আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনে 'সেক্যুলারিজম' বা ধর্মনিরপেক্ষতাকে একটি নিরপেক্ষ, সার্বজনীন এবং বস্তুনিষ্ঠ জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করার যে ইউরোসেন্ট্রিক চেষ্টা দৃশ্যমান, পোস্ট-কলোনিয়াল বা উত্তর-উপনিবেশবাদী বিশ্লেষণে তা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। উত্তর-উপনিবেশবাদী চিন্তাবিদদের মতে, ওয়েস্টার্ন সেক্যুলারিজম বা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতা আদতে কোনো নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় দর্শন নয়; বরং এটি বিশেষ এক ধরনের প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের রূপান্তরিত আধুনিক রূপ, যাকে ‘থিওলজিক্যাল ইম্পেরিয়ালিজম’ বা ধর্মতাত্ত্বিক সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে গ্লোবাল সাউথের (Global South) ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় আলোকিত যুগ (Enlightenment) পরবর্তীতে ধর্মীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার দাবি করলেও, তারা মূলত খ্রিষ্টীয় প্রোটেস্ট্যান্ট মূল্যবোধকেই ‘সাবজেক্টিভিটি’, ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য’ এবং ‘সার্বভৌম রাষ্ট্র ব্যবস্থা’ (Westphalian Sovereign State) হিসেবে পুনর্সংজ্ঞায়িত করেছে। গ্লোবাল সাউথের ঐতিহ্যবাহী সমাজব্যবস্থা, বিশেষ করে ইসলামি সভ্যতা ও শরীয়াহভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোকে ধ্বংস করে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ যে শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল, আধুনিক সেক্যুলারিজম হলো তারই অব্যাহত জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্য (Epistemic Hegemony)। রাসুলুল্লাহ সা.-এর নবুওতী রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক দর্শনের বিপরীতে পশ্চিমা সেক্যুলারিজমের এই আধিপত্যকামী ধারণাকে অনুধাবন করা আধুনিক ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
১. পশ্চিমের ইউনিভার্সালিজম ও সেক্যুলারিজমের প্রোটেস্ট্যান্ট থিওলজিক্যাল শেকড়: জ্ঞানতাত্ত্বিক সাম্রাজ্যবাদ (Epistemic Imperialism)
পশ্চিমা বিশ্ব সেক্যুলারিজমকে সমগ্র মানবতার জন্য একমাত্র প্রগতিশীল ও গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে এটি মূলত পশ্চিমের "সার্বজনীনতাবাদ" (Western Universalism)-এর এক ছদ্মবেশী বয়ান। প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী তালাল আসাদ তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সেক্যুলারিজম কেবল একটি আইনি বা প্রশাসনিক কাঠামো নয়; বরং এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-ধর্মীয় সংস্কারের ফসল যা মূলত পশ্চিম ইউরোপের ১৬-১৭ শতকের প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টধর্মের বিবর্তন থেকে উদ্ভূত। ইউরোপে যখন ধর্মীয় বিভাজন ও ত্রিশ বছরের যুদ্ধ (Thirty Years' War) চলছিল, তখন রাষ্ট্রীয় শান্তি প্রতিষ্ঠার অজুহাতে ধর্মকে ব্যক্তির 'ব্যক্তিগত বিশ্বাসে' রূপান্তর করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে চূড়ান্ত নৈতিক নিয়ন্ত্রক বানিয়ে ফেলা হয়। ইউরোপীয় হাবসবার্গ সাম্রাজ্য (Habsburg Empire) এবং পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় সংঘাত ও পরমতঅসহিষ্ণুতার ইতিহাস এর বড় প্রমাণ [1] । ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও অসামঞ্জস্যতাকে বৈশ্বিক মানদণ্ড বানিয়ে পরবর্তীতে কলোনিয়াল বা ঔপনিবেশিক শক্তির মাধ্যমে সমগ্র গ্লোবাল সাউথের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
পোস্ট-কলোনিয়াল ক্রিটিক অনুযায়ী, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ কেবল ভূখণ্ড দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং গ্লোবাল সাউথের রাজনৈতিক জ্ঞানতত্ত্বকেও (Epistemology) পঙ্গু করে দিয়েছে। ইউরোপে হাবসবার্গ বংশের শাসক ষষ্ঠ চার্লস বা দ্বিতীয় রুডলফের আমলে যেভাবে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট সংঘাত সাম্রাজ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল এবং কীভাবে তারা রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় মতবাদকে দমন বা ব্যবহার করত, তার বিবরণ ইতিহাসবিদ ডুরান্টের আলোচনায় স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় [2] । ইউরোপের সেই বিশেষ ঐতিহাসিক সঙ্কটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘সেক্যুলারিজম’ কোনোকালেই অ-পশ্চিমা বা অ-খ্রিষ্টীয় সমাজের জন্য স্বতঃসিদ্ধ ছিল না। অথচ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের রেখে যাওয়া আধুনিক পোস্ট-কলোনিয়াল এলিটরা গ্লোবাল সাউথের ট্র্যাডিশনাল সমাজব্যবস্থাকে "মধ্যযুগীয়" বা "অনগ্রসর" আখ্যা দিয়ে এই সেক্যুলার রাষ্ট্রযন্ত্রকে সুসংগঠিত করেছে। এটিই হলো থিওলজিক্যাল ইম্পেরিয়ালিজম—যেখানে খ্রিষ্টীয় প্রোটেস্ট্যান্ট ক্যাটাগরিকে ‘নিরপেক্ষ সেক্যুলার’ নামে গ্লোবাল সাউথের ওপর জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতা (Epistemic Violence) হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ইসলামি সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জীবন বিচ্ছিন্ন দুটি সত্তা নয়; বরং দ্বীন ও দাওয়াহ হলো এক সমন্বিত জীবনপদ্ধতি। কিন্তু পশ্চিমা সেক্যুলারিজম দাবি করে যে, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে ঐশ্বরিক নির্দেশনা (ওহী) সম্পূর্ণ বর্জনীয়। এই জোরপূর্বক বিভাজন ইসলামি বিশ্বের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পঙ্গু করার মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা আফ্রিকার গোত্রীয় সমাজ থেকে শুরু করে এশিয়ার সমৃদ্ধ মুসলিম সুলতানাতগুলো ধ্বংস করে একটি কৃত্রিম ওয়েস্টফেলিয়ান রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করে, যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল গ্লোবাল সাউথের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও আধ্যাত্মিক স্বতন্ত্রতা হরণ করা। ফলে, সেক্যুলারিজম গ্লোবাল সাউথের জন্য কোনো স্বাধীনতার বার্তা আনেনি, এনেছে একটি নতুন ধরনের ভাবাদর্শিক গোলামি।
২. ইউরোপীয় ইতিহাসপ্রবাহে ধর্মীয় একাধিপত্য ও নিপীড়নের ঐতিহাসিক নজির: পোস্ট-কলোনিয়াল তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ইউরোপীয় সেক্যুলারিজম নিজেকে যে মানবিক ও সহনশীলতার পরম আধার বলে দাবি করে, আধুনিক ইতিহাসবিদ ও উত্তর-উপনিবেশবাদী গবেষকরা তার বিপরীতে ইউরোপের গোঁড়ামি ও ধর্মীয় নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন। প্রাক-ইসলামি ও মধ্যযুগীয় ইউরোপে রাষ্ট্র ও চার্চের আঁতাত কীভাবে ভিন্নমতাবলম্বী ও সংখ্যালঘুদের চরম নিপীড়ন করেছিল, তা তাত্ত্বিক পর্যালোচনার দাবি রাখে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যান্ডালুসিয়া বা স্পেনে মুসলিম বিজয়ের পূর্বে ভিসিগোথ (Visigoth) খ্রিষ্টান শাসকদের আমলে ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ওপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালানো হয়েছিল, তা ইতিহাসসিদ্ধ। ইতিহাসবিদ ডজি ও অন্যান্য সংকলকদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, রাজা সিজবুট (Sisebut) বা রাজা এজিকার আমলে কীভাবে ইহুদিদের জোরপূর্বক খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করা হতো অথবা তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে দাসত্বে বাধ্য করা হতো [3] । আরবি পাঠে এর বিবরণ স্পষ্ট পাওয়া যায়:
ففي عصر الملك سيزبوت فرض التنصر على اليهود أو النفي أو المصادرة، فاعتنق النصرانية كثير منهم كرها ورياء
"রাজা সিজবুটের যুগে ইহুদিদের ওপর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল; অন্যথায় নির্বাসন বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের দণ্ড দেওয়া হতো। ফলে বহু ইহুদি বাধ্য হয়ে এবং বাহ্যিকভাবে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে।" [4]
একইভাবে, বাইজেন্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও ধর্মীয় স্বৈরাচার কীভাবে উত্তর আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে পিষ্ট করেছিল, তা ইতিহাসের অপর এক অধ্যায়। বিজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান ও তাঁর পরবর্তী শাসকদের আমলে জনগণের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হয় এবং বিকল্প ধর্মীয় মতাবলম্বীদের সমাজচ্যুত করা হয়। প্রাক-ইসলামি আফ্রিকার দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয়েছে যে, বাইজেন্টাইন শাসনের করের অত্যাচার ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে জনগণ কৃষিকাজ ও ব্যবসা ছেড়ে ডাকাত বা ভিটেমাটিহীন সর্বশান্তে পরিণত হয়েছিল [5] । ইউরোপের এই রক্তক্ষয়ী অহিষ্ণুতার পটভূমিতে তৈরি সেক্যুলারিজম প্রকৃতপক্ষে ইউরোপীয় মনস্তত্ত্বেরই এক প্রতিক্রিয়াশীল রূপ। ইউরোপের সমস্যাটি ছিল চার্চ ও রাষ্ট্রের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, কিন্তু গ্লোবাল সাউথ তথা বিশেষত ইসলামি বিশ্বে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পোপতন্ত্র বা চার্চ ব্যবস্থার অস্তিত্বই কখনো ছিল না।
আধুনিক সেক্যুলার ইম্পেরিয়ালিজম মূলত ইউরোপের এই পুরোনো একনায়কতান্ত্রিক প্রবৃত্তিকেই ভিন্ন মোড়কে বিশ্বজুড়ে বাস্তবায়ন করছে। পূর্বে যা ছিল 'খ্রিষ্টীয় ক্রুসেড' বা ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ, তা-ই আধুনিক যুগে রূপ নিয়েছে 'সেক্যুলার ডেমোক্রেসি', 'হিউম্যান রাইটস' বা 'লিবারেল মডার্নিটি'র নামে নতুন মতাদর্শিক সাম্রাজ্যবাদে। গ্লোবাল সাউথের যেসব দেশ তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ, ইসলামি শরীয়াহ বা স্থানীয় শাসনপদ্ধতি প্রয়োগ করতে চায়, ইউরোপীয় ও আমেরিকান পরাশক্তিগুলো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা (IMF, World Bank) এবং রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে সেগুলোকে ‘উগ্রবাদ’ বা ‘গণতন্ত্রহীনতা’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এভাবে আধুনিক ওয়েস্টার্ন সেক্যুলারিজম বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হরণের জন্য একটি নতুন ধর্মতাত্ত্বিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
৩. নবুওতী রাজনৈতিক দর্শন ও গ্লোবাল সাউথের বিকল্প মডেল: ইনসাফ, বহুমাত্রিকতা ও আধুনিক উত্তর-উপনিবেশবাদ
ওয়েস্টার্ন সেক্যুলারিজম যখন সমজাতীয়করণ (Homogenization) এবং আধুনিক রাষ্ট্রের একচ্ছত্র সার্বভৌমত্বের মাধ্যমে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ এবং নবুওতী রাজনৈতিক দর্শন গ্লোবাল সাউথের জন্য একটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী, ইনসাফভিত্তিক ও বহুমাত্রিক বিকল্প মডেল পেশ করে। বিশ্বনবি সা.-এর প্রতিষ্ঠিত মদিনা সনদ এবং নবুওতী সামাজিক চুক্তি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের নামে ব্যক্তির দ্বীন বা ঈমানকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে বলি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। নবুওতী নীতিতে মুসলিম, ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য সম্প্রদায় প্রত্যেকে নিজ নিজ আইনি ও সামাজিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত—যা আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রের মতো সব নাগরিকের ওপর কৃত্রিম সাংস্কৃতিক অভিন্নতা চাপিয়ে দেয় না।
নবুওতী রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল সুবিচার বা 'আদল' এবং যেকোনো প্রকারের জুলুমের নিরসন। রাসুলুল্লাহ সা. জাহিলী যুগের গোত্রীয় অন্ধ অনুগত ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সার্বজনীন ন্যায়বিচারের নীতি ঘোষণা করেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন:
انصر أخاك ظالمًا أو مظلومًا
"তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে অত্যাচারী হোক বা অত্যাচারিত।" [6]
সাহাবিগণ যখন জিজ্ঞাসা করলেন যে, অত্যাচারিতকে সাহায্য করা তো বোধগম্য, কিন্তু অত্যাচারীকে কীভাবে সাহায্য করব? রাসুলুল্লাহ সা. উত্তর দিলেন, তাকে জুলুম করা থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে। নবুওতী এই বাণী কেবল ব্যক্তি পর্যায়ের নীতিশাস্ত্র নয়; এটি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের একটি মহান মূলনীতি। পশ্চিমা সেক্যুলার সাম্রাজ্যবাদ যেখানে নিজের 'জাতীয় স্বার্থ' (National Interest) রক্ষার অজুহাতে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ওপর বেআইনি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও শোষণকে বৈধতা দেয়, সেখানে নবুওতী আদর্শ শাসককেও জুলুম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়।
হিজরতের পূর্বে মক্কী জীবনের কঠিন মুহূর্তে যখন সাহাবিগণ চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সা. সাহাবিদের আবিসিনিয়ায় (হাবশা) হিজরত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আবিসিনিয়ার তৎকালীন খ্রিষ্টান রাজা নাজ্জাশীর নিরপেক্ষতা ও ইনসাফের ভূয়সী প্রশংসা করে আল্লাহর রাসুল সা. বলেছিলেন:
لو خرجتم إلى أرض الحبشة فإن بها ملكا لا يُظلم عنده أحد
"যদি তোমরা হাবশা (আবিসিনিয়া) দেশে চলে যেতে, তবে ভালো হতো; কারণ সেখানে এমন একজন রাজা আছেন যার নিকট কাউকে অত্যাচার করা হয় না।" [7]
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, নবুওতী দর্শন কোনো ভূরাজনৈতিক বা সংকীর্ণ ধর্মীয় তোষণ নীতি সমর্থন করে না; বরং যেকোনো ভূখণ্ডে ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারের অস্তিত্বকে সম্মান জানায়। হাবশার রাজত্ব সেক্যুলার ছিল না, কিন্তু তিনি ছিলেন ন্যায়বিচারক। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, পোস্ট-কলোনিয়াল গ্লোবাল সাউথের মুক্তি পশ্চিমা সেক্যুলারিজমের অন্ধ অনুকরণের মধ্যে নিহিত নয়; বরং ন্যায়বিচার, নৈতিক দায়িত্বশীলতা এবং খোদায়ী সার্বভৌমত্বের বাস্তবায়নের মধ্যে নিহিত।
সাম্রাজ্যবাদোত্তর বিশ্বে গ্লোবাল সাউথকে মুক্ত করতে হলে কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতা লাভ করলেই চলবে না; জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বাধীনতা (Epistemic Liberation) অর্জন করতে হবে। ইউরোসেন্ট্রিক সেক্যুলারিজমকে একমাত্র আধুনিকতা ভাবার ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামি সভ্যতার ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দেওয়ানি অধিকার ও সহাবস্থানের যে সমৃদ্ধ নজির নবুওতী যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাকে পুনর্গঠিত করতে হবে। থিওলজিক্যাল ইম্পেরিয়ালিজমের পোস্ট-কলোনিয়াল ক্রিটিক কেবল পশ্চিমা আধিপত্যকে উন্মোচনই করে না; বরং একটি ন্যায়সংগত, বহুমাত্রিক ও খোদাকেন্দ্রিক বৈশ্বিক মানবিক শৃঙ্খলা গড়ে তোলার জন্য রাসুলুল্লাহ সা.-এর নবুওতী জীবনদর্শনকে একমাত্র কার্যকরী বিকল্প হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করে।