ইতালীয় পাণ্ডুলিপির উৎসতত্ত্ব এবং মধ্যযুগীয় সাহিত্যের প্রভাব
ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপিতত্ত্ব (Manuscriptology) এবং পাঠসমালোচনার (Textual Criticism) ক্ষেত্রে কোনো গ্রন্থের উৎস অনুসন্ধান করতে গেলে তার ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তন ও সমসাময়িক সাহিত্যিক কাঠামোর চুলচেরা বিশ্লেষণ অপরিহার্য। বিশেষত, বার্নাবাসের ইঞ্জিল বা এই জাতীয় ট্রিনিটি-বিরোধী বিকল্প ধর্মগ্রন্থগুলোর ক্ষেত্রে গবেষকদের প্রধানতম বিতর্ক হলো—এগুলো কি ১৬শ শতকের কোনো ইতালীয় জালিয়াতি, নাকি এগুলো আদিম যুগের কোনো হিব্রু বা ল্যাটিন টেক্সটের অনুবাদ? মধ্যযুগীয় ইতালিতে ল্যাটিন থেকে ইতালীয় উপভাষায় ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গ্রন্থ অনুবাদের একটি সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। উদাহরণস্বরূপ, সেন্ট ফ্রান্সিস অব আসিসির জীবনীর ওপর ভিত্তি করে রচিত 'ফিওরেত্তি' (Fioretta) বা 'লিটল ফ্লাওয়ার্স'-এর কথা উল্লেখ করা যায়। এই গ্রন্থটি মূলত ল্যাটিন ভাষায় রচিত 'আক্টুস বিয়াতি ফ্রান্সিস্কি' (Actus Beati Francisci) গ্রন্থের একটি ইতালীয় সরলীকরণ রূপ, যা ১৩২৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে সংকলিত হয়েছিল।
ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, এই ধরনের অনুবাদ বা রূপান্তরগুলো প্রায়শই মূল ইতিহাসের চেয়ে সাহিত্যিক অলংকরণে সমৃদ্ধ হতো। তৎকালীন ইতালীয় পাণ্ডুলিপিগুলোর সাহিত্যিক মান ও ঐতিহাসিক সত্যতার পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে ঐতিহাসিক উইল ডুরান্ট তাঁর বিশ্বখ্যাত 'সভ্যতার ইতিহাস' গ্রন্থে লিখেছেন:
"والزهريات Fioretta التي نقلنا منها هذه القصة هي تبسيط باللغة الإيطالية لكتاب Actus Beati Francisci المكتوب باللغة اللاتينية (1323)، وهي اقرب إلى الأدب منها إلى التاريخ الحق، ولكنها تعد في مستوى أجمل مؤلفات عصر الإيمان وأعظمها متعة."
অর্থাৎ, "ফিওরেত্তি (Fioretta), যেখান থেকে আমরা এই গল্পটি গ্রহণ করেছি, তা মূলত ১৩২৩ খ্রিস্টাব্দে ল্যাটিন ভাষায় লিখিত 'আক্টুস বিয়াতি ফ্রান্সিস্কি' গ্রন্থের ইতালীয় ভাষার একটি সরলীকরণ। এটি প্রকৃত ইতিহাসের চেয়ে সাহিত্যের অনেক কাছাকাছি, তবে এটি বিশ্বাসের যুগের অন্যতম সুন্দর ও উপভোগ্য রচনা হিসেবে গণ্য।" [1] । এই বিবরণটি প্রমাণ করে যে, মধ্যযুগীয় ইতালীয় পাণ্ডুলিপিগুলো প্রায়শই প্রাচীন ল্যাটিন বা গ্রিক উৎসের ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও, অনুবাদকদের নিজস্ব সাহিত্যিক শৈলী ও ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মূল টেক্সটের চেয়ে তা অনেক সময় ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করত।
ভ্যাটিকানের গোপন আর্কাইভে সংরক্ষিত বহু প্রাচীন নথির ক্ষেত্রেও এই একই নিয়ম প্রযোজ্য। গবেষকদের একটি বড় অংশের মতে, ১৬শ শতকে আবিষ্কৃত ইতালীয় ম্যানুস্ক্রিপ্টটি কোনো আকস্মিক সৃষ্টি নয়, বরং তা ভ্যাটিকানের গোপন প্রকোষ্ঠে সংরক্ষিত কোনো আদিম ল্যাটিন বা গ্রিক পাণ্ডুলিপিরই ইতালীয় অনুবাদ। পোপীয় কর্তৃত্বের যুগে যেকোনো নতুন ধর্মীয় ধারা বা মতবাদ প্রচারের জন্য রোমের অনুমোদন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক ছিল, যা সেন্ট ফ্রান্সিসের ঐতিহাসিক রোম সফরের ঘটনা থেকেও প্রমাণিত হয় [2] । ফলে, মূলধারার ট্রিনিটিবাদী বিশ্বাসের বাইরে যেকোনো বিকল্প পাণ্ডুলিপিকে ভ্যাটিকান তার গোপন আর্কাইভে কঠোরভাবে অবরুদ্ধ করে রাখত, যা পরবর্তীকালে রেনেসাঁ যুগের স্বাধীন চিন্তাবিদদের মাধ্যমে ইতালীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে আত্মপ্রকাশ করে থাকতে পারে।
১৬শ শতকের ট্রিনিটি-বিরোধী আন্দোলন এবং মাইকেল সার্ভেটাসের ট্র্যাজেডি
১৬শ শতকের ইউরোপীয় ধর্মতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সময়টি ছিল চরম ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং একই সাথে ট্রিনিটি-বিরোধী (Anti-Trinitarian) গোপন আন্দোলনের উত্থানকাল। এই যুগের সবচেয়ে আলোচিত ও ট্র্যাজিক ঘটনা ছিল স্প্যানিশ চিকিৎসক ও ধর্মতত্ত্ববিদ মাইকেল সার্ভেটাসের (Michael Servetus) বিচার ও মৃত্যুদণ্ড। সার্ভেটাস প্রচলিত ত্রিত্ববাদ বা ট্রিনিটি এবং শিশু বাপ্তিস্মের ধারণাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর এই বৈপ্লবিক চিন্তাধারা তৎকালীন ক্যাথলিক চার্চ এবং প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারক জন ক্যালভিন (John Calvin) উভয়ের জন্যই এক বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছিল।
সার্ভেটাসের বিরুদ্ধে আনীত প্রধান অভিযোগগুলো সম্পর্কে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে:
"وكانت الاتهامات الرئيسية الموجهة إلى سرفيتوس هي أنه رفض التسليم بالثالوث وتعميد الأطفال، كما اتهم أيضاً بأنه طعن في شخص السيد كالفن العقائد التي فرضها إنجيل كنيسة جنيف..."
অর্থাৎ, "সার্ভেটাসের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো ছিল এই যে, তিনি ত্রিত্ববাদ (ট্রিনিটি) এবং শিশু বাপ্তিস্ম স্বীকার করতে অস্বীকার করেছিলেন। তদুপরি, তাঁর বিরুদ্ধে জেনেভা চার্চের সুসমাচার দ্বারা আরোপিত বিশ্বাসের বিষয়ে এবং জন ক্যালভিনের ব্যক্তিত্বের ওপর আঘাত হানার অভিযোগও আনা হয়েছিল।" [3] । এই ঐতিহাসিক সত্যটি প্রমাণ করে যে, ১৬শ শতকে ট্রিনিটি-বিরোধী যেকোনো পাণ্ডুলিপি বা মতবাদকে কতটা কঠোরভাবে দমন করা হতো। সার্ভেটাসকে শেষ পর্যন্ত ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ অক্টোবর জেনেভায় জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয় [4] ।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি বার্নাবাসের ইঞ্জিলের মতো ট্রিনিটি-বিরোধী ইতালীয় ম্যানুস্ক্রিপ্টের অস্তিত্বের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গবেষকদের মতে, ১৬শ শতকের এই চরম দমনপীড়নের যুগে কোনো লেখকের পক্ষে প্রকাশ্যে ট্রিনিটি-বিরোধী গ্রন্থ রচনা বা প্রকাশ করা অসম্ভব ছিল। তাই, এই ধরনের পাণ্ডুলিপিগুলো হয় অত্যন্ত গোপনে অনূদিত ও অনুলিপিকৃত হতো, অথবা ভ্যাটিকানের গোপন আর্কাইভ থেকে কোনোভাবে চুরি করে বাইরে আনা হতো। সার্ভেটাসের মতো পণ্ডিতদের নির্মম হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে, কেন এই ধরনের বিকল্প টেক্সটগুলো দীর্ঘকাল ধরে জনসমক্ষে আসতে পারেনি এবং কেন এগুলোকে কেবল গোপন পাণ্ডুলিপি হিসেবেই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়েছিল [5] ।
ভ্যাটিকানের গোপন আর্কাইভ এবং প্রাচীন পাণ্ডুলিপি দমনের ভূরাজনীতি
ভ্যাটিকানের গোপন আর্কাইভ (Archivio Segreto Vaticano) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় স্থান হিসেবে পরিচিত। মধ্যযুগ ও রেনেসাঁ যুগে রোমান ক্যাথলিক চার্চের ভূরাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক একাধিপত্য বজায় রাখার জন্য এই আর্কাইভটি ছিল একটি প্রধান হাতিয়ার। চার্চের প্রতিষ্ঠিত ডগমার সাথে সাংঘর্ষিক যেকোনো প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, বিশেষ করে আদিম জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান (Judeo-Christian) বা ইবায়োনাইট (Ebionite) সম্প্রদায়ের গ্রন্থগুলো, যা যিশুর ঐশ্বরিকতার পরিবর্তে তাঁর মানবিয় সত্তা ও একত্ববাদের ওপর জোর দিত, সেগুলোকে এই আর্কাইভে চিরতরে অবরুদ্ধ করে রাখা হতো।
চার্চের এই দমনমূলক নীতির ভয়াবহতা কেবল জীবিত ব্যক্তিদের ওপরই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মৃত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও তা প্রয়োগ করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, অ্যানাব্যাপ্টিস্ট নেতা ডেভিড জুরিসের (David Joris) ঘটনাটি উল্লেখ করা যায়। তাঁর মৃত্যুর পর যখন জানা যায় যে তিনি ট্রিনিটি-বিরোধী মতবাদ সমর্থন করে ছদ্মনামে বই লিখেছিলেন, তখন তাঁর মৃতদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে পুড়িয়ে ফেলা হয়:
"ولما أفلتت من محكمة تفتيش فيين فريستها فإنها قامت بإحراق تمثال لسرفيتوس... ونشر دافيد جوريس البازيلي، وهو لا معمداني، احتجاجاً ضد تنفيذ حكم الإعدام، بيد أنه وقع عليه باسم مستعار ولما اكتشفت بعد وفاته أنه كاتب هذا الاحتجاج أخرجت جثته بعد الدفن وأحرقت علناً (1566)."
অর্থাৎ, "যখন ভিয়েনের ইনকুইজিশন কোর্ট তার শিকারকে (সার্ভেটাস) হাতছাড়া করল, তখন তারা সার্ভেটাসের একটি পুতুল পুড়িয়ে ক্ষোভ মেটাল... এবং বাসেলের অ্যানাব্যাপ্টিস্ট ডেভিড জুরিস এই মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে ছদ্মনামে একটি প্রতিবাদপত্র প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর যখন জানা গেল যে তিনিই এই প্রতিবাদের লেখক, তখন ১৫৬৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃতদেহ কবর থেকে বের করে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলা হয়।" [6] । এই ধরনের চরম দমনমূলক পরিবেশ প্রমাণ করে যে, ভ্যাটিকান এবং তৎকালীন ধর্মীয় কর্তৃপক্ষগুলো তাদের প্রতিষ্ঠিত মতবাদের সুরক্ষায় কতটা মরিয়া ছিল।
এই ভূরাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক দমননীতির কারণেই বার্নাবাসের ইঞ্জিলের মতো পাণ্ডুলিপিগুলোর উৎস সন্ধানে ভ্যাটিকানের গোপন আর্কাইভের দিকে আঙুল তোলা হয়। গবেষকদের ধারণা, পোপের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি বা গোপন আর্কাইভে এমন কিছু আদিম পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল, যা ১৬শ শতকের দিকে কোনো প্রগতিশীল ক্যাথলিক সন্ন্যাসী (যেমন ফ্রা মারিনো) কর্তৃক অনূদিত বা অনুলিপিকৃত হয়েছিল। চার্চের ইনকুইজিশন বা ধর্মীয় আদালতের ভয়ে এই ধরনের পাণ্ডুলিপিগুলোকে অত্যন্ত গোপনে সংরক্ষণ করা হতো, কারণ সামান্যতম সন্দেহের বশেও যেকোনো গ্রন্থকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তার লেখক ও সংরক্ষণকারীকে পুড়িয়ে মারার বিধান কার্যকর ছিল [7] ।
অ্যাকাডেমিক অনুসন্ধান: টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম ও ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই
আধুনিক অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডলে ১৬শ শতকের ইতালীয় ম্যানুস্ক্রিপ্টটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (Philological Analysis) এবং টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজমকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গবেষকদের একটি দল দাবি করেন যে, এই পাণ্ডুলিপির ইতালীয় ভাষা ও বানানরীতি ১৬শ শতকের ভেনিস বা টাস্কানি অঞ্চলের উপভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে অন্য একদল গবেষক মনে করেন, এই ইতালীয় টেক্সটের গভীরে এমন কিছু প্রাচীন হিব্রু ও আরামীয় শব্দতাত্ত্বিক কাঠামো (Semitic Substratum) লুকিয়ে রয়েছে, যা কোনো ১৬শ শতকের ইউরোপীয় জালিয়াতের পক্ষে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা অসম্ভব ছিল। এই অ্যাকাডেমিক অনুসন্ধানের ধারাটি মূলত রেনেসাঁ যুগের বহুভাষাবিদ পণ্ডিতদের কাজের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যাঁরা প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোর মূল উৎস সন্ধানে গ্রিক, ল্যাটিন ও হিব্রু ভাষার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতেন।
১৬শ শতকের এমনই একজন প্রখ্যাত বহুভাষাবিদ ও মানবতাবাদী পণ্ডিত ছিলেন সেবাস্টিয়ান কাস্তেলিও (Sebastian Castellio), যিনি ল্যাটিন, গ্রিক ও হিব্রু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন এবং বাইবেলের মূল পাঠ্য নিয়ে গভীর গবেষণা করেছিলেন:
"فسباسيان كاستيليو الذي ولد في جورا الفرنسية عام 1515 أصبح حاذقاً للغات اللاتينية واليونانية والعبرية ودرس اليونانية في ليون وعاش مع كالفن في شتراسبورج... وترجم الكتاب المقدس إلى الفرنسية."
অর্থাৎ, "সেবাস্টিয়ান কাস্তেলিও, যিনি ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি জুরায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তিনি ল্যাটিন, গ্রিক ও হিব্রু ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ হয়ে ওঠেন। তিনি লিওনে গ্রিক ভাষা অধ্যয়ন করেন এবং স্ট্র্যাসবুর্গে ক্যালভিনের সাথে বসবাস করেন... এবং তিনি সমগ্র বাইবেল ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন।" [8] । কাস্তেলিওর মতো পণ্ডিতদের এই ভাষাতাত্ত্বিক কাজগুলো প্রমাণ করে যে, ১৬শ শতকে বাইবেলের বিভিন্ন পাণ্ডুলিপির অনুবাদ ও পাঠগত ভিন্নতা নিয়ে ইউরোপীয় অ্যাকাডেমিক মহলে একটি সূক্ষ্ম ও গভীর অনুসন্ধান প্রক্রিয়া চলমান ছিল।
তাছাড়া, ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপিগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে চার্চের প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। সেন্ট ফ্রান্সিসের যুগেও দেখা গেছে যে, কোনো নতুন নিয়ম বা পাণ্ডুলিপি তৈরি হলে তা পোপের দরবারে পেশ করে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হতো:
"ولما قيل له إن إنشاء طائفة دينية جديدة يتطلب الحصول على إذن من البابا، سافر فرانسس ومريده الاثنا عشر إلى روما في عام 1210، وعرضوا طلبهم ومبادئهم على إنوسنت الثالث."
অর্থাৎ, "যখন তাঁকে বলা হলো যে একটি নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার জন্য পোপের অনুমতির প্রয়োজন, তখন ফ্রান্সিস এবং তাঁর বারোজন অনুসারী ১২১০ খ্রিস্টাব্দে রোমে ভ্রমণ করেন এবং পোপ ইনোসেন্ট III-এর কাছে তাঁদের আবেদন ও মূলনীতিগুলো পেশ করেন।" [9] । এই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে, যেকোনো বিকল্প বা অপ্রচলিত ধর্মীয় পাঠ্যকে চার্চের কঠোর সেন্সরশিপের মুখোমুখি হতে হতো।
আধুনিক অ্যাকাডেমিক অনুসন্ধানে তাই বার্নাবাসের ইঞ্জিল বা এই জাতীয় ইতালীয় ম্যানুস্ক্রিপ্টগুলোকে কেবল একটি একক যুগের সৃষ্টি হিসেবে দেখা হয় না। বরং কাস্তেলিওর মতো পণ্ডিতদের বহুভাষিক অনুবাদতত্ত্ব এবং চার্চের ঐতিহাসিক সেন্সরশিপের আলোকে এগুলোকে বিশ্লেষণ করা হয় [10] । গবেষকদের সিদ্ধান্ত হলো, ১৬শ শতকের ইতালীয় ম্যানুস্ক্রিপ্টটি বাহ্যিকভাবে সমসাময়িক ভাষারীতি ধারণ করলেও, এর অন্তর্নিহিত ধর্মতাত্ত্বিক বার্তাটি মূলত প্রথম কয়েক শতাব্দীর সেইসব আদিম খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি, যা ভ্যাটিকানের কঠোর দমনপীড়ন সত্ত্বেও কোনো গোপন সূত্রের মাধ্যমে মধ্যযুগীয় ইতালীয় অনুবাদকদের হাতে এসে পৌঁছেছিল।