খণ্ড 87
ফন্ট:100%
থিম:

১৪.২৮ লিডারশিপ প্রোটোকল: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ক্রাইসিস মুহূর্তে রাষ্ট্রপ্রধানের ইকো-রেস্পনসিবিলিটি (Eco-responsibility)

১. পরিবেশগত বিপর্যয় ও রাষ্ট্রপ্রধানের তাত্ত্বিক দায়বদ্ধতা: ইসলামি দৃষ্টিকোণ


ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনের মূল ভিত্তি হলো খিলাফাহ বা প্রতিনিধিত্ব, যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান কেবল মানবসমাজের রাজনৈতিক শাসক নন, বরং সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের (Ecosystem) একজন অতন্দ্র প্রহরী ও ট্রাস্টি (Trustee)। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশগত সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রপ্রধানের এই দায়িত্বশীলতা আরও সংবেদনশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করে, যাকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় 'ইকো-রেস্পনসিবিলিটি' (Eco-responsibility) বা পরিবেশগত দায়বদ্ধতা বলা হয়। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর মদিনা রাষ্ট্রে এই পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার এক অনন্য প্রশাসনিক প্রোটোকল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি কেবল আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন না, বরং মদিনার প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষত পানি, চারণভূমি এবং বনাঞ্চল সংরক্ষণে কঠোর আইনি কাঠামো প্রণয়ন করেছিলেন। ইসলামি আইনশাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা রাষ্ট্রপ্রধানের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংবিধানিক কর্তব্য।

ঐতিহাসিক দলিলসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যখনই কোনো অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে, তখনই ইসলামি নেতৃত্ব অত্যন্ত দ্রুততার সাথে প্রশাসনিক ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায় এবং কূপসমূহ শুকিয়ে যায়, তখন তা কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা থাকে না, বরং তা সমগ্র মানব ও উদ্ভিদকুলের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই ধরনের সংকটে রাষ্ট্রপ্রধানের নিষ্ক্রিয় থাকার কোনো সুযোগ নেই। ঐতিহাসিক গ্রন্থ 'তذكرة أولي النهى والعرفان' এ উল্লেখ রয়েছে যে, সুদাইর অঞ্চলে যখন তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছিল এবং অধিকাংশ কূপের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল, তখন তা সমগ্র অঞ্চলের কৃষি ও উদ্ভিদকুলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল:

"وفيها غارت المياه بمنطقة سدير ونضب أكثر الآبار فأصبح السكان يكابدون مصاعب الحياة ومتاعب جمة ويعيشون ظروفًا قاسية جدًّا مما أدى إلى عطش الزروع وموت الخضروات وهلاك النخيل والأشجار"

অর্থাৎ, "এবং এই বছরে সুদাইর অঞ্চলের পানি ভূগর্ভে বিলীন হয়ে যায় এবং অধিকাংশ কূপ শুকিয়ে যায়। ফলে অধিবাসীরা জীবনের চরম কষ্ট ও সীমাহীন দুর্ভোগের মুখোমুখি হয় এবং অত্যন্ত কঠোর পরিস্থিতির মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে থাকে; যার ফলে ফসল তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে, শাকসবজি মারা যায় এবং খেজুরগাছ ও অন্যান্য বৃক্ষরাজি ধ্বংস হয়ে যায়।" [1] । এই ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম প্রোটোকল হলো ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধার এবং নাগরিকদের জীবনধারণের মৌলিক উপাদান সরবরাহ করা।

রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক প্রবর্তিত পরিবেশগত প্রোটোকলের মূল কথা ছিল যে, প্রাকৃতিক সম্পদ কোনো একক ব্যক্তির একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, বরং তা সমগ্র উম্মাহর যৌথ অধিকার। মদিনা রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে 'হিমা' বা সংরক্ষিত প্রাকৃতিক অঞ্চল ঘোষণা করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ অপরিহার্য। আধুনিক পরিবেশগত রাষ্ট্রনীতিতে যা 'Collective Security' বা যৌথ নিরাপত্তা নামে পরিচিত, তা মূলত রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক মদিনা সনদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত পরিবেশগত ও সামাজিক নিরাপত্তারই একটি সম্প্রসারিত রূপ। রাষ্ট্রপ্রধান যখন পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলায় নীতি নির্ধারণ করেন, তখন তাকে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষম বণ্টনের বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়, যা ইসলামি শরিয়তের অন্যতম প্রধান মাকাসিদ বা উদ্দেশ্য।

২. জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও ভূগর্ভস্থ ভারসাম্য রক্ষা: প্রশাসনিক প্রোটোকল


পানি হলো জীবনের উৎস এবং যেকোনো রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার মূল চালিকাশক্তি। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন বা অপব্যবহার যখন পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্রপ্রধানের ইকো-রেস্পনসিবিলিটি হলো কঠোর আইনি বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে জলসম্পদের অপচয় রোধ করা। ইসলামি আইনশাস্ত্রে পানির অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এমনকি প্রবাহিত নদীর তীরে বসে অজু করার সময়ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধানের প্রশাসনিক প্রোটোকলের মধ্যে অন্যতম হলো ভূগর্ভস্থ জলস্তরের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং এমন কোনো খনন বা নিষ্কাশন কাজ বন্ধ করা যা পরিবেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ঐতিহাসিক নথিপত্রে দেখা যায়, সৌদি আরবের বুরাইদাহ শহরে যখন অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে বা পানির তীব্র প্রবাহের কারণে শহরের চারপাশের পরিবেশ ও অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়েছিল, তখন রাষ্ট্র অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সরকারি ডিক্রি বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে সেখানে গভীর নলকূপ বা আর্টেসিয়ান কূপ খনন সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যাতে পানির স্তর এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা যায়:

"وفيها أعلنت الحكومة السعودية القرار رقم ٣٨٩ بتاريخ ١٥/ ٨ بمنع أعمال الحفر لأبيار إرتوازية حتى تنظر في شأن المياه لما أصبحت المياه لغزارتها تهدد بالأخطار المحيطة في مدينة بريدة"

অর্থাৎ, "এবং এই বছরে সৌদি সরকার ১৫/৮ তারিখে ৩৮৯ নম্বর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আর্টেসিয়ান কূপ খননের কাজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, যতক্ষণ না পানির সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়; যেহেতু পানির অতিরিক্ত প্রাচুর্য বুরাইদাহ শহরের চারপাশের পরিবেশকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।" [2] । এই সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করে যে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে রাষ্ট্রপ্রধান যেকোনো ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক উদ্যোগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন, যা আধুনিক পরিবেশগত আইনের 'Precautionary Principle' বা সতর্কতামূলক নীতির সাথে হুবহু মিলে যায়।

রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার বিভিন্ন উপত্যকা, যেমন মাহজুর ও মুদাইনিবের পানি বণ্টন নিয়ে যে ঐতিহাসিক ফয়সালা দিয়েছিলেন, তা ছিল জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, পানির ওপরের অংশের মালিকরা প্রথমে তাদের ফসল সেচ করবে এবং পানি যখন টাখনু পর্যন্ত পৌঁছাবে, তখন তারা তা নিচের অংশের মালিকদের জন্য ছেড়ে দেবে। এই প্রোটোকলটি কেবল পানির সুষম বণ্টনই নিশ্চিত করেনি, বরং মাটির আর্দ্রতা রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বজায় রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। রাষ্ট্রপ্রধানের এই ধরনের পরিবেশগত সিদ্ধান্তসমূহ কেবল তাৎক্ষণিক সংকটের সমাধান করে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ও নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা প্রদান করে।

৩. দুর্যোগ মোকাবিলায় কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন: একটি আধুনিক ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা


প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পরিবেশগত সংকট যখন কোনো রাষ্ট্রের সীমানায় আঘাত হানে, তখন কেবল আবেগ বা ঐতিহ্যগত উপায়ে তা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কারিগরি দক্ষতা এবং বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স বা কমিটি। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর শাসন আমলে যেকোনো জটিল সামাজিক বা প্রাকৃতিক সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। খন্দকের যুদ্ধে সালমান আল-ফারসি রা. এর পরামর্শে পরিখা খনন কিংবা মদিনার কৃষি ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রপ্রধানের ইকো-রেস্পনসিবিলিটির একটি বড় অংশ হলো পরিবেশগত সংকট নিরসনে সঠিক বিশেষজ্ঞদের নিযুক্ত করা এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন করা।

ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখতে পাই, যখন কোনো শহরের মাটির ঘরবাড়ি পানির চুইয়ে পড়া বা লিকেজের কারণে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল, তখন তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান স্বাস্থ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছিলেন। কাদা ও খড় দিয়ে তৈরি ঘরবাড়ির ভিত্তি যাতে পানির কারণে নষ্ট না হয়, সে জন্য বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই সমস্যার সমাধান খোঁজা হয়েছিল:

"فأمر جلالة الملك بإرسال لجنة تتكون من وزير الصحة ووزير الزراعة يرافقهما خبراء فنيون وذلك لوضع حد لتسرب المياه التي أخذت كل عام تزداد وتهدد المدينة وليس هذا بالأمر الهين إذا كان بيوت المدينة من الطين والتّبن فإنَّه إذا ارتفع منسوب الماء إلى سطح الأرض فسيأتي على البيوت من قواعدها"

অর্থাৎ, "অতঃপর মহামান্য রাজা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি কমিটি প্রেরণের নির্দেশ দেন, যাদের সাথে ছিলেন কারিগরি বিশেষজ্ঞগণ; যাতে প্রতি বছর বৃদ্ধি পাওয়া পানির চুইয়ে পড়া বন্ধে একটি চূড়ান্ত সমাধান বের করা যায়, যা শহরকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। আর এটি কোনো সহজ বিষয় ছিল না, কারণ শহরের ঘরবাড়িগুলো ছিল কাদা ও খড় দিয়ে তৈরি। ফলে পানির স্তর যদি মাটির উপরিভাগে উঠে আসে, তবে তা ঘরবাড়িগুলোকে তাদের ভিত্তি থেকেই ধ্বংস করে দেবে।" [3]

এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, পরিবেশগত দুর্যোগ মোকাবিলায় রাষ্ট্রপ্রধানকে অবশ্যই বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পথ অবলম্বন করতে হবে। স্বাস্থ্য, কৃষি এবং কারিগরি খাতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ করা অসম্ভব। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার মহামারি বা প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চল থেকে যাতায়াত নিষিদ্ধ করে যে কোয়ারেন্টাইন প্রোটোকল দিয়েছিলেন, তাও ছিল মূলত চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামতেরই এক ঐশ্বরিক প্রতিফলন। আধুনিক যুগে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বহুমুখী দুর্যোগ মোকাবিলায় এই ধরনের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন এবং তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া রাষ্ট্রপ্রধানের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক দায়িত্ব।

৪. সামাজিক নিরাপত্তা ও যৌথ সহযোগিতা (Collective Security): দুর্যোগকালীন মানবিক প্রোটোকল


প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল পরিবেশের ক্ষতি করে না, বরং তা মানবসমাজে তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট সৃষ্টি করে। ফসলহানি, খরা বা বন্যার ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ধরনের ক্রাইসিস মুহূর্তে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব হলো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করা এবং বিত্তশালীদের উদ্বুদ্ধ করে একটি যৌথ সহযোগিতা বা 'Collective Security' নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনায় হিজরতের পর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যে 'মুয়াখাত' বা ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করেছিলেন, তা ছিল মূলত যেকোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করার একটি স্থায়ী সামাজিক নিরাপত্তা প্রোটোকল।

দুর্যোগের সময় দান-সদকা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা কেবল একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং তা দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সমাজকে রক্ষা করার একটি আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত হাতিয়ার। রাসুলুল্লাহ সা. এর একটি বিখ্যাত হাদিস এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যা দুর্যোগকালীন সময়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেয়:

"باكروا بالصدقة فإنَّ البلاء لا يتخطاها"

অর্থাৎ, "তোমরা সকাল সকাল সদকা করো, কারণ বিপদ বা দুর্যোগ সদকাকে অতিক্রম করতে পারে না।" [4] । এই হাদিসের আলোকে রাষ্ট্রপ্রধান দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথেই রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে ত্রাণ বিতরণ এবং বিত্তশালীদের মাধ্যমে সামাজিক সহায়তার হাত প্রসারিত করার নির্দেশ দেবেন।

ইসলামি ইতিহাসে দেখা যায়, সংকটের সময়ে ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ কেবল তাদের ব্যক্তিগত ভোগের বস্তু থাকে না, বরং তা জনকল্যাণে নিয়োজিত করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক নথিতে ধনীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে:

"وجاهدوا يا ذوي الأموال في سبيل الله ببناء المدارس والمساجد والمستشفيات وكفالة الأيتام وتشغيل العاطلين"

অর্থাৎ, "হে সম্পদশালীগণ! তোমরা আল্লাহর রাস্তায় বিদ্যালয়, মসজিদ ও হাসপাতাল নির্মাণ, এতিমদের লালন-পালন এবং বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে জিহাদ করো।" [5] । দুর্যোগের সময় যখন কর্মসংস্থান নষ্ট হয় এবং মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রপ্রধানের ইকো-রেস্পনসিবিলিটির অংশ হিসেবে এই ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা অপরিহার্য। খালিদ বিন উকবাহ এবং আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের ঐতিহাসিক দানশীলতার ঘটনাগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সংকটের সময়ে প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখা ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ [6]

৫. পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও টেকসই শাসননীতি: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ


টেকসই শাসননীতি বা Sustainable Governance-এর মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশকে নিরাপদ রাখা। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনা রাষ্ট্রে যে পরিবেশগত নীতিমালার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী ও বিজ্ঞানসম্মত। তিনি যুদ্ধের ময়দানেও শত্রু পক্ষের গাছপালা কাটা, ফসল ধ্বংস করা বা জলাশয় দূষিত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। এই নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ করে যে, চরম সংকটের মুহূর্তেও পরিবেশের ক্ষতি করা ইসলামি যুদ্ধনীতি ও রাষ্ট্রনীতির পরিপন্থী। রাষ্ট্রপ্রধানের ইকো-রেস্পনসিবিলিটি কেবল দুর্যোগের সময় সক্রিয় হওয়া নয়, বরং দুর্যোগ যাতে সৃষ্টি না হতে পারে সে জন্য পূর্বপ্রস্তুতিমূলক টেকসই নীতি গ্রহণ করা।

ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন বন্ধে সৌদি সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং সুদাইর অঞ্চলের খরা পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পানি সংরক্ষণ নীতি প্রণয়ন মূলত এই টেকসই শাসননীতিরই অংশ [7] । রাষ্ট্রপ্রধান যখন কোনো পরিবেশগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন তাকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হয়। ইসলামি আইনশাস্ত্রের একটি বিখ্যাত নীতি হলো:

"درء المفاسد مقدم على جلب المصالح"

অর্থাৎ, "ক্ষতি প্রতিরোধ করা কল্যাণ অর্জনের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।" এই নীতির আলোকে, যদি কোনো শিল্পকারখানা বা উন্নয়ন প্রকল্প পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে বা জনগণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, তবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব হলো সেই প্রকল্প বন্ধ বা সংশোধন করা, ঠিক যেভাবে বুরাইদাহ শহরে পানির অতিরিক্ত প্রবাহের কারণে কূপ খনন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল [8]

রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার চারপাশের চারণভূমি ও বনাঞ্চলকে 'হারাম' বা সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে সেখানে গাছ কাটা এবং শিকার করা নিষিদ্ধ করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক প্রোটোকলটি আধুনিক যুগের 'National Park' বা 'Bio-reserve' ধারণার আদি রূপ। রাষ্ট্রপ্রধানের ইকো-রেস্পনসিবিলিটি হলো এই ধরনের সংরক্ষিত অঞ্চল গড়ে তোলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও কারো হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে। এই নির্দেশনা প্রমাণ করে যে, পরিবেশ সংরক্ষণ কেবল একটি সাময়িক রাজনৈতিক এজেন্ডা নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন ইবাদত এবং রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য এটি একটি অলঙ্ঘনীয় প্রশাসনিক প্রোটোকল।

""
১৪.২৮ লিডারশিপ প্রোটোকল: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ক্রাইসিস মুহূর্তে রাষ্ট্রপ্রধানের ইকো-রেস্পনসিবিলিটি (Eco-responsibility)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১৪.২৮ লিডারশিপ প্রোটোকল: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ক্রাইসিস মুহূর্তে রাষ্ট্রপ্রধানের ইকো-রেস্পনসিবিলিটি (Eco-responsibility) কুইজ

1 / 5

ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে রাষ্ট্রপ্রধান মূলত প্রাকৃতিক পরিবেশের কী?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...