ইমাম আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনে জারির তাবারী রহ. রচিত 'তারিখ আল-রুসুল ওয়াল মুলুক' (Tarikh al-Rusul wal-Muluk) কেবল একটি ঐতিহাসিক কালানুক্রমিক গ্রন্থ নয়, বরং এটি মধ্যযুগীয় ইতিহাসতত্ত্বের (Historiography) একটি অনন্য ও জটিল কাঠামো। তাবারীর ইতিহাস রচনার পদ্ধতিটি মূলত 'মাল্টি-ভয়েস ন্যারেটিভ' বা বহুমাত্রিক কণ্ঠস্বরের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে সমসাময়িক অনেক ইতিহাসবিদ একটি একক ও সুসংগত (Monolithic) কাহিনী নির্মাণের চেষ্টা করতেন, সেখানে তাবারী বিভিন্ন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে প্রাপ্ত ভিন্ন ভিন্ন সনদ বা সূত্র (Isnad) সমূহের একটি সংকলন উপস্থাপন করেছেন। এই পদ্ধতিগত বৈচিত্র্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ইতিহাসের মূলধারার বাইরে থাকা 'মার্জিনালাইজড' বা প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর—যাদের কণ্ঠস্বর সাধারণত রাজকীয় বা অভিজাত ইতিহাস রচনায় অনুপস্থিত থাকে—একটি পরোক্ষ কিন্তু শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব প্রদান করে।
তাবারীর এই পদ্ধতিগত বৈশিষ্ট্যটি মূলত তাঁর 'সনদ' (Isnad) নির্ভর জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) কাঠামোর ফসল। তিনি কোনো ঘটনাকে একক সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করে, সেই ঘটনার বিপরীতে বিদ্যমান বিভিন্ন মতবাদ বা বর্ণনার পরম্পরাকে সংরক্ষিত রেখেছেন। এই বৈচিত্র্যময় বর্ণনার স্তরে স্তরে আমরা এমন কিছু সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক উপাত্ত খুঁজে পাই, যা তৎকালীন সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, অ-আরব বা নিম্নবর্গের মানুষের অস্তিত্ব ও প্রভাবকে নির্দেশ করে।
সনদ ও বহুমাত্রিক কণ্ঠস্বরের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো (Epistemological Framework of Isnad and Multi-voice Narrative)
তাবারীর ইতিহাস রচনার মূল ভিত্তি হলো 'সনদ' বা বর্ণনাকারীদের পরম্পরা। তাঁর পদ্ধতিতে একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেবল একটি কাহিনী হিসেবে বর্ণনা করা হয় না, বরং সেই ঘটনার বিপরীতে বিদ্যমান সকল প্রকার 'রিপোর্ট' বা বর্ণনাকে তাঁর গ্রন্থে স্থান দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'প্লুরালিস্টিক ন্যারেটিভ' (Pluralistic Narrative)-এর সমতুল্য, যেখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আধিপত্যের পরিবর্তে বিভিন্ন পক্ষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাবারী যখন কোনো যুদ্ধের বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের বর্ণনা দেন, তখন তিনি কেবল বিজয়ী বা শাসক শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন না, বরং বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে সেই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটও উপস্থাপন করেন [1] ।
এই মাল্টি-ভয়েস পদ্ধতিটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি 'ভয়েস রিপ্রেজেন্টেশন' বা কণ্ঠস্বরের সুযোগ তৈরি করে দেয়। কারণ, যখন তাবারী একাধিক সনদ বা বর্ণনার তুলনা (Cross-referencing) করেন, তখন অনেক ক্ষেত্রে এমন কিছু ক্ষুদ্র বা অপ্রাসঙ্গিক তথ্য বেরিয়ে আসে যা মূলধারার বড় বড় কাহিনীতে হারিয়ে যেত। এই ক্ষুদ্র তথ্যগুলোই মূলত সেইসব মানুষের পরিচয় বহন করে যারা সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক ছিল। তাবারীর এই পদ্ধতিগত সততা ও নিরপেক্ষতা তাঁকে একজন সাধারণ ইতিহাসবিদ থেকে একজন উচ্চতর 'অ্যানালিটিক্যাল হিস্টোরিয়ান' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে [2] ।
তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তাবারীর এই পদ্ধতিটি ইতিহাসের 'ডিমোক্র্যাটাইজেশন' বা গণতন্ত্রীকরণ ঘটায়। তিনি ইতিহাসকে কেবল রাজাদের বিজয়গাথা হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে, বর্ণনাকারীদের বৈচিত্র্যের মাধ্যমে একটি সামাজিক দলিল হিসেবে রূপান্তরিত করেছেন। এই বৈচিত্র্যের কারণেই তাঁর গ্রন্থে এমন সব মানুষের উল্লেখ পাওয়া যায়, যারা হয়তো তৎকালীন আরব্য অভিজাত সমাজের অংশ ছিলেন না, কিন্তু ইসলামের প্রসারের সাথে সাথে ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ও 'আল-সাওয়াদান' (Al-Sawadan) এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
তাবারীর বর্ণনাসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি তৎকালীন আরব্য সমাজের কাঠামোর বাইরে থাকা বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক ও জাতিগত গোষ্ঠীর অস্তিত্ব অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে, 'আল-সাওয়াদান' (السوادن) বা কৃষ্ণবর্ণের/আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি তাঁর বর্ণনার বিভিন্ন স্তরে পরিলক্ষিত হয়। যদিও অনেক ধ্রুপদী ইতিহাস গ্রন্থে এই গোষ্ঠীগুলোকে কেবল বর্ণনামূলক উপাত্ত হিসেবে ব্যবহার করা হতো, তাবারীর গ্রন্থে তাঁদের উপস্থিতি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফুটে ওঠে।
তাবারীর গ্রন্থে বর্ণিত বিভিন্ন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বা সামাজিক সংঘাতের বর্ণনায় দেখা যায় যে, ইসলামের প্রাথমিক বিস্তারের সময় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক। এই জনগোষ্ঠীর মানুষরা অনেক সময় মূলধারার আরব্য অভিজাতদের তুলনায় সামাজিক মর্যাদায় নিম্নস্তরে থাকলেও, তাবারীর 'মাল্টি-ভয়েস' পদ্ধতিতে তাঁদের নাম বা তাঁদের দ্বারা বর্ণিত ঘটনাগুলো সংরক্ষিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, তাবারীর ইতিহাস কেবল আরব্যদের ইতিহাস নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক ও বহু-জাতিগত (Multi-ethnic) ইতিহাস [3] ।
সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা যায়, তাবারীর এই বর্ণনাগুলো তৎকালীন 'সোশ্যাল স্ট্র্যাটিফিকেশন' বা সামাজিক স্তরবিন্যাস বুঝতে সাহায্য করে। প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলো কীভাবে তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল বা কীভাবে তারা ইসলামের প্রসারের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছিল, তা তাবারীর বর্ণনার মধ্য দিয়ে একটি অস্পষ্ট কিন্তু শক্তিশালী চিত্র প্রদান করে। এই প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর মূলত তাবারীর সনদের বৈচিত্র্যের মাধ্যমেই ইতিহাসের পাতায় টিকে আছে, যা otherwise বিলুপ্ত হয়ে যেত [4] ।
ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে প্রান্তিকতার প্রতিফলন: 'বাহরাসির' ও 'মউদুদ সাহেব আল-আন্দালুস' এর বিশ্লেষণ
তাবারীর গ্রন্থে কিছু নির্দিষ্ট নাম বা ব্যক্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়, যারা মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে থেকে ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, 'বাহরাসির' (بهرسير) নামক ব্যক্তিত্বের উল্লেখ তাবারীর বর্ণনার একটি বিশেষ দিক নির্দেশ করে, যা সম্ভবত কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বা জাতিগত পরিচয়ের সাথে সম্পৃক্ত। এই ধরনের নামগুলো প্রমাণ করে যে, তাবারী কেবল বড় বড় খলিফা বা সেনাপতিদের নামই লিপিবদ্ধ করেননি, বরং ইতিহাসের প্রান্তিক বা গৌণ চরিত্রগুলোকেও তাঁর সংকলনে স্থান দিয়েছেন।
একইভাবে, 'মউদুদ সাহেব আল-আন্দালুস' (مودود صاحب الأندلس) এর মতো ব্যক্তিত্বের উল্লেখ তাবারীর বর্ণনার সেই বৈচিত্র্যকে নির্দেশ করে, যেখানে ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে প্রান্তিক বা দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের প্রভাবও ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত হয়েছে। এই ধরনের নামগুলো তাবারীর ইতিহাসের 'স্পেশালিস্টিক ডেনসিটি' বা তথ্যের ঘনত্ব বৃদ্ধি করে। একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে তাবারী যখন এই নামগুলো উল্লেখ করেন, তখন তিনি মূলত তৎকালীন বিশ্বের একটি বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় মানচিত্র তুলে ধরেন, যেখানে প্রান্তিক বা দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষরাও ইতিহাসের অংশ হিসেবে স্বীকৃত।
এই ব্যক্তিত্বদের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা হয়তো কোনো বড় সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন না, কিন্তু তাঁদের অস্তিত্ব বা তাঁদের সাথে সম্পর্কিত ঘটনাগুলো তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। তাবারীর 'মাল্টি-ভয়েস' পদ্ধতি এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তথ্যগুলোকে একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, তাবারীর ইতিহাসতত্ত্ব কেবল 'টপ-ডাউন' (Top-down) বা শাসককেন্দ্রিক নয়, বরং এতে 'বটম-আপ' (Bottom-up) বা সাধারণ মানুষের ইতিহাসের একটি সূক্ষ্ম প্রতিফলন বিদ্যমান [5] ।
সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব (Geopolitical Significance)
তাবারীর এই বহুমাত্রিক বর্ণনা পদ্ধতিটি কেবল ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহের কৌশল নয়, বরং এটি তৎকালীন সময়ের জটিল ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) ও সামাজিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। ইসলামের প্রসারের ফলে আরব্য উপদ্বীপের বাইরে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও জাতির মানুষের সাথে যে মিথস্ক্রিয়া (Interaction) ঘটেছিল, তাবারীর গ্রন্থে তার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর ভয়েস রিপ্রেজেন্টেশন মূলত এই সাংস্কৃতিক ও জাতিগত সংমিশ্রণেরই একটি বহিঃপ্রকাশ [6] ।
তৎকালীন সময়ে যখন আরব্য আধিপত্য ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার লড়াই চলছিল, তখন তাবারীর এই পদ্ধতিটি একটি নিরপেক্ষ 'ডকুমেন্টারি রেকর্ড' হিসেবে কাজ করেছে। প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর অংশগ্রহণ বা তাঁদের প্রতি তৎকালীন শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি তাবারীর বর্ণনার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় ইতিহাস নয়, বরং এটি একটি সমাজতাত্ত্বিক দলিল যা তৎকালীন বিশ্বের সামাজিক স্তরবিন্যাস, জাতিগত বৈচিত্র্য এবং ক্ষমতার বিন্যাসকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করে [7] ।
পরিশেষে বলা যায়, তাবারীর ইতিহাস রচনার পদ্ধতিটি আধুনিক ইতিহাসবিদদের জন্য একটি বিশাল সম্পদ। তাঁর 'মাল্টি-ভয়েস ন্যারেটিভ' পদ্ধতিটি যেভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে ইতিহাসের মূলধারার সাথে যুক্ত করেছে, তা অত্যন্ত বিরল। তাবারী কেবল ঘটনা বর্ণনা করেননি, বরং তিনি ইতিহাসের সেই সব মানুষের অস্তিত্বকেও স্বীকৃতি দিয়েছেন যারা সময়ের গর্ভে হারিয়ে যেতে পারত। তাঁর এই পদ্ধতিগত বৈচিত্র্য ও তথ্যের গভীরতা 'তারিখ আল-রুসুল ওয়াল মুলুক'-কে একটি বিশ্বমানের এনসাইক্লোপেডিক মাস্টারপিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা আজও সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের কাছে গবেষণার এক অমূল্য উৎস [8] ।