১. হিসবা ব্যবস্থার তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি (Theoretical and Historical Foundations of Hisbah)
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বাজার ব্যবস্থার নৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য যে সমস্ত প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, তার মধ্যে ‘হিসবা’ (الحسبة) বা বাজার তদারকি ব্যবস্থা অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে হিসবা হলো আল-কুরআনে বর্ণিত ‘আমর বিল-মা‘রুফ ওয়ান-নাহয়ি ‘আনিল-মুনকার’ (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ) নামক সার্বজনীন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রয়োগিক রূপ। মদিনা রাষ্ট্রে একটি শোষণমুক্ত, স্বচ্ছ এবং ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ সা. এই ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে ‘বাজার নিয়ন্ত্রণ’ (Market Regulation), ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ’ (Consumer Protection) এবং ‘জননিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা’ (Public Accountability & Collective Security)-র একটি সমন্বিত রূপ হিসেবে অভিহিত করা যায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মদিনার বাজার ছিল তৎকালীন ইহুদি ও কুরাইশদের একচেটিয়া প্রভাবাধীন, যেখানে সুদের কারবার, ওজনে কারচুপি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং প্রতারণামূলক বিপণন পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এই বিশৃঙ্খল ও শোষণমূলক বাজার ব্যবস্থাকে একটি সুশৃঙ্খল ও নৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার জন্য রাসুলুল্লাহ সা. ঐশ্বরিক নির্দেশনার আলোকে হিসবা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। আল-মাওয়ার্দী তাঁর ধ্রুপদী গ্রন্থ ‘আল-আহকাম আস-সুলতানিয়্যাহ’ গ্রন্থে হিসবার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেছেন যে, এটি এমন একটি রাষ্ট্রীয় তদারকি ব্যবস্থা যা সমাজে প্রকাশ্য অন্যায় ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করে এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সৎকাজের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে [1] । এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল কেবল পরকালীন মুক্তি নয়, বরং ইহকালীন অর্থনীতিতে একটি সুষম ও শোষণহীন বাজার কাঠামো গড়ে তোলা।
হিসবা ব্যবস্থার তাত্ত্বিক ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছে আল-কুরআনের সূরা আল-ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে, যেখানে একটি সুনির্দিষ্ট দলের আবশ্যকতা ঘোষণা করা হয়েছে যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণ ও নৈতিকতা রক্ষা করবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ তাঁর ‘আল-হিসবাহ ফিল ইসলাম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, হিসবা হলো এমন একটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব যা সমাজের অর্থনৈতিক লেনদেনে সততা, স্বচ্ছতা এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য করে [2] । ফলে, মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই বাজার তদারকি বা মার্কেট ইন্সপেকশন একটি ঐচ্ছিক নৈতিক উপদেশের স্তর থেকে উন্নীত হয়ে রাষ্ট্রীয় আইনের বাধ্যতামূলক ধারায় রূপান্তরিত হয়।
২. মদিনার বাজারে প্রথম পরিদর্শক ও বাজার তদারকি ব্যবস্থা (The First Market Inspectors in Madinah and Inspection Mechanisms)
মদিনা রাষ্ট্রে বাজার তদারকি ব্যবস্থার প্রথম এবং প্রধান ‘মুহতাসিব’ (Market Inspector) ছিলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সা.। তিনি নিয়মিত মদিনার বাজারগুলো ব্যক্তিগতভাবে পরিদর্শন করতেন, পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করতেন এবং ব্যবসায়ীদের লেনদেনের সততা যাচাই করতেন। এই তদারকি ব্যবস্থার একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হলো ভেজা শস্যের ঘটনা। একদিন রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার বাজারে একটি খাদ্যশস্যের স্তূপের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর পবিত্র হাত শস্যস্তূপের ভেতরে প্রবেশ করান। এতে তাঁর আঙুলগুলো ভিজে যায়। তিনি বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে শস্যের মালিক! এটি কী?" বিক্রেতা উত্তর দিল, "হে আল্লাহর রাসুল! বৃষ্টির পানিতে এটি ভিজে গিয়েছিল।" তখন রাসুলুল্লাহ সা. একটি ঐতিহাসিক নীতিবাক্য উচ্চারণ করেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ভোক্তা অধিকারের প্রধান সনদ হিসেবে স্বীকৃত। তিনি বললেন:
أَفَلَا جَعَلْتَهُ فَوْقَ الطَّعَامِ كَيْ يَرَاهُ النَّاسُ؟ مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
অর্থাৎ: "তাহলে তুমি ভেজা অংশটি শস্যের উপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ তা দেখতে পেত? যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" [3] । এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, পণ্যের ত্রুটি গোপন করা এবং ক্রেতাকে অন্ধকারে রেখে পণ্য বিক্রয় করা ইসলামি বাজার ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।
মদিনা রাষ্ট্রের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে রাসুলুল্লাহ সা. বাজার তদারকির কাজটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বিভিন্ন বাজারে যোগ্য সাহাবিদের পরিদর্শক বা মুহতাসিব হিসেবে নিয়োগ দান করেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি সা‘ইদ ইবনুল ‘আস রা.-কে মক্কার বাজারের প্রধান পরিদর্শক হিসেবে নিযুক্ত করেন [4] । একইভাবে, মদিনার বাজারে তদারকির জন্য তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে বিশেষ দায়িত্ব প্রদান করেন। এই পরিদর্শকগণের মূল কাজ ছিল বাজারে কোনো ধরনের জালিয়াতি, ওজনে কম দেওয়া, কৃত্রিম উপায়ে পণ্যের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মজুদদারি করা অথবা ক্রেতাকে ধোঁকা দেওয়ার মতো কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটছে কি না তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা তাবাকাত আল-কুবরা: খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৮২">[5] ।
৩. কনজ্যুমার প্রোটেকশন বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ এবং 'মুমা কাছাহ' (Consumer Protection and the Concept of Mumakasah)
ইসলামি বাজার দর্শনে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ (Consumer Protection) কেবল একটি আধুনিক আইনি ধারণা নয়, বরং এটি ঈমান ও আমানতদারীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার দরদাম, দর-কষাকষি এবং পণ্যের মূল্য হ্রাসের প্রক্রিয়াকে ‘মুমা কাছাহ’ (المماكسة) বলা হয়। ধ্রুপদী আরবি অভিধান ‘লিসানুল আরব’-এ মুমা কাছাহ-এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইবনুল মনযূর লিখেছেন:
المُمَاكسة في البيع: انتقاص الثمن واستحطاطه.
অর্থাৎ: "ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল্যের হ্রাস ঘটানো এবং দাম কমানোর জন্য দর-কষাকষি করা।" [6] । ইসলাম ভোক্তাকে এই অধিকার দিয়েছে যে, সে বাজারে স্বাধীনভাবে দর-কষাকষি করে পণ্যের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করতে পারবে এবং বিক্রেতা কোনোভাবেই কৃত্রিম উপায়ে বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অতিরিক্ত মূল্য আদায় করতে পারবে না।
ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় রাসুলুল্লাহ সা. বাজারে সব ধরনের অসাধু প্রতিযোগিতা এবং তথ্যগত অসমতা (Information Asymmetry) নিষিদ্ধ করেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘নাজাশ’ (Najash) বা কৃত্রিমভাবে দর বৃদ্ধি করা। নাজাশ হলো এমন এক ধরনের প্রতারণামূলক কৌশল যেখানে কোনো ব্যক্তি পণ্য কেনার ইচ্ছা ছাড়াই কেবল দাম বাড়িয়ে ক্রেতাকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য বাজারে কৃত্রিম দর হাঁকায়। রাসুলুল্লাহ সা. এ সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলেন, "তোমরা কেউ যেন অপরের ক্রয়ের ওপর দাম বাড়িয়ে ক্রেতাকে ধোঁকা না দাও" [7] । এছাড়া ‘তাডলিস’ (Tadlis) বা পণ্যের ত্রুটি গোপন করে তা ভালো পণ্য হিসেবে চালিয়ে দেওয়াকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইমাম ইবনে কুদামাহ তাঁর ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, যদি কোনো বিক্রেতা পণ্যের ত্রুটি গোপন করে তা বিক্রয় করে, তবে ক্রেতার পূর্ণ অধিকার রয়েছে সেই চুক্তি বাতিল করে পণ্য ফেরত দেওয়ার এবং তার অর্থ বুঝে নেওয়ার, যাকে ফিকহের পরিভাষায় ‘খিয়ারুল আইব’ (Option of Defect) বলা হয় [8] ।
ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে মদিনার বাজারে ‘তালাক্কি আল-জালব’ (Talaqqi al-Jalab) বা বহিরাগত কাফেলাকে বাজারে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে আটকিয়ে কম মূল্যে পণ্য কিনে নেওয়ার সিন্ডিকেট প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সা. নির্দেশ দেন যে, গ্রামীণ বা বহিরাগত বিক্রেতারা সরাসরি বাজারে এসে পণ্যের প্রকৃত বাজার দর জেনে যেন পণ্য বিক্রি করতে পারে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীরা ভোক্তাদের শোষণ করতে না পারে [9] । এই আইনি সংস্কারের মাধ্যমে মদিনা রাষ্ট্রে মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও ভোক্তা অধিকারের এক অনন্য সমন্বয় সাধিত হয়েছিল।
৪. ওজনে কারচুপি রোধ এবং পরিমাপের মানদণ্ড নির্ধারণ (Prevention of Weight Fraud and Standardization of Weights and Measures)
অর্থনৈতিক অপরাধের মধ্যে ওজনে কারচুপি ও পরিমাপে কম দেওয়া একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি, যা একটি জাতির ধ্বংসের কারণ হতে পারে। আল-কুরআনে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের (যেমন শোয়াইব আলাইহিস সালামের কওম) ধ্বংসের অন্যতম কারণ হিসেবে ওজনে কারচুপির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আল-মুতাফফিফীনের প্রথম তিন আয়াতে আল্লাহ তাআলা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন:
وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ
অর্থাৎ: "ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় নেয়, আর যখন তাদের মেপে দেয় বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।" [10] । এই ঐশ্বরিক বিধানকে মদিনা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আইনের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে রাসুলুল্লাহ সা. পরিমাপের মানদণ্ড নির্ধারণ ও ওজনে কারচুপি রোধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
মদিনার বাজারে ওজনের একক এবং পরিমাপের পাত্রের মধ্যে একরূপতা ও মানদণ্ড (Standardization) প্রতিষ্ঠার জন্য রাসুলুল্লাহ সা. একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করেন। তিনি বলেন:
الْوَزْنُ وَزْنُ أَهْلِ مَكَّةَ وَالْمِكْيَالُ مِكْيَالُ أَهْلِ الْمَدِينَةِ
অর্থাৎ: "ওজনের ক্ষেত্রে মক্কাবাসীদের ওজন (মানদণ্ড) এবং পরিমাপের ক্ষেত্রে মদিনাবাসীদের পরিমাপ (পাত্র) গ্রহণযোগ্য হবে।" [11] । এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের অসম পরিমাপ পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও প্রমিত মানদণ্ড (Standardized Weights and Measures) প্রতিষ্ঠা করেন। মক্কার ‘দিরহাম’ ও ‘দিনার’-এর ওজন এবং মদিনার ‘সা‘ ’ (Sa') ও ‘মুদ্দ’ (Mudd)-কে রাষ্ট্রীয় পরিমাপের আদর্শ একক হিসেবে নির্ধারণ করা হয় [12] ।
হিসবা বিভাগের পরিদর্শকগণ বাজারে নিয়মিত বাটখারা এবং পরিমাপের পাত্রগুলো পরীক্ষা করতেন। কোনো ব্যবসায়ী যদি কম ওজনের বাটখারা ব্যবহার করত বা পরিমাপের পাত্রের তলা কেটে ছোট করত, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। ইমাম আস-সান‘আনী তাঁর ‘সুবুলুস সালাম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, পরিমাপের যন্ত্রপাতিতে জালিয়াতি করা কেবল একটি দেওয়ানি অপরাধ নয়, বরং এটি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো এবং এর জন্য বেত্রাঘাত, পণ্য বাজেয়াপ্তকরণ এবং বাজার থেকে বহিষ্কারের মতো শাস্তির বিধান ছিল [13] । এই কঠোর তদারকির ফলে মদিনার বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের এক অভূতপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, যা মদিনার অর্থনীতিকে দ্রুত সমৃদ্ধির শিখরে নিয়ে যায়।
৫. হিসবা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ও নারী পরিদর্শক নিয়োগ (Institutional Evolution of Hisbah and Appointment of Female Inspectors)
রাসুলুল্লাহ সা.-এর যুগে শুরু হওয়া বাজার তদারকি ব্যবস্থা কেবল পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে নারীদেরও এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও কার্যকর ছিল। রাসুলুল্লাহ সা. এবং পরবর্তীতে খলীফা উমর রা.-এর আমলে মদিনার বাজারে নারী পরিদর্শক নিয়োগের ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায়।
এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ রা.। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিদুষী, শিক্ষিত এবং প্রশাসনিক কাজে দক্ষ একজন নারী সাহাবি। ইবনে আবদিল বার তাঁর ‘আল-ইস্তিয়াব’ গ্রন্থে এবং ইবনে হাজার আসকালানী তাঁর ‘আল-ইসাবাহ’ গ্রন্থে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ রা.-কে মদিনার বাজারের পরিদর্শক (মুহতাসিব) হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন এবং বাজার তদারকি ও বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তাঁর মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন [14] । শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ রা. বাজারে চাবুক হাতে নিয়ে ঘুরতেন এবং কোনো ব্যবসায়ীকে জালিয়াতি বা ওজনে কারচুপি করতে দেখলে তাকে শাসন করতেন এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন।
অনুরূপভাবে, সামরা বিনতে নুহাইক আল-আসাদিয়্যাহ রা. নামক অপর এক নারী সাহাবিকেও বাজার পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ইবনে আবদিল বার তাঁর গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:
أَنَّ سَمْرَاءَ بِنْتَ نُهَيْكٍ الأَسَدِيَّةَ كَانَتْ تَمُرُّ فِي الأَسْوَاقِ تَأْمُرُ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَى عَنِ الْمُنْكَرِ، وَتَضْرِبُ النَّاسَ عَلَى ذَلِكَ بِسَوْطٍ كَانَ مَعَهَا
অর্থাৎ: "সামরা বিনতে নুহাইক আল-আসাদিয়্যাহ বাজারে বাজারে ঘুরে বেড়াতেন, সৎকাজের আদেশ দিতেন ও অসৎকাজের নিষেধ করতেন এবং তাঁর সাথে থাকা চাবুক দিয়ে (আইন অমান্যকারী ও প্রতারক) মানুষকে শাসন করতেন।" [15] । এই ঐতিহাসিক তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, মদিনা রাষ্ট্রে হিসবা ব্যবস্থা কেবল একটি সাধারণ ধর্মীয় উপদেশমূলক কার্যক্রম ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং লিঙ্গ-নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো, যা বাজারের শৃঙ্খলা ও ভোক্তা অধিকার রক্ষায় আপসহীন ভূমিকা পালন করত [16] ।
হিসবা ব্যবস্থার এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর পরবর্তীকালে উমাইয়া, আব্বাসীয় এবং বিশেষ করে স্পেনের কর্ডোভা খিলাফতে অত্যন্ত শক্তিশালী ‘দিওয়ানুল হিসবাহ’ (Department of Hisbah) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই বিভাগটি কেবল বাজার তদারকিই করত না, বরং রাস্তাঘাটের পরিচ্ছন্নতা, ভবনের নিরাপত্তা, পশুদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানো রোধ এবং চিকিৎসকদের পেশাগত যোগ্যতা যাচাইয়ের মতো আধুনিক সিটি কর্পোরেশন ও কনজ্যুমার রাইটস অথরিটির যাবতীয় দায়িত্ব পালন করত [17] । মদিনা রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত এই হিসবা ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে, একটি কল্যাণকামী ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বাজার ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রীয় নৈতিক তদারকি ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কতটা অপরিহার্য।