৭.৬ রাসুল (সা.)-এর অংশগ্রহণ ও উদ্দীপনা: তরুণ বয়সে সিভিক অ্যাক্টিভিজমে (Civic Activism) যোগদান
মানব ইতিহাসের পাতায় কোনো ব্যক্তিত্বের শৈশব ও কৈশোর যদি এতটা পরিচ্ছন্ন এবং আদর্শিক দিকনির্দেশনামূলক হয়, তবে তিনি হলেন মুহাম্মাদ সা.। আরবের জাহেলিয়াত যুগের চরম বিশৃঙ্খলা, গোত্রীয় সংঘাত এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মাঝেও তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল এক অনন্য আলোকবর্তিকা। প্রাক-নবুওয়াতের যুগেও তিনি কেবল একজন নীরব দর্শক ছিলেন না, বরং সমাজের অন্যায় প্রতিরোধ এবং আর্তমানবতার সেবায় তিনি যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় 'সিভিক অ্যাক্টিভিজম' বা 'পৌর নাগরিক সক্রিয়তা'র এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর এই সক্রিয়তা কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং জন্মগত সততা এবং ইনসাফ কায়েমের এক সহজাত তাড়না থেকে উৎসারিত হয়েছিল।
প্রাক-ইসলামিক মক্কার আর্থ-সামাজিক অস্থিরতা ও নাগরিক নিরাপত্তা সংকট
ষষ্ঠ শতাব্দীর মক্কা ছিল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র, কিন্তু সেখানে কোনো কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা বা লিখিত আইন ছিল না। পুরো সমাজটি পরিচালিত হতো 'আসাবিয়্যাহ' বা গোত্রীয় অন্ধ আনুগত্যের ভিত্তিতে। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তির অধিকারের চেয়ে গোত্রের ক্ষমতা ছিল মুখ্য। ফলে কোনো প্রভাবশালী গোত্রের সদস্য যদি কোনো দুর্বল ব্যক্তি বা বহিরাগত ব্যবসায়ীর ওপর জুলুম করত, তবে সেই আর্তনাদ শোনার মতো কোনো আইনি কাঠামো সেখানে বিদ্যমান ছিল না। এই চরম অরাজকতার ফলে মক্কায় এক ধরণের 'নিরাপত্তা শূন্যতা' (Security Vacuum) তৈরি হয়েছিল, যা বিশেষ করে বহিরাগত বণিকদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল [1] ।
এই সামাজিক অস্থিরতার মূলে ছিল ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা। মক্কার কুরাইশদের অভ্যন্তরীণ উপগোত্রগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই চলত নিরন্তর। যখন কোনো দুর্বল গোত্রের মানুষ বা মক্কায় আগত কোনো মুসাফির প্রতারিত হতো, তখন তার একমাত্র ভরসা ছিল অন্য কোনো শক্তিশালী গোত্রের আশ্রয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে শক্তিশালী গোত্রগুলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই সুযোগের সুযোগ নিত। এই প্রেক্ষাপটে মক্কার সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের হতাশা এবং নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছিল, যা সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দিচ্ছিল [2] ।
রাসুল সা. তাঁর কৈশোর ও যৌবনের এই সময়ে মক্কার এই সামগ্রিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, কেবল ব্যক্তিগত সততা যথেষ্ট নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। তাঁর এই পর্যবেক্ষণই তাঁকে পরবর্তীকালে মক্কার তরুণদের সাথে নিয়ে এক অনন্য সামাজিক চুক্তিতে সম্পৃক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি ছিল মূলত একটি 'কলেক্টিভ সিকিউরিটি' বা যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রাথমিক রূপ, যা তৎকালীন আরবের গোত্রীয় সংঘাতের বিপরীতে এক মানবিক ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল [3] ।
হিলফুল ফুজুল: নাগরিক অধিকার রক্ষায় এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকার
মক্কার এই অরাজকতার বিপরীতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে 'হিলফুল ফুজুল' বা 'পুণ্যবানদের সংঘ'। এই চুক্তির সূত্রপাত হয়েছিল এক যামেনি ব্যবসায়ীর সাথে ঘটে যাওয়া চরম অবিচারের মাধ্যমে। ওই ব্যবসায়ী মক্কায় পণ্য নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু একজন প্রভাবশালী কুরাইশ নেতা তাঁর পাওনা পরিশোধ না করে তাঁকে প্রতারিত করেন। অসহায় ব্যবসায়ীটি মক্কার মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানালে, মক্কার কিছু বিবেকবান ব্যক্তি এই অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আবদুল্লাহ বিন জুদআন রা.-এর গৃহে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়, যেখানে মক্কার বিভিন্ন গোত্রের গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং তরুণরা একত্রিত হন [4] ।
এই সমাবেশে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ এক অভূতপূর্ব শপথ গ্রহণ করেন। তাঁদের অঙ্গীকার ছিল মক্কায় যে কেউ—সেটি কোনো কুরাইশ হোক বা বহিরাগত—যদি জুলুমের শিকার হয়, তবে তারা সবাই সম্মিলিতভাবে তার পাশে দাঁড়াবে এবং অপরাধীর কাছ থেকে তার অধিকার আদায় করে দেবে। এই চুক্তির মূল কথাটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং দৃঢ়। আরবিতে এই অঙ্গীকারের সারমর্ম ছিল নিম্নরূপ:
অর্থাৎ: "আমরা মক্কায় কোনো মজলুমকে (অত্যাচারিতকে) দেখব না যার পাশে আমরা দাঁড়াব না, যতক্ষণ না তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়; এবং আমরা কোনো জালিমকে (অত্যাচারীকে) দেখব না যার বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হব না, যতক্ষণ না মজলুমের হক আদায় করা হয়" [5] ।
এই চুক্তিটি ছিল তৎকালীন আরবের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। কারণ এটি গোত্রীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে 'মানবিক মূল্যবোধ' এবং 'ন্যায়বিচারের' ভিত্তিতে একটি সামাজিক জোট গঠন করেছিল। এটি ছিল মূলত একটি অরাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য ছিল কেবল নাগরিক অধিকার রক্ষা করা। রাসুল সা. তাঁর যৌবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিতে অত্যন্ত উদ্দীপনার সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং এই চুক্তির প্রতিটি শর্তের প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন ছিল [6] ।
রাসুল (সা.)-এর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান ও সিভিক অ্যাক্টিভিজমে তাঁর ভূমিকা
হিলফুল ফুজুলে রাসুল সা.-এর অংশগ্রহণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং এটি ছিল তাঁর চরিত্রের অন্তর্নিহিত ইনসাফ-প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি জন্মগতভাবেই সত্যনিষ্ঠ এবং ন্যায়পরায়ণ ছিলেন, যার কারণে মক্কাবাসীরা তাঁকে 'আল-আমীন' (বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। তাঁর মনস্তাত্ত্বিক গঠন ছিল এমন যে, তিনি অন্যের কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না। এই সংবেদনশীলতা তাঁকে কেবল ব্যক্তিগত পরোপকারে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং তাঁকে একটি কাঠামোগত সামাজিক পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করেছিল [7] ।
তরুণ বয়সেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ব্যক্তিগত সততা সমাজ পরিবর্তন করতে পারে না যদি না তা একটি সংগঠিত শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। হিলফুল ফুজুলের মাধ্যমে তিনি প্রথমবার অনুভব করেন যে, ন্যায়বিচারের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা বা 'কলেক্টিভ অ্যাকশন' কতটা কার্যকর হতে পারে। তাঁর এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল আধ্যাত্মিকতার চর্চায় মগ্ন ছিলেন না, বরং সমাজের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় এবং আগ্রহী ছিলেন। তাঁর এই উদ্দীপনা ছিল মূলত একটি নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে উৎসারিত [8] ।
রাসুল সা.-এর এই সক্রিয়তা তাঁর নেতৃত্বের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি এখানে কোনো নেতৃত্ব দাবি করেননি, বরং একজন সদস্য হিসেবে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন। তাঁর এই বিনয় এবং ন্যায়নিষ্ঠার কারণে এই সংঘের অন্যান্য সদস্যরা তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, একজন প্রকৃত নেতা তিনিই, যিনি সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণির অধিকার রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর এই মানসিকতা পরবর্তীকালে ইসলামের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে [9] ।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ
রাসুল সা.-এর এই সিভিক অ্যাক্টিভিজমকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'হিউম্যান রাইটস অ্যাডভোকেসি' (Human Rights Advocacy) এবং 'সোশ্যাল জাস্টিস মুভমেন্ট' (Social Justice Movement)-এর সাথে তুলনা করা যায়। যখন পৃথিবীতে মানবাধিকারের কোনো ধারণা ছিল না, তখন তিনি একটি চুক্তির মাধ্যমে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এটি ছিল মূলত একটি 'নন-স্টেট অ্যাক্টর' (Non-state actor) হিসেবে সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা, যা বর্তমান যুগের এনজিও (NGO) বা সিভিল সোসাইটির কাজের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ [10] ।
সমাজতাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হিলফুল ফুজুল ছিল 'ট্রাইবাল ইথনিসিটি' (Tribal Ethnicity) বা গোত্রীয় জাতিসত্ত্বার বিপরীতে 'ইউনিভার্সাল হিউম্যানিটি' বা সার্বজনীন মানবতাবাদের এক প্রাথমিক বহিঃপ্রকাশ। রাসুল সা. এই চুক্তির মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যে, ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে কোনো জাতিগত বা গোত্রীয় ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। এটি ছিল একটি 'সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' বা সামাজিক চুক্তি, যা সমাজের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। এই প্রক্রিয়ায় তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল শক্তির প্রয়োজন নেই, বরং নৈতিক অঙ্গীকার এবং পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন [11] ।
রাসুল সা.-এর এই উদ্দীপনা এবং অংশগ্রহণ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, একজন মুমিন কেবল ইবাদতকেন্দ্রিক জীবন যাপন করেন না, বরং তিনি সমাজের প্রতিটি অন্যায় প্রতিরোধে সক্রিয় থাকেন। তাঁর এই যৌবনের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, ইসলাম আসার আগে থেকেই তিনি আল্লাহর মনোনীত একজন মানুষ ছিলেন, যার হৃদয়ে ইনসাফের বীজ রোপিত ছিল। তাঁর এই সিভিক অ্যাক্টিভিজম ছিল মূলত একটি প্রস্তুতিমূলক পর্যায়, যা তাঁকে পরবর্তীকালে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা পরিচালনার যোগ্য করে তুলেছিল [12] ।