খণ্ড 88
ফন্ট:100%
থিম:

১৬.২ পরিশিষ্ট ১: প্রাচ্যবিদ স্কলারদের (যেমন: বার্নার্ড লুইস, উইলিয়াম মুইর, ইগনাজ গোল্ডজিহার) প্রধান অভিযোগ ও তার সংক্ষিপ্ত উত্তর

ইসলামি ইতিহাস ও হাদিস শাস্ত্রের গবেষণার ইতিহাসে প্রাচ্যবাদ বা 'ইস্তিশরাক' (Orientalism) একটি অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়। প্রাচ্যবিদদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা কেবল একাডেমিক অনুসন্ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত 'সভ্যতার সংঘাত' (الصراع الحضاري) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে [1] । তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামের দ্বিতীয় প্রধান উৎস—সুন্নাহ ও হাদিসকে আক্রমণ করার মাধ্যমে ইসলামের তাত্ত্বিক ও আইনি কাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়া [2] । বার্নার্ড লুইস, উইলিয়াম মুইর এবং ইগনাজ গোল্ডজিহারের মতো প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদরা হাদিস শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে যে সকল সংশয়বাদী প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, তা মূলত ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। এই পরিশিষ্টে তাদের প্রধান অভিযোগসমূহ এবং সেগুলোর বিপরীতে গবেষণাধর্মী ও তাত্ত্বিক উত্তরসমূহ উপস্থাপন করা হলো।

১. হাদিস রচনার সময়কাল ও প্রারম্ভিক দলিল সংক্রান্ত সংশয়বাদ

প্রাচ্যবিদদের অন্যতম প্রধান ও বহুল প্রচলিত অভিযোগ হলো যে, হাদিসসমূহ রাসুল সা.-এর যুগ বা সাহাবায়ে কেরামের যুগে লিখিত হয়নি, বরং তা অনেক পরে, বিশেষ করে হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথমার্ধে লিখিত হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, হাদিস রচনার এই বিলম্বের কারণে মূল ওণীর (Revelation) সাথে পরবর্তীকালের রাজনৈতিক ও সামাজিক রচনার মিশ্রণ ঘটে গেছে [3] । তারা মনে করেন, হাদিস রচনার এই দীর্ঘ ব্যবধানের ফলে রাসুল সা.-এর প্রকৃত বাণী ও পরবর্তীকালের উদ্ভাবিত বা জাল হাদিসের মধ্যে পার্থক্য করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে [4]

এই অভিযোগের পেছনে তাদের মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ছিল হাদিসকে একটি 'ঐতিহাসিক নির্মাণ' (Historical Construction) হিসেবে উপস্থাপন করা, যা রাসুল সা.-এর জীবদ্দশায় প্রতিষ্ঠিত ছিল না। তারা দাবি করেন যে, হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে যখন রাজনৈতিক মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে, তখন বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য হাদিস রচনা শুরু করে [5] । এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা হাদিস শাস্ত্রের বিশুদ্ধতাকে একটি কাল্পনিক ধারণা হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়।

তবে এই অভিযোগটি ঐতিহাসিক ও পদ্ধতিগতভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, রাসুল সা.-এর যুগ থেকেই সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীদের মধ্যে হাদিস মুখস্থ রাখা এবং তা লিখে রাখার (Sahifah) একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। যদিও পূর্ণাঙ্গ হাদিস গ্রন্থ সংকলনের প্রক্রিয়াটি পরবর্তীকালে সুসংগঠিত হয়েছে, কিন্তু হাদিসের মূল উপাদানসমূহ এবং তাদের মৌখিক ও লিখিত পরম্পরা অত্যন্ত সুসংহত ছিল। প্রাচ্যবিদরা যে 'বিলম্বিত রচনার' কথা বলেন, তা মূলত হাদিস সংকলনের পদ্ধতিগত বিবর্তনকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার একটি কৌশল মাত্র।

২. সনদ বা বর্ণনাসূত্রের (Isnad) কৃত্রিমতা ও গোল্ডজিহারের তত্ত্ব

হাদিস শাস্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ হলো 'সনদ' বা বর্ণনাসূত্র। কিন্তু ইগনাজ গোল্ডজিহার এবং জোসেফ শখত (Joseph Schacht)-এর মতো প্রাচ্যবিদরা এই সনদের ওপর এক ভয়াবহ আক্রমণ চালিয়েছেন। গোল্ডজিহার ও শখতের প্রধান দাবি হলো, হাদিসের সনদ বা বর্ণনাসূত্রগুলো মূলত একটি কৃত্রিম উদ্ভাবন (Artificial Invention)। তাদের মতে, হাদিসগুলোকে রাসুল সা.-এর সাথে যুক্ত করার জন্য বর্ণনাকারীরা নিজেরাই সনদ তৈরি করে নিয়েছে [6] । শখত বিশেষভাবে দাবি করেছেন যে, হাদিসের সনদের একটি বিশাল অংশই মূলত 'স্বেচ্ছাচর' বা 'খামখেয়ালি' (Arbitrary), যা কেবল হাদিসকে প্রামাণ্য করার জন্য পরে যুক্ত করা হয়েছে [7]

يقول شاخت: "إن أكبر جزء من أسانيد الأحاديث اعتباطي، ومعلوم لدى الجميع..." [8]

এই তাত্ত্বিক আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল হাদিসের 'ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা' (Historical Continuity) ধ্বংস করা। তারা বলতে চেয়েছেন যে, একজন বর্ণনাকারী যখন কোনো হাদিস বর্ণনা করেন, তখন তিনি আসলে একটি কাল্পনিক শিকড় বা সনদ তৈরি করেন যাতে হাদিসটি গ্রহণযোগ্য মনে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা হাদিস শাস্ত্রের 'ইলমুল রিজাল' (علم الرجال) বা বর্ণনাকারীদের জীবনী সংক্রান্ত বিজ্ঞানকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করেছেন।

এই অভিযোগের বিপরীতে মুহাদ্দিসগণের (Muhaddithin) উদ্ভাবিত 'ইলমুল রিজাল' এবং 'জারহতাদিল' (Jarh wa Ta'dil) পদ্ধতি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক। মুহাদ্দিসগণ কেবল বর্ণনাকারীর নাম জানতেন না, বরং তার সততা, স্মৃতিশক্তি, সামাজিক অবস্থান এবং তার সমসাময়িক অন্যান্য বর্ণনাকারীর সাথে তার সাক্ষাতের সম্ভাবনা (Liqa) পর্যন্ত যাচাই করতেন [9] । শখত ও গোল্ডজিহারের এই দাবি যে সনদগুলো 'খামখেয়ালি', তা হাদিস শাস্ত্রের কঠোর মানদণ্ড ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। সনদ কেবল একটি তালিকা নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত জটিল ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ঐতিহাসিক প্রমাণ ব্যবস্থা, যা প্রাচ্যবিদদের কল্পনার অতীত।

৩. বিশুদ্ধ ও জাল হাদিসের মিশ্রণ ও বিভাজন অসম্ভবতা

প্রাচ্যবিদদের তৃতীয় একটি গুরুতর অভিযোগ হলো, হাদিস সংকলনকালে প্রচুর পরিমাণে জাল বা মনগড়া হাদিস (Maudu') সহীহ বা বিশুদ্ধ হাদিসের সাথে মিশে গেছে [10] । তাদের দাবি অনুযায়ী, এই মিশ্রণের ফলে বিশুদ্ধ ও জাল হাদিসের মধ্যে পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে [11] । তারা মনে করেন, হাদিস শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ (Scholars) এই বিশাল ভাণ্ডার থেকে নিখুঁতভাবে জাল হাদিসগুলোকে আলাদা করতে সক্ষম ছিলেন না, যা হাদিস শাস্ত্রের সামগ্রিক নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই অভিযোগটি মূলত হাদিস শাস্ত্রের 'সংশোধনমূলক প্রক্রিয়া' (Correctional Process) কে অস্বীকার করার একটি প্রচেষ্টা। প্রাচ্যবিদরা মনে করেন যে, হাদিস একটি বিশৃঙ্খল ও অসংগঠিত সংগ্রহ, যেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। তারা হাদিস শাস্ত্রের পণ্ডিতদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে খাটো করে দেখানোর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় ও আইনি ভিত্তি দুর্বল করতে চেয়েছেন।

বাস্তবতা হলো, মুহাদ্দিসগণ হাদিসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় যে 'মুস্তলাহুল হাদিস' (Mustalah al-Hadith) বা হাদিস শাস্ত্রের নীতিমালার উদ্ভাবন করেছেন, তা বিশ্ব ইতিহাসের যেকোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতির চেয়ে অধিকতর কঠোর। তারা কেবল হাদিসের পাঠ (Matn) নয়, বরং সনদের প্রতিটি স্তরে থাকা বর্ণনাকারীর মানদণ্ড যাচাই করতেন। জাল হাদিস শনাক্ত করার জন্য তারা 'তাকরিব' (Taqrib) বা নিকটবর্তী বর্ণনাকারীদের সাথে তুলনা এবং 'তাকদিস' (Taqdis) বা পবিত্রতা যাচাইয়ের মতো উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। সুতরাং, বিশুদ্ধ ও জাল হাদিসের মিশ্রণ নিয়ে তাদের সংশয়টি মূলত হাদিস শাস্ত্রের পদ্ধতিগত উৎকর্ষতা সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল ধারণা থেকে উদ্ভূত।

৪. ভূ-রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট ও উপসংহার

প্রাচ্যবিদদের এই সকল আক্রমণের পেছনে কেবল একাডেমিক কৌতূহল ছিল না, বরং এর একটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ইসলামের প্রসারের সাথে সাথে পশ্চিমা বিশ্বের যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার একটি অংশ ছিল ইসলামের মূল উৎসগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা [12] । যদি হাদিসকে একটি 'নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখা যায়, তবে ইসলামের আইন ও জীবনবিধানকে আধুনিক ও যুক্তিবাদী মানদণ্ডে চ্যালেঞ্জ করা সহজ হয়।

প্রাচ্যবিদদের এই আক্রমণ মূলত একটি 'মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ' (Psychological Warfare), যার লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর আস্থা কমিয়ে দেওয়া। তারা হাদিসকে একটি 'ঐতিহাসিক মিথ' (Historical Myth) হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। তবে আধুনিক গবেষণায় এবং পূর্ববর্তী মুহাদ্দিসগণের কঠোর মানদণ্ডের বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, তাদের এই সকল দাবি কোনো বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং পূর্বনির্ধারিত একটি বৈরিতা ও সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।

পরিশেষে বলা যায়, প্রাচ্যবিদদের এই অভিযোগসমূহ হাদিস শাস্ত্রের পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক কাঠামোর সামনে টিকতে সক্ষম নয়। মুহাদ্দিসগণের উদ্ভাবিত সনদ ও যাচাইকরণ পদ্ধতি হাদিসকে কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে নয়, বরং একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রাচ্যবিদদের এই সংশয়বাদী ঢেউ সাময়িক হলেও, হাদিসের সত্যতা ও বিশুদ্ধতা ইসলামের ইতিহাসে একটি অবিচল ও অকাট্য সত্য হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে।

""
১৬.২ পরিশিষ্ট ১: প্রাচ্যবিদ স্কলারদের (যেমন: বার্নার্ড লুইস, উইলিয়াম মুইর, ইগনাজ গোল্ডজিহার) প্রধান অভিযোগ ও তার সংক্ষিপ্ত উত্তর
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১৬.২ পরিশিষ্ট ১: প্রাচ্যবিদ স্কলারদের (যেমন: বার্নার্ড লুইস, উইলিয়াম মুইর, ইগনাজ গোল্ডজিহার) প্রধান অভিযোগ ও তার সংক্ষিপ্ত উত্তর কুইজ

1 / 5

প্রাচ্যবিদদের মতে হাদিসসমূহ কখন রচিত হয়েছে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...