৩.৪.২ তৃষ্ণার্ত ইহুদিদের দুর্গ থেকে বেরিয়ে সম্মুখ সমরে (Open Combat) বাধ্য হওয়া এবং পতন
খায়বার উপত্যকার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ইহুদিদের সুসংহত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৎকালীন আরবের সামরিক মানচিত্রের একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল অধ্যায়। খায়বারের ইহুদিরা কেবল একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী ছিল না, বরং তারা ছিল একটি শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি, যারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সুরক্ষিত দুর্গের অভ্যন্তরে অবস্থান করছিল। এই দুর্গগুলো ছিল খায়বারের ভূপ্রকৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খায়বারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত তিনটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত ছিল: নাতা (النطاة), শাক (الشق) এবং কতিবা (الكتيبة) [1] । এই অঞ্চলগুলোতে প্রায় দশ হাজার প্রশিক্ষিত যোদ্ধা অবস্থান করছিল, যারা তাদের দুর্গের প্রাচীর ও কৌশলগত অবস্থানকে ব্যবহার করে মুসলিম বাহিনীকে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের সম্মুখীন করেছিল [2] ।
খায়বারের এই সামরিক শক্তির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক কারণ ছিল তাদের শক্তিশালী মিত্রতা। বিশেষ করে গাতাফান (غطفان) গোত্রের উপজাতিরা, বিশেষ করে ফাজারাহ (فزارة), খায়বারের ইহুদিদের প্রধান মিত্র হিসেবে বিবেচিত হতো [3] । এই মিত্রতার কারণে খায়বার কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্গ নয়, বরং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। এমনকি উয়াইনা বিন হিসন (عيينة بن حصن) ইহুদিদের সাহায্য করার জন্য দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও তিনি খায়বারে পৌঁছানোর আগেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল এবং ইহুদিরা তাদের প্রাথমিক প্রতিরক্ষা বলয় হারাতে শুরু করেছিল [4] ।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর সামরিক কৌশল ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং আধুনিক নগর যুদ্ধের (Urban Warfare) সমসাময়িক। তিনি সরাসরি একটি বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি না হয়ে, কৌশলগতভাবে কিছু দুর্গে ছোট ছোট বাহিনী পাঠিয়ে শত্রুর মনোযোগ বিভক্ত করে দেন (Distraction Strategy)। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রধান আক্রমণকারী বাহিনীকে একটি নির্দিষ্ট দুর্গের ওপর কেন্দ্রীভূত করা, যাতে সেই দুর্গটি দ্রুত পতন ঘটে এবং এরপর ক্রমান্বয়ে পরবর্তী দুর্গের দিকে অগ্রসর হওয়া যায় [5] । এই কৌশলটি আধুনিক সামরিক বিজ্ঞানের 'Concentration of Force' নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি রাসুলুল্লাহ সা. কেবল সম্মুখ সমরে বা 'কার ও ফার' (Hit and Run) পদ্ধতিতে লড়তেন, তবে খায়বারের সুসংহত দুর্গের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হতো [6] ।
না'ইম দুর্গের পতন ও বীরত্বগাথা
খায়বারের আটটি দুর্গের মধ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা বলয় ছিল না'ইম (حصن ناعم) দুর্গ। এর কৌশলগত অবস্থানের কারণে এটি ছিল ইহুদিদের প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর। এই দুর্গের প্রধান রক্ষক ছিলেন মারহাব (مرحب), যিনি একজন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বীর যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মারহাবের বীরত্ব ও সামরিক সামর্থ্য ছিল এক হাজার যোদ্ধার সমতুল্য [7] ।
যখন মুসলিম বাহিনী না'ইম দুর্গের দিকে অগ্রসর হয়, তখন আলি (রা.) এই দুর্গের নেতৃত্ব দেন। তিনি ইহুদিদের ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন, কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। যুদ্ধের ময়দানে মারহাব অত্যন্ত দম্ভের সাথে মুসলিমদের চ্যালেঞ্জ করেন এবং দ্বৈরথের আহ্বান জানান। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আলি (রা.) এবং মারহাবের মধ্যে যে সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তা ছিল খায়বারের যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো একটি ঘটনা। মারহাবের বীরত্ব সত্ত্বেও, আলি (রা.) অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তাকে পরাজিত ও হত্যা করেন [8] ।
এই যুদ্ধে মাহমুদ বিন মাসলামা আনসারি (রা.) শহীদ হন। মারহাব যখন দুর্গের ওপর থেকে ভারী শস্য ভাঙার চাকা (Millstone) নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন তা মাহমুদ বিন মাসলামা (রা.)-এর ওপর আঘাত হানে, যার ফলে তিনি শাহাদাত বরণ করেন [9] । মারহাবের মৃত্যু ইহুদিদের মধ্যে ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। একজন প্রধান বীরের পতন তাদের আত্মবিশ্বাসকে ধূলিসাৎ করে দেয় এবং দুর্গের অভ্যন্তরে এক চরম অস্থিরতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে [10] ।
খায়বারের অবরোধ কেবল সামরিক আক্রমণ ছিল না, এটি ছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ (War of Attrition)। দুর্গের চারপাশ থেকে মুসলিম বাহিনী যখন ক্রমাগত আক্রমণ চালাতে থাকে, তখন ইহুদিদের জন্য খাদ্য ও পানির সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের অবরোধে তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত ইহুদিরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে শুরু করে। দুর্গের অভ্যন্তরে থাকা যোদ্ধারা যখন বুঝতে পারল যে তাদের মিত্ররা আর সাহায্য করতে আসছে না এবং তাদের খাদ্য ও পানির মজুদ ফুরিয়ে আসছে, তখন তাদের মধ্যে পলায়নপরতা ও হতাশা দেখা দেয় [12] ।
এই সংকটকালীন সময়ে ইহুদিদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। অনেক ইহুদি সৈন্য তাদের দুর্গ ত্যাগ করে পালিয়ে যেতে শুরু করে। এমনকি কিছু ইহুদি মুসলিম বাহিনীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং খায়বারীয় দুর্গের গোপনীয়তা ও দুর্বল স্থানগুলো সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সা.-কে অবহিত করে [13] । এই তথ্যগুলো মুসলিম বাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা অবরোধের গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শত্রুর অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং তথ্যের অভাব তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে ফেলেছিল [14] ।
অবরোধের এই পর্যায়ে যুদ্ধের তীব্রতা চরমে পৌঁছায়। খায়বারের শেষ দিকের দুর্গগুলোতে (যেমন: ওয়তিহ, সালাম ও জুবায়ের দুর্গ) প্রায় বিশ দিন ধরে অবিরাম যুদ্ধ ও দ্বৈরথ চলতে থাকে [15] । এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে উভয় পক্ষের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০০ জন ইহুদি এবং ১৫ জন মুসলিম শহীদ হন [16] । যুদ্ধের এই ভয়াবহতা এবং মৃত্যুভয় ইহুদিদের এমন এক পর্যায়ে নিয়ে আসে যে, তারা বুঝতে পারে যে এই দুর্গ রক্ষা করা এখন আর সম্ভব নয় এবং তারা নিশ্চিত মৃত্যুর সম্মুখীন হচ্ছে [17] ।
সন্ধি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা: একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত
যখন ইহুদিরা বুঝতে পারল যে তাদের পতন অনিবার্য, তখন তারা রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে আত্মসমর্পণ ও সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে আসে। তারা তাদের রক্তপাত বন্ধ করার জন্য এবং এলাকা ত্যাগ করার পরিবর্তে সেখানে থেকে যাওয়ার জন্য একটি বিশেষ প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটি ছিল—তারা তাদের উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক অংশ মুসলিমদের প্রদান করবে, বিনিময়ে তাদের নিজেদের জমিতে বসবাস করতে দেওয়া হবে [18] । রাসুলুল্লাহ সা. এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন, যা ছিল তৎকালীন সময়ের একটি অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত [19] ।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে বেশ কিছু গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ ছিল। প্রথমত, খায়বার ছিল অত্যন্ত উর্বর এবং কৃষিপ্রধান একটি অঞ্চল। তৎকালীন নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রটি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় ছিল এবং খায়বারের কৃষি সম্পদ রাষ্ট্রের কোষাগার ও জনকল্যাণে অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল [20] । দ্বিতীয়ত, খায়বারের কৃষি কাজে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন ছিল। আরবের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজে অভ্যস্ত ছিল না, তাই ইহুদিদের সেখানে রেখে দেওয়া হলে তারা কৃষি কাজ চালিয়ে যেতে পারত, যা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করত [21] ।
রাসুলুল্লাহ সা. এই সন্ধি করার সময় একটি শর্তারোপ করেছিলেন যে, এই চুক্তি চিরস্থায়ী নয়। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন,
অর্থাৎ, "যদি আমরা চাই, তবে আমরা তোমাদের বের করে দিতে পারি" [22] । এটি ছিল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা, যা ইহুদিদের মনে এই ধারণা গেঁথে দেয় যে, তাদের অবস্থান সম্পূর্ণভাবে মুসলিম রাষ্ট্রের দয়ার ওপর নির্ভরশীল।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই মহানুভবতা ও ন্যায়পরায়ণতা খায়বারের যুদ্ধের একটি অনন্য দিক। যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও তিনি ইহুদিদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বা তাওরাতের (Torah) প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেননি। যুদ্ধের সময় মুসলিমদের হাতে প্রাপ্ত তাওরাতের বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি যখন ইহুদিরা ফেরত চাইল, রাসুলুল্লাহ সা. তা তাদের বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন [23] । রোমানরা যখন জেরুজালেম জয় করেছিল, তখন তারা পবিত্র গ্রন্থগুলো পুড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই আচরণ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এবং এটি তাঁর উচ্চতর নৈতিক ও মানবিক আদর্শের বহিঃপ্রকাশ [24] ।