প্রাক-ইসলামিক আরব উপদ্বীপের সামাজিক ও জনতাত্ত্বিক কাঠামোর বিশ্লেষণে 'ইনফ্যান্ট মর্টালিটি' বা শিশু মৃত্যুহার একটি অত্যন্ত জটিল এবং বেদনাদায়ক অধ্যায়। ষষ্ঠ শতাব্দীর আরবের ভৌগোলিক প্রতিকূলতা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম অভাব এবং চরমপন্থী সামাজিক প্রথাগুলো সম্মিলিতভাবে শিশুদের জীবনাবসানের হারকে এক ভয়াবহ মাত্রায় উন্নীত করেছিল। যদিও আধুনিক পরিসংখ্যানবিদ্যার (Statistical Science) মাপকাঠিতে সেই সময়ের কোনো সুনির্দিষ্ট ডেটাবেস বিদ্যমান নেই, তবে পবিত্র কুরআন, প্রাচীন সীরাত গ্রন্থ এবং তৎকালীন আরবের সমাজতাত্ত্বিক বিবরণীর মাধ্যমে একটি গবেষণাধর্মী চিত্র ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। এই মৃত্যুহার কেবল প্রাকৃতিক কারণে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর পেছনে কাজ করেছিল গভীর অর্থনৈতিক সংকট এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন সামাজিক মনস্তত্ত্ব।
ভৌগোলিক প্রতিকূলতা ও পরিবেশগত প্রভাবকসমূহের বিশ্লেষণ
আরব উপদ্বীপের চরম শুষ্ক জলবায়ু এবং প্রতিকূল পরিবেশ নবজাতকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে হ্রাস করে দিত। বিশেষ করে হিজাজ এবং নজদ অঞ্চলের তীব্র উত্তাপ এবং পানির তীব্র সংকট শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠত। নবজাতকের শরীর অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় ডিহাইড্রেশন এবং হিটস্ট্রোকের মতো সমস্যাগুলো তৎকালীন সময়ে সাধারণ ছিল। মরুভূমির ধূলিকণা এবং বালুঝড় শিশুদের শ্বাসতন্ত্রে গুরুতর সংক্রমণ সৃষ্টি করত, যার প্রতিকারের জন্য কোনো কার্যকর ঔষধ বা চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। এই পরিবেশগত চাপ শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিত, ফলে সামান্য সংক্রমণও দ্রুত মৃত্যুতে রূপ নিত [1] ।
তৎকালীন আরবে প্রসূতি সেবার (Obstetric Care) চরম অভাব ছিল। প্রসবকালীন জটিলতা এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে নবজাতক এবং মা উভয়েরই মৃত্যুহার ছিল অত্যন্ত উচ্চ। বিশেষ করে বেদুইন সম্প্রদায়ের মধ্যে যাযাবর জীবনযাপনের ফলে তারা স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে বঞ্চিত ছিল। প্রসবের পর নবজাতকের সঠিক পরিচর্যার অভাব এবং পুষ্টির ঘাটতি ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেট বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা পালন করত। প্রাচীন আরবের চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল মূলত ভেষজ এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সংমিশ্রণ, যা জটিল শৈশবকালীন রোগ নিরাময়ে সম্পূর্ণ ব্যর্থ ছিল [2] ।
জলবায়ুগত প্রভাবের পাশাপাশি পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি শিশুদের পুষ্টির ওপর প্রভাব ফেলত। দুধের অভাব বা নিম্নমানের পুষ্টির কারণে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতো এবং তারা বিভিন্ন সংক্রামক রোগের শিকার হতো। মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং খনিজের অভাব তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিত, যা পরোক্ষভাবে মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে সহায়ক ছিল। এই পরিবেশগত ও জৈবিক সীমাবদ্ধতাগুলো প্রাক-ইসলামিক আরবে শিশুদের জীবনকালকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছিল [3] ।
অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব
প্রাক-ইসলামিক আরবের গোত্রীয় সমাজব্যবস্থায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব ছিল প্রকট। সম্পদ বণ্টন ছিল অত্যন্ত অসম এবং অধিকাংশ গোত্র চরম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করত। এই অর্থনৈতিক সংকট শিশুদের বেঁচে থাকার অধিকারকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছিল। যখন কোনো পরিবারে খাদ্যের তীব্র অভাব দেখা দিত, তখন শিশুদের পুষ্টির বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়ত। দারিদ্র্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের পর্যাপ্ত দুধ বা খাদ্য দেওয়া সম্ভব হতো না, যা তাদের অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিত। এই অর্থনৈতিক চাপ কেবল শারীরিক মৃত্যু নয়, বরং মানসিক চাপের মাধ্যমেও শিশুদের জীবনকে প্রভাবিত করত [4] ।
তৎকালীন আরবে 'রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট' বা সম্পদ ব্যবস্থাপনার ধারণাটি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। গোত্রীয় সংঘাত এবং ক্রমাগত যুদ্ধের ফলে কৃষি ও পশুপালনের ব্যাপক ক্ষতি হতো, যার প্রভাব পড়ত শিশুদের ওপর। যুদ্ধের সময় যখন পুরুষ সদস্যরা রণক্ষেত্রে চলে যেত, তখন শিশুদের দেখাশোনার দায়িত্ব নারী ও বৃদ্ধদের ওপর বর্তাত। এই অস্থিতিশীল পরিবেশে শিশুদের সঠিক যত্ন এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ এবং মহামারীর প্রকোপ শিশুদের মৃত্যুহারকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিত [5] ।
সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল। অনেক সময় শত্রু গোত্রের আক্রমণ বা অপহরণের ফলে শিশুদের জীবনহানি ঘটত। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের রক্ষা করার সামর্থ্য রাখত না। এই চরম নিরাপত্তাহীনতা এবং সম্পদের অভাবের ফলে শিশুদের জীবনকে একটি বোঝা হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, যা পরবর্তীতে আরও ভয়াবহ সামাজিক প্রথার জন্ম দিয়েছিল [6] ।
'ওয়াদ' (Wa'd) বা কন্যা শিশু হত্যার মনস্তাত্ত্বিক ও পরিসংখ্যানগত প্রভাব
প্রাক-ইসলামিক আরবের ইনফ্যান্ট মর্টালিটির সবচেয়ে অন্ধকার দিক ছিল 'ওয়াদ' বা কন্যা শিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রথা। এটি কেবল একটি সামাজিক কুসংস্কার ছিল না, বরং এর পেছনে কাজ করেছিল গভীর অর্থনৈতিক ভয় এবং সামাজিক মর্যাদার সংকট। তৎকালীন আরবে কন্যা সন্তানকে অর্থনৈতিক বোঝা এবং পারিবারিক সম্মানের জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য করা হতো। এই প্রথার ফলে কন্যা শিশুদের মৃত্যুহার ছিল অবিশ্বাস্য রকমের উচ্চ, যা সামগ্রিক ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেটকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল। পবিত্র কুরআনে এই ভয়াবহ প্রথার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
وَإِذَا الْمَوْؤُودَةُ سُئِلَتْ بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ[7]
এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন আরবে কন্যা শিশুদের হত্যা করা একটি প্রচলিত প্রথা ছিল। মনস্তাত্ত্বিকভাবে, আরবের পুরুষরা মনে করত যে কন্যা সন্তান তাদের বংশের গৌরব রক্ষা করতে পারবে না এবং যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করতে পারবে না। ফলে তারা কন্যা সন্তানদের জন্মকে একটি পরাজয় হিসেবে দেখত। এই মানসিকতা থেকে জন্ম নেওয়া 'ওয়াদ' প্রথাটি কেবল কিছু নির্দিষ্ট গোত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি আরবের একটি ব্যাপক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছিল [8] ।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কন্যা শিশুদের লালন-পালন করাকে ব্যয়বহুল মনে করা হতো। দারিদ্র্যের ভয়ে অনেক বাবা-মা তাদের কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দিতেন। পবিত্র কুরআনে এই অর্থনৈতিক ভয়ের কথা এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
. وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِالْبِنْتِ ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ[9]
এই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, কন্যা শিশুদের জন্ম তৎকালীন আরবে চরম হতাশার কারণ ছিল। পরিসংখ্যানগতভাবে দেখলে, এই প্রথার কারণে কন্যা শিশুদের মৃত্যুহার পুত্র শিশুদের তুলনায় বহুগুণ বেশি ছিল। এটি কেবল প্রাকৃতিক মৃত্যু ছিল না, বরং ছিল একটি পরিকল্পিত সামাজিক হত্যাকাণ্ড, যা আরবের জনতাত্ত্বিক ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছিল [10] ।
গোত্রীয় যুদ্ধ এবং শিশুদের জীবনহানির ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
আরব উপদ্বীপের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্থির। ছোট ছোট গোত্রগুলোর মধ্যে পানি, চারণভূমি এবং বাণিজ্য পথ নিয়ে প্রতিনিয়ত সংঘাত চলত। এই অন্তহীন যুদ্ধ এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলে শিশুদের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ত। যুদ্ধের সময় কেবল যোদ্ধারা নয়, বরং পুরো গোত্রটিই আক্রমণের শিকার হতো। শত্রু গোত্র যখন কোনো বসতি আক্রমণ করত, তখন শিশুদের হত্যা করা বা বন্দি করা ছিল সাধারণ ঘটনা। এই সহিংস পরিবেশ শিশুদের জন্য একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছিল [11] ।
যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতি শিশুদের মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা পালন করত। যখন কোনো গোত্র তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হতো, তখন নবজাতক এবং ছোট শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও আশ্রয়ের অভাব দেখা দিত। দীর্ঘ পথ ভ্রমণের কষ্ট এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় অনেক শিশু প্রাণ হারাত। এই বাস্তুচ্যুতির ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেত এবং তারা দ্রুত মহামারীর কবলে পড়ত। যুদ্ধের পর সৃষ্ট শূন্যতা এবং অভিভাবকহীনতা শিশুদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলত [12] ।
এছাড়া, গোত্রীয় প্রতিশোধের সংস্কৃতিতে শিশুদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হতো। বংশপরম্পরায় শত্রুতার কারণে অনেক সময় প্রতিপক্ষ গোত্রের শিশুদের হত্যা করা হতো যাতে ভবিষ্যতে তারা বড় হয়ে প্রতিশোধ নিতে না পারে। এই নিষ্ঠুর ভূ-রাজনৈতিক কৌশল শিশুদের মৃত্যুহারকে একটি কৃত্রিম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অরাজকতা এবং আইনের অনুপস্থিতি শিশুদের জীবনকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত করে দিয়েছিল, যা প্রাক-ইসলামিক আরবের একটি চরম ট্র্যাজেডি [13] ।
লিঙ্গ-ভিত্তিক মৃত্যুহারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও সামাজিক প্রভাব
প্রাক-ইসলামিক আরবে পুত্র এবং কন্যা শিশুদের মৃত্যুহারের মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান ছিল। পুত্র শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ছিল মূলত প্রাকৃতিক এবং পরিবেশগত কারণে, কিন্তু কন্যা শিশুদের ক্ষেত্রে এটি ছিল সামাজিক ও পরিকল্পিত। পুত্র সন্তানদের যুদ্ধ এবং পশুপালনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ হিসেবে দেখা হতো, তাই তাদের বেঁচে থাকার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হতো। বিপরীতে, কন্যা সন্তানদের প্রতি চরম অবহেলা এবং ঘৃণা তাদের মৃত্যুহারকে আকাশচুম্বী করে দিয়েছিল। এই লিঙ্গ-ভিত্তিক বৈষম্য আরবের সামাজিক বুননে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল [14] ।
এই বৈষম্যের ফলে আরবে নারী জনসংখ্যার একটি বড় অংশ শৈশবেই বিলীন হয়ে যেত। এর ফলে বিবাহযোগ্য নারীর সংখ্যা হ্রাস পেত এবং সামাজিক সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হতো। যদিও কিছু প্রভাবশালী গোত্রে কন্যা সন্তানদের রাখা হতো, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে 'ওয়াদ' প্রথাটি ছিল অত্যন্ত প্রবল। এই বৈষম্যমূলক মৃত্যুহার কেবল শারীরিক মৃত্যু নয়, বরং এটি ছিল নারীর মানবিক মর্যাদার চরম অবমাননা। এই পরিস্থিতি আরবের সমাজকে একটি পুরুষতান্ত্রিক এবং সহিংস কাঠামোর দিকে ঠেলে দিয়েছিল [15] ।
সামাজিকভাবে, এই উচ্চ মৃত্যুহারের ফলে পরিবারগুলোর মধ্যে এক ধরণের মানসিক জড়তা তৈরি হয়েছিল। শিশুদের মৃত্যুকে তারা নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছিল এবং এর প্রতিকারের কোনো চেষ্টা করেনি। বিশেষ করে কন্যা সন্তানদের মৃত্যুতে কোনো শোক পালন করা হতো না, বরং একে একটি বোঝা থেকে মুক্তি হিসেবে দেখা হতো। এই চরম সংবেদনহীনতা আরবের নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পর্যায়কে নির্দেশ করে। এই অন্ধকার যুগের সমাপ্তি এবং শিশুদের বিশেষ করে কন্যা শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তৎকালীন আরবে অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠেছিল [16] ।