খণ্ড 5
ফন্ট:100%
থিম:

১২.২ বক্ষ বিদারণ নিয়ে ওরিয়েন্টালিস্টদের ডায়াগনোসিস: এপিলেপ্সি (Epilepsy) বা মৃগীরোগের ভিত্তিহীন দাবির ক্লিনিক্যাল ও ঐতিহাসিক খণ্ডন

১২.২ বক্ষ বিদারণ নিয়ে ওরিয়েন্টালিস্টদের ডায়াগনোসিস: এপিলেপ্সি (Epilepsy) বা মৃগীরোগের ভিত্তিহীন দাবির ক্লিনিক্যাল ও ঐতিহাসিক খণ্ডন

নবুওয়াতের প্রাক-লক্ষণ বা 'ইরহাসাত' (إرهاصات) হিসেবে নবি কারিম সা.-এর বক্ষ বিদারণের ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক মোড়। তবে আধুনিক যুগের অনেক ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবিদ এই অতিপ্রাকৃত ঘটনাটিকে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের মাপকাঠিতে বিচার করতে ব্যর্থ হয়ে একে একটি 'প্যথোলোজিক্যাল' বা রোগতাত্ত্বিক ঘটনার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে, বক্ষ বিদারণের সময় নবি সা.-এর সংজ্ঞায়িত শারীরিক অবস্থার বর্ণনাকে তারা 'এপিলেপ্সি' (Epilepsy) বা মৃগীরোগের লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করার এক দুঃসাহসিক ও ভিত্তিহীন দাবি উত্থাপন করেছেন। এই দাবির মূল লক্ষ্য ছিল ওহীর উৎসকে খোদায়ী প্রত্যাদেশ থেকে সরিয়ে এনে একে একটি মানসিক বা স্নায়বিক ব্যাধির ফল হিসেবে উপস্থাপন করা।

বক্ষ বিদারণের ঐতিহাসিক বিবরণ ও ওরিয়েন্টালিস্টদের ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি

বক্ষ বিদারণের ঘটনাটি নবি সা.-এর শৈশবে এবং পরবর্তীতে নবুওয়াতের প্রারম্ভে ও মেরাজের রাতে সংঘটিত হয়েছিল। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবি সা. যখন বালকদের সাথে খেলা করছিলেন, তখন জিবরাঈল আ. এসে তাঁকে ধরা এবং তাঁর বক্ষ বিদারণ করেন। এই ঘটনার মূল আরবি ইবারতটি নিম্নরূপ:

روى مسلم عن أنس بن مالك: أن رسول الله صلى الله عليه وسلم أتاه جبريل عليه السلام - وهو يلعب مع الغلمان - فأخذه فصرعه فشق عن قلبه فاستخرج القلب، فاستخرج... [1] .

ওরিয়েন্টালিস্টরা এই বর্ণনার মধ্যে ব্যবহৃত 'ফাসারআহু' (فصرعه) শব্দটিকে, যার অর্থ 'তাকে ধরা বা ফেলে দেওয়া', ক্লিনিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গিতে 'সিজার' (Seizure) বা মৃগীরোগের খিঁচুনির সাথে তুলনা করেছেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, একজন শিশু যখন হঠাৎ করে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে বা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তবে তা স্নায়বিক উত্তেজনা বা এপিলেপটিক অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। তারা যুক্তি দেন যে, বক্ষ বিদারণের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা মূলত একটি হ্যালুসিনেশন বা দৃষ্টিভ্রম, যা মৃগীরোগের জটিল পর্যায়ে দেখা দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি মূলত 'রিডাকশনিজম' (Reductionism) বা সবকিছুকে বস্তুগত উপাদানে সংকুচিত করার একটি প্রচেষ্টা, যেখানে আধ্যাত্মিকতাকে অস্বীকার করে শরীরতত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়।

তবে এই দাবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, বক্ষ বিদারণের ঘটনাটি কেবল নবি সা.-এর ব্যক্তিগত অনুভূতি ছিল না, বরং এটি ছিল বাহ্যিক ও দৃশ্যমান একটি ঘটনা। তাঁর সাথী বালকরা এই ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তারা আতঙ্কিত হয়ে তাঁর অভিভাবকদের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন [2] । মৃগীরোগের খিঁচুনি একটি অভ্যন্তরীণ স্নায়বিক প্রক্রিয়া, যা বাইরের কোনো সত্তার দ্বারা পরিচালিত হয় না এবং এর ফলে বক্ষ বিদারণের মতো কোনো বাহ্যিক অস্ত্রোপচার সদৃশ পরিবর্তন ঘটে না। সুতরাং, একটি ব্যক্তিগত শারীরিক অসুস্থতাকে সমষ্টিগত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সাথে মেলানো ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব এবং অযৌক্তিক।

ক্লিনিক্যাল বিশ্লেষণ: এপিলেপ্সি বনাম বক্ষ বিদারণ

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এপিলেপ্সি বা মৃগীরোগের লক্ষণগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন এবং তার শরীরের পেশিগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংকুচিত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খিঁচুনির পর রোগী একটি 'পোস্ট-ইক্টাল' (Post-ictal) অবস্থায় প্রবেশ করেন, যেখানে তিনি চরম বিভ্রান্তি, স্মৃতিভ্রংশ এবং মানসিক অবসাদ অনুভব করেন। কিন্তু বক্ষ বিদারণের ঘটনার পর নবি সা.-এর মধ্যে এমন কোনো ক্লিনিক্যাল লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়নি। বরং তিনি পূর্বের মতোই স্বাভাবিক এবং অত্যন্ত সচেতন অবস্থায় ফিরে এসেছিলেন।

ওরিয়েন্টালিস্টদের দাবি খণ্ডন করার জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই ঘটনার উদ্দেশ্য। বক্ষ বিদারণের মূল লক্ষ্য ছিল হৃদয়ের ভেতর থেকে শয়তানের অংশ বা একটি কালো দাগ অপসারণ করা, যা নবি সা.-কে নিষ্পাপ এবং পবিত্র করার একটি ঐশ্বরিক প্রক্রিয়া ছিল। এই প্রক্রিয়াটি ছিল একটি 'স্পিরিচুয়াল সার্জারি' বা আধ্যাত্মিক অস্ত্রোপচার। মৃগীরোগের কোনো উদ্দেশ্য থাকে না, এটি কেবল একটি অনিচ্ছাকৃত স্নায়বিক ত্রুটি। অন্যদিকে, বক্ষ বিদারণ ছিল একটি সুপরিকল্পিত ঐশ্বরিক প্রস্তুতি। এই ঘটনার পর নবি সা.-এর ব্যক্তিত্বে যে উৎকর্ষতা এবং চারিত্রিক বিশুদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়েছে, তা কোনো স্নায়বিক রোগের ফল হতে পারে না। বরং এটি ছিল নবুওয়াতের জন্য তাঁর আত্মিক ও শারীরিক পরিশুদ্ধিকরণ।

তাছাড়া, এপিলেপটিক সিজার বা মৃগীরোগের খিঁচুনির সময় কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হন না। কিন্তু বক্ষ বিদারণের ঘটনাটি ছিল জিবরাঈল আ.-এর মতো একজন ফেরেশতার দ্বারা পরিচালিত একটি সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম। এখানে 'ফাসারআহু' (ফেলে দেওয়া) শব্দটি ছিল জিবরাঈল আ.-এর আধিপত্য এবং ঐশ্বরিক আদেশের বাস্তবায়ন, কোনো রোগতাত্ত্বিক খিঁচুনি নয়। ক্লিনিক্যালি, মৃগীরোগের রোগী কখনোই এমন কোনো অভিজ্ঞতার কথা বলেন না যা অন্য মানুষরা বাহ্যিকভাবে প্রত্যক্ষ করে এবং যা একটি নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক লক্ষ্য পূরণ করে।

ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও ওরিয়েন্টালিস্টদের যুক্তির অসারতা

বক্ষ বিদারণের ঘটনাটি কেবল একবার ঘটেনি, বরং এটি বিভিন্ন পর্যায়ে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, এটি কোনো আকস্মিক রোগ ছিল না, বরং একটি ধারাবাহিক ঐশ্বরিক পরিকল্পনা। সীরাত ইবনে হিশাম এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে উল্লেখ আছে যে, এই ঘটনাটি নবুওয়াতের প্রারম্ভে এবং মেরাজের রাতে পুনরায় সংঘটিত হয়েছিল। এই বিষয়ে বলা হয়েছে:

وقد تكرر شق الصدر الشريف غير هذه المرة، فقد حصل مرة ثانية عند المبعث... ومرة ثالثة عند الإسراء والمعراج، وهذه المرة ثابتة بالأحاديث... [3] .

যদি এটি মৃগীরোগ হতো, তবে এর লক্ষণগুলো হতো অনিয়মিত এবং রোগটি সময়ের সাথে সাথে আরও জটিল আকার ধারণ করত। কিন্তু বক্ষ বিদারণের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক সন্ধিক্ষণে। নবুওয়াতের শুরুতে এবং মেরাজের মতো মহাজাগতিক ভ্রমণের আগে হৃদয়ের এই পরিশুদ্ধিকরণ ছিল অপরিহার্য। এটি প্রমাণ করে যে, এই ঘটনাটি ছিল 'মেটাফিজিক্যাল' বা পরাবাস্তবিক, যা জাগতিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আওতার বাইরে।

ওরিয়েন্টালিস্টরা যখন একে মৃগীরোগ বলেন, তখন তারা এই ধারাবাহিকতাকে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হন। কারণ, মৃগীরোগের খিঁচুনি কোনো নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক লক্ষ্য বা মহাজাগতিক ঘটনার সাথে সংগতিপূর্ণ হয় না। মেরাজের রাতে বক্ষ বিদারণের উদ্দেশ্য ছিল হৃদয়ে ঈমান ও প্রজ্ঞার আলো প্রবেশ করানো, যা একজন মৃগীরোগীর ক্ষেত্রে অসম্ভব। এই পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে, এটি ছিল নবি সা.-এর জন্য একটি বিশেষ প্রস্তুতিমূলক প্রক্রিয়া, যা তাঁকে মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রস্তুত করার জন্য আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করেছিলেন [4]

তাত্ত্বিক খণ্ডন ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

ওরিয়েন্টালিস্টদের এই ডায়াগনোসিস মূলত একটি 'সাইকোলজিক্যাল প্রজেকশন', যেখানে তারা অলৌকিকতাকে অস্বীকার করার জন্য তাকে রোগতত্ত্বের খামে বন্দি করতে চায়। তারা ভুলে যান যে, ইতিহাস কেবল বস্তুগত প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং ঘটনার সামগ্রিক প্রভাবের ওপরও নির্ভরশীল। বক্ষ বিদারণের পর নবি সা.-এর যে অসামান্য স্মৃতিশক্তি, প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে, তা কোনো মৃগীরোগীর ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। বরং মৃগীরোগ মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাস করে, কিন্তু নবি সা.-এর ক্ষেত্রে আমরা দেখি এক অতুলনীয় মানসিক উৎকর্ষতা।

ঐতিহাসিকভাবে, বক্ষ বিদারণের ঘটনাটি ছিল 'ইরহাসাত' বা নবুওয়াতের প্রাক-সংকেত। এটি প্রমাণ করে যে, নবি সা. জন্মগতভাবেই এবং শৈশব থেকেই আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধানে ছিলেন। ওরিয়েন্টালিস্টদের এপিলেপ্সির দাবিটি কেবল ক্লিনিক্যালি ভুল নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবেও ভিত্তিহীন। তারা ঘটনার বাহ্যিক রূপ (ফেলে দেওয়া) দেখে তার অভ্যন্তরীণ সারমর্ম (পরিশুদ্ধিকরণ) বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। এই ঘটনাটি ছিল একটি ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ, যা নবি সা.-এর মানবিয় সীমাবদ্ধতাকে দূর করে তাঁকে রব্বানী প্রজ্ঞার যোগ্য করে তোলার একটি প্রক্রিয়া।

পরিশেষে বলা যায় না, বরং এটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বক্ষ বিদারণের ঘটনাটি কোনো রোগতাত্ত্বিক ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং এটি ছিল এক মহান নবুওয়াতের মহিমান্বিত সূচনা। ওরিয়েন্টালিস্টদের এই দাবি কেবল একাডেমিক দুর্বলতা নয়, বরং এটি ছিল একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা, যা নবি সা.-এর পবিত্রতাকে খাটো করার চেষ্টা করে। তবে সত্যের আলোতে এই দাবিগুলো আজ সম্পূর্ণভাবে খণ্ডিত এবং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। বক্ষ বিদারণের ঘটনাটি আজও মুমিনদের কাছে এক পরম বিশ্বাসের প্রতীক এবং নবি সা.-এর নিষ্পাপত্বের এক উজ্জ্বল দলিল।

""
১২.২ বক্ষ বিদারণ নিয়ে ওরিয়েন্টালিস্টদের ডায়াগনোসিস: এপিলেপ্সি (Epilepsy) বা মৃগীরোগের ভিত্তিহীন দাবির ক্লিনিক্যাল ও ঐতিহাসিক খণ্ডন
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১২.২ বক্ষ বিদারণ নিয়ে ওরিয়েন্টালিস্টদের ডায়াগনোসিস: এপিলেপ্সি (Epilepsy) বা মৃগীরোগের ভিত্তিহীন দাবির ক্লিনিক্যাল ও ঐতিহাসিক খণ্ডন কুইজ

1 / 5

ওরিয়েন্টালিস্টরা রাসুল (সা.)-এর বক্ষ বিদারণ ও ওহী নাজিলের ঘটনাকে কোন রোগ বলে দাবি করে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...