু বিসর্জন প্রদান করা ছিল একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এই সংবেদনশীলতা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের অংশ ছিল না, বরং এটি ছিল 'শরীয়তের প্রতি চরম সম্মান প্রদর্শন' (تعظيم لشرائع الدين)-এর একটি বহিঃপ্রকাশ। যখন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র তার ধর্মীয় প্রতীকের প্রতি এই স্তরের শ্রদ্ধা পোষণ করে, তখন সেই প্রতীকের অবমাননা বা ব্লাসফেমি কেবল একটি বাক্যালাপের বিষয় থাকে না, বরং তা সমগ্র সামাজিক সংহতির (Social Cohesion) ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য হয়।

কাজী আয়াজের 'আশ-শিফা' গ্রন্থে নবি সা.-এর যে মহিমা বর্ণিত হয়েছে, তা মূলত এই মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নবি সা.-এর পবিত্র সত্তাকে আক্রমণ করে, তখন তা কেবল একজন ব্যক্তির সম্মানহানি নয়, বরং একটি জাতির আত্মিক ও নৈতিক মেরুদণ্ডকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, একে 'Collective Identity Attack' বা সামষ্টিক পরিচয় আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। তাই ইসলামি আইনি কাঠামোতে ব্লাসফেমি ল'-এর মূল উদ্দেশ্য হলো এই সামষ্টিক আত্মিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

ধর্মের বিকৃতি ও তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি: 'তুদগিলু ফিল দ্বীন' এর বিশ্লেষণ

ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিপজ্জনক দিক হলো ধর্মের মূল নির্যাসকে বিকৃত করা বা ধর্মের ভেতরে বিভ্রান্তি প্রবেশ করানো। এটি কেবল সরাসরি উপহাস নয়, বরং ধর্মের মৌলিক নীতিগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যা সত্যকে আড়াল করে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে।


ثُمَّ قَالَ: يَا لَاهِزُ تُدْغِلُ فِي الدِّينِ!

এই ইবারতটি নির্দেশ করে যে, ধর্মের ভেতরে বিভ্রান্তি বা বিকৃতি (Entangling/Distorting the religion) ঘটানো একটি গুরুতর অপরাধ। এখানে 'تُدْغِلُ' (তুদগিলু) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা কোনো কিছুকে জটিল করা বা সত্যের সাথে মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করাকে বোঝায়। আধুনিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে, যখন 'Post-truth' বা 'সত্য-উত্তর যুগ'-এর প্রভাবে ধর্মীয় অনুশাসনগুলোকে ব্যঙ্গাত্মক বা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়, তখন তা মূলত এই 'তুদগিলু ফিল দ্বীন'-এরই একটি আধুনিক রূপ।

ব্লাসফেমি ল'-এর প্রবক্তারা যুক্তি দেন যে, যদি ধর্মের মৌলিক কাঠামোকে বিকৃত করার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে তা সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দেবে। আধুনিক 'Freedom of Speech' বা বাক-স্বাধীনতার নামে যখন ধর্মের মৌলিক সত্যগুলোকে আক্রমণাত্মকভাবে বিকৃত করা হয়, তখন তা কেবল একটি মতের প্রকাশ থাকে না, বরং তা একটি 'Intellectual Terrorism' বা বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হয়। কাজী আয়াজ যে প্রেক্ষাপটে নবি সা.-এর শান বর্ণনা করেছেন, সেখানে এই বিকৃতি রোধ করা ছিল একটি অপরিহার্য সামাজিক দায়িত্ব।

মিলটনীয় স্বাধীনতা বনাম আধুনিক উদারনৈতিক বাক-স্বাধীনতা: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ

আধুনিক বিশ্বে বাক-স্বাধীনতার যে ধারণা প্রচলিত, তা প্রায়শই নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে বিচ্ছিন্ন। তবে ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু দার্শনিক চিন্তাধারা রয়েছে যা আধুনিক উদারতাবাদের চেয়েও অনেক বেশি গভীর ও নৈতিকভাবে সংহত ছিল। জন মিলটনের (John Milton) রাজনৈতিক ও দার্শনিক দর্শন এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক মানদণ্ড প্রদান করে। মিলটন কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, বরং একটি 'নৈতিক স্বাধীনতা'র কথা বলেছিলেন।

ঐতিহাসিক গ্রন্থ 'দ্য স্টোরি অফ সিভিলাইজেশন' (The Story of Civilization) অনুযায়ী, মিলটন স্বাধীনতার সংজ্ঞায় কেবল ভোটাধিকার বা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের কথা বলেননি, বরং তিনি স্বাধীনতার সাথে নৈতিকতা ও বিচক্ষণতার (Prudence and Virtue) সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।

[1]

মিলটনের মতে, প্রকৃত স্বাধীনতা হলো একজন ব্যক্তির 'তাকওয়া' বা ধর্মভীরুতা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিচক্ষণতা এবং ন্যায়পরায়ণতা। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কেবল ভোট দেওয়ার ক্ষমতা বা সংসদীয় সদস্য নির্বাচনের অধিকার থাকলেই একজন মানুষ স্বাধীন হতে পারে না। যদি সেই নির্বাচন প্রক্রিয়া কেবল স্বার্থান্বেষী বা অনৈতিক ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে তা প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। মিলটনের এই দর্শনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি বলেছিলেন:


فلأن أن تكون حراً، هو بالضبط أن تكون تقياً عاقلاً عادلاً معتدلاً مكتفياً بذاتك...

[2]

অর্থাৎ, "স্বাধীন হওয়ার অর্থ হলো একজন ধর্মভীরু (Pious), বুদ্ধিমান (Rational), ন্যায়পরায়ণ (Just) এবং পরিমিতিবোধ সম্পন্ন (Moderate) মানুষ হওয়া।" মিলটনের এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক 'Unrestricted Freedom of Speech'-এর বিপরীতে একটি শক্তিশালী যুক্তি প্রদান করে। আধুনিক বিশ্বে বাক-স্বাধীনতা প্রায়শই 'অসংযম' (Immoderation) এবং 'অনৈতিকতা'র ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু মিলটনের দর্শন অনুযায়ী, যদি কোনো স্বাধীনতা মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ঘটায় বা সামাজিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে, তবে তা স্বাধীনতা নয়, বরং এক প্রকার 'দাসত্ব' (Slavery to passions)।

এই তাত্ত্বিক সংযোগটি ব্লাসফেমি ল'-এর সাথে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ইসলামি রাষ্ট্রীয় দর্শনে ব্লাসফেমি ল'-এর উদ্দেশ্য হলো সেই 'পরিমিতিবোধ' ও 'নৈতিকতা' রক্ষা করা, যা মিলটনও তাঁর দর্শনে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যখন বাক-স্বাধীনতা ধর্মের পবিত্রতাকে পদদলিত করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা মিলটনের সংজ্ঞায় সেই 'অসংযমী স্বাধীনতা', যা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সামাজিক সংহতির সুরক্ষা

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ধর্মীয় অনুভূতি এবং বাক-স্বাধীনতার মধ্যকার এই সংঘাত কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং এটি একটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) ইস্যু। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে 'Freedom of Speech'-কে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মুসলিম দেশগুলোর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে আঘাত করা হয়। এটি মূলত একটি 'Soft Power' কৌশল, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জীবনদর্শনকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়।

ইসলামি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ব্লাসফেমি ল'-এর প্রয়োগ কেবল শাস্তির বিধান নয়, বরং এটি একটি 'Collective Security' বা সামষ্টিক নিরাপত্তার অংশ। একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার নাগরিকদের মধ্যকার পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং তাদের পবিত্রতম বিশ্বাসের সুরক্ষার ওপর। যদি কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকরা তাদের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থাকে বা ধর্মের পবিত্রতা নিয়ে ক্রমাগত উপহাস করা হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের সামাজিক সংহতি (Social Cohesion) ভেঙে পড়া অনিবার্য।

কাজী আয়াজের 'আশ-শিফা' গ্রন্থে বর্ণিত নবি সা.-এর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের যে গভীর শ্রদ্ধা, তা মূলত একটি আদর্শ সমাজের ভিত্তি। সেই আদর্শ সমাজ গঠিত হয় যেখানে 'Adab' (শিষ্টাচার) এবং 'Taqwa' (খোদাভীতি) হলো বাক-স্বাধীনতার সীমানা নির্ধারণকারী। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায়, এই সীমানা নির্ধারণ করাকে 'Social Contract'-এর একটি অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে নাগরিকরা তাদের ব্যক্তিগত মত প্রকাশের অধিকারের বিনিময়ে সমাজের নৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

পরিশেষে বলা যায়, ব্লাসফেমি ল' এবং মডার্ন ফ্রিডম অফ স্পিচ ডিবেটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো 'সীমানা' (Boundary)। আধুনিক উদারতাবাদ যেখানে সীমানাহীনতাকে স্বাধীনতা বলে দাবি করে, সেখানে ইসলামি দর্শন এবং মিলটনের মতো ধ্রুপদী চিন্তাবিদগণ মনে করেন যে, প্রকৃত স্বাধীনতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা কেবল তখনই সম্ভব যখন তা নৈতিকতা, বিচক্ষণতা এবং পবিত্রতার সীমানার মধ্যে অবস্থান করে। নবি সা.-এর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের সেই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও শরীয়তের প্রতি তাঁদের গভীর সম্মানই হলো সেই নৈতিক সীমানার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, যা একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজ বিনির্মাণে অপরিহার্য।

""
১১.৯ কাজী আয়াজের 'আশ-শিফা' গ্রন্থে বর্ণিত ব্লাসফেমি ল' (Blasphemy Law) এবং মডার্ন ফ্রিডম অফ স্পিচ ডিবেট
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১১.৯ কাজী আয়াজের 'আশ-শিফা' কুইজ

1 / 5

'আশ-শিফা' গ্রন্থের রচয়িতা কে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...