মানব সভ্যতার ইতিহাস কেবল কতগুলো ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং এটি নিরন্তর বিবর্তন, সংগ্রাম এবং আধ্যাত্মিক চেতনার এক মহাকাব্যিক আখ্যান। ইতিহাসের পাতায় যখন আমরা প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, ইলাম এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন আমরা এমন এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের সম্মুখীন হই, যা পরবর্তীকালে পৃথিবীর ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এই প্রাচীন সভ্যতাগুলো কেবল স্থাপত্য বা প্রযুক্তির উদ্ভাবক ছিল না, বরং তারা ছিল মানুষের অস্তিত্বের সংকট, আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা এবং সামাজিক সংগঠনের প্রাথমিক পরীক্ষাগার।
প্রাচীন নিকট প্রাচ্য বা 'Near East'-এর এই অঞ্চলটি ছিল বিশ্ব সভ্যতার সূতিকাগার। এখানে নদীমাতৃক সভ্যতাগুলোর উত্থান এবং পতনের মধ্য দিয়ে মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান, বাণিজ্য এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের এক বিস্ময়কর সমন্বয় ঘটেছিল। এই অধ্যায়ে আমরা ইলামীয় সভ্যতা এবং সুমেরীয় সভ্যতার সেই সুপ্ত ও বিস্মৃত ইতিহাস অন্বেষণ করব, যা আধুনিক সভ্যতার অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। একইসঙ্গে, সেই সময়ের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের বিবর্তন—যা মূর্তিপূজা ও আত্মার রহস্যময় ধারণার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হতো—তাও নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হবে।
ইলামীয় সভ্যতা: শুষানের গৌরব ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব
প্রাচীন বিশ্বের ইতিহাসে ইলামীয় সভ্যতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত অধ্যায়। বর্তমান ইরানের মানচিত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করলে এবং দজলা (Tigris) নদী অনুসরণ করে পূর্ব দিকে অগ্রসর হলে আমরা শুষান (Susa) নামক প্রাচীন শহরের অবস্থান খুঁজে পাই। এই শুষান ছিল ইলামীয় সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র, যা ইহুদিদের কাছে 'ইলাম' বা 'উচ্চভূমি' হিসেবে পরিচিত ছিল। এই অঞ্চলটি পশ্চিমের উপত্যকা এবং পূর্বের বিশাল ইরানি মালভূমির মধ্যবর্তী একটি সংকীর্ণ কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ছিল।
إذ نظر القارئ إلى مصور لبلاد إيران ومر بإصبعه على نهر دجلة-مبتدئا من الخليج الفارسي حتى يصل إلى العمارة، ثم اتجه به شرقاً مخترقاً حدود العراق إلى مدينة شوشان الحديثة، إذا فعل هذا فقد حدد لنفسه موقع مدينة السوس القديمة- التي كانت فيما مضى مركز إقليم يسميه اليهود بلاد عيلام- أي الأرض العالية.
[1]
ইলামীয় সভ্যতার ঐতিহাসিক গভীরতা বিস্ময়কর। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই অঞ্চলে প্রায় ২০,০০০ বছর পূর্বের মানব অস্তিত্বের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তবে একটি সুসংগঠিত ও উন্নত সংস্কৃতি হিসেবে এর বিকাশ ঘটেছিল প্রায় ৪,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে [2] । এই সভ্যতাটি মূলত যাযাবর জীবন থেকে কৃষিভিত্তিক ও স্থায়ী বসতি স্থাপনের দিকে উত্তরণ ঘটিয়েছিল। তারা তামার সরঞ্জাম ব্যবহার করত, শস্য উৎপাদন করত এবং পশুপালন করত। তাদের একটি নিজস্ব পবিত্র লিখন পদ্ধতি এবং বাণিজ্যিক নথিপত্র ছিল, যা তাদের একটি উচ্চতর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়।
ইলামীয়দের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। মিশর থেকে শুরু করে ভারত পর্যন্ত তাদের বাণিজ্যের প্রসার ছিল। তাদের শিল্পকলা ও কারুকার্যের মান ছিল অত্যন্ত উন্নত; বিশেষ করে তাদের তৈরি মৃৎপাত্র এবং অলঙ্কারের সূক্ষ্মতা আজও গবেষকদের মুগ্ধ করে। শুষান নগরীটি প্রায় ছয় হাজার বছর ধরে টিকে ছিল এবং এই দীর্ঘ সময়ে এটি সুমের, ব্যাবিলন, মিশর, আসিরিয়া, পারস্য, গ্রিস ও রোমের মতো বিশাল সাম্রাজ্যগুলোর উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করেছে [3] । শুষানের এই দীর্ঘস্থায়িত্ব প্রমাণ করে যে, এটি কেবল একটি শহর ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু, যা বিভিন্ন সাম্রাজ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করত।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে ইলামীয়রা ছিল অগ্রগামী। তারা কেবল মৃৎচক্র (Potter's wheel) ব্যবহার করত না, বরং তারা চাকার সাহায্যে চালিত যানবাহনের প্রাথমিক রূপও উদ্ভাবন করেছিল, যা পরবর্তীতে ব্যাবিলন ও মিশরে আরও উন্নত পর্যায়ে পৌঁছায় [4] । এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা তাদের সামরিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এক বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছিল। তবে ইতিহাসের নির্মম নিয়মে, এই সমৃদ্ধ সভ্যতাটি যুদ্ধের ধ্বংসলীলার শিকার হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, আসুরীয় সম্রাট আনিবনিপাল (Ashurbanipal) যখন ৬৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুষান জয় করেন, তখন তিনি বিপুল পরিমাণ সোনা, রুপা, রত্নপাথর এবং মূল্যবান আসবাবপত্র লুণ্ঠন করেছিলেন, যা এই শহরের তৎকালীন ঐশ্বর্যেরই প্রমাণ দেয় [5] ।
সুমেরীয় সভ্যতা: মেসোপটেমিয়ার প্রথম মহাকাব্যিক উত্থান
মেসোপটেমিয়া বা 'দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি'র ইতিহাস মূলত সুমেরীয় সভ্যতার ইতিহাস। দজলা ও ফোরাত নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই সভ্যতা ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম ব্যাপক ও সুসংগঠিত সভ্যতা। সুমেরীয়দের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। ইরাকের আধুনিক মানচিত্র অনুযায়ী, এরিদু (Eridu), উর (Ur), উরুক (Uruk), লাঘাশ (Lagash) এবং নিপ্পুর (Nippur)-এর মতো প্রাচীন নগরীগুলো ছিল এই সভ্যতার প্রধান স্তম্ভ [6] ।
وإذا عدنا إلى خريطة الشرق الأدنى وتتبع المجرى المشترك المكون من نهري دجلة والفرات... وجدنا في شماله وجنوبه المدن السومرية القديمة المطمورة هي: إريدو وأور وأورك ولارْسا ولكش ونبور.
[7]
সুমেরীয়দের উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। তারা কোন বংশোদ্ভূত ছিল বা কীভাবে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল, তা আজও একটি রহস্য। ধারণা করা হয়, তারা মধ্য এশিয়া, ককেশাস বা আর্মেনিয়া থেকে দজলা নদীর গতিপথ অনুসরণ করে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল [8] । সুমেরীয় সভ্যতাটি ছিল মূলত একটি অ-সেমিটিক (Non-Semitic) জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি, যারা উত্তর দিক থেকে আসা সেমিটিক অভিবাসীদের বিরুদ্ধে তাদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য দীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছিল। এই সংঘাতের মধ্য দিয়েই মেসোপটেমিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর বিবর্তন ঘটে।
সুমেরীয়দের এই সংগ্রাম কেবল ভূখণ্ড রক্ষার জন্য ছিল না, বরং এটি ছিল একটি উন্নত সংস্কৃতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। এই সংঘাতের মধ্যেই এক প্রকার পরোক্ষ সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল, যা বিশ্বের প্রথম ব্যাপক ও সৃজনশীল সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল [9] । রোমান ও গ্রীক ঐতিহাসিকরা, এমনকি হিরোডোটাসও, সুমেরীয়দের সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা রাখতে পারেননি, কারণ এই সভ্যতা ছিল তাদের সময়ের চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন। মূলত ব্যাবিলনীয় ঐতিহাসিক ব্রোসাস (Berossus), যিনি প্রায় ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে লিখেছিলেন, তিনিই সুমেরীয়দের সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন [10] ।
সুমেরীয় সভ্যতার বিস্ময়কর দিক হলো তাদের নগর পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা। তারা কেবল কৃষি ও বাণিজ্যে দক্ষ ছিল না, বরং তারা এমন এক সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল যা পরবর্তীকালে ব্যাবিলন ও আসিরীয় সাম্রাজ্যের মডেল হিসেবে কাজ করেছে। তাদের নগরীগুলো ছিল জ্ঞান ও ধর্মের কেন্দ্রস্থল, যেখানে মহাজাগতিক জ্ঞান এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অত্যন্ত সুসংগঠিত ছিল।
প্রাচীন আধ্যাত্মিকতা ও আত্মার ধারণা: মূর্তিপূজা থেকে প্রকৃতিবাদ
প্রাচীন সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মানুষের আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় চিন্তাধারার এক জটিল বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এই যুগে ধর্মের মূল ভিত্তি ছিল প্রকৃতিবাদ এবং পরবর্তীতে মূর্তিপূজা। মানুষ যখন মহাজাগতিক শক্তি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হতো, তখন তারা এই শক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিভিন্ন উপাসনা ও আচার-অনুষ্ঠান উদ্ভাবন করত। এই বিশ্বাসগুলো ছিল মূলত অদৃশ্য শক্তির (Ghaib) ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা, যা মানুষের মনে ভীতি ও বিস্ময় উভয়ই সৃষ্টি করত।
প্রাচীনকালে মূর্তিপূজা ছিল অত্যন্ত প্রচলিত। মানুষ যখন মহাজাগতিক বস্তুর (Celestial bodies) রহস্য বুঝতে পারছিল না, তখন তারা এই বস্তুগুলোকে দেবত্ব প্রদান করত। এই মূর্তিপূজার সাথে অনেক সময় অতিপ্রাকৃত ও গায়েবীয় (Metaphysical) উপাদান মিশে যেত। মানুষের এই বিশ্বাসের মূলে ছিল একটি ধারণা যে, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের পেছনে কোনো না কোনো অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে।
আত্মা বা 'রূহ' (Ruh) সংক্রান্ত ধারণাটি ছিল সেই সময়ের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক জগতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীন মানুষ বিশ্বাস করত যে, মানুষের দেহের ভেতরে একটি অদৃশ্য শক্তি বা 'নফস' (Nafs) বিদ্যমান, যা দেহের বাইরেও অস্তিত্বশীল থাকতে পারে। তারা আত্মাকে বাতাসের মতো অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী কিছু হিসেবে কল্পনা করত। অনেক ক্ষেত্রে তারা আত্মাকে একটি পাখির সাথে তুলনা করত, যা মানুষের মৃত্যুর পর তার চারপাশেই ঘুরে বেড়ায় [11] ।
لقد ساد في الجاهلية اعتقاد بأن في بعض المظاهر الطبيعية قوى خفية هي فوق قوى الطبيعة، منها ما يكون في الجسم وهي النفس، ومنها ما يكون خارج الجسم وهي الروح.
[12]
এই আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের একটি অন্ধকার ও ভীতিপ্রদ দিক ছিল 'হামা' (Hama) বা আত্মার বিচরণ সংক্রান্ত লোকবিশ্বাস। প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির যদি অন্যায়ভাবে মৃত্যু ঘটে এবং তার রক্তের প্রতিশোধ না নেওয়া হয়, তবে তার আত্মা একটি 'হামা' বা নিশাচর পাখির (যেমন পেঁচা) রূপ ধারণ করে কবরের আশেপাশে বিচরণ করতে থাকে। তারা বিশ্বাস করত যে, এই আত্মাটি আর্তনাদ করে বলে, "আমাকে পান করাও, আমাকে পান করাও" (اسقوني، اسقوني), যতক্ষণ না তার রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া হয় [13] । এই ধরনের বিশ্বাস মানুষের মনে মৃত্যু পরবর্তী জীবন এবং অদৃশ্যের প্রতি এক গভীর ও ভীতিমিশ্রিত শ্রদ্ধা তৈরি করেছিল।
আত্মার এই বহুমুখী রূপ ও ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। তারা বিশ্বাস করত যে, আত্মা বিভিন্ন প্রাণীর মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে, যার ফলে কাক, পেঁচা, সাপ বা বিচ্ছুর মতো প্রাণীদের প্রতি মানুষের মনে এক ধরণের কুসংস্কার ও ভীতি কাজ করত। এই প্রাণীদের কিছু ক্ষেত্রে শুভ বা অশুভ সংকেত হিসেবে দেখা হতো [14] । এই আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটটিই ছিল সেই সময়ের সমাজব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা মানুষকে একদিকে যেমন নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার দিকে ধাবিত করত, অন্যদিকে অতিপ্রাকৃত ভয়ের মাধ্যমে তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করত।