খণ্ড 83
ফন্ট:100%
থিম:

১২.৫ স্ত্রী প্রহারের (Beating) অপব্যাখ্যা এবং সূরা আন-নিসার ৩৪ নং আয়াতের হারমেনিউটিক্স (Hermeneutics)

পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ৩৪ নং আয়াতটি মানব ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এবং বহুল আলোচিত একটি পাঠ। বিশেষত, এই আয়াতের শেষাংশে বর্ণিত 'দারাবা' (ضرب) শব্দটির অনুবাদ এবং প্রয়োগ নিয়ে সমকালীন সময়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এই বিতর্কের মূলে রয়েছে ভাষাতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অনুপস্থিতি। ইসলামি আইনশাস্ত্র এবং তাফসীর শাস্ত্রের দৃষ্টিতে এই আয়াতটি কোনো সহিংসতাকে বৈধতা দেয় না, বরং এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পারিবারিক সংকটের পর্যায়ক্রমিক সমাধান প্রক্রিয়ার রূপরেখা প্রদান করে। এই আলোচনায় আমরা এই আয়াতের হারমেনিউটিক্স বা ব্যাখ্যাতত্ত্বের মাধ্যমে এর প্রকৃত মর্মার্থ এবং প্রহারের নামে যে অপব্যাখ্যা প্রচলিত হয়েছে, তার তাত্ত্বিক খণ্ডন উপস্থাপন করব।

'নুশূয' (نُشُوز) এর সংজ্ঞা এবং মনস্তাত্ত্বিক সংশোধনের পর্যায়ক্রমিক ধাপ

সূরা আন-নিসার ৩৪ নং আয়াতের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো 'নুশূয' (نُشُوز) শব্দটির সঠিক বিশ্লেষণ। ভাষাতাত্ত্বিকভাবে 'নুশূয' শব্দের অর্থ হলো উচ্চতা বা কোনো কিছু থেকে উপরে উঠে যাওয়া। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো দাম্পত্য সম্পর্কের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে স্ত্রীর পক্ষ থেকে অবাধ্যতা, অহংকার বা বৈবাহিক অধিকার পালনে চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করা। এটি কেবল একটি আইনি অপরাধ নয়, বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক সংকট। যখন দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অভাব ঘটে এবং স্ত্রী স্বামীর আনুগত্য ও অধিকার অস্বীকার করেন, তখন তাকে 'নুশূয' বলা হয়। [1]

কুরআন এই সংকটের সমাধানে সরাসরি কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেনি, বরং একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়ক্রমিক ধাপ (Gradual Process) নির্ধারণ করে দিয়েছে। প্রথম ধাপটি হলো 'ওয়াজ' (وعظ) বা সদুপদেশ। এর উদ্দেশ্য হলো প্রেমের সাথে এবং যুক্তির মাধ্যমে স্ত্রীর ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া এবং তাকে পারিবারিক সংহতির গুরুত্ব বোঝানো। এই প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার ক্রোধ বা কঠোরতার স্থান নেই, বরং এখানে লক্ষ্য থাকে হৃদয়ের পরিবর্তন। ইমাম আবু জাফর আত-তাবারী রহ. উল্লেখ করেছেন যে, পুরুষদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব হলো তাদের স্ত্রীদের আদব বা শিষ্টাচার শেখানো এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করা।

قال أبو جعفر: يعني بقوله جل ثناؤه: (١) "الرجال قوّامون على النساء"، الرجال أهل قيام على نسائهم، في تأديبهن والأخذ على أيديهن فيما يجب عليهن لله ولأنفسهم
[2]

যদি সদুপদেশ ব্যর্থ হয়, তবে দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে 'হিজরান ফিল মাদাজি' (هجر في المضاجع) বা শয্যায় পৃথক থাকার কথা বলা হয়েছে। এটি কোনো শারীরিক শাস্তি নয়, বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক সংকেত। এর মাধ্যমে স্বামী তার নীরব অভিমানের কথা প্রকাশ করেন, যা স্ত্রীর মনে অনুশোচনা সৃষ্টি করে এবং তাকে সম্পর্কের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। এই পর্যায়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং এর উদ্দেশ্য হলো শারীরিক দূরত্ব তৈরির মাধ্যমে মানসিক নৈকট্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। ইমাম আল-কুশাইরী রহ. এই পর্যায়ক্রমিক সংশোধনের গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেছেন যে, এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হলো নম্রতা এবং ধৈর্যের সাথে সংশোধন করা।

قوله: «وَاللَّاتِي تَخافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ» : أي ارتقوا فى تهذيبهن بالتدريج والرفق
[3]

'দারাবা' (ضرب) শব্দের হারমেনিউটিক্স এবং প্রহারের অপব্যাখ্যা

আয়াতের শেষাংশে বর্ণিত 'ওয়াদরিবুহুন্না' (واضربوهن) শব্দটিকে অনেক ক্ষেত্রে ভুলভাবে 'প্রহার করা' হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে, যা এই আয়াতের সামগ্রিক উদ্দেশ্যকে বিকৃত করেছে। আরবি ভাষায় 'দারাবা' (ضرب) একটি বহুমাত্রিক শব্দ (Polysemous word), যার অর্থ কেবল আঘাত করা নয়, বরং এর অনেকগুলো রূপক অর্থ রয়েছে। যেমন—'দারাবা আল-মাসাল' (ضرب المثل) মানে উদাহরণ দেওয়া, অথবা 'দারাবা ফিল আরদ' (ضرب في الأرض) মানে ভ্রমণ করা। হারমেনিউটিক্স বা ব্যাখ্যাতত্ত্বের আলোকে দেখা যায়, এখানে 'দারাবা' শব্দটির প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত এবং শর্তসাপেক্ষ। এটি কোনোভাবেই শারীরিক নির্যাতন বা মারধরের লাইসেন্স নয়।

ইসলামি ফিকহ এবং তাফসীর শাস্ত্রের প্রামাণিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যদি প্রথম দুটি ধাপ (সদুপদেশ এবং শয্যায় পৃথক থাকা) ব্যর্থ হয় এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বিবাহ বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে পড়ে, তবেই এই শেষ ধাপটি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এই 'প্রহার' হতে হবে সম্পূর্ণ প্রতীকী (Symbolic)। অনেক মুফাসসিরের মতে, এটি হতে হবে 'দারবান গায়রা মুবরিহ' (ضرب غير مبرح), অর্থাৎ এমন একটি মৃদু আঘাত যা কোনোভাবেই শারীরিক ক্ষতি করে না বা ত্বকে কোনো চিহ্ন ফেলে না। ইমাম আল-কুশাইরী রহ. স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যদি সদুপদেশ বা প্রথম ধাপেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, তবে পরবর্তী ধাপগুলোতে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই এবং বিশেষ করে লাঠির ব্যবহার বা প্রহারের কথা চিন্তা করাও উচিত নয়।

وإن صلح الأمر بالوعظ فلا تستعمل العصا بالضرب، فالآية ...
[4]

এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীর মনে এই উপলব্ধি তৈরি করা যে, স্বামী তার প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট এবং সম্পর্কটি এখন চরম সংকটের মুখে। এটি একটি সতর্কবার্তা মাত্র, শাস্তি নয়। রাসুল সা. এর পুরো জীবন ছিল এই আয়াতের বাস্তব প্রয়োগের সর্বোত্তম উদাহরণ। তিনি জীবনে কখনো কোনো নারীকে প্রহার করেননি এবং সাহাবায়ে কিরাম রা. কেও এই নির্দেশনার অপব্যবহার করে সহিংসতা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সুতরাং, যারা এই আয়াতটিকে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য বা শারীরিক নির্যাতনের দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন, তারা মূলত আরবি ভাষার গভীরতা এবং রাসুল সা. এর সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক ব্যাখ্যা প্রদান করছেন। [5]

'কাওয়ামুন' (قوامون) এর রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

আয়াতের শুরুতে বর্ণিত 'আর-রিজালু কাওয়ামুনা আলা আন-নিসা' (الرجال قوامون على النساء) বাক্যটি পুরুষ ও নারীর সম্পর্কের একটি কাঠামোগত বিন্যাস প্রদান করে। এখানে 'কাওয়ামুন' শব্দটি 'কিয়াম' (قيام) মূলধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো দাঁড়ানো, রক্ষণাবেক্ষণ করা বা দায়িত্ব পালন করা। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে 'Administrative Responsibility' বা প্রশাসনিক দায়িত্ব বলা যেতে পারে। এটি কোনো শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নয়, বরং এটি একটি সেবামূলক দায়িত্ব (Service-oriented responsibility)। স্বামী এখানে পরিবারের প্রধান হিসেবে আর্থিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য দায়বদ্ধ।

ইমাম আত-তাবারী রহ. এর ব্যাখ্যায় দেখা যায়, পুরুষদের এই 'কিয়াম' বা দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীদের সঠিক আদব শেখানো এবং তাদের জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করা।

الرجال أهل قيام على نسائهم، في تأديبهن والأخذ على أيديهن فيما يجب عليهن لله ولأنفسهم
[6] । এই দায়িত্বটি মূলত একটি সামাজিক চুক্তির মতো, যেখানে পুরুষ তার শক্তির এবং সম্পদের বিনিময়ে পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এটি কোনো স্বৈরাচারী শাসন নয়, বরং একটি সহযোগিতামূলক নেতৃত্ব, যেখানে লক্ষ্য থাকে পরিবারের শান্তি ও স্থিতিশীলতা।

এই কাঠামোর ভেতরেই 'নুশূয' এর সমাধান প্রক্রিয়াটি কাজ করে। যখন একজন নেতা (স্বামী) তার পরিবারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে দেখেন যে, তার সঙ্গিনী সম্পর্কের মূল ভিত্তিগুলো ভেঙে ফেলছেন, তখন তিনি এই পর্যায়ক্রমিক ধাপগুলো অনুসরণ করেন। এখানে লক্ষ্য থাকে 'Collective Security' বা পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যদি স্বামী এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন বা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তবে তিনি আল্লাহর কাছে জবাবদিহির সম্মুখীন হবেন। সুতরাং, 'কাওয়ামুন' শব্দটির অর্থ এখানে আধিপত্য নয়, বরং এটি একটি গুরুভার দায়িত্ব যা পুরুষের কাঁধে অর্পিত হয়েছে। [7]

খোদায়ী সাক্ষী এবং বৈবাহিক চুক্তির নৈতিকতা

সূরা আন-নিসার ৩৪ নং আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:

إِنَّ اللَّهَ كانَ عَلى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيداً
অর্থাৎ, "নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর সাক্ষী।" এই বাক্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি স্বামীর জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা যে, সে তার স্ত্রীর সাথে কেমন আচরণ করছে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ আল্লাহর নজরদারিতে রয়েছে। যখন একজন স্বামী তার স্ত্রীর সংশোধন করতে যান, তখন তাকে মনে রাখতে হবে যে, তিনি কেবল একজন মানুষের সাথে কথা বলছেন না, বরং তিনি আল্লাহর একজন বান্দার সাথে আচরণ করছেন এবং আল্লাহ নিজেই এর সাক্ষী। [8]

ইমাম আল-কুরতুবী রহ. এই অংশের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার চুক্তির সাক্ষী এবং তিনি প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা পছন্দ করেন।

أَيْ قَدْ شَهِدَ مُعَاقَدَتَكُمْ إياهم، وهو عز وجل يحب الوفاء
[9] । বৈবাহিক সম্পর্কটি কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি 'মিছাকুন গালিয' বা সুদৃঢ় অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক দয়া, মমতা এবং সম্মান। যখন এই সম্পর্কের ভেতরে কোনো সংঘাত সৃষ্টি হয়, তখন সমাধান প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে আল্লাহর উপস্থিতির কথা স্মরণ করা আবশ্যক।

এই খোদায়ী সাক্ষ্যের ধারণাটি স্বামীর মনে এক ধরণের নৈতিক নিয়ন্ত্রণ (Moral Constraint) তৈরি করে। এটি তাকে মনে করিয়ে দেয় যে, যদি সে সংশোধন করার নামে কোনো অন্যায় করে বা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে প্রহার করে, তবে তাকে পরকালে আল্লাহর সামনে জবাব দিতে হবে। সুতরাং, এই আয়াতের হারমেনিউটিক্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি পুরুষকে ক্ষমতা দেওয়ার চেয়ে বরং তাকে তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার কথা বেশি মনে করিয়ে দেয়। পারিবারিক সংহতি রক্ষার এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে করুণা এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বিচ্ছেদ রোধ করে একটি সুখী পরিবার গঠন করা। [10]

""
১২.৫ স্ত্রী প্রহারের (Beating) অপব্যাখ্যা এবং সূরা আন-নিসার ৩৪ নং আয়াতের হারমেনিউটিক্স (Hermeneutics)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১২.৫ স্ত্রী প্রহারের অপব্যাখ্যা এবং সূরা আন-নিসার ৩৪ কুইজ

1 / 5

সূরা আন-নিসার ৩৪ নং আয়াতে বর্ণিত 'দারাফ' বা প্রহারের বিধানটি কোন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...