খণ্ড 90
ফন্ট:100%
থিম:

২.১ তাওরাতের ডিউটেরনমি (Deuteronomy 18:18): "তাদের ভাইদের মধ্য থেকে তোমার মতো একজন নবি..."

ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা বা 'Prophetic Continuity' একটি অত্যন্ত জটিল ও গভীর আলোচনার বিষয়। আসমানী কিতাবসমূহের পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি যুগে আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নবি ও রাসুল প্রেরণ করেছেন। তবে তাওরাতের (Torah) অভ্যন্তরে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী বা 'Bisharat' বিদ্যমান রয়েছে, যা কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতির জন্য নয়, বরং একটি মহাজাগতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত প্রদান করে। ডিউটেরনমি বা দ্বিতীয় বিবরণী (Deuteronomy) গ্রন্থের ১৮:১৮ নম্বর আয়াতে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীটি মূলত সেই মহাজাগতিক পরিবর্তনের একটি প্রামাণিক দলিল। এই আয়াতটি কেবল মুসা (আ.)-এর পরবর্তী কোনো নবি আসার কথা বলে না, বরং সেই নবির পরিচয়, তাঁর বংশীয় উৎস এবং তাঁর বাণীর প্রকৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক তথ্য প্রদান করে।

তাওরাতের ভাষাতাত্ত্বিক ও শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ (Scriptural and Linguistic Analysis)

তাওরাতের এই ভবিষ্যদ্বাণীটি কেবল একটি সাধারণ ঘোষণা নয়, বরং এটি একটি ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতি। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'কিতাবুন নুবুওয়াত'-এ এই আয়াতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তাওরাতের এই অংশটি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ঘোষণা, যেখানে তিনি বনী ইসরাঈলের জন্য একজন নবির আগমনের কথা ব্যক্ত করেছেন। ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর উদ্ধৃতি অনুযায়ী, তাওরাতের মূল পাঠে বলা হয়েছে:

"سأُقيم لبني إسرائيل من إخوتهم نبيّاً مثلك، أجعل كلامي على فمه، كلكم يسمعون"

[1]

এই আরবি ইবারতটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয়। প্রথমত, "سأُقيم" (আমি প্রতিষ্ঠিত করব) শব্দটি একটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎকাল নির্দেশ করে, যা আল্লাহর অটল সংকল্পের প্রতীক। দ্বিতীয়ত, "نبيّاً مثلك" (তোমার মতো একজন নবি) অংশটি মুসা (আ.)-এর সাথে আগত নবির সাদৃশ্য ও মর্যাদার ইঙ্গিত দেয়। তৃতীয়ত, "أجعل كلامي على فمه" (আমি আমার বাণী তাঁর মুখে স্থাপন করব) বাক্যটি নবির ওহী বা ঐশ্বরিক বাণীর বাহক হওয়ার প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। এটি নির্দেশ করে যে, আগত নবি কোনো নিজস্ব মতবাদ প্রচার করবেন না, বরং তাঁর প্রতিটি শব্দ হবে সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহী, যা সমগ্র মানবজাতি শুনতে বাধ্য হবে।

এই শাস্ত্রীয় ঘোষণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি মুসা (আ.)-এর পরবর্তী নবিদের সাধারণ ধারার বাইরে একটি বিশেষ সত্তার অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়। সাধারণত বনী ইসরাঈলের নবিরা তাদের নিজেদের বংশধারা থেকেই আসতেন, কিন্তু এখানে একটি ভিন্নধর্মী কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। এই বাণীর গভীরতা বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, এটি কেবল একটি ধর্মীয় সংস্কার নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান বা 'Divine Legislation' প্রবর্তনের পূর্বলক্ষণ।

বংশীয় উৎস ও 'ইখওয়াত' (Brethren) শব্দের ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য

ডিউটেরনমি ১৮:১৮ আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত শব্দগুচ্ছ হলো "من إخوتهم" (তাদের ভাইদের মধ্য থেকে)। এই শব্দটির প্রয়োগে একটি সূক্ষ্ম অথচ অত্যন্ত গভীর তাত্ত্বিক পার্থক্য বিদ্যমান। যদি এই নবি বনী ইসরাঈলের নিজস্ব বংশধর হতেন, তবে সেখানে "من نسلهم" (তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে) বা "من بني إسرائيل" (বনী ইসরাঈলের মধ্য থেকে) শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হতো। কিন্তু তাওরাতের এই অকাট্য প্রমাণ বলছে যে, নবিটি হবেন তাদের 'ভাইদের' মধ্য থেকে।

ইসলামি ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, এখানে 'ভাই' বা 'ইখওয়াত' বলতে বনী ইসরাঈলের (যাকুব আ.-এর বংশধর) ভাই হিসেবে ইসমাইল (আ.)-এর বংশধর বা আরবের কথা বুঝানো হয়েছে। ইব্রাহিম (আ.)-এর দুই পুত্র ইসহাক (আ.) এবং ইসমাইল (আ.) ছিলেন পরস্পর ভাই। ইসহাক (আ.)-এর বংশধারা থেকে বনী ইসরাঈল উদ্ভূত হয়েছে, আর ইসমাইল (আ.)-এর বংশধারা থেকে আরবরা উদ্ভূত হয়েছে। সুতরাং, যখন তাওরাতা বলছে যে নবিটি তাদের 'ভাইদের' মধ্য থেকে আসবেন, তখন এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সেই নবি বনী ইসরাঈলের রক্তসম্পর্কীয় বংশধর হবেন না, বরং তাদের ভ্রাতৃপ্রতিম জাতি অর্থাৎ ইসমাইলীয় বংশধর বা আরবের মধ্য থেকে আসবেন।

[2]

এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি তৎকালীন ইহুদিদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। ইহুদিরা বিশ্বাস করত যে, তাদের পরবর্তী নবি অবশ্যই তাদের নিজস্ব গোত্র বা বংশের অন্তর্ভুক্ত হবেন। কিন্তু তাওরাতের এই ভবিষ্যদ্বাণীটি একটি বৈশ্বিক ও আন্তঃজাতিগত (Inter-ethnic) পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এটি নির্দেশ করে যে, নবুওয়াতের ধারাটি কেবল একটি নির্দিষ্ট বংশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা একটি বৃহত্তর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হবে। এই ভূ-রাজনৈতিক ও বংশীয় পরিবর্তনটিই মূলত ইসলামের বিশ্বজনীনতা বা 'Universality'-র ভিত্তি স্থাপন করে।

জ্ঞানতাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব: স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতির মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

তাওরাতের এই সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী থাকা সত্ত্বেও কেন বনী ইসরাঈল বা আহলে কিতাবগণ মুহাম্মাদ সা.-এর আগমনকে সানন্দে গ্রহণ করতে পারেননি? এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্ন। কুরআন মাজিদ এই পরিস্থিতির একটি চমৎকার বিশ্লেষণ প্রদান করেছে। সূরা আল-বাকারা-র ১৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءهُمْ وَإِنَّ فَرِيقاً مِّنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ"

[3]

আয়াতটির অর্থ হলো, যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাঁকে (মুহাম্মাদ সা.-কে) ঠিক তেমনিভাবে চিনতে পারে যেভাবে তারা তাদের নিজেদের সন্তানদের চেনে। অর্থাৎ, তাদের কাছে মুহাম্মাদ সা.-এর নবুওয়াতের প্রমাণাদি এবং তাওরাতের ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে তাঁর সাদৃশ্য এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, তা অস্বীকার করার কোনো যৌক্তিক অবকাশ ছিল না। তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) স্তর ছিল অত্যন্ত উন্নত; তারা তাঁর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানত।

তবে এই স্বীকৃতির বিপরীতে একটি প্রবল 'অস্বীকৃতি' বা 'Concealment' কাজ করছিল। তাদের এই অস্বীকৃতির মূল কারণ ছিল বংশীয় অহংকার এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা। যেহেতু মুহাম্মাদ সা. তাদের নিজস্ব বংশীয় উত্তরাধিকারী ছিলেন না, বরং তাদের 'ভাইদের' (আরবদের) মধ্য থেকে এসেছিলেন, তাই তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে তাঁকে মেনে নেওয়া ছিল অসম্ভব। তারা জানত যে, তাঁর আগমনের ফলে তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক একচেটিয়া আধিপত্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ফলে, সত্য জানার পরেও তারা তা গোপন করতে শুরু করে। এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বটি মূলত সত্যের প্রতি আনুগত্য বনাম গোষ্ঠীগত স্বার্থের চিরন্তন লড়াইকে ফুটিয়ে তোলে।

পরিশেষে, তাওরাতের ডিউটেরনমি ১৮:১৮ আয়াতটি কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং এটি একটি মহাজাগতিক মানচিত্র। এটি একদিকে যেমন মুসা (আ.)-এর উত্তরাধিকার বহনকারী একজন নবির আগমনের ঘোষণা দেয়, অন্যদিকে এটি বনী ইসরাঈলের গণ্ডি পেরিয়ে একটি নতুন জাতি ও নতুন জীবনবিধানের উত্থানের পথ প্রশস্ত করে। এই ভবিষ্যদ্বাণীটি প্রমাণ করে যে, নবুওয়াতের ধারাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ঐশ্বরিক ধারাবাহিকতা, যা ইব্রাহিমীয় ঐতিহ্যের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করেছে।

""
২.১ তাওরাতের ডিউটেরনমি (Deuteronomy 18:18): "তাদের ভাইদের মধ্য থেকে তোমার মতো একজন নবি..."
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

২.১ তাওরাতের ডিউটেরনমি (Deuteronomy 18:18): "তাদের ভাইদের মধ্য থেকে তোমার মতো একজন নবি..." কুইজ

1 / 5

ডিউটেরনমি ১৮:১৮ আয়াতে ব্যবহৃত 'سأُقيم' শব্দটি কী নির্দেশ করে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...