খণ্ড 92
ফন্ট:100%
থিম:

৭.৩ সেক্যুলার হিউম্যানিজম (Secular Humanism)-এর সংকট: উপযোগবাদ (Utilitarianism) এবং নৈতিক আপেক্ষিকতার বিপদ

আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো সেক্যুলার হিউম্যানিজম বা ইহজাগতিক মানবতাবাদ। এই মতবাদটি মানবজীবন, সমাজ ও নৈতিকতার ব্যাখ্যায় কোনো প্রকার ঐশী কর্তৃত্ব বা মেটাফিজিক্যাল (অধিবিদ্যক) ভিত্তিকে অস্বীকার করে। সেক্যুলার হিউম্যানিজমের মূল দাবি হলো, মানুষ নিজেই নিজের নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করতে সক্ষম এবং এর জন্য কোনো আসমানী ওহী বা নবুয়তের নির্দেশনার প্রয়োজন নেই। তবে এই ইহজাগতিক নৈতিক দর্শনের গভীরে প্রবেশ করলে এর চরম জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) ও নৈতিক সংকট উন্মোচিত হয়। বিশেষত, সেক্যুলার হিউম্যানিজম যখন নৈতিকতার ভিত্তি হিসেবে উপযোগবাদ (Utilitarianism) এবং নৈতিক আপেক্ষিকতাকে (Moral Relativism) গ্রহণ করে, তখন তা মানব সমাজকে এক চরম নৈরাজ্য ও অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়। এই তাত্ত্বিক সংকটের বিপরীতে ইসলামের নবুয়তভিত্তিক নৈতিক দর্শন কীভাবে একটি শাশ্বত, অপরিবর্তনীয় এবং বস্তুনিষ্ঠ নৈতিক কাঠামো প্রদান করে, তা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও গভীর আলোচনার দাবি রাখে।

সেক্যুলার হিউম্যানিজম ও নৈতিকতার ভিত্তিহীনতা: একটি দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক পর্যালোচনা

সেক্যুলার হিউম্যানিজম যখন নৈতিকতার জগত থেকে ঈশ্বর এবং ওহীকে নির্বাসিত করে, তখন নৈতিক মূল্যবোধগুলো তার পরম ও বস্তুনিষ্ঠ (Objective) ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। যদি কোনো পরম সত্তা বা স্রষ্টা না থাকেন যিনি মহাবিশ্বের নৈতিক নিয়ম নির্ধারণ করেন, তবে নৈতিকতা কেবলই মানুষের সামাজিক চুক্তি বা বিবর্তনীয় প্রয়োজনের একটি উপজাত (Byproduct) হিসেবে অবশিষ্ট থাকে। এই অবস্থায় "ভালো" এবং "মন্দ"-এর কোনো স্থায়ী সংজ্ঞা থাকে না। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট নৈতিকতার জন্য একটি পরম নিয়মের (Categorical Imperative) কথা বললেও, সেক্যুলার হিউম্যানিজম সেই পরম নিয়মকে কোনো অতিপ্রাকৃতিক উৎসের সাথে যুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে, ইহজাগতিক মানবতাবাদ মানুষের বুদ্ধি ও আবেগের ওপর ভিত্তি করে যে নৈতিকতার প্রাসাদ নির্মাণ করতে চায়, তা বালির বাঁধের মতোই ভঙ্গুর প্রমাণিত হয়। কারণ, মানুষের বুদ্ধি ও আবেগ সদা পরিবর্তনশীল এবং তা ব্যক্তি ও সমাজভেদে ভিন্ন হতে বাধ্য।

ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের দৃষ্টিতে, নৈতিকতার একমাত্র নির্ভরযোগ্য ও অপরিবর্তনীয় উৎস হলো নবুয়ত (Nubuwwah)। নবুয়ত কোনো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তনের ফসল নয়, বরং তা সরাসরি ঐশী নির্বাচন বা ইস্তীফা (Istifa)। মহান আল্লাহ তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে মনোনীত করেছেন মানবজাতিকে সত্য ও সুন্দরের পথ দেখানোর জন্য। এই নবুয়তের মূল সত্তা কোনো আপেক্ষিক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইমাম আলি আল-কারী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'শারহুশ শিফা'-তে নবুয়তের এই পরম ও অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন:

وَأَمَّا النُّبُوَّةُ فِي نَفْسِهَا... فَلَا تَتَفَاضَلُ أَيْ لَا تَفَاوُتَ فِي حَالَاتِهَا وَلَا تَتَزَايَدُ فِي مَقَامَاتِهَا، وَإِنَّمَا التَّفَاضَلُ بِأُمُورٍ أُخَرَ زَائِدَةٍ عَلَيْهَا

অর্থাৎ, "আর নবুয়ত তার নিজের সত্তার দিক থেকে... কোনো তারতম্য বা কমবেশি গ্রহণ করে না। অর্থাৎ এর মূল হাকীকতের মধ্যে কোনো কমবেশি বা হ্রাস-বৃদ্ধি নেই। তবে নবুয়তের অতিরিক্ত অন্যান্য গুণাবলীর কারণে নবিদের মধ্যে মর্যাদাগত পার্থক্য হয়ে থাকে।" [1]

নবুয়তের এই পরম ও অবিভাজ্য সত্তাই মানবজাতিকে এমন এক নৈতিক মানদণ্ড প্রদান করে যা স্থান, কাল ও পাত্রের সীমানা পেরিয়ে সর্বদা অপরিবর্তনীয় থাকে। সেক্যুলার হিউম্যানিজম যেখানে মানুষের সীমিত বুদ্ধির ওপর ভরসা করে নৈতিকতার ভিত্তি খুঁজতে গিয়ে গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়, সেখানে নবুয়ত মানুষকে এক পরম ও ঐশী নৈতিক নোঙর (Metaphysical Anchor) দান করে, যা মানব সমাজকে নৈতিক নৈরাজ্য থেকে রক্ষা করে।

উপযোগবাদের (Utilitarianism) ফাঁদ: সংখ্যাগরিষ্ঠের সুখ বনাম পরম নৈতিক মূল্যবোধ

সেক্যুলার হিউম্যানিজমের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া অন্যতম প্রভাবশালী নৈতিক তত্ত্ব হলো উপযোগবাদ বা ইউটিলিটারিয়ানিজম। জেরেমি বেনথাম এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের মতো দার্শনিকদের দ্বারা বিকশিত এই তত্ত্বের মূল কথা হলো—"সর্বাধিক মানুষের জন্য সর্বাধিক সুখ নিশ্চিত করাই নৈতিকতার একমাত্র লক্ষ্য" (The greatest happiness of the greatest number)। আপাতদৃষ্টিতে এই তত্ত্বটিকে অত্যন্ত কল্যাণমুখী ও বাস্তবসম্মত মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ নৈতিক ফাঁদ। উপযোগবাদ নৈতিকতাকে একটি গাণিতিক সমীকরণে রূপান্তর করে, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারকে কেবল "উপযোগিতা" বা "সুখের" দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করা হয়। এই দর্শনের অধীনে, যদি কোনো সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সুখের জন্য একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার করা বা তাদের অধিকার হরণ করা উপযোগী মনে হয়, তবে উপযোগবাদের দৃষ্টিতে তা নৈতিকভাবে বৈধ হয়ে যায়। এটি মূলত ডিওন্টোলজিক্যাল (Deontological) বা পরম নৈতিক দায়িত্ববোধকে অস্বীকার করে এবং ফলাফলবাদের (Consequentialism) ওপর ভিত্তি করে অনৈতিকতাকে জাস্টিফাই করে।

ইসলামি নৈতিক দর্শন উপযোগবাদের এই সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে। ইসলামের নৈতিকতা কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠের সাময়িক সুখ বা রাজনৈতিক উপযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং তা পরম ন্যায়বিচার (Adl) এবং ঐশী রহমতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমাদের প্রিয় নবি সা. কেবল কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সংখ্যাগরিষ্ঠের উপযোগিতা নিশ্চিত করতে আসেননি, বরং তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য পরম রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর এই রহমত কোনো জাগতিক হিসাব-নিকাশ বা উপযোগিতার অধীন নয়। আলি আল-কারী 'শারহুশ শিফা'-তে রাসুলুল্লাহ সা.-এর গুণাবলী আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন:

وَأَمَّا نَبِيُّ الرَّحْمَةِ وَالتَّوْبَةِ وَالْمَرْحَمَةِ وَالرَّاحَةِ فَقَدْ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ... وَجَعَلَ أُمَّتَهُ أُمَّةً مَرْحُومَةً وَوَصَفَهَا بِالرَّحْمَةِ

অর্থাৎ, "আর তিনি হলেন রহমত, তাওবা, মারহামাত (দয়া) এবং রাহাত (স্বস্তি)-এর নবি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন: 'আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।' ... এবং তিনি তাঁর উম্মতকে একটি দয়াশীল উম্মত হিসেবে গঠন করেছেন এবং তাদের দয়ার গুণে গুণান্বিত করেছেন।" [2]

রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই বিশ্বজনীন রহমত ও নৈতিক আদর্শের কারণে ইসলামি সমাজে দুর্বল, অসহায় এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার কোনো উপযোগবাদী হিসাবের কারণে খর্ব করা সম্ভব নয়। যেখানে উপযোগবাদ কেবল উৎপাদনশীল ও সামাজিকভাবে "উপযোগী" মানুষের অধিকারকে প্রাধান্য দেয়, সেখানে নবি সা.-এর আদর্শ সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও অনুৎপাদনশীল মানুষের মর্যাদাকেও পরম ঐশী অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে। রাসুলুল্লাহ সা. এবং মুয়াজ রা. ও আবু মুসা আল-আশআরি রা.-কে যখন ইয়ামেনে প্রেরণ করেছিলেন, তখন তাঁদের প্রতি নির্দেশ ছিল মানুষের জন্য সহজ করা, কঠিন না করা। আনাস রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, "তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, মানুষকে দূরে ঠেলে দিও না।" [3] । এই নির্দেশনা কোনো উপযোগবাদী কৌশল ছিল না, বরং এটি ছিল ঐশী রহমতের বাস্তব প্রয়োগ যা মানুষের আত্মিক ও সামাজিক মুক্তি নিশ্চিত করে।

নৈতিক আপেক্ষিকতা (Moral Relativism) এবং আধুনিক সংস্কৃতির শূন্যতা

সেক্যুলার হিউম্যানিজমের আরেকটি অনিবার্য পরিণতি হলো নৈতিক আপেক্ষিকতা বা মোরাল রিলেটিভিজম। এই মতবাদ অনুযায়ী, পরম বা সার্বজনীন কোনো ভালো-মন্দ নেই; নৈতিকতা কেবলই সংস্কৃতি, সমাজ, ইতিহাস বা ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভরশীল। নৈতিক আপেক্ষিকতার এই ধারণা আধুনিক সমাজকে এক গভীর শূন্যতা ও আত্মপরিচয়ের সংকটে নিমজ্জিত করেছে। যদি নৈতিকতা আপেক্ষিকই হয়, তবে কোনো সমাজ বা সংস্কৃতির অন্যায়, জুলুম বা বর্বরতাকে অন্য কোনো সমাজ অনৈতিক বলে নিন্দা করার নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সংস্কৃতিতে যদি দাসপ্রথা বা বর্ণবাদকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, তবে নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদের দৃষ্টিতে তাকে ভুল বলা অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ তাদের কাছে সেটাই তাদের নৈতিকতা। এই দর্শন মানুষকে এক চরম নৈতিক পক্ষাঘাতগ্রস্ততার (Moral Paralysis) দিকে নিয়ে যায়, যেখানে সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্য সম্পূর্ণ মুছে যায়।

এই নৈতিক অন্ধকারের বিপরীতে রাসুলুল্লাহ সা.-এর আগমন ঘটেছিল এক পরম সত্যের আলোকবর্তিকা নিয়ে। তিনি কেবল একজন সমাজ সংস্কারক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন 'আল-মাহীর' (The Eraser)—যিনি কুফর, শিরক এবং জাহেলিয়াতের সমস্ত আপেক্ষিক ও মিথ্যা নৈতিক কাঠামোকে চিরতরে মিটিয়ে দিতে এসেছিলেন। জুবায়ের ইবনে মুতয়িম রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ সা. নিজের এই গুণটি বর্ণনা করেছেন, যা আলি আল-কারী তাঁর গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন:

وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِي يَمْحُو اللَّهُ بِيَ الْكُفْرَ... وَيَكُونُ مَحْوُ الْكُفْرِ إِمَّا مِنْ مَكَّةَ وَبِلَادِ الْعَرَبِ... أَوْ يَكُونُ الْمَحْوُ عَامًّا بِمَعْنَى الظُّهُورِ وَالْغَلِبَةِ

অর্থাৎ, "আমিই হলাম আল-মাহীর (মিটিয়ে দাতা), যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কুফরকে মিটিয়ে দেন। আর কুফর মিটিয়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি মক্কা ও আরব ভূখণ্ড থেকে শুরু করে... সমগ্র পৃথিবীতে সত্যের বিজয় ও আধিপত্যের মাধ্যমে সাধারণ রূপ লাভ করে।" [4]

রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক কুফর ও জাহেলিয়াত মিটিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো—মানুষের তৈরি সমস্ত আপেক্ষিক, স্বার্থান্বেষী এবং জুলুমভিত্তিক নৈতিক মানদণ্ডকে বাতিল করে আল্লাহর দেওয়া পরম ও বস্তুনিষ্ঠ নৈতিক বিধানকে প্রতিষ্ঠা করা। তিনি মানুষকে এমন এক জীবনব্যবস্থা দান করেছেন যা কেবল কোনো নির্দিষ্ট যুগের বা সংস্কৃতির জন্য নয়, বরং তা কিয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত মানুষের জন্য এক শাশ্বত গাইডলাইন। তিনি হলেন 'আল-আকিব' (The Ultimate) এবং 'আল-মুকাফফী' (The Final Prophet)—যার পর আর কোনো নতুন নবি বা নতুন কোনো নৈতিক বিধানের প্রয়োজন নেই। তাঁর আনীত শরীয়ত ও নৈতিক আদর্শই হলো সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন বিভাজক রেখা (Criterion)।

ঐশী নৈতিকতার শ্রেষ্ঠত্ব: উপযোগবাদ ও আপেক্ষিকতার ঊর্ধ্বে এক শাশ্বত সমাধান

সেক্যুলার হিউম্যানিজম, উপযোগবাদ এবং নৈতিক আপেক্ষিকতার এই ত্রিমুখী সংকট থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করার একমাত্র পথ হলো ওহী ও নবুয়তের শাশ্বত আলোকের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। মানুষের তৈরি যেকোনো নৈতিক দর্শনই শেষ পর্যন্ত মানুষের সীমাবদ্ধতা, স্বার্থপরতা এবং সংকীর্ণতার দ্বারা প্রভাবিত হতে বাধ্য। কিন্তু আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের মাধ্যমে প্রেরিত ঐশী নৈতিকতা মানুষের এই সমস্ত সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। কারণ এর উৎস স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা, যিনি মানুষের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ এবং তাদের অন্তরের সূক্ষ্মতম অনুভূতি সম্পর্কেও পূর্ণ অবগত। নবুয়তের এই নৈতিক কাঠামো মানুষকে কেবল বাহ্যিক আইনের অনুসারী বানায় না, বরং মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগ্রত করে এক অনন্য নৈতিক বিপ্লব সাধন করে।

হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের একটি ঐতিহাসিক দোয়ায় এই পরম নৈতিক আদর্শের পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকুতি ফুটে উঠেছিল, যা আলি আল-কারী তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:

قَالَ دَاوُدُ عَلَيْهِ السَّلَامُ اللَّهُمَّ ابْعَثْ لَنَا مُحَمَّدًا مُقِيمَ السُّنَّةِ بَعْدَ الْفَتْرَةِ

অর্থাৎ, "হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম দোয়া করেছিলেন: হে আল্লাহ! আমাদের জন্য মুহাম্মাদ সা.-কে প্রেরণ করুন, যিনি দীর্ঘ ফাতরাতের (ঐশী বার্তা বন্ধ থাকার সময়কাল) পর পুনরায় আপনার শাশ্বত সুন্নাহ ও নৈতিক বিধানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন।" [5]

এই 'মুকীমুস সুন্নাহ' বা সুন্নাহর সুপ্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে রাসুলুল্লাহ সা.-এর আগমন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নৈতিক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। তিনি এমন এক সমাজ বিনির্মাণ করেছিলেন যেখানে নৈতিকতা কোনো আপেক্ষিক বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল পরম সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে একজন সাধারণ মানুষের অধিকারও খলীফার চেয়ে কম ছিল না, কারণ উভয়েই একই পরম ঐশী আইনের অধীন ছিলেন। সেক্যুলার হিউম্যানিজম যেখানে মানুষকে কেবল একটি অর্থনৈতিক বা সামাজিক একক (Economic or Social Unit) হিসেবে দেখে, ইসলাম সেখানে মানুষকে আল্লাহর প্রতিনিধি (খলীফাতুল্লাহ) হিসেবে পরম মর্যাদা দান করে। এই মর্যাদার কারণেই মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরীয়াহ)। উপযোগবাদের কৃত্রিম সুখের ধারণার চেয়ে ইসলামের এই আত্মিক ও নৈতিক প্রশান্তি অনেক বেশি গভীর ও স্থায়ী, যা ইহকাল পেরিয়ে পরকালেও মানুষকে প্রকৃত মুক্তি ও পরম কল্যাণ দান করে।

""
৭.৩ সেক্যুলার হিউম্যানিজম (Secular Humanism)-এর সংকট: উপযোগবাদ (Utilitarianism) এবং নৈতিক আপেক্ষিকতার বিপদ
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৭.৩ সেক্যুলার হিউম্যানিজম (Secular Humanism)-এর সংকট: উপযোগবাদ (Utilitarianism) এবং নৈতিক আপেক্ষিকতার বিপদ কুইজ

1 / 5

সেক্যুলার হিউম্যানিজম বা ইহজাগতিক মানবতাবাদ নিচের কোনটিকে অস্বীকার করে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...