খণ্ড 88
ফন্ট:100%
থিম:

অধ্যায় ২: বহুবিবাহ (Polygamy): ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব (Historical Context & Comparative Religion)

মানব সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় বিবাহ ও পারিবারিক কাঠামো কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি জটিল সমাজতাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বহুবিবাহ বা Polygamy-এর ধারণাটি মানব ইতিহাসের বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন রূপে বিদ্যমান ছিল। প্রাক-ইসলামি যুগে আরবের সামাজিক কাঠামোতে বহুবিবাহের যে প্রথা প্রচলিত ছিল, তা ছিল মূলত কোনো নির্দিষ্ট আইনি বা নৈতিক সীমারেখা বহির্ভূত একটি অরাজক পরিস্থিতি। এই অধ্যায়ে আমরা বহুবিবাহের ঐতিহাসিক বিবর্তন, বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থের আলোকে এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং প্রাক-ইসলামি আরবের জটিল বিবাহতাত্ত্বিক কাঠামোর একটি গভীর ও গবেষণাধর্মী পর্যালোচনা করব।

জাহেলিয়াত ও প্রাক-ইসলামি আরবের বিবাহতাত্ত্বিক অরাজকতা

প্রাক-ইসলামি আরব বা জাহেলিয়াত যুগে বহুবিবাহের কোনো সুনির্দিষ্ট ঊর্ধ্বসীমা বা আইনি নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তৎকালীন আরবের গোত্রীয় সমাজব্যবস্থায় পুরুষরা তাদের ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা এবং সম্পদ প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে বহুবিবাহকে ব্যবহার করত। এই সময়ে বিবাহ ছিল মূলত একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার, যেখানে কোনো পুরুষের কতজন স্ত্রী থাকবে তা তার বংশীয় প্রভাব ও সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করত। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন আরবের পুরুষরা অত্যন্ত অসংযতভাবে বহুবিবাহের চর্চা করত।

ঐতিহাসিকদের মতে, কুরাইশ বংশের এমনকি সাধারণ আরবের পুরুষদের মধ্যেও বহুবিবাহের ব্যাপকতা ছিল। অনেক ক্ষেত্রে একজন পুরুষ দশ বা তারও বেশি নারীকে বিবাহ করত। এই অসংযত প্রথার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো গাইলান বিন সালামাহ আল-সাক্বাফী (Ghaylan bin Salama al-Thaqafi)-র ঘটনা। তিনি জাহেলিয়াত যুগে দশজন নারীকে বিবাহ করেছিলেন। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন রাসুলুল্লাহ সা. তাকে নির্দেশ দেন যেন তিনি অতিরিক্ত স্ত্রীগণকে তালাক প্রদান করেন এবং কুরআনের নির্ধারিত বিধানের আওতায় এসে বিবাহিত জীবন অতিবাহিত করেন।


رُوي أن "غيلان بن سلمة الثقفي"، كان قد تزوج في الجاهلية بعشر نساء، فلما أسلم، أمره رسول الله بتطليق الزائد وبالتقيد بما جاء في حكم القرآن

[1]

তৎকালীন আরবের এই সামাজিক অস্থিরতা কেবল সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর সাথে জড়িত ছিল বংশীয় বিশুদ্ধতা ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা। আরবের অনেক গোত্রে দেখা যেত, একজন ব্যক্তি তার ক্ষমতার দাপটে অসংখ্য নারীকে বিবাহ করত, যা সামাজিক ভারসাম্য ও সম্পদের সুষম বণ্টনে বিঘ্ন ঘটাত। [2] । এই অসংযত প্রথাটি মূলত একটি বিশৃঙ্খল সামাজিক কাঠামোর বহিঃপ্রকাশ ছিল, যেখানে নারীর অধিকার বা বংশের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না।

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব: তাওরাত ও পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে বহুবিবাহ

বহুবিবাহের ধারণাটি কেবল আরবের জাহেলিয়াত যুগের প্রথা নয়, বরং এটি পূর্ববর্তী বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের (Comparative Theology) আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তাওরাত বা ইহুদি ধর্মীয় গ্রন্থেও বহুবিবাহ ও উপপত্নী রাখার বিধানের উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি প্রমাণ করে যে, বহুবিবাহের একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট রয়েছে।

তাওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত সুলাইমান (আ.)-এর বহুবিবাহের ঘটনাটি অত্যন্ত সুপরিচিত। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁর বহুসংখ্যক স্ত্রী ও উপপত্নী ছিল। এই ঐতিহাসিক তথ্যটি বহুবিবাহের একটি প্রাচীন ও স্বীকৃত রূপকে নির্দেশ করে, যা তৎকালীন ধর্মীয় ও রাজকীয় কাঠামোর অংশ ছিল।


وكانت له- سليمان- سبع مئين من النساء السيدات، وثلاث مئين من السراري

[3]

ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তাওরাতের এই বর্ণনাটি নির্দেশ করে যে, বহুবিবাহের প্রথাটি তৎকালীন সমাজ ও ধর্মীয় বিধানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। [4] । এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় যে, কীভাবে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন নবি ও ধর্মীয় বিধানের মাধ্যমে এই প্রথাটি ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক ও নৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করা হয়েছে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে বহুবিবাহের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ইসলাম যখন বহুবিবাহের ওপর নির্দিষ্ট আইনি ও নৈতিক সীমাবদ্ধতা আরোপ করে, তখন তা মূলত একটি বিদ্যমান সামাজিক প্রথাকে একটি সুশৃঙ্খল ও ন্যায়বিচারভিত্তিক কাঠামোর দিকে পরিচালিত করার প্রয়াস ছিল।

সমাজতাত্ত্বিক জটিলতা: পলিঅ্যান্ড্রি ও ভ্রাতৃত্বমূলক বহুবিবাহ

প্রাক-ইসলামি আরবের বিবাহতাত্ত্বিক কাঠামো কেবল বহুবিবাহের (Polygyny) মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সেখানে অত্যন্ত জটিল কিছু সমাজতাত্ত্বিক প্রথা বিদ্যমান ছিল, যা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় 'Fraternal Polyandry' বা ভ্রাতৃত্বমূলক বহুবিবাহ হিসেবে পরিচিত। স্ট্রাবো (Strabo)-র মতো প্রাচীন ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় উঠে এসেছে যে, কিছু ক্ষেত্রে ভাইয়েরা একই নারীকে বিবাহ করত, যা মূলত একটি মধ্যবর্তী সামাজিক স্তর হিসেবে কাজ করত।

এই প্রথার একটি বিশেষ রূপ ছিল 'Le Virate Marriage', যেখানে একজন ভাই তার মৃত ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীকে বিবাহ করত। এটি মূলত বংশীয় সম্পদ ও নারীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি আদিম প্রচেষ্টা ছিল। ইহুদি ও হাবশিদের মধ্যেও এই প্রথাটি প্রচলিত ছিল। যখন একজন পুরুষ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যেত, তখন তার ভাই তার বিধবা স্ত্রীকে গ্রহণ করত এবং যদি তাদের কোনো সন্তান হতো, তবে সেই সন্তানকে মৃত ভাইয়ের বংশধর হিসেবে গণ্য করা হতো।


واشتراك الأخوة في زوج واحدة، وهو ما يعبر عنه بـFraternal Polyandry عند علماء الاجتماع، على نحو ما أشار "سترابون" إليه، هو زواج يعدّ مرحلة وسطى بين تعدد الأزواج Polyandry، البدائي الذي لم يكن مقيدًا بقيود وبين الزواج المقيد المعروف

[5]

এই ধরনের বহুবিবাহ বা পলিঅ্যান্ড্রি প্রথা বংশীয় পরিচয় বা 'Nasab' নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি মারাত্মক সংকট তৈরি করত। যেহেতু একাধিক পুরুষ একই নারীর সাথে মিলিত হতো, তাই সন্তানের প্রকৃত পিতাকে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। এর ফলে মাতৃতান্ত্রিক (Matrilineal) সমাজব্যবস্থার উদ্ভব ঘটত, যেখানে বংশ পরিচয় মায়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হতো। [6] । সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আরবে নারীদের সংখ্যার তুলনায় পুরুষদের সংখ্যা কম থাকা (যা সম্ভবত নারী শিশু হত্যার বা 'Wa'd'-এর কারণে হতো) এই ধরনের জটিল বিবাহ প্রথার অন্যতম কারণ হতে পারে, যদিও এই দাবিটি ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্কের বিষয়। [7]

ইসলামি শরীয়াহর সংস্কারমূলক ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো

ইসলামের আগমনের মাধ্যমে আরবের এই বিশৃঙ্খল ও অসংগত বিবাহ প্রথাগুলো একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও নৈতিক কাঠামোর অধীনে চলে আসে। ইসলাম বহুবিবাহকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেনি, বরং একে একটি নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। ইসলাম মূলত প্রাক-ইসলামি আরবের সেই অরাজক প্রথাগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে যা বংশীয় বিশুদ্ধতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী ছিল।

কুরআন মাজিদের মাধ্যমে ইসলাম স্পষ্টভাবে কিছু সম্পর্কের ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যেমন, দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা (Combining two sisters) বা পিতার বিবাহিত স্ত্রীকে বিবাহ করা প্রাক-ইসলামি আরবে প্রচলিত থাকলেও ইসলাম তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত পারিবারিক শৃঙ্খলা ও আত্মীয়তার সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষার জন্য প্রবর্তিত হয়েছিল।


حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالاتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ مِنَ الرَّضَاعَةِ وَأُمَّهَاتُ نِسَائِكُمْ وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُمْ مِنْ نِسَائِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَإِنْ لَمْ تَكُونُوا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ وَحَلائِلُ أَبْنَائِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلابِكُمْ وَأَنْ تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَحِيمًا

[8]

অনুরূপভাবে, পিতার বিবাহিত স্ত্রীকে বিবাহ করার ক্ষেত্রেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে:


وَلا تَنْكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُمْ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَمَقْتًا وَسَاءَ سَبِيلًا

[9]

এই আইনি সংস্কারগুলো কেবল সামাজিক রীতিনীতি পরিবর্তন করেনি, বরং এটি একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। ইসলামে বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে বংশীয় বিশুদ্ধতা (Nasab) এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রাক-ইসলামি যুগে যেখানে বিবাহ ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন, সেখানে ইসলামে বিবাহ হয়ে ওঠে একটি পবিত্র ও আইনি চুক্তি, যেখানে প্রতিটি স্ত্রীর অধিকার এবং সন্তানের বংশপরিচয় নিশ্চিত করার জন্য কঠোর নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। [10] । এই কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমেই আরবের সমাজব্যবস্থা একটি অরাজক গোত্রীয় কাঠামো থেকে একটি সুশৃঙ্খল ও আইনভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে শুরু করে।

""
অধ্যায় ২: বহুবিবাহ (Polygamy): ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব (Historical Context & Comparative Religion)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

অধ্যায় ২: বহুবিবাহ (Polygamy): ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব (Historical Context & Comparative Religion) কুইজ

1 / 5

প্রাক-ইসলামি আরবে গাইলান বিন সালামাহ আল-সাক্বাফী কতজন নারীকে বিবাহ করেছিলেন?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...