ভূমিকা: ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও সাংস্কৃতিক আত্মীকরণের তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো বহুত্ববাদী সমাজে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর সহাবস্থান এবং তাদের পরিচয় সংরক্ষণের পদ্ধতি। এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দুটি বিপরীতমুখী ধারণা: 'রিলিজিয়াস প্লুরালিজম' বা ধর্মীয় বহুত্ববাদ এবং 'কালচারাল অ্যাসিমিলেশন' বা সাংস্কৃতিক আত্মীকরণ। ধর্মীয় বহুত্ববাদ এমন একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে নির্দেশ করে, যেখানে একাধিক ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং আইনি স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে একটি একক রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধীনে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে। পক্ষান্তরে, সাংস্কৃতিক আত্মীকরণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো প্রভাবশালী সংখ্যাগরিষ্ঠ বা শাসক গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে সংখ্যালঘু বা অধীনস্থ গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে তারা নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় হারিয়ে মূল স্রোতে বিলীন হতে বাধ্য হয়।
ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনের সূচনা থেকেই এই দুটি ধারণার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। মহানবি হযরত মুহাম্মাদ সা. মদিনায় যে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা কোনো জোরপূর্বক সাংস্কৃতিক আত্মীকরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি; বরং তা ছিল ধর্মীয় বহুত্ববাদের এক অনন্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। আল-কুরআনের চিরন্তন ঘোষণা এবং ইসলামি আইনের মূলনীতি অনুযায়ী, ধর্মীয় বিশ্বাসে কোনো জোর-জবরদস্তির স্থান নেই। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
«لا إِكْراهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ»
অনুবাদ: "দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই; সত্য পথ ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।" [1] । এই ঐশী নির্দেশনা ইসলামি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে বহুত্ববাদের আইনি ভিত্তি স্থাপন করে, যা কোনো অমুসলিম নাগরিককে তার ধর্মীয় পরিচয় ত্যাগ করে মুসলিম সংস্কৃতিতে আত্মীকৃত হতে বাধ্য করে না।
ইসলামি সমাজব্যবস্থায় মানবজাতির মৌলিক ঐক্যকে স্বীকার করার পাশাপাশি তাদের বৈচিত্র্যকে একটি স্বাভাবিক ঐশ্বরিক নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। আল-কুরআনের আরেকটি আয়াতে মানবজাতির এই বহুত্ববাদী রূপকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে:
«يا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْناكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثى وَجَعَلْناكُمْ شُعُوباً وَقَبائِلَ لِتَعارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقاكُمْ»
অনুবাদ: "হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।" [2] । এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে একটি সমজাতীয় (Homogeneous) সমাজ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে পারস্পরিক পরিচিতি ও সহাবস্থানের বহুত্ববাদী মডেলকে উৎসাহিত করে।
মদিনা সনদ ও প্রাথমিক ইসলামি রাষ্ট্রে বহুত্ববাদের আইনি ভিত্তি
মদিনায় হিজরতের পর মহানবি সা. যে ঐতিহাসিক 'মদিনা সনদ' (دستور المدينة) প্রণয়ন করেছিলেন, তা ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান এবং ধর্মীয় বহুত্ববাদের এক বাস্তব প্রয়োগ। এই সনদের মাধ্যমে মদিনার মুসলিম, ইহুদি এবং অন্যান্য পৌত্তলিক গোত্রগুলোকে নিয়ে একটি যৌথ রাজনৈতিক সম্প্রদায় বা 'উম্মাহ' গঠন করা হয়, যেখানে প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আইনি স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হয়েছিল। মদিনা সনদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ইহুদিরা তাদের ধর্ম পালন করবে এবং মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। এটি ছিল আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'কালেক্টিভ সিকিউরিটি' বা সামষ্টিক নিরাপত্তা এবং 'রিলিজিয়াস টলারেন্স' বা ধর্মীয় সহনশীলতার এক অপূর্ব সমন্বয়।
ইসলামি রাষ্ট্রের এই বহুত্ববাদী নীতি কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অন্যান্য অমুসলিম পরাশক্তিগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটি প্রতিফলিত হতো। মহানবি সা. যখন রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে পত্র প্রেরণ করেন, তখন তিনি তাকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার কোনো হুমকি দেননি, বরং অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। সেই পত্রে তিনি কুরআনের এই আয়াতটি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন:
«قُلْ يا أَهْلَ الْكِتابِ تَعالَوْا إِلى كَلِمَةٍ سَواءٍ بَيْنَنا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئاً وَلا يَتَّخِذَ بَعْضُنا بَعْضاً أَرْباباً مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ»
অনুবাদ: "বলুন, হে আহলে কিতাবগণ! এসো এমন এক কথার দিকে যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে অভিন্ন; তা হলো—আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোনো শরিক করব না এবং আমাদের কেউ আল্লাহ ছাড়া একে অপরকে রব হিসেবে গ্রহণ করব না। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলো—তোমরা সাক্ষী থাকো যে আমরা মুসলিম।" [3] । এই কূটনৈতিক পত্রটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম অমুসলিমদের সাথে একটি 'অভিন্ন শব্দ' বা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছিল, কোনো সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় আগ্রাসনের মাধ্যমে নয়।
মদিনা সনদের এই বহুত্ববাদী কাঠামো পরবর্তীকালে খলিফাদের জন্য একটি আইনি মডেল হিসেবে কাজ করেছে। প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রা. এবং দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. যখন সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও পারস্য জয় করেন, তখন তারা স্থানীয় খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং তাদের উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। তারা স্থানীয় জনগণকে জোরপূর্বক আরব সংস্কৃতি বা ইসলামে দীক্ষিত করার কোনো চেষ্টা করেননি, যা প্রমাণ করে যে প্রাথমিক ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা 'কালচারাল অ্যাসিমিলেশন'-এর নীতিকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল [4] ।
রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের বিপরীতে ইসলামি বহুত্ববাদের ভূ-রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব
তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রোমান (বাইজান্টাইন) এবং পারস্য (সাসানীয়) সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা ছিল চরমভাবে একচেটিয়া এবং জোরপূর্বক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আত্মীকরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করে অন্যান্য সমস্ত খ্রিস্টান উপদল (যেমন মনোভিসিট ও নেস্টোরিয়ান) এবং ইহুদিদের ওপর তীব্র নিপীড়ন চালানো হতো। তাদের বাধ্য করা হতো রাষ্ট্রীয় চার্চের মতবাদ গ্রহণ করতে, অন্যথায় তাদের নাগরিক অধিকার হরণ করা হতো এবং নির্বাসনে পাঠানো হতো। একইভাবে সাসানীয় পারস্যে জরথুষ্ট্রীয় ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হতো এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হতো।
এই দমবন্ধকর পরিস্থিতিতে ইসলামের আগমন এবং এর বহুত্ববাদী নীতি স্থানীয় নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর কাছে এক মহা মুক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। সিরিয়া ও মিশরের মনোভিসিট খ্রিস্টানরা বাইজান্টাইনদের জোরপূর্বক আত্মীকরণ নীতির চেয়ে মুসলিমদের অধীনে ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রাখাকে অনেক বেশি শ্রেয় মনে করেছিল। ইসলামি রাষ্ট্র তাদের 'জিম্মি' (সংরক্ষিত নাগরিক) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যার ফলে তারা তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন, ভাষা এবং সংস্কৃতি অক্ষুণ্ণ রাখার সুযোগ পায়। এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে স্থানীয় জনগণের ওপর কোনো মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হয়নি, যা তাদের নিজস্ব পরিচয় সংরক্ষণে সহায়তা করেছিল [5] ।
যদিও বাইজান্টাইনরা মুসলিমদের এই উদারতাকে দুর্বলতা মনে করে বারবার আক্রমণ চালিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে মুতাহ ও তাবুকের মতো যুদ্ধগুলো সংঘটিত হয়েছিল, তবুও মহানবি সা. বা তাঁর পরবর্তী খলিফাগণ কখনোই প্রতিশোধমূলকভাবে অমুসলিমদের ওপর জোরপূর্বক ধর্মান্তর বা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চাপিয়ে দেননি। তাবুক অভিযানের সময় যখন রোমানরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটে, তখন মহানবি সা. সিরিয়ার সীমান্তে অবস্থান করেও রোমান ভূখণ্ডে প্রবেশ করে জোরপূর্বক কোনো বিজয় বা আত্মীকরণের চেষ্টা করেননি, যা প্রমাণ করে যে ইসলামের যুদ্ধনীতি ছিল কেবলই আত্মরক্ষামূলক এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার পথ উন্মুক্ত করার জন্য [6] ।
জিম্মি চুক্তি ও ইসলামি আইনে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষা
ইসলামি আইনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো 'আহদুজ জিম্মাহ' বা জিম্মি চুক্তি। এই চুক্তির অধীনে অমুসলিম নাগরিকরা (আহলে কিতাব এবং অন্যান্য স্বীকৃত ধর্মাবলম্বী) জিজিয়া কর প্রদানের বিনিময়ে ইসলামি রাষ্ট্রে পূর্ণ নাগরিক নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নিজস্ব দেওয়ানি আইন (Personal Law) প্রয়োগের অধিকার লাভ করত। জিজিয়া ছিল মূলত সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতির একটি কর, কারণ অমুসলিমদের ওপর ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ করা বাধ্যতামূলক ছিল না। এই আইনি কাঠামোর মাধ্যমে ইসলাম অমুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার পূর্ণ গ্যারান্টি প্রদান করেছিল।
ইসলামি রাষ্ট্রে চুক্তির পবিত্রতা ও তা রক্ষা করার গুরুত্ব কতটা অপরিসীম, তা পবিত্র কুরআনের এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়:
«وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللَّهِ إِذا عاهَدْتُمْ وَلا تَنْقُضُوا الْأَيْمانَ بَعْدَ تَوْكِيدِها وَقَدْ جَعَلْتُمُ اللَّهَ عَلَيْكُمْ كَفِيلًا»
অনুবাদ: "এবং তোমরা আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার পর সেই অঙ্গীকার পূর্ণ করো এবং শপথ দৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ করো না, অথচ তোমরা আল্লাহকে তোমাদের জামিনদার করেছ।" [7] । এই আয়াতের ভিত্তিতে ইসলামি আইনবিদগণ ফতোয়া দিয়েছেন যে, জিম্মি চুক্তি ভঙ্গ করা বা অমুসলিমদের অধিকার হরণ করা একটি গুরুতর ধর্মীয় অপরাধ।
এমনকি যুদ্ধাবস্থাতেও যদি কোনো অমুসলিম গোষ্ঠী মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে চায়, তবে ইসলাম তাদের সেই সুযোগ দেয় এবং তাদের ওপর কোনো সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় শর্ত আরোপ করে না। ইসলামি রাষ্ট্রের এই আইনি উদারতা ও চুক্তির প্রতি আনুগত্যের কারণে অমুসলিমরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্বে টিকে থাকতে পেরেছে। আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন এবং বাইজান্টাইন সম্রাট থিওফিলাসের মধ্যে যে কূটনৈতিক পত্রবিনিময় হয়েছিল, সেখানেও যুদ্ধ ও শান্তির আলোচনার পাশাপাশি বন্দি বিনিময় এবং বাণিজ্যের স্বাধীনতার মতো দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো স্থান পেয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে ইসলামি রাষ্ট্র সর্বদা আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল [8] ।
সাংস্কৃতিক আত্মীকরণ বনাম ইসলামি সভ্যতা বিনির্মাণে অমুসলিমদের অংশগ্রহণ
সাংস্কৃতিক আত্মীকরণের আধুনিক তত্ত্বে দেখা যায় যে, একটি প্রভাবশালী সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব মেধা ও স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলে। কিন্তু ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে (Islamic Golden Age) এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়। সেখানে অমুসলিমরা তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রেখেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা ও অনুবাদ শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদ এবং আল-মামুনের আমলে বাগদাদের 'বাইতুল হিকমাহ' (House of Wisdom) ছিল এই বহুত্ববাদী মেধা চর্চার প্রধান কেন্দ্র।
এই বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অমুসলিম পণ্ডিতদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। উদাহরণস্বরূপ, বিখ্যাত সিরিয়াক খ্রিস্টান পণ্ডিত কুস্তা ইবনে লুকা (Qusta ibn Luqa) এর কথা উল্লেখ করা যায়। তাঁর সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনুল কিফতি লিখেছেন:
«قسطا بن لوقا فيلسوف شامي نصراني في أيام العباسيين، دخل بلاد الروم، وحصل من تصانيفهم الكثير، وعاد إلى الشام، واستدعي إلى بغداد ليترجم كتبا يستخرجها من لسان يونان إلى لسان العرب»
অনুবাদ: "কুস্তা ইবনে লুকা ছিলেন আব্বাসীয় যুগের একজন সিরীয় খ্রিস্টান দার্শনিক। তিনি রোমানদের দেশে প্রবেশ করে তাদের বহু গ্রন্থ সংগ্রহ করেন এবং সিরিয়ায় ফিরে আসেন। পরবর্তীতে তাঁকে বাগদাদে আমন্ত্রণ জানানো হয় গ্রিক ভাষা থেকে আরবি ভাষায় গ্রন্থসমূহ অনুবাদ করার জন্য।" [9] । কুস্তা ইবনে লুকা তাঁর খ্রিস্টান পরিচয় বজায় রেখেই ইসলামি খেলাফতের অন্যতম প্রধান অনুবাদক ও বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেছিলেন, যা প্রমাণ করে যে ইসলামি রাষ্ট্র মেধার মূল্যায়নে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আত্মীকরণের কোনো শর্ত আরোপ করেনি।
খলিফা আল-মামুন গ্রিক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে বিশেষ বৈজ্ঞানিক প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেছিলেন। এই প্রতিনিধিদলে মুসলিমদের পাশাপাশি অমুসলিম পণ্ডিতরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন [10] । উমাইয়া যুগেও খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ এবং হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের আমলে চিকিৎসা ও রসায়ন শাস্ত্রের বহু গ্রন্থ অমুসলিম পণ্ডিতদের মাধ্যমে অনূদিত হয়েছিল [11] । এই ঐতিহাসিক তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামি সভ্যতা ছিল একটি সমন্বিত ও বহুত্ববাদী সভ্যতা, যেখানে অমুসলিমরা কোনো প্রকার সাংস্কৃতিক আত্মীকরণের শিকার না হয়েই তাদের নিজস্ব মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পেরেছিল।
উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে বহুত্ববাদের বিবর্তন ও আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে এর মূল্যায়ন
উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে ইসলামি সাম্রাজ্যের সীমানা যখন স্পেন থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, তখন রাষ্ট্রকে এক বিশাল জাতিগত ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এই বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনায় উমাইয়া ও আব্বাসীয় খলিফাগণ মদিনা সনদের বহুত্ববাদী নীতিকেই কিছুটা পরিবর্তিত ও বিবর্তিত রূপে প্রয়োগ করেছিলেন। উমাইয়া খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের শাসনকাল ছিল এই বহুত্ববাদের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বাইজান্টাইন সম্রাট লিও-র সাথে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এমনকি খলিফা যখন অসুস্থ হন, তখন সম্রাট লিও তাঁর রাজকীয় চিকিৎসককে (যিনি একজন খ্রিস্টান যাজক ছিলেন) খলিফার চিকিৎসার জন্য দামেস্কে প্রেরণ করেছিলেন [12] । এটি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।
আব্বাসীয় যুগেও এই বহুত্ববাদী নীতি অব্যাহত ছিল। খলিফা হারুন আল-রশিদ যখন বাইজান্টাইন সম্রাজ্ঞী আইরিনের সাথে শান্তি চুক্তি করেন, তখন তিনি কেবল যুদ্ধ বন্ধই করেননি, বরং বন্দি মুক্তি এবং বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত করার মাধ্যমে উভয় রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন [13] । আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় 'পিপল-টু-পিপল ডিপ্লোম্যাসি' (People-to-People Diplomacy), যা কেবল রাজনৈতিক স্তরেই নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্তরেও বহুত্ববাদকে উৎসাহিত করে।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করলে দেখা যায় যে, পশ্চিমা বিশ্ব যেখানে বিংশ শতাব্দীতে এসে 'মাল্টিকালচারালিজম' (Multiculturalism) বা বহুসংস্কৃতিবাদের ধারণা গ্রহণ করেছে, ইসলাম তা চৌদ্দশত বছর আগেই অত্যন্ত সফলভাবে প্রয়োগ করেছিল। ইসলাম অমুসলিমদের ওপর 'কালচারাল অ্যাসিমিলেশন' বা জোরপূর্বক সাংস্কৃতিক আত্মীকরণ চাপিয়ে না দিয়ে তাদের নিজস্ব আইনি ও ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসন (Millet System-এর আদি রূপ) প্রদান করেছিল। এর ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ থাকত, অন্যদিকে তেমনি বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব পরিচয় নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারত। ইসলামি ইতিহাসের এই বহুত্ববাদী মডেলটি আজীবন মানব সভ্যতার জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।