ভূমিকা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: পশ্চিমা মানবাধিকারের বিবর্তন বনাম ইসলামি অধিকারের শাশ্বত উৎস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, কোটি মানুষের প্রাণহানি এবং ফ্যাসিবাদের চরম আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক 'ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অফ হিউম্যান রাইটস' (UDHR) বা সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা গৃহীত হয়। পশ্চিমা রাষ্ট্রচিন্তা ও উদারনৈতিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই দলিলটি মূলত মানব ইতিহাসের এক চরম সংকটের পর সৃষ্ট তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, যা মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোকে বৈশ্বিক পর্যায়ে সুরক্ষার দাবি জানায় [1] । কিন্তু ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পশ্চিমা মানবাধিকারের এই বিবর্তন অত্যন্ত মন্থর এবং তা বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, যেমন—ম্যাগনা কার্টা (১২১৫), ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) এবং মার্কিন স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। পক্ষান্তরে, ইসলামি মানবাধিকারের কাঠামো কোনো ঐতিহাসিক সংকট বা রাজনৈতিক বিপ্লবের আকস্মিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং তা আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে সরাসরি ঐশী ওহির মাধ্যমে মানবজাতির জন্য অবতীর্ণ এক শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় জীবনবিধান [2] ।
রাসুলুল্লাহ সা. মদিনায় হিজরত করার পর যে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ছিল ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান বা 'মদিনা সনদ' (Constitution of Medina)-এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক অনন্য ব্যবস্থা। এই সনদে কেবল মুসলিমদেরই নয়, বরং ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং মদিনার অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, জানমালের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছিল [3] । পশ্চিমা মানবাধিকার যেখানে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীন এবং যা সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তনশীল, সেখানে ইসলামি মানবাধিকারের উৎস হলো পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর অকাট্য বিধান, যা মানুষের তৈরি কোনো আইনের মুখাপেক্ষী নয়। ইসলামি মানবাধিকারের এই কাঠামো কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখা বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য এক সার্বজনীন ঘোষণা [4] ।
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানবাধিকারের ধারণাটি কোনো রাজনৈতিক আপস বা সামাজিক চুক্তির ফসল নয়, বরং এটি স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার সম্পর্কের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পশ্চিমা বিশ্বে যখন সামন্তবাদ ও চার্চের শোষণে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ ছিল, তখন ইসলাম মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীনে প্রকৃত স্বাধীনতা প্রদান করেছিল [5] । রাসুলুল্লাহ সা. বিদায় হজের ভাষণে যে ঐতিহাসিক মানবাধিকারের রূপরেখা ঘোষণা করেছিলেন, তা আধুনিক UDHR-এর চেয়েও অনেক বেশি গভীর, বাস্তবমুখী এবং নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ফলে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিক থেকে বিচার করলে, পশ্চিমা মানবাধিকার যেখানে মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও সংগ্রামের ফসল, সেখানে ইসলামি মানবাধিকার হলো মানব সৃষ্টির সূচনা থেকেই নির্ধারিত ঐশী উপহার [6] ।
সার্বভৌমত্ব ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি: ঐশী কর্তৃত্ব (Divine Sovereignty) বনাম মানবকেন্দ্রিক আইন (Anthropocentric Law)
UDHR এবং ইসলামি মানবাধিকার কাঠামোর মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) পার্থক্যটি নিহিত রয়েছে তাদের সার্বভৌমত্বের ধারণার মধ্যে। UDHR-এর মূল ভিত্তি হলো মানবকেন্দ্রিক আইন (Anthropocentric Law), যেখানে মানুষের বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক চুক্তি এবং রাষ্ট্রীয় আইনকে অধিকারের চূড়ান্ত উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ব্যবস্থায় মানুষের অধিকারগুলো মূলত রাষ্ট্র বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, যা যেকোনো সময় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে পরিবর্তিত, পরিমার্জিত বা বাতিল হতে পারে [7] । কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে সার্বভৌমত্বের একমাত্র মালিক হলেন মহান আল্লাহ তাআলা (Divine Sovereignty)। ইসলামে মানবাধিকার কোনো মানুষের তৈরি আইন নয়, বরং তা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত 'হক' বা অধিকার, যা কোনো শাসক, সংসদ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা কেড়ে নিতে পারে না [8] ।
ইসলামি মানবাধিকারের এই ঐশী ভিত্তি মানুষের অধিকারগুলোকে এক অনন্য স্থায়িত্ব ও পবিত্রতা দান করে। যেহেতু এই অধিকারগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, তাই এগুলোকে লঙ্ঘন করা কেবল একটি আইনি অপরাধই নয়, বরং একটি গুরুতর ধর্মীয় পাপও বটে। ইসলামি শরিয়তের মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যাকে 'মাকাসিদুশ শরিয়াহ' (Objectives of Shariah) বলা হয়; এগুলো হলো—জীবন (নাফস), ধর্ম (দ্বীন), বংশধারা (নাসল), সম্পদ (মাল) এবং বুদ্ধি (আকল) [9] । এই পাঁচটি মৌলিক অধিকারের সুরক্ষায় ইসলাম যে কঠোর আইনি ও নৈতিক কাঠামো প্রদান করেছে, তা মানুষের তৈরি কোনো আইনের পক্ষে সম্ভব নয়। ইসলামি চিন্তাবিদ উমর উবাইদ হাসানা এই বিষয়ে অত্যন্ত চমৎকার আলোকপাত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইসলাম মানুষের অধিকারকে কেবল মানুষের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেয়নি, কারণ মানুষের ইচ্ছা প্রায়শই প্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশির দ্বারা প্রভাবিত হয় [10] । তিনি লিখেছেন:
"والإسلام لم يدع إقرار الحقوق لإرادة الإنسان، التي قد تعصف بها الأهواء، فقد يستعذب بعض الناس العبودية أحيانا، وإنما جعل تلك الحقوق حقا وواجبا معا..."অনুবাদ: "ইসলাম মানবাধিকারের বিষয়টিকে মানুষের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেয়নি, যা প্রায়শই প্রবৃত্তির তাড়নায় বিপর্যস্ত হয়; কারণ কখনো কখনো কিছু মানুষ দাসত্বকেও মিষ্টি বা আরামদায়ক মনে করতে পারে। বরং ইসলাম এই অধিকারগুলোকে একই সাথে অধিকার এবং কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে।" [11]
এই জ্ঞানতাত্ত্বিক পার্থক্যের কারণে, পশ্চিমা মানবাধিকার যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ইসলামি মানবাধিকার দাঁড়িয়ে আছে তাওহিদ ও তাকওয়ার ওপর। পশ্চিমা ব্যবস্থায় অধিকার আদায়ের জন্য মানুষকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়, কিন্তু ইসলামে রাষ্ট্র নিজেই আল্লাহর আইনের অধীনে নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য। যদি কোনো শাসক নাগরিকের এই ঐশী অধিকার হরণ করে, তবে ইসলামি আইন অনুযায়ী সেই শাসকের আনুগত্য করার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না [12] । ফলে, ইসলামি মানবাধিকারের কাঠামো কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং তা এক পরম ও অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা মানুষের আত্মিক ও জাগতিক উভয় কল্যাণ নিশ্চিত করে [13] ।
অধিকার ও কর্তব্যের মিথস্ক্রিয়া: পারস্পরিক দায়বদ্ধতা (Reciprocal Responsibility) বনাম নিরঙ্কুশ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Absolute Individualism)
UDHR-এর একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর নিরঙ্কুশ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Absolute Individualism), যেখানে ব্যক্তির অধিকারকে সমাজের সমষ্টিগত কল্যাণ বা নৈতিক শৃঙ্খলার ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তি তার অধিকারের প্রয়োগ করতে গিয়ে সামাজিক বা পারিবারিক দায়িত্বের প্রতি উদাসীন হতে পারে, যা আধুনিক সমাজে পারিবারিক ভাঙন এবং নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। পক্ষান্তরে, ইসলামি মানবাধিকারের কাঠামো গড়ে উঠেছে অধিকার ও কর্তব্যের এক অপূর্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ মিথস্ক্রিয়ার (Reciprocal Responsibility) ওপর ভিত্তি করে [14] । ইসলামে প্রতিটি অধিকারের বিপরীতে একটি সুনির্দিষ্ট কর্তব্য বা দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ, একজনের অধিকার হলো অন্যজনের পবিত্র দায়িত্ব [15] ।
রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার সমাজ গঠনে এই পারস্পরিক দায়বদ্ধতার নীতিটি অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। ইসলামে পিতা-মাতার অধিকার যেমন সন্তানের কর্তব্য, তেমনি সন্তানের অধিকারও পিতা-মাতার জন্য এক অলঙ্ঘনীয় দায়িত্ব। প্রতিবেশীর অধিকার, এতিম ও মিসকিনদের অধিকার, এমনকি অমুসলিম নাগরিকদের অধিকারও মুসলিমদের জন্য কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং তা ইবাদতের অংশ [16] । ইসলামি অর্থনীতিতে ধনীদের সম্পদে দরিদ্রদের অধিকার (যাকাত) নির্ধারণ করা হয়েছে, যা কোনো করুণা বা দান নয়, বরং দরিদ্রদের আইনগত প্রাপ্য অধিকার। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলাম সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে এক অভূতপূর্ব সামাজিক সংহতি (Social Solidarity) প্রতিষ্ঠা করেছিল [17] ।
পশ্চিমা মানবাধিকার যেখানে কেবল ব্যক্তির অধিকারের দাবি জানায়, সেখানে ইসলাম ব্যক্তিকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। রাসুলুল্লাহ সা. বিদায় হজের ভাষণে নারী অধিকারের কথা বলতে গিয়ে পুরুষদের যেমন তাদের প্রতি সদয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনি নারীদেরও তাদের পারিবারিক দায়িত্ব পালনের তাগিদ দিয়েছেন। এই ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে ইসলামি সমাজে অধিকার আদায়ের জন্য কোনো শ্রেণীসংগ্রাম বা সামাজিক বিশৃঙ্খলার প্রয়োজন হয় না, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ধর্মীয় অনুভূতির মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকে [18] । ইসলামি আইন ও সমাজব্যবস্থায় অধিকার ও কর্তব্যের এই মেলবন্ধনই প্রমাণ করে যে, ইসলামি মানবাধিকারের কাঠামো আধুনিক পশ্চিমা কাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত এবং মানব প্রকৃতির (Fitrah) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ [19] ।
আইনগত নিশ্চয়তা ও বিচারিক সমতা: আইনের শাসন (Rule of Law) এবং মদিনা সনদের বৈশ্বিক রূপরেখা
আইনের শাসন (Rule of Law) এবং বিচারিক সমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইসলামি মানবাধিকারের কাঠামো এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। UDHR-এর অনুচ্ছেদগুলোতে আইনের চোখে সবার সমতা এবং ন্যায়বিচারের অধিকারের কথা বলা হলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিচারব্যবস্থা প্রায়শই বর্ণ, শ্রেণী এবং রাজনৈতিক প্রতিপত্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়। কিন্তু ইসলামি বিচারব্যবস্থায় আইনের শাসন ও সমতা এতটাই কঠোর যে, সেখানে খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধানকেও একজন সাধারণ নাগরিকের মতোই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় [20] । রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার বিচারব্যবস্থায় যে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ছিল তৎকালীন আরব জাহানের জন্য এক অবিশ্বাস্য বিপ্লব। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, যদি তাঁর কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে তিনি তার হাত কাটার নির্দেশ দিতেন [21] ।
মদিনা সনদ ছিল এই বিচারিক সমতা ও নাগরিক অধিকারের প্রথম বাস্তব দলিল। এই সনদের মাধ্যমে মদিনার সকল গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়কে একটি একক রাজনৈতিক উম্মাহ বা জাতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, যেখানে প্রত্যেকের জানমাল ও ধর্মের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল [22] । মদিনা সনদের ধারাগুলোতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, কোনো অপরাধীকে তার বংশ বা সামাজিক মর্যাদার কারণে ছাড় দেওয়া হবে না এবং মজলুমকে সর্বদা সাহায্য করা হবে, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন [23] । ইসলামি বিচারব্যবস্থায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য যে সমস্ত গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো—নিরপরাধের সুরক্ষার নীতি (Presumption of Innocence), সাক্ষ্যগ্রহণের কঠোর নিয়ম এবং বিচারকের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা [24] ।
ইসলামি বিচারিক কাঠামোর এই অনন্য বৈশিষ্ট্যটি কেবল মুসলিমদের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল না। অমুসলিম নাগরিক বা জিম্মিদের অধিকার সুরক্ষায় রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, "যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিকের ওপর জুলুম করবে বা তার অধিকার খর্ব করবে, কিয়ামতের দিন আমি স্বয়ং তার বিরুদ্ধে বাদী হব" [25] । এই বিচারিক সমতা ও আইনের শাসনই ইসলামি রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিল। পশ্চিমা বিশ্ব যখন অন্ধকার যুগে নিমজ্জিত ছিল, তখন ইসলাম এই বিচারিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে মানবতাকে এক নতুন আলোর পথ দেখিয়েছিল [26] ।
বাস্তবায়নযোগ্যতা ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা: নৈতিক শক্তি বনাম ক্ষমতার রাজনীতি (Power Geopolitics)
UDHR-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর বাস্তবায়নযোগ্যতার অভাব (Lack of Enforcement Mechanism)। জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত এই অধিকারগুলো মূলত রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক ধরনের নৈতিক সুপারিশ মাত্র, যা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করার মতো কোনো কার্যকর বৈশ্বিক কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে, আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় (Geopolitics) দেখা যায় যে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই নিজেদের স্বার্থে মানবাধিকারের এই নীতিগুলোকে লঙ্ঘন করে এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে মানবাধিকারকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে [27] । পক্ষান্তরে, ইসলামি মানবাধিকারের কাঠামো কেবল তাত্ত্বিক ঘোষণা নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় শক্তি ও নৈতিক আইনের এক অপূর্ব সমন্বয়, যা বাস্তবায়নের জন্য ইসলামে একটি সুনির্দিষ্ট শাসনতান্ত্রিক ও আইনি কাঠামো রয়েছে [28] ।
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানবাধিকারের বাস্তবায়ন কেবল বাহ্যিক পুলিশি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা মানুষের অন্তরের তাকওয়া ও আখিরাতের জবাবদিহিতার সাথে যুক্ত। একজন মুসলিম শাসক বা নাগরিক যখন কোনো অধিকার লঙ্ঘন করে, তখন সে জানে যে তাকে কেবল দুনিয়ার আদালতেই নয়, বরং কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারেও জবাবদিহি করতে হবে [29] । এই আত্মিক ও নৈতিক শক্তিই ইসলামি মানবাধিকারকে বাস্তব ক্ষেত্রে কার্যকর করে তোলে। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা কেবল নৈতিক উপদেশের ওপর ভিত্তি করে চলেনি, বরং সেখানে আইন অমান্যকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধানও ছিল। ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তায় শক্তির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, কারণ শক্তি ছাড়া কেবল নৈতিক বাণী সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না [30] । এই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে:
"إن القيم النبيلة تتحول في لسان الضعفاء إلى مظاهرة صوتية تحتج وتصيح بلا مجيب وتستغيث بلا مغيث..."অনুবাদ: "দুর্বলদের মুখে মহৎ মূল্যবোধগুলো কেবল এক ধরনের মৌখিক প্রতিবাদে পরিণত হয়, যা চিৎকার ও আর্তনাদ করে কিন্তু কোনো সাড়া পায় না এবং সাহায্যকারী ছাড়াই সাহায্য প্রার্থনা করে..." [31]
এই ভূ-রাজনৈতিক সত্যটি রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি কেবল মক্কার যুগে নৈতিক দাওয়াত দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং মদিনায় হিজরত করে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, যা মজলুমের অধিকার রক্ষা এবং জালিমের হাতকে প্রতিহত করতে সক্ষম ছিল [32] । ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় যুদ্ধ ও কূটনীতির (Diplomacy) মূল লক্ষ্যই ছিল মানুষের মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা। রাসুলুল্লাহ সা. যখন মক্কা বিজয় করেছিলেন, তখন তিনি কোনো প্রতিশোধ নেননি, বরং তাঁর চরম শত্রুদেরও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে মানবাধিকারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন [33] । এই ভূ-রাজনৈতিক ও নৈতিক শক্তির ভারসাম্যই ইসলামি মানবাধিকারের কাঠামোকে আধুনিক UDHR-এর চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবমুখী, কার্যকর এবং মানবকল্যাণকামী করে তুলেছে [34] ।