খণ্ড 88
ফন্ট:100%
থিম:

১.৩.১ ইউরোসেন্ট্রিজম (Eurocentrism) বনাম হিস্টোরিক্যাল অবজেক্টিভিটি (Historical Objectivity)

মানবসভ্যতার ইতিহাস চর্চায় 'ইউরোসেন্ট্রিজম' বা 'ইউরোপকেন্দ্রিকতা' একটি অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত তাত্ত্বিক কাঠামো। এটি কেবল একটি ভৌগোলিক কেন্দ্রিকতা নয়, বরং এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি যা বিশ্ব ইতিহাসকে ইউরোপের উত্থান, পতন এবং প্রগতির মানদণ্ডে পরিমাপ করে। যখন কোনো ইতিহাসবিদ বা ঐতিহাসিক গ্রন্থ সমগ্র মানবজাতির বিবর্তনকে ইউরোপীয় রেনেসাঁ, শিল্প বিপ্লব বা আলোকায়ন (Enlightenment) এর প্রেক্ষাপটে বিচার করতে শুরু করে, তখনই সেখানে 'হিস্টোরিক্যাল অবজেক্টিভিটি' বা 'ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতা'র অবক্ষয় ঘটে। বস্তুনিষ্ঠতা দাবি করে যে, ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা মহাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে, নিরপেক্ষভাবে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু ইউরোসেন্ট্রিক বয়ান প্রায়শই প্রাচ্যের সভ্যতাগুলোকে কেবল ইউরোপের 'প্রস্তুতিমূলক পর্যায়' বা 'অন্ধকার যুগ' হিসেবে চিত্রিত করে, যা প্রকৃত ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করে একটি কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্বের মিথ নির্মাণ করে।

ইউরোসেন্ট্রিক কাঠামো ও ইতিহাসের শ্রেণিবিন্যাসতত্ত্ব

ঐতিহাসিক বয়ান রচনার ক্ষেত্রে শ্রেণিবিন্যাস বা Taxonomy অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসকে এমনভাবে বিন্যস্ত করে যেখানে ইউরোপীয় অগ্রগতিকে ইতিহাসের মূলধারা হিসেবে গণ্য করা হয় এবং অন্যান্য অঞ্চলের ইতিহাসকে কেবল পার্শ্বগল্প বা 'প্রি-কুইজিক্যাল' (pre-quizzical) ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। উইল ডিউরান্টের 'দ্য স্টোরি অব সিভিলাইজেশন' (The Story of Civilization) গ্রন্থের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে এই কাঠামোগত পক্ষপাতিত্বের একটি স্পষ্ট চিত্র পরিলক্ষিত হয়। এই বিশাল মহাকাব্যিক গ্রন্থটি যখন মানব সভ্যতার ইতিহাস বর্ণনা করতে শুরু করে, তখন এটি একটি নির্দিষ্ট ক্রম অনুসরণ করে যা পরোক্ষভাবে ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে।

গ্রন্থটির বিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রথম খণ্ডে প্রাচ্যের ইতিহাস (মিশর, ভারত, চীন ও জাপান) নিয়ে আলোচনা করা হলেও, তা মূলত ইউরোপীয় সভ্যতার বিকাশের একটি পটভূমি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। গ্রন্থটির তৃতীয় খণ্ডটি মূলত "শ্বেতাঙ্গ জাতিসত্তার ইতিহাস" বা "the white race" এর উত্থান ও বিকাশের ওপর আলোকপাত করে। এই শ্রেণিবিন্যাসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ইতিহাসকে ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে সরিয়ে একটি বর্ণবাদী ও জাতিগত কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে।


"وكان جزؤها الثاني حياة اليونان (1939) وهو يسجل تاريخ اليونان وثقافتهم من اقدم العصور المعروفة... وكان جزؤها الثالث قيصر والمسيح (1944) رواية قصة الجنس الأبيض حتى عام 325 م"

[1]

উপরোক্ত আরবি ইবারতটি প্রমাণ করে যে, ঐতিহাসিক ঘটনাবলিকে যেভাবে খণ্ডবিভক্ত করা হয়েছে, তা মূলত একটি নির্দিষ্ট জাতিসত্তার (শ্বেতাঙ্গ জাতি) আধিপত্যবাদী ইতিহাস নির্মাণের প্রচেষ্টা। যখন ইতিহাসকে 'الجنس الأبيض' (শ্বেতাঙ্গ জাতি) এর কাহিনী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তখন এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর (যেমন এশীয় বা আফ্রিকান) ইতিহাসকে একটি গৌণ বা 'অন্যান্য' (Othering) পর্যায়ে ঠেলে দেয়। এটি ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতার পরিপন্থী, কারণ ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট বর্ণের বা জাতির একচেটিয়া সম্পত্তি হতে পারে না।

তদুপরি, রেনেসাঁ বা নবজাগরণকে কেবল ইতালির প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ রেখে এবং একে ইউরোপের সামগ্রিক উত্তরণের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে একটি সংকীর্ণ ঐতিহাসিক দিগন্ত তৈরি করা হয়েছে। যদিও ইতালীয় রেনেসাঁ বিশ্ব ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, কিন্তু ইউরোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন ইউরোপের বাইরে অন্য কোনো অঞ্চলের জ্ঞানতাত্ত্বিক বা সাংস্কৃতিক বিকাশ ইতিহাসের মূলধারার অংশ নয়। এই ধরনের শ্রেণিবিন্যাসতত্ত্ব মূলত একটি 'টেলিওলজিক্যাল' (Teleological) ধারণা প্রচার করে, যেখানে মনে করা হয় সমস্ত মানব সভ্যতা শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় আধুনিকতার দিকেই ধাবিত হচ্ছে।

বর্ণবাদী ইতিহাসতত্ত্ব ও 'শ্বেতাঙ্গ জাতিসত্তার' নির্মাণ

ইউরোসেন্ট্রিজমের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো বর্ণবাদী ইতিহাসতত্ত্ব (Racialized Historiography)। ইতিহাসের পাতায় যখন কোনো সভ্যতাকে 'সভ্য' এবং অন্যকে 'বর্বর' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন তার মূলে থাকে একটি নির্দিষ্ট বর্ণবাদী শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা। 'দ্য স্টোরি অব সিভিলাইজেশন' গ্রন্থের কাঠামোতে যেভাবে 'الجنس الأبيض' বা শ্বেতাঙ্গ জাতির ইতিহাসকে একটি স্বতন্ত্র ও কেন্দ্রীয় অধ্যায় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তা মূলত ইউরোপীয় আধিপত্যকে বৈধতা দেওয়ার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল।

ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতা দাবি করে যে, সভ্যতার বিবর্তন কোনো নির্দিষ্ট বর্ণের একক অর্জন নয়, বরং এটি মানবজাতির সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। কিন্তু ইউরোসেন্ট্রিক বয়ান ইতিহাসকে একটি বর্ণবাদী রেখাচিত্রের (Racial Lineage) মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে চায়। এই প্রক্রিয়ায় প্রাচ্যের উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন এবং স্থাপত্যবিদ্যাকে কেবল ইউরোপীয় রেনেসাঁর জন্য একটি 'উৎস' বা 'অনুপ্রেরণা' হিসেবে দেখানো হয়, কিন্তু সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক মালিকানা বা অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয় না।


"وكان جزؤها الثالث قيصر والمسيح (1944) رواية قصة الجنس الأبيض حتى عام 325 م"

[2]

এই ইবারতটি নির্দেশ করে যে, ইতিহাসের একটি বিশাল অংশকে 'শ্বেতাঙ্গ জাতির কাহিনী' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ঐতিহাসিক প্রবণতা। যখন ইতিহাসকে বর্ণভিত্তিক পরিচয়ে বিভক্ত করা হয়, তখন তা বৈজ্ঞানিক গবেষণার পরিবর্তে রাজনৈতিক ও সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এর ফলে, অ-ইউরোপীয় সভ্যতাগুলোর নিজস্ব স্বকীয়তা ও বিবর্তনীয় ধারাটি অবহেলিত হয় এবং তাদের ইতিহাসকে কেবল ইউরোপীয় অগ্রগতির একটি 'প্রস্তাবনা' হিসেবে গণ্য করা হয়।

এই ধরনের বর্ণবাদী ইতিহাসতত্ত্বের প্রভাব কেবল পাঠকদের দৃষ্টিভঙ্গিতেই পড়ে না, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যখন এশিয়া ও আফ্রিকা দখল করেছিল, তখন তারা তাদের এই 'ইতিহাসতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব' বা 'Civilizing Mission'-কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, যেহেতু তারা ঐতিহাসিকভাবে 'উন্নত' এবং 'সভ্য', তাই তাদের দায়িত্ব হলো 'বর্বর' বা 'অসভ্য' জাতিগুলোকে শাসন করা। সুতরাং, ইউরোসেন্ট্রিক ইতিহাসতত্ত্ব কেবল অতীতের বর্ণনা নয়, বরং এটি একটি চলমান রাজনৈতিক হাতিয়ার যা বর্তমানের বৈষম্যমূলক বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।

মিথ নির্মাণ বনাম বৈজ্ঞানিক সত্যতা: ক্লাসিক্যাল স্টাডিজের সংকট

ইউরোসেন্ট্রিজম প্রায়শই ঐতিহাসিক সত্যের পরিবর্তে জাতীয়তাবাদী মিথ বা পৌরাণিক কাহিনীকে (Mythology) ইতিহাসের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে। ইউরোপীয় জাতিসমূহ তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য প্রায়শই প্রাচীন গ্রিক বা রোমান মিথের সাথে নিজেদের সংযোগ স্থাপন করে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রাঙ্কিশ বা ফ্রাঙ্কদের (Franks) উৎস নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণা ছিল যা মূলত একটি কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্বের মিথ ছিল। অনেক ঐতিহাসিক দাবি করতেন যে, ফ্রাঙ্করা গ্রিস বা ট্রয় থেকে আসা একদল 'স্বাধীন' যোদ্ধা, যা তাদের ইউরোপীয় আভিজাত্যের সাথে যুক্ত করার একটি প্রচেষ্টা ছিল।

তবে, ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যখন এই মিথগুলোর মুখোমুখি হয়, তখন সত্যের উদ্ঘাটন ঘটে। নিকোলা ফ্রিয়েরি (Nicola Frieri)-র মতো গবেষকরা ক্লাসিক্যাল স্টাডিজের এই মিথগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ফ্রাঙ্করা গ্রিস থেকে আসা কোনো মহৎ বা স্বাধীন জাতি ছিল না, বরং তারা ছিল দক্ষিণ জার্মানি থেকে আসা একদল 'বর্বর' (Barbarians)।


"وقبل عضواً في الأكاديمية الفرنسية الملكية للمأثورات والآداب البحتة وهو في السادسة والعشرين، وقرأ لها في ذلك العام (1714) بحثاً 'في أصل الفرنجة' قلب الأسطورة الفخور التي زعمت أن الفرنجة رجال 'أحرار' قدموا من اليونان أو طروادة، فقال إن الأصح أنهم كانوا همجاً من ألمان الجنوبيين."

[3]

ফ্রিয়েরি-র এই গবেষণাটি ইউরোসেন্ট্রিক মিথ নির্মাণের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আঘাত। তিনি দেখিয়েছেন যে, কীভাবে একটি জাতির পরিচয়কে মহিমান্বিত করার জন্য ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়। ফ্রাঙ্কদের 'স্বাধীন যোদ্ধা' হিসেবে উপস্থাপন করার পেছনে যে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ছিল, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইতিহাসচর্চায় বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা কতটা কঠিন যখন জাতীয়তাবাদ ও শ্রেষ্ঠত্ববোধের সংঘাত ঘটে।

ক্লাসিক্যাল স্টাডিজের এই সংকটটি আরও বিস্তৃত। রোমুলুস ও রিমাস (Romulus and Remus) বা হোমারের মহাকাব্যিক চরিত্রগুলোর ঐতিহাসিকতা নিয়ে যখন সন্দেহ প্রকাশ করা হয়, তখন অনেক রক্ষণশীল ইতিহাসবিদ একে আক্রমণ করেন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিক পদ্ধতি অনুযায়ী, এই কাহিনীগুলো কেবল পৌরাণিক বা মিথলজিক্যাল, যা ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তির অংশ হতে পারে না। ইউরোসেন্ট্রিক ইতিহাসতত্ত্ব প্রায়শই এই মিথগুলোকে 'ঐতিহাসিক সত্য' হিসেবে গ্রহণ করে যাতে ইউরোপীয় সভ্যতার শিকড়কে অতিপ্রাকৃত বা অতি-মহিমান্বিত দেখানো যায়। অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক ইতিহাসতত্ত্ব (Scientific Historiography) মিথ এবং সত্যের মধ্যে একটি কঠোর সীমারেখা টেনে দেয়, যা ইউরোসেন্ট্রিক বয়ানের জন্য সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জ।

ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও ঐতিহাসিক বয়ানসমূহের সংঘাত

ইতিহাস কেবল অতীতের দলিল নয়, এটি বর্তমানের ক্ষমতার লড়াইয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইউরোসেন্ট্রিক বয়ান এবং ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতার মধ্যকার দ্বন্দ্বটি প্রায়শই ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো একটি অঞ্চলের ইতিহাস যেভাবে লেখা হয়, তা সেই অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্যের প্রতিফলন ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ, ১৭শ শতাব্দীর ইউরোপীয় রাজনীতিতে ফ্রান্সের আধিপত্য এবং তার বিরুদ্ধে গঠিত বিভিন্ন জোটের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কীভাবে ইতিহাসকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

লুই চতুর্দশ (Louis XIV)-এর শাসনকাল এবং তার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সংঘাতের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক লড়াইও ছিল। তৎকালীন সময়ে ফরাসি ইতিহাস বা সংস্কৃতিকে যেভাবে উপস্থাপন করা হতো, তা অনেক সময় সমালোচকদের কাছে 'বর্বরতা' বা 'অত্যধিক উগ্রতা' হিসেবে প্রতীয়মান হতো।


"ونعتوا لويس بأنه مسخ كافر مجدف همجي بالغ الهمجية... وكانت الحرب آنذاك حرب أوربا ضد فرنسا."

[4]

এই ইবারতটি নির্দেশ করে যে, কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা একজন শাসকের ইতিহাস বা চরিত্রকে 'বর্বর' (همجي) হিসেবে চিত্রিত করার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করত। এটি প্রমাণ করে যে, ইতিহাসচর্চায় 'বর্বরতা' (Barbarism) এবং 'সভ্যতা' (Civilization)-র সংজ্ঞাগুলো অত্যন্ত আপেক্ষিক এবং রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। ইউরোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়শই ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সংঘাতগুলোকে 'সভ্যতার লড়াই' হিসেবে দেখায়, কিন্তু যখন সেই একই মানদণ্ড অন্য কোনো অঞ্চলের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তখন তা 'বর্বরতা' হিসেবে চিহ্নিত হয়।

পরিশেষে বলা যায়, ইউরোসেন্ট্রিজম এবং ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতার মধ্যকার এই দ্বন্দ্বটি মূলত ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ইউরোসেন্ট্রিজম ইতিহাসকে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে দেখার চেষ্টা করে যা ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও বর্ণবাদী কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে, ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতা দাবি করে একটি বহু-কেন্দ্রিক (Polycentric) এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে প্রতিটি সভ্যতা তার নিজস্ব প্রেক্ষাপটে এবং তার নিজস্ব যোগ্যতায় বিচার্য। ইতিহাসকে কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতির জয়গান হিসেবে না দেখে, বরং মানবজাতির বৈচিত্র্যময় ও জটিল বিবর্তনের একটি নিরপেক্ষ দলিল হিসেবে গড়ে তোলাই হলো আধুনিক ইতিহাসতত্ত্বের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

""
১.৩.১ ইউরোসেন্ট্রিজম (Eurocentrism) বনাম হিস্টোরিক্যাল অবজেক্টিভিটি (Historical Objectivity)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১.৩.১ ইউরোসেন্ট্রিজম (Eurocentrism) বনাম হিস্টোরিক্যাল অবজেক্টিভিটি (Historical Objectivity) কুইজ

1 / 5

ইউরোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ব ইতিহাসকে মূলত কিসের মানদণ্ডে পরিমাপ করে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...