৩.২ উলঙ্গ তাওয়াফ: ধর্মীয় রিচুয়ালে চরমপন্থা (Extremism) এবং 'হুমস' (Hums) প্রথার মনস্তত্ত্ব
জাহেলিয়াত বা প্রাক-ইসলামি যুগের আরবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান কেবল আধ্যাত্মিক সাধনা ছিল না, বরং তা ছিল সামাজিক আধিপত্য, গোষ্ঠীগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং চরমপন্থা বা 'Religious Extremism'-এর এক জটিল সংমিশ্রণ। মক্কার পবিত্র কাবা শরীফকে কেন্দ্র করে যে উপাসনা পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, তার একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে অবমাননাকর দিক ছিল 'উলঙ্গ তাওয়াফ' বা বস্ত্রহীনভাবে কাবা প্রদক্ষিণ করা। এই প্রথাটি কেবল একটি কুসংস্কার ছিল না, বরং এটি ছিল মানুষের আত্মমর্যাদাকে বিসর্জন দিয়ে এক প্রকার কৃত্রিম পবিত্রতা অর্জনের একটি চরমপন্থী প্রচেষ্টা। এই প্রথার মাধ্যমে একদিকে যেমন মানুষের পার্থিবতা বিসর্জনের নামে চরমপন্থা প্রদর্শন করা হতো, অন্যদিকে 'হুমস' (Hums) নামক একটি বিশেষ গোষ্ঠী তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত বিভাজন তৈরি করেছিল।
প্রাক-ইসলামি আরবের এই ধর্মীয় রীতিনীতিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সেখানে পবিত্রতা ও অপবিত্রতার ধারণাটি অত্যন্ত বিকৃত ছিল। মানুষ মনে করত, নতুন বা পরিচ্ছন্ন বস্ত্র পরিধান করে তাওয়াফ করা হলো এক প্রকার পাপ বা অহংকার প্রদর্শন। ফলে তারা তাদের বস্ত্র ত্যাগ করে উলঙ্গ অবস্থায় কাবা প্রদক্ষিণ করতে শুরু করে। এই রীতির নাম ছিল 'আল-লিকা' (Al-Liqa'), যেখানে মানুষ তাদের বস্ত্র মাটিতে ফেলে রাখত এবং সেই বস্ত্রগুলো মানুষের পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে জীর্ণ হয়ে যেত। এই চরমপন্থাটি মূলত মানুষের আত্মিক শুদ্ধির নামে শারীরিক ও সামাজিক অবমাননার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করত।
উলঙ্গ তাওয়াফ ও 'আল-লিকা' (Al-Liqa') প্রথার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
জাহেলিয়াত যুগে আরবের বিভিন্ন গোত্র কাবা শরীফ তাওয়াফ করার সময় সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় তা সম্পন্ন করত। এই প্রথাটি ছিল অত্যন্ত চরমপন্থী এবং এটি মানুষের স্বাভাবিক শালীনতা ও মর্যাদাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করত। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, আরবের বিভিন্ন গোত্র, যেমন বনু আমির ও অন্যান্য গোত্রীয় সদস্যরা এই রীতির অনুসারী ছিল। তারা বিশ্বাস করত যে, যে বস্ত্র দিয়ে তারা গুনাহ করেছে, সেই বস্ত্র পরিধান করে তাওয়াফ করা অনুচিত।
كَانُوا فِي الْجَاهِلِيَّةِ يَطُوفُونَ بِالْبَيْتِ عُرَاةً وَيَرْمُونَ ثِيَابَهُمْ وَيَتْرُكُونَهَا مُلْقَاةً عَلَى الْأَرْضِ، وَلَا يَأْخُذُونَهَا أَبَدًا، بَلْ يَتْرُكُونَهَا تُدَاسُ بِالْأَرْجُلِ حَتَّى تَبْلَى، وَيُسَمَّى: اللِّقَاءَ [1] এই 'আল-লিকা' প্রথার একটি ভয়াবহ দিক ছিল বস্ত্রের অবমাননা। মানুষ তাদের পোশাকগুলো মাটিতে ফেলে রাখত এবং সেগুলো কোনো সংগ্রহে রাখা হতো না; বরং হাজীদের পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে সেগুলো জীর্ণ ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো। এই প্রক্রিয়াটি ছিল এক প্রকার 'Ritualistic Self-Abasement' বা রীতির মাধ্যমে আত্ম-অবমাননা। তারা মনে করত, বস্ত্র ত্যাগ করা মানেই হলো পার্থিব মোহ ত্যাগ করা, কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল একটি বিশৃঙ্খল ও অমানবিক প্রথা যা মানুষের সামাজিক ও ব্যক্তিগত মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দিত। [2] ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আরবের বিভিন্ন গোত্র এই প্রথাটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পালন করত। পুরুষরা দিনের বেলা এবং নারীরা রাতের বেলা উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ সম্পন্ন করত। এই চরমপন্থাটি কেবল শারীরিক নগ্নতা নয়, বরং এটি ছিল একটি সামাজিক বিশৃঙ্খলা যা ধর্মের নামে মানুষের শালীনতাকে বিসর্জন দিয়েছিল। [3] । এই রীতির মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতির নামে এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা ও চরমপন্থা ছড়িয়ে পড়েছিল, যা মানুষের স্বাভাবিক বিবেক ও সামাজিক কাঠামোর পরিপন্থী ছিল।
'হুমস' (Hums) প্রথা: ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও সামাজিক বিভাজন
জাহেলিয়াত যুগের এই চরমপন্থা ও নগ্নতার প্রথার মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম ছিল 'হুমস' (Hums) নামক একটি বিশেষ গোষ্ঠী। 'হুমস' বলতে মূলত কুরাইশ বংশ এবং তাদের নিকটাত্মীয়দের বোঝানো হতো। যখন আরবের অন্যান্য গোত্রগুলো উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করত, তখন কুরাইশরা এবং তাদের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী এই প্রথা থেকে মুক্ত ছিল। তারা নগ্ন হয়ে তাওয়াফ করত না, বরং পরিহিত অবস্থায় তা সম্পন্ন করত। এই ব্যতিক্রমটি কেবল একটি ধর্মীয় নিয়ম ছিল না, বরং এটি ছিল কুরাইশদের সামাজিক ও ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের (Religious Superiority) একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
كَانَتِ الْعَرَبُ تَطُوفُ بِالْبَيْتِ عُرَاةً إِلَّا الْحُمُسَ، وَالْحُمُسُ قُرَيْشٌ وَمَا وَلَدَتْ [4] এই 'হুমস' প্রথার মাধ্যমে কুরাইশরা একটি কৃত্রিম আধ্যাত্মিক স্তরবিন্যাস তৈরি করেছিল। তারা নিজেদের এমন এক উচ্চস্তরে স্থাপন করেছিল যেখানে তারা নগ্নতার এই 'পবিত্রতা' বা 'ত্যাগের' প্রথা থেকে মুক্ত ছিল। এটি ছিল এক প্রকার 'Social Stratification' বা সামাজিক স্তরবিন্যাস, যেখানে কুরাইশদের পোশাক পরিহিত থাকাটা তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে গণ্য হতো, আর অন্যদের নগ্নতা ছিল তাদের ধর্মের প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ। [5] । এই বিভাজনটি মক্কার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভূ-রাজনীতিতে কুরাইশদের আধিপত্যকে আরও সুসংহত করেছিল।
তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, 'হুমস' প্রথাটি ছিল এক প্রকার 'Psychological Hegemony' বা মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য। যখন অন্যান্য গোত্রীয় হাজীরা তাদের বস্ত্র ত্যাগ করে মাটিতে ফেলে রাখত, তখন কুরাইশরা তাদের পরিচ্ছন্ন ও সংরক্ষিত বস্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করত। আল-আজরাকি রহ. এর বর্ণনা অনুযায়ী, যখন কোনো হাজি বা গোত্রীয় সদস্য কাবা শরীফের নিকটবর্তী হতো, তখন তারা এই 'হুমস' বা কুরাইশদের কাছে এসে বস্ত্র ধার করার জন্য অনুরোধ করত। [6] । এর মাধ্যমে কুরাইশরা কেবল ধর্মীয়ভাবে নয়, বরং সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবেও হাজীদের ওপর এক প্রকার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত।
অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: পোশাকের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ
'হুমস' প্রথাটি কেবল ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি একটি গভীর অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করেছিল। হাজীদের জন্য বস্ত্রের অভাব এবং তাদের নগ্নতা একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল, যার মাধ্যমে কুরাইশরা তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারত। যখন হাজীরা তাদের বস্ত্র মাটিতে ফেলে দিয়ে জীর্ণ করে ফেলত, তখন তারা সম্পূর্ণভাবে বস্ত্রহীন ও অসহায় হয়ে পড়ত। এই অসহায়ত্বের মুহূর্তে কুরাইশদের কাছে বস্ত্র ভিক্ষা করা বা ধার করা ছিল একটি বাধ্যতামূলক সামাজিক রীতির মতো।
এই প্রক্রিয়াটি ছিল এক প্রকার 'Economic and Psychological Dominance'। হাজীরা যখন কুরাইশদের কাছে বস্ত্র ধার করত, তখন তারা পরোক্ষভাবে কুরাইশদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্য প্রকাশ করতে বাধ্য হতো। এটি ছিল একটি 'Power Dynamics' যেখানে বস্ত্র কেবল একটি প্রয়োজনীয় বস্তু ছিল না, বরং তা ছিল ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীক। [7] । এই ব্যবস্থায় কুরাইশরা নিজেদের একটি 'Gatekeeper' বা রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, যারা অন্যদের পবিত্রতার পথে প্রবেশের জন্য বস্ত্র বা 'মর্যাদা' প্রদান করত।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই প্রথাটি হাজীদের মধ্যে এক প্রকার হীনম্মন্যতা তৈরি করত। একদিকে তারা ধর্মীয় রীতির নামে নিজেদের বস্ত্র ও মর্যাদা ত্যাগ করতে বাধ্য হতো, অন্যদিকে তারা কুরাইশদের কাছে বস্ত্রের জন্য মুখাপেক্ষী হতো। এই দ্বিমুখী চাপ হাজীদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দিত এবং কুরাইশদের আধিপত্যকে প্রশ্নাতীত করে তুলত। [8] । সুতরাং, 'হুমস' প্রথাটি কেবল একটি ধর্মীয় ব্যতিক্রম ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা কুরাইশদের মক্কার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল।
ইসলামি সংস্কার: মর্যাদা ও শালীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা
ইসলামের আগমনের মাধ্যমে এই চরমপন্থী ও অবমাননাকর প্রথাগুলোর অবসান ঘটে। ইসলাম কেবল একটি নতুন ধর্ম নয়, বরং এটি ছিল মানুষের মর্যাদা ও শালীনতার (Dignity and Modesty) এক মহান সংস্কার আন্দোলন। ইসলাম প্রাক-ইসলামি যুগের সেই বিকৃত ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করে যে, নগ্নতা বা বস্ত্র ত্যাগ করা হলো পবিত্রতার লক্ষণ। বরং ইসলাম শিখিয়েছে যে, ইবাদতের সময় মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য ও শালীনতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
কুরআন মাজিদের সূরা আল-আরাফের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন, যা সরাসরি প্রাক-ইসলামি যুগের সেই নগ্নতা ও অবমাননাকর প্রথার অবসান ঘটায়।
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ [9] এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন যে, প্রতিটি নামাজের সময় বা পবিত্র স্থানে প্রবেশের সময় যেন মানুষ তাদের সৌন্দর্য ও পোশাক (Adornment) গ্রহণ করে। এই নির্দেশটি ছিল প্রাক-ইসলামি যুগের 'আল-লিকা' এবং 'উলঙ্গ তাওয়াফ'-এর বিরুদ্ধে একটি সরাসরি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। [10] । এর মাধ্যমে মানুষের শারীরিক ও মানসিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইবাদতটি আর কোনো অবমাননাকর বা চরমপন্থী রীতির অংশ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে এক মার্জিত ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
রাসুলুল্লাহ সা. এর নেতৃত্বে ইসলামের এই সংস্কারটি সামাজিক বৈষম্যকেও দূর করে দেয়। 'হুমস' প্রথার মাধ্যমে যে ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজন তৈরি হয়েছিল, ইসলাম তা ভেঙে দেয়। ইসলামে আর কোনো গোষ্ঠী বা গোত্র (যেমন কুরাইশ) ধর্মীয় রীতির মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারে না। তাওয়াফ করার ক্ষেত্রে পোশাকের প্রয়োজনীয়তা এবং শালীনতার বিধান সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য করা হয়। [11] । এর ফলে হাজীদের মধ্যে যে হীনম্মন্যতা বা কুরাইশদের প্রতি যে মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা ছিল, তা চিরতরে বিলুপ্ত হয়। ইসলাম ধর্মের এই সংস্কারটি মানুষের আত্মমর্যাদাকে রক্ষা করার পাশাপাশি ধর্মকে চরমপন্থা ও কুসংস্কারের হাত থেকে মুক্ত করে এক সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদতে রূপান্তরিত করে।