খণ্ড 91
ফন্ট:100%
থিম:

৭.২ মৈত্রেয় বুদ্ধের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য (Physical and Moral Attributes) এবং শামায়েলে মুস্তফার (Physical Anthropology) মিল

ভূমিকা ও তাত্ত্বিক পটভূমি: তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও শারীরিক নৃবিজ্ঞান (Physical Anthropology)


তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব (Comparative Religion) এবং ঐতিহাসিক নৃবিজ্ঞানের এক অতি কৌতূহলোদ্দীপক ও গভীর গবেষণার ক্ষেত্র হলো প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহে বর্ণিত ভবিষ্যৎ ত্রাণকর্তা বা মহাপুরুষদের শারীরিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ। বৌদ্ধ এস্ক্যাটোলজি বা পরকালবিদ্যায় 'মৈত্রেয়' (Maitreya) হলেন সেই পরম প্রতীক্ষিত বুদ্ধ, যিনি বর্তমান বুদ্ধ শাসন বা কল্পের অবসানে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হবেন এবং মানবজাতিকে সত্য, অহিংসা ও পরম মুক্তির পথ প্রদর্শন করবেন। অন্যদিকে, ইসলামি ঐতিহ্যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, শেষ নবি হযরত মুহাম্মাদ সা. হলেন সেই প্রতিশ্রুত ব্যক্তিত্ব, যাঁর শুভাগমন পূর্ববর্তী সকল প্রধান ধর্মে কোনো না কোনোভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের শারীরিক অবয়ব (Physical Anthropology) এবং নৈতিক সুষমার (Moral Attributes) তুলনামূলক বিশ্লেষণ কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের মেলবন্ধন ঘটায় না, বরং তা মানব ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতাকে উন্মোচিত করে। প্রাচীন সভ্যতার বিবর্তন এবং ধর্মীয় ধারণার প্রসারের ক্ষেত্রে এই ধরনের তুলনামূলক আলোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ [1]


বৌদ্ধ ঐতিহ্যে মৈত্রেয় বুদ্ধের যে শারীরিক ও নৈতিক রূপরেখা অঙ্কন করা হয়েছে, তা মূলত 'মহাপুরুষ লক্ষণ' (Mahapurusha Lakshana) বা বত্রিশটি প্রধান শারীরিক চিহ্নের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এই লক্ষণগুলো কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং তা আধ্যাত্মিক পূর্ণতা ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের বহিঃপ্রকাশ। একইভাবে, ইসলামি ঐতিহ্যে ইমাম তিরমিজি রহ. সংকলিত 'শামায়েলুত তিরমিজি' বা 'শামায়েলে মুস্তফা' গ্রন্থে অত্যন্ত নিখুঁত ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে রাসুলুল্লাহ সা. এর শারীরিক গঠন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিমাপ, গাত্রবর্ণ, চুল, হাঁটার গতি এবং সামগ্রিক অবয়বের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই দুই ধারার বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলা ও ধর্মীয় সাহিত্যে বর্ণিত মৈত্রেয় বুদ্ধের শারীরিক সৌন্দর্যের আদর্শ রূপটি ঐতিহাসিকভাবে রাসুলুল্লাহ সা. এর বাস্তব অবয়বের সাথে আশ্চর্যজনকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ [2]


মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি সমাজের ত্রাণকর্তার শারীরিক অবয়ব কেমন হবে, তা নিয়ে মানুষের অবচেতন মনে এক ধরনের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা থাকে। মৈত্রেয় বুদ্ধের শারীরিক ও নৈতিক গুণাবলীর এই বিবরণগুলো মূলত সেই পরম মানবেরই প্রতিচ্ছবি, যাঁর বাস্তব রূপায়ণ ঘটেছিল মক্কার মরুদ্যানে জন্ম নেওয়া মুহাম্মাদ সা. এর ব্যক্তিত্বে। এই অধ্যায়ে আমরা মৈত্রেয় বুদ্ধের চারিত্রিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সাথে শামায়েলে মুস্তফার নিখুঁত নৃবৈজ্ঞানিক মিলগুলো ঐতিহাসিক দলিল ও শাস্ত্রীয় প্রমাণের আলোকে বিশ্লেষণ করব।

মৈত্রেয় বুদ্ধের চারিত্রিক ও নৈতিক গুণাবলী (Moral Attributes of Maitreya)


মৈত্রেয় শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থই হলো 'মৈত্রী' বা সর্বজনীন ভালোবাসা ও করুণার আধার (The Compassionate One)। বৌদ্ধ শাস্ত্রমতে, মৈত্রেয় বুদ্ধ হবেন পরম দয়ালু, যিনি শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে জগতের সকল জীবের প্রতি অসীম করুণা প্রদর্শন করবেন। তাঁর এই নৈতিক চরিত্রটি সরাসরি কুরআনুল কারিমে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সা. এর 'রাহমাতুল লিল আলামিন' বা 'সৃষ্টিজগতের জন্য পরম করুণা' গুণের সাথে সমান্তরালভাবে মিলে যায়। বৌদ্ধ ঐতিহ্যের বিভিন্ন ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় মৈত্রেয় বুদ্ধের এই করুণাময় রূপটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে, যা তাঁর আধ্যাত্মিক জাগরণ ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক [3]


মৈত্রেয় বুদ্ধের অন্যতম প্রধান নৈতিক বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা এবং অহিংসার মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের দৃঢ় সংকল্প। তিনি কোনো রাজকীয় জাঁকজমক বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য ও আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করবেন। সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বিবরণগুলোতে আমরা দেখতে পাই, নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বেই মক্কার কুরাইশ সমাজ রাসুলুল্লাহ সা. কে 'আল-আমিন' বা পরম বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত করেছিল। আকাবার দ্বিতীয় বায়আতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মদিনার আনসারগণ যখন তাঁর হাতে হাত রেখে আনুগত্যের শপথ নিচ্ছিলেন, তখন তা কেবল একটি রাজনৈতিক চুক্তি ছিল না, বরং তা ছিল রাসুলুল্লাহ সা. এর অনন্য নৈতিক ও চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। সীরাত গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে:


«أبايعكم على أن تمنعوني مما تمنعون منه نساءكم وأبناءكم»

অর্থাৎ, "আমি তোমাদের থেকে এই মর্মে বায়আত নিচ্ছি যে, তোমরা আমাকে সেই সব বিষয় থেকে রক্ষা করবে, যা থেকে তোমরা তোমাদের নারী ও সন্তানদের রক্ষা করে থাকো।" [4] । এই ঐতিহাসিক শপথ প্রমাণ করে যে, তাঁর নৈতিক নেতৃত্ব ছিল আত্মত্যাগ ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা মৈত্রেয় বুদ্ধের প্রতিশ্রুত নৈতিক শাসনের সাথে হুবহু মিলে যায়।


এছাড়াও, মৈত্রেয় বুদ্ধের চরিত্রে ক্রোধের অনুপস্থিতি, ক্ষমাশীলতা এবং শত্রুর প্রতি সদাচরণের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা রাসুলুল্লাহ সা. এর তায়েফের ময়দানে প্রদর্শিত ক্ষমা এবং মক্কা বিজয়ের দিন সাধারণ ক্ষমার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের সাথে তুলনীয়। বৌদ্ধ শাস্ত্রের বিবরণ অনুযায়ী, মৈত্রেয় বুদ্ধের বাণী হবে অত্যন্ত প্রাঞ্জল, হৃদয়গ্রাহী এবং সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত, যা মানুষের মনের অন্ধকার দূর করবে। রাসুলুল্লাহ সা. এর জাওয়ামিউল কালিম বা সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ বাণী প্রদানের অলৌকিক ক্ষমতা এবং তাঁর মিষ্টভাষিতা এই নৈতিক বৈশিষ্ট্যেরই বাস্তব প্রতিফলন ঘটায়।

শামায়েলে মুস্তফা (সা.) এবং মৈত্রেয় বুদ্ধের শারীরিক অবয়বের (Physical Anthropology) তুলনামূলক বিশ্লেষণ


শারীরিক নৃবিজ্ঞানের (Physical Anthropology) দৃষ্টিকোণ থেকে মৈত্রেয় বুদ্ধের দৈহিক গঠন এবং শামায়েলে মুস্তফায় বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সা. এর অবয়বের মধ্যে গভীর ও সূক্ষ্ম সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে বুদ্ধের শারীরিক সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে যে সকল তমা বা উপমা ব্যবহার করা হয়েছে, তা মূলত প্রাচীন ভারতের শিল্পকলায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা (সিলন) এবং জাভার বোরোবুদুরে আবিষ্কৃত বুদ্ধের প্রাচীনতম ও সুন্দরতম মূর্তিগুলোতে তাঁর যে শারীরিক অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা অত্যন্ত সুসংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ দৈহিক গঠনের সাক্ষ্য দেয় [5]


বৌদ্ধ শাস্ত্রের বিবরণ অনুযায়ী, মৈত্রেয় বুদ্ধের গাত্রবর্ণ হবে উজ্জ্বল স্বর্ণাভ বা গৌরবর্ণ। শামায়েলে মুস্তফায় হযরত আনাস রা. এবং অন্যান্য সাহাবিদের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, রাসুলুল্লাহ সা. এর গাত্রবর্ণ ছিল শ্বেত-রক্তিম মিশ্রিত অত্যন্ত উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়। তিনি অতি দীর্ঘও ছিলেন না, আবার অতি খর্বও ছিলেন না, বরং ছিলেন মাঝারি গড়নের এক অনন্য পুরুষ। বৌদ্ধ শাস্ত্রে মৈত্রেয় বুদ্ধের চুলকে বর্ণনা করা হয়েছে কুঞ্চিত, ঘন এবং অত্যন্ত সুবিন্যস্ত হিসেবে। অন্যদিকে, শামায়েলে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সা. এর মোবারক চুল ছিল বাবরি দুলানো, যা সম্পূর্ণ সোজা বা অতিরিক্ত কোঁকড়ানো ছিল না, বরং ছিল মৃদু ঢেউখেলানো বা কুঞ্চিত। রেঙ্গুনের বিখ্যাত শোয়েডাগন প্যাগোডায় বুদ্ধের চুল বা কেশধাতু সংরক্ষণের যে ঐতিহ্য রয়েছে, তা প্রমাণ করে যে প্রাচীন অনুসারীগণ তাঁর শারীরিক অবয়বের এই অংশটিকে কতটা পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন [6] । ঠিক একইভাবে, ইসলামি ঐতিহ্যে রাসুলুল্লাহ সা. এর কর্তিত চুল মোবারক সাহাবিগণ অত্যন্ত যত্নের সাথে সংরক্ষণ করতেন, যা আজও মুসলিম উম্মাহর কাছে পরম শ্রদ্ধার বস্তু।


মৈত্রেয় বুদ্ধের দৈহিক বৈশিষ্ট্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর প্রশস্ত বক্ষদেশ এবং সুগঠিত কাঁধ। বৌদ্ধ শাস্ত্রে একে 'সিংহ-সদৃশ বক্ষ' বলে অভিহিত করা হয়েছে। শামায়েলে মুস্তফায় বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সা. ছিলেন প্রশস্ত বক্ষবিশিষ্ট (بعيد ما بين المنكبين) এবং তাঁর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান ছিল চওড়া [7] । তাঁর হাত ও পায়ের তালু ছিল অত্যন্ত নরম, মাংসল এবং আঙুলগুলো ছিল দীর্ঘ ও সুবিন্যস্ত। বৌদ্ধ ঐতিহ্যেও বুদ্ধের হাত ও পায়ের আঙুলগুলোর দীর্ঘতা এবং কোমলতাকে তাঁর মহাপুরুষ লক্ষণের অন্যতম প্রধান চিহ্ন হিসেবে গণ্য করা হয়। এই শারীরিক নৃবৈজ্ঞানিক মিলগুলো প্রমাণ করে যে, প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে যে আদর্শ শারীরিক অবয়বের কল্পনা করা হয়েছিল, তা মূলত রাসুলুল্লাহ সা. এর ঐতিহাসিক ও বাস্তব দৈহিক কাঠামোর সাথেই সর্বাধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রতীকী চিহ্ন ও দৈহিক লক্ষণাবলি: সীল অব প্রফেসি বনাম শ্রীবাৎস (Prophetic Marks)


প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যে মহাপুরুষদের চেনার জন্য কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক প্রতীক বা চিহ্নের (Prophetic Marks) উল্লেখ থাকে। বৌদ্ধ শাস্ত্রে বুদ্ধের বক্ষে বা শরীরে 'শ্রীবাৎস' (Shrivatsa) নামক একটি বিশেষ চিহ্নের কথা বলা হয়েছে, যা তাঁর আধ্যাত্মিক সার্বভৌমত্ব ও নবুয়তের প্রতীক। এই চিহ্নটি মূলত একটি পবিত্র গ্রন্থি বা সীলমোহরের মতো, যা তাঁর অনন্য মর্যাদাকে নির্দেশ করে। বৌদ্ধ শিল্পকলায় এবং জাতকের গল্পগুলোতে এই চিহ্নের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়, যা বুদ্ধের জীবনের অলৌকিক ঘটনা ও তাঁর আধ্যাত্মিক পূর্ণতার সাথে সম্পর্কিত [8]


ইসলামি ঐতিহ্যে এই প্রতীকী চিহ্নের হুবহু এবং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত প্রতিরূপ হলো 'খাতামুন নবুয়ত' বা নবুয়তের সীলমোহর। শামায়েলে মুস্তফায় বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সা. এর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে, বাম কাঁধের হাড়ের সামান্য নিচে একটি কবুতরের ডিমের মতো উঁচু মাংসপিণ্ড ছিল, যা ছিল লালচে আভাযুক্ত এবং তার ওপর কিছু চুল ছিল। এটিই ছিল তাঁর শেষ নবি হওয়ার অকাট্য শারীরিক প্রমাণ। পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের পণ্ডিতগণ, যেমন সালমান ফারসি রা. এবং বাহিরা রাহেব, এই সীলমোহর দেখেই তাঁকে চিনেছিলেন। দালায়েলুন নবুয়াহ গ্রন্থে ইমাম বায়হাকি রহ. এই সীলমোহরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং এর চাক্ষুষ প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন [9]


মৈত্রেয় বুদ্ধের কপালে 'উর্ণা' (Urna) নামক একটি উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় বিন্দুর কথা বলা হয়েছে, যা থেকে আলোকরশ্মি নির্গত হয়। শামায়েলে মুস্তফায় বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সা. এর কপাল মোবারক ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত এবং যখন তিনি রাগান্বিত হতেন বা আধ্যাত্মিক অবস্থায় থাকতেন, তখন তাঁর কপালে একটি রগ ভেসে উঠত, যা উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত হতো। তাঁর চেহারা মোবারক পূর্ণিমার চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করত। এই প্রতীকী ও দৈহিক লক্ষণগুলোর সাদৃশ্য কেবল রূপক নয়, বরং তা নির্দেশ করে যে প্রাচীন ঋষি ও ভাববাদীগণ আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে সেই শেষ মহাপুরুষের দৈহিক রূপটি অবলোকন করেছিলেন এবং তা তাঁদের শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন।

ভূ-রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: বিশ্বজনীন বার্তার মেলবন্ধন


মৈত্রেয় বুদ্ধের চারিত্রিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সাথে শামায়েলে মুস্তফার এই গভীর মিল কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এর পেছনে এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে। প্রাচীন রেশম পথ (Silk Road) এবং সমুদ্র বাণিজ্য পথের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশ, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যে নিবিড় সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ঘটেছিল, তার ফলে বৌদ্ধ ও ইসলামি সংস্কৃতির মধ্যে এক ধরনের মেলবন্ধন তৈরি হয় [10] । এই অঞ্চলের মানুষ যখন ইসলামের সংস্পর্শে আসে, তখন তারা রাসুলুল্লাহ সা. এর চরিত্র ও শারীরিক বর্ণনার মধ্যে তাদের প্রতীক্ষিত মৈত্রেয় বুদ্ধের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়।


বৌদ্ধ সংস্কৃতির এই বিশ্বজনীন বিস্তার শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে জাভা, সুমাত্রা, চীন ও জাপান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল [11] । এই বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলে ইসলামের দ্রুত প্রসারের অন্যতম মনস্তাত্ত্বিক কারণ ছিল এই যে, নবদীক্ষিত মুসলিমগণ রাসুলুল্লাহ সা. কে কোনো অপরিচিত বা ভিনদেশী নবি হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁদের নিজস্ব শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যে বর্ণিত পরম করুণাময় মৈত্রেয় বুদ্ধের বাস্তব রূপ হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সা. এর চরিত্রমাধুর্য, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন সংগ্রাম বৌদ্ধদের অহিংসা ও সাম্যের দর্শনের সাথে সম্পূর্ণ মিলে গিয়েছিল।


ফলশ্রুতিতে, এই তুলনামূলক নৃবৈজ্ঞানিক ও চারিত্রিক বিশ্লেষণটি তৎকালীন ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটিয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, সত্যের আলো কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ থাকে না। মৈত্রেয় বুদ্ধের চারিত্রিক সুষমা এবং শামায়েলে মুস্তফার দৈহিক লাবণ্যের এই অপূর্ব সমন্বয় মূলত মানবজাতির আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক পরম সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করে, যা যুগে যুগে মানুষকে এক পরম করুণাময় স্রষ্টার দিকে এবং তাঁর প্রেরিত শেষ আলোকবর্তিকার দিকে আহ্বান জানিয়েছে।

""
৭.২ মৈত্রেয় বুদ্ধের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য (Physical and Moral Attributes) এবং শামায়েলে মুস্তফার (Physical Anthropology) মিল
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৭.২ মৈত্রেয় বুদ্ধের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য (Physical and Moral Attributes) এবং শামায়েলে মুস্তফার (Physical Anthropology) মিল কুইজ

1 / 5

বৌদ্ধ ঐতিহ্যে মৈত্রেয় বুদ্ধের শারীরিক সৌন্দর্য বোঝাতে কোন পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...