মানব সভ্যতার ইতিহাসে রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় 'সুশাসন' বা 'গুড গভর্নেন্স' (Good Governance) এবং 'প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা' (Institutional Accountability) অত্যন্ত আধুনিক ও পরিশীলিত ধারণা হিসেবে বিবেচিত হয়। সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও নীতি-নির্ধারকগণ একটি আদর্শ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এই উপাদানগুলোকে অপরিহার্য মনে করেন। তবে আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে, সপ্তম শতাব্দীর আরবের মরুঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাহীন এক সমাজে রাসুলুল্লাহ সা. যে মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ছিল আধুনিক সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার এক কালজয়ী ও তাত্ত্বিক ব্লু-প্রিন্ট। তৎকালীন রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের স্বৈরতান্ত্রিক ও সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর বিপরীতে মদিনার এই নববী মডেলটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী, যেখানে শাসনক্ষমতাকে কোনো ঐশ্বরিক একনায়কত্ব বা অভিজাত শ্রেণীর একচেটিয়া অধিকার হিসেবে গণ্য না করে, একে একটি পবিত্র 'আমানত' (Trust) এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এই অধ্যায়ে আমরা নববী শাসনব্যবস্থার সেই অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, জবাবদিহিতার তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং সমকালীন রাজনৈতিক দর্শনের সাথে এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ আলোচনা করব।
১. গুড গভর্নেন্স বা সুশাসনের নববী ধারণা ও এর তাত্ত্বিক ভিত্তি (Theoretical Foundations of Prophetic Good Governance)
রাসুলুল্লাহ সা. প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্রের সুশাসন কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল এক সুসংহত তাত্ত্বিক ও ওহী-ভিত্তিক দর্শনের বাস্তবায়ন। তৎকালীন বিশ্বের রাজনৈতিক দর্শনগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর 'রিপাবলিক' বা আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণায় রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য চরম কর্তৃত্ববাদ ও জনগণের চিন্তার স্বাধীনতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্ট তাঁর 'দ্য স্টোরি অব সিভিলাইজেশন' গ্রন্থে প্লেটোনিক ও প্রাচীন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার স্বৈরতান্ত্রিক রূপ চিত্রায়িত করতে গিয়ে লিখেছেন:
وللوصول إلى هذا كله في هدوء وسلام يجب أن تشرف الدولة إشرافاً تاماً على شئون التعليم، والنشر، وغيرها من وسائل تكوين الرأي العام، وأخلاق الأفراد... وكل من يتردد في الخضوع لهذا الدين الرسمي يسجن، فإن أصر على عدم الخضوع له وجب أن يقتلঅনুবাদ: "এবং এই সমস্ত কিছু শান্ত ও শান্তিপূর্ণভাবে অর্জনের জন্য রাষ্ট্রকে অবশ্যই শিক্ষা, প্রকাশনা এবং জনমত ও ব্যক্তির নৈতিকতা গঠনের অন্যান্য মাধ্যমের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে... এবং যে কেউ এই রাষ্ট্রীয় ধর্ম বা আদর্শের অনুগত হতে দ্বিধা করবে তাকে কারারুদ্ধ করা হবে, আর যদি সে অবাধ্যতায় অবিচল থাকে তবে তাকে হত্যা করা আবশ্যক।" [1] ।
প্লেটোনিক বা এই ধরনের ধর্মনিরপেক্ষ ও স্বৈরতান্ত্রিক দর্শনের বিপরীতে, যেখানে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষার নামে নাগরিকের মৌলিক স্বাধীনতা হরণ করা হতো, রাসুলুল্লাহ সা. এমন এক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন যা মানুষের বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সম্মান জানিয়ে এক অনন্য নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। মধ্যযুগীয় খ্রিস্টীয় রাজ্যগুলোতে যেখানে সামন্ত প্রভু ও ধর্মযাজকদের জোট সাধারণ মানুষের ওপর বিচারহীনতার রাজত্ব কায়েম করেছিল, যার বিবরণ ঐতিহাসিক নথিতে পাওয়া যায়:
التنظيم السياسي للمملكة النصرانية. السلطة المركزية. الأشراف. القضاء واشتراك الأشراف في مزاولته. رجال الدين وسلطانهم الإقطاعي.অনুবাদ: "খ্রিস্টীয় রাজ্যের রাজনৈতিক সংগঠন: কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ, অভিজাত শ্রেণী, বিচার বিভাগ এবং বিচার পরিচালনায় অভিজাতদের অংশগ্রহণ, এবং ধর্মযাজক ও তাদের সামন্ততান্ত্রিক আধিপত্য।" [2] ।
এই সামন্ততান্ত্রিক ও শ্রেণী-বিভক্ত বিচার ব্যবস্থার বিপরীতে মদিনার নববী মডেলটি ছিল সম্পূর্ণ সমতাভিত্তিক। এখানে আইনের চোখে শাসক ও শাসিতের কোনো পার্থক্য ছিল না। নববী সুশাসনের মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল এই যে, ক্ষমতা কোনো ভোগের বস্তু নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি আমানত এবং এর জন্য ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতেই জবাবদিহি করতে হবে। রাসুলুল্লাহ সা. এই তাত্ত্বিক ভিত্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গিয়ে ঘোষণা করেন, "তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন রাখাল বা দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে" [3] । এই একটিমাত্র ঘোষণা তৎকালীন আরবের গোত্রীয় স্বেচ্ছাচারিতাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে এক প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরদায়িত্বের (Accountability) জন্ম দেয়, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'গুড গভর্নেন্স'-এর মূল চালিকাশক্তি।
২. প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা (Institutional Accountability) ও 'হিসবাহ' (Hisbah) ব্যবস্থার সূচনা
মদিনা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো কেবল তাত্ত্বিক উপদেশের ওপর নির্ভরশীল ছিল না, বরং সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক অঙ্গ ও তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। পরবর্তীতে ইসলামি খেলাফতের যুগে যে 'হিসবাহ' (Hisbah) বা বাজার ও নৈতিকতা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এবং 'সাহিবুল আশগাল' (Sahib al-Ashghal) বা 'সাহিবুশ শুরতাহ' (Sahib al-Shurtah)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদের সৃষ্টি হয়েছিল, তার বীজ রোপিত হয়েছিল স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সা.-এর যুগে। ঐতিহাসিক দলিলসমূহে পরবর্তীকালের এই প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনের উল্লেখ পাওয়া যায়:
وقد يتولى صاحب الأشغال المخزنية أحيانا، الإشراف على ما يتعلق " بالسهام السلطانية " أي أنصبة الخليفة أو حقوقه الشرعية في الغنائم وغيرها... وكان منصب صاحب الشرطة، من الناصب الإدارية الهامة...অনুবাদ: "এবং কখনো কখনো 'সাহিবুল আশগাল আল-মাখজানিয়্যাহ' (কোষাগার বা রাজস্ব কর্মকর্তা) খলিফার অংশ বা গনীমত ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তাঁর শরয়ী অধিকার সংক্রান্ত বিষয়াবলি তদারকি করার দায়িত্ব পালন করতেন... এবং 'সাহিবুশ শুরতাহ' (পুলিশ প্রধান)-এর পদটি ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ..." [4] ।
এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আদি উৎস ছিল রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রত্যক্ষ তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের নীতি। রাসুলুল্লাহ সা. নিজে মদিনার বাজারে গিয়ে ব্যবসায়িক লেনদেন ও পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করতেন, যা ছিল ইতিহাসের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক 'হিসবাহ' বা বাজার তদারকি ব্যবস্থা। একবার তিনি এক খাদ্য বিক্রেতার স্তূপীকৃত খাদ্যের ভেতর হাত প্রবেশ করিয়ে দেখলেন ভেতরের খাদ্যগুলো ভেজা। তিনি বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে খাদ্যের মালিক! এটি কী?" বিক্রেতা উত্তর দিল, "হে আল্লাহর রাসুল সা.! বৃষ্টিতে এটি ভিজে গিয়েছিল।" তখন রাসুলুল্লাহ সা. এক ঐতিহাসিক নীতি নির্ধারণ করে দিলেন:
أَفَلَا جَعَلْتَهُ فَوْقَ الطَّعَامِ كَيْ يَرَاهُ النَّاسُ؟ مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّاঅনুবাদ: "তবে তুমি কেন ভেজা অংশটি খাদ্যের ওপরে রাখলে না, যাতে মানুষ তা দেখতে পেত? যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" [5] ।
এই ঘটনাটি কেবল একটি নৈতিক উপদেশ ছিল না, বরং এটি ছিল ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ (Consumer Protection) এবং ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার বাজারে নারী সাহাবি সামরা বিনতে নুহাইক রা. এবং শিফা বিনতে আবদুল্লাহ রা.-কে বাজার পরিদর্শক (Muhtasib) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে যে নববী জবাবদিহিতা ব্যবস্থায় লিঙ্গভিত্তিক কোনো বৈষম্য ছিল না এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব অর্পণ করা হতো [6] । এই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ফলেই মদিনার অর্থনীতিতে কোনো কৃত্রিম সংকট বা কালোবাজারি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।
৩. ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রশাসনিক ভারসাম্য (Decentralization of Power and Administrative Balance)
মদিনা রাষ্ট্রের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিধি যখন দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, তখন রাসুলুল্লাহ সা. ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণের (Over-centralization) কুফল এড়াতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে 'প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ' (Administrative Decentralization)-এর নীতি গ্রহণ করেন। তিনি মদিনার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্রে গভর্নর (Wali), বিচারক (Qadi) এবং যাকাত সংগ্রাহক (Amil) নিয়োগ করেন। তবে এই বিকেন্দ্রীকরণের সাথে সাথে তিনি কঠোর কেন্দ্রীয় তদারকি ও অডিট (Audit) ব্যবস্থা চালু রেখেছিলেন, যাতে কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার বা আর্থিক অনিয়ম করতে না পারেন।
রাসুলুল্লাহ সা. যখন মুয়াজ ইবনে জাবাল রা.-কে ইয়েমেনের গভর্নর ও বিচারক হিসেবে প্রেরণ করেন, তখন তিনি তাঁর প্রশাসনিক ও বিচারিক যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি ঐতিহাসিক সংলাপ পরিচালনা করেন। রাসুলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার কাছে কোনো বিচার্য বিষয় আসলে কীভাবে ফয়সালা করবে?" মুয়াজ রা. উত্তর দিলেন, "আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী।" রাসুলুল্লাহ সা. আবার জিজ্ঞেস করলেন, "যদি আল্লাহর কিতাবে তা না পাও?" তিনি বললেন, "তাহলে আল্লাহর রাসুলের সুন্নাহ অনুযায়ী।" রাসুলুল্লাহ সা. পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, "যদি সেখানেও না পাও?" মুয়াজ রা. দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিলেন, "আমি আমার বুদ্ধি-বিবেচনা প্রয়োগ করে ইজতিহাদ করব এবং এতে কোনো ত্রুটি করব না।" এই উত্তর শুনে রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন [7] । এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, নববী মডেল স্থানীয় কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা (Discretionary Power) প্রদান করত, তবে তা অবশ্যই মূল নীতিমালার অধীনে নিয়ন্ত্রিত ছিল।
একই সাথে, আর্থিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সা. ছিলেন আপসহীন। যাকাত আদায়ের জন্য নিযুক্ত কর্মকর্তাদের হিসাব তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করতেন। একবার ইবনুল লুতবিয়্যাহ রা. নামক এক কর্মকর্তাকে যাকাত আদায়ের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হলে তিনি ফিরে এসে কিছু সম্পদ দেখিয়ে বললেন, "এগুলো আপনাদের (রাষ্ট্রের) সম্পদ, আর এগুলো আমাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে।" এই কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং তাৎক্ষণিকভাবে মিম্বরে দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন:
مَا بَالُ الْعَامِلِ نَبْعَثُهُ، فَيَأْتِي يَقُولُ: هَذَا لَكَ وَهَذَا لِي! فَهَلَّا جَلَسَ فِي بَيْتِ أَبِيهِ وَأُمِّهِ فَيَنْظُرَ أَيُهْدَى لَهُ أَمْ لَا؟অনুবাদ: "সেই কর্মকর্তার কী হলো, যাকে আমরা কোনো দায়িত্ব দিয়ে পাঠাই, আর সে এসে বলে: এটি আপনার এবং এটি আমাকে উপহার দেওয়া হয়েছে! সে কেন তার বাবা-মায়ের ঘরে বসে থাকল না, তখন সে দেখত তাকে কেউ উপহার দেয় কি না?" [8] ।
এই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. সরকারি কর্মকর্তাদের 'স্বার্থের সংঘাত' (Conflict of Interest) এবং 'ঘুষ ও উপহারের' মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য স্পষ্ট করে দেন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সরকারি কর্মকর্তাদের উপহার গ্রহণের ওপর যে আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, তার মূল ভিত্তি দেড় হাজার বছর পূর্বেই রাসুলুল্লাহ সা. এই ঘটনার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন।
৪. জনগণের অধিকার ও শাসকের জবাবদিহিতা: একটি তুলনামূলক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ (Public Rights and Ruler's Accountability)
একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক বা কল্যাণ রাষ্ট্রে জনগণের অন্যতম প্রধান অধিকার হলো শাসকের কাজের সমালোচনা করা এবং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। পশ্চিমা রাষ্ট্রদর্শনে এই অধিকারটি দীর্ঘ সংগ্রামের পর অর্জিত হয়েছে। কিন্তু নববী শাসনব্যবস্থায় এই অধিকারটিকে কেবল একটি রাজনৈতিক অধিকার হিসেবেই গণ্য করা হয়নি, বরং একে একটি ধর্মীয় কর্তব্য এবং 'জিহাদ'-এর সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা. ঘোষণা করেছেন:
أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍঅনুবাদ: "অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য ও ন্যায়ের কথা বলাই হলো সর্বোত্তম জিহাদ।" [9] ।
এই ঘোষণার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. নাগরিক সমাজকে (Civil Society) শাসকের অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক প্রেরণা প্রদান করেন। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে যেখানে ভিন্নমতাবলম্বীদের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা নির্বাসনের বিধান ছিল [10] , সেখানে মদিনা রাষ্ট্রে সাধারণ নাগরিকগণও সরাসরি রাসুলুল্লাহ সা.-এর নিকট এসে তাঁদের অধিকারের দাবি জানাতে পারতেন এবং রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত ধৈর্য ও সহানুভূতির সাথে তা শ্রবণ করতেন।
মদিনা সনদের (Constitution of Madinah) মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার সকল গোত্র, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের জন্য সমান নাগরিক অধিকার এবং সম্মিলিত নিরাপত্তার গ্যারান্টি প্রদান করেছিলেন। এই সনদের মাধ্যমে আইনের শাসন (Rule of Law) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে কোনো অপরাধী তার গোত্রীয় বা সামাজিক মর্যাদার কারণে শাস্তি থেকে রেহাই পেত না। কুরাইশ বংশের মাখজুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী যখন চুরির অপরাধে দণ্ডিত হয়, তখন উসামা বিন যায়েদ রা. তার শাস্তি মওকুফের জন্য সুপারিশ করতে আসলে রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, "তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহ ধ্বংস হয়ে গেছে কারণ যখন তাদের কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করত তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত, আর যখন কোনো দুর্বল ব্যক্তি চুরি করত তখন তারা তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম" [11] ।
আইনের শাসনের এই চরম পরাকাষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার এই অনন্য মডেলই মদিনা রাষ্ট্রকে একটি বিশৃঙ্খল সমাজ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। নববী গুড গভর্নেন্সের এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি কেবল তৎকালীন আরবের জন্যই প্রযোজ্য ছিল না, বরং এটি কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানব সভ্যতার জন্য সুশাসন ও জবাবদিহিতার এক শাশ্বত ও অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।