খণ্ড 35
ফন্ট:100%
থিম:

৩.২.২ কল্যাণ রাষ্ট্র (Welfare State) মডেল: খুমুসের মাধ্যমে এতিম, বিধবা এবং অভাবীদের সোশ্যাল সেফটি নেট (Social Safety Net) তৈরি

৩.২.২ কল্যাণ রাষ্ট্র (Welfare State) মডেল: খুমুসের মাধ্যমে এতিম, বিধবা এবং অভাবীদের সোশ্যাল সেফটি নেট (Social Safety Net) তৈরি

মানব সভ্যতার ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিবর্তনে 'কল্যাণ রাষ্ট্র' বা 'Welfare State'-এর ধারণাটি একটি অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক বিষয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায়, একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হলো সেই ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। সপ্তম শতাব্দীতে মদিনার রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নবি সা.-এর প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামরিক কাঠামো ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত ও বৈপ্লবিক 'Social Safety Net' বা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। এই নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্যতম প্রধান আর্থিক স্তম্ভ ছিল 'খুমুস' (Khumus) বা সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ বণ্টন পদ্ধতি। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্র অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এতিম, বিধবা এবং সমাজের প্রান্তিক ও অভাবী শ্রেণির জন্য একটি টেকসই অর্থনৈতিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছিল, যা তৎকালীন বিশ্বের অন্যান্য সমসাময়িক সাম্রাজ্যগুলোর তুলনায় অধিকতর ন্যায়বিচারভিত্তিক ও মানবিক ছিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাচীন গ্রিস বা এথেন্সের মতো উন্নত সভ্যতাগুলোতেও সামাজিক সহায়তার কিছু প্রচেষ্টা ছিল। তবে তাদের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং রাজনৈতিক স্বার্থে কলুষিত। এথেন্সের 'Dheoric Fund' বা সামাজিক তহবিল ব্যবস্থাটি ছিল মূলত একটি শ্রেণিবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা, যেখানে এক শ্রেণির সম্পদ অন্য শ্রেণিতে হস্তান্তরের মাধ্যমে একটি

"جمعية تعاونية خيرية تأخذ المال من إحدى الطبقات لتُنفقه على طبقة أخرى"

(এমন একটি দাতব্য সমবায় সমিতি যা এক শ্রেণির কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে অন্য শ্রেণির ওপর ব্যয় করে) [1] তৈরি করা হয়েছিল। এই ধরনের ব্যবস্থা প্রায়শই রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্নীতির শিকার হতো। পক্ষান্তরে, নবি সা.-এর খুমুস ভিত্তিক মডেলটি ছিল একটি সুসংগঠিত

"دولة الرفاهية الاجتماعية"

(সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র) [2] -এর প্রকৃত প্রতিফলন, যেখানে সম্পদের উৎস ছিল সুনির্দিষ্ট এবং এর বণ্টন ছিল সরাসরি ঐশ্বরিক নির্দেশিত ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।

খুমুস: একটি বৈপ্লবিক রাজস্ব ও সামাজিক পুনর্বণ্টনকরণ কৌশল

খুমুস বা সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ প্রদানের বিধানটি কেবল একটি কর ব্যবস্থা ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রের কোষাগার এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত কৌশল। যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বা অন্যান্য বিশেষ উৎস থেকে প্রাপ্ত সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা হতো, যার একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও অবহেলিত শ্রেণির জন্য বরাদ্দ করা হতো। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্র একটি শক্তিশালী 'Fiscal Instrument' বা আর্থিক হাতিয়ার তৈরি করেছিল, যা সমাজের সম্পদকে কেবল মুষ্টিমেয় ধনীদের হাতে কুক্ষিগত হতে দেয়নি, বরং তা পুনরায় সমাজের নিম্নবিত্তের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।

প্রাচীন চীন বা রোমান সাম্রাজ্যের রাজস্ব ব্যবস্থার সাথে তুলনা করলে খুমুস ব্যবস্থার অনন্যতা আরও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। চীনের বিভিন্ন রাজবংশের শাসনামলে অনেক সময় করের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর অসহনীয় হয়ে উঠত, যা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক অস্থিরতা ও বিদ্রোহের জন্ম দিত [3] । এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে জনগণের সম্পদ লুণ্ঠিত হতো। কিন্তু নবি সা.-এর মদিনা রাষ্ট্রে খুমুস এবং যাকাতের মাধ্যমে যে রাজস্ব কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং এর মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রের কোষাগার কেবল সামরিক বা প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহ করত না, বরং এটি ছিল একটি 'Social Development' বা সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।

ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, খুমুস ব্যবস্থাটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। যখন রাষ্ট্র নিশ্চিত করে যে তার নাগরিকদের—বিশেষ করে এতিম ও বিধবাদের—মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা হচ্ছে, তখন সমাজে অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পায় এবং সামাজিক সংহতি (Social Cohesion) বৃদ্ধি পায়। এটি একটি 'Collective Security' বা সামষ্টিক নিরাপত্তার ধারণা প্রদান করে, যেখানে সমাজের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকে কারণ তারা জানে যে বিপদের সময় রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াবে। এই মডেলটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'Social Welfare' বা সামাজিক কল্যাণের ধারণাকে প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে বাস্তবে রূপদান করেছিল।

এতিম ও বিধবাদের সুরক্ষা: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রভাব

নবি সা.-এর কল্যাণ রাষ্ট্র মডেলের সবচেয়ে মানবিক দিকটি ছিল এতিম, বিধবা এবং অসহায় নারীদের প্রতি রাষ্ট্রের বিশেষ মনোযোগ। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সামাজিক বিপর্যয়ে এতিম ও বিধবাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া ছিল একটি অনিবার্য বাস্তবতা। এই গোষ্ঠীগুলো ছিল সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ (Vulnerable) অংশ। খুমুস এবং অন্যান্য সামাজিক তহবিলের মাধ্যমে রাষ্ট্র তাদের জন্য একটি স্থায়ী 'Social Safety Net' বা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছিল। এটি কেবল তাদের খাদ্যের জোগান দিত না, বরং তাদের সামাজিক মর্যাদা ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করতেও সাহায্য করত।

মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখন একজন এতিম বা বিধবা রাষ্ট্রীয় সহায়তার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে তার এবং তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত, তখন তার মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা চরম হতাশা তৈরি হয় না। এটি তাদের সমাজের মূলধারার সাথে যুক্ত থাকতে উৎসাহিত করে। আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় বলা হয়েছে যে, সামাজিক কাজ বা 'Social Work' তখনই সফল হয় যখন তা প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে ব্যক্তির জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখে [4] । নবি সা.-এর মদিনা রাষ্ট্রে এই সামাজিক কাজ কোনো করুণা বা দয়ার বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রের একটি আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা।

প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় দেখা যেত, অনেক সময় কর আদায়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ কেবল প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা ব্যয়েই ব্যয় হতো, যা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াত [5] । কিন্তু মদিনার মডেলে খুমুস ও যাকাতের মাধ্যমে সংগৃহীত সম্পদ সরাসরি মানুষের কল্যাণে ফিরিয়ে দেওয়া হতো। এই প্রক্রিয়াটি সমাজের মানুষের মধ্যে একটি গভীর বিশ্বাস তৈরি করেছিল যে, রাষ্ট্র তাদের শত্রু নয়, বরং তাদের অভিভাবক। এই বিশ্বাসটিই ছিল মদিনা রাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি।

সামাজিক সংহতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ

কল্যাণ রাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করা এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখা। নবি সা.-এর খুমুস ভিত্তিক মডেলটি এই লক্ষ্য অর্জনে অত্যন্ত কার্যকর ছিল। সম্পদের এই সুষম বণ্টন ব্যবস্থা সমাজের ধনী ও দরিদ্র শ্রেণির মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেছিল। যখন সম্পদ কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তখন সমাজে শ্রেণিবিভাগ বা Class Conflict বা শ্রেণি সংঘাতের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।

চীনের সং (Song) রাজবংশের সময় দেখা গিয়েছিল যে, মুদ্রণ শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসার ঘটেছিল, যা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে সাহায্য করেছিল [6] । একইভাবে, মদিনা রাষ্ট্রে খুমুস ও যাকাতের মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ফলে মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পেয়েছিল। রাষ্ট্র যখন মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তখন মানুষ সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল কাজে বেশি মনোনিবেশ করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।

পরিশেষে বলা যায়, নবি সা.-এর প্রবর্তিত কল্যাণ রাষ্ট্র মডেলটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত ব্যবস্থা। এটি কেবল দারিদ্র্য বিমোচন করেনি, বরং একটি ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। খুমুস ব্যবস্থার মাধ্যমে এতিম, বিধবা এবং অভাবীদের জন্য যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছিল, তা ছিল তৎকালীন বিশ্বের জন্য এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। এই মডেলটি প্রমাণ করে যে, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কেবল তার সামরিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে না, বরং তার নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। এই ঐতিহাসিক শিক্ষাটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'Welfare State' এবং 'Social Justice' বা সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণার জন্য আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক।

""
৩.২.২ কল্যাণ রাষ্ট্র (Welfare State) মডেল: খুমুসের মাধ্যমে এতিম, বিধবা এবং অভাবীদের সোশ্যাল সেফটি নেট (Social Safety Net) তৈরি
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৩.২.২ কল্যাণ রাষ্ট্র (Welfare State) মডেল: খুমুসের মাধ্যমে এতিম, বিধবা এবং অভাবীদের সোশ্যাল সেফটি নেট (Social Safety Net) তৈরি কুইজ

1 / 5

খুমুসের (১/৫ অংশ) একটি বড় অংশ কাদের কল্যাণে ব্যয় করা হতো?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...