প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় প্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে লোহিত সাগর ছিল কেবল একটি জলপথ নয়, বরং তা ছিল এশিয়া ও আফ্রিকার বাণিজ্য, ধর্মীয় আদর্শ এবং সামরিক আধিপত্য বিস্তারের প্রধান ধমনী। হিজাজ ও ইয়েমেন সংলগ্ন আরব উপদ্বীপের সার্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আফ্রিকান শিং (Horn of Africa)-এ অবস্থিত আকসুমাইট বা আবিসিনীয় (হাবশা) সাম্রাজ্যের অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও কৌশলগত। হিজরতের বহু পূর্ব থেকেই আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনপ্রবাহ ইথিওপিয়ান সাম্রাজ্যের গতিপ্রকৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। জহিরিয়া বা প্রাক-ইসলামি যুগে রোমান-বাইজান্টাইন ও সাসানীয় পারস্যের দ্বিমুখী বৈশ্বিক স্নায়ুযুদ্ধের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল দক্ষিণ আরব ও আবিসিনিয়া। বাইজান্টাইন রোম খ্রিস্টধর্মীয় কৌশলগত মিত্রতার সুবাদে আকসুমাইট সাম্রাজ্যকে আরব উপদ্বীপে নিজেদের ছায়া-শক্তি (proxy force) হিসেবে ব্যবহার করত, যার চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখি ইয়েমেনে হাবশী শাসন প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে আবরাহার মক্কা অভিযানের মাধ্যমে [1] । ইবনে ইসহাকের সীরাত সাহিত্য পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, আবিসিনিয়ার এই জিও-স্ট্র্যাটেজিক বাস্তবতাকে রসূলুল্লাহ সা. অত্যন্ত সূক্ষ্ম কূটনৈতিক প্রজ্ঞার সাথে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।
লোহিত সাগরের উভয় তীরের এই ভূ-রাজনৈতিক আন্তঃসম্পর্ক কেবল সামরিক সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা অর্থনৈতিক লেনদেন ও জনসংখ্যাগত স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে এক গভীর রূপ পরিগ্রহ করেছিল। মক্কার কুরাইশ বণিকদের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলো যেমন উত্তরে শামে এবং দক্ষিণে ইয়েমেনে যাতায়াত করত, তেমনি লোহিত সাগর অতিক্রম করে আফ্রিকান উপকূলে তাদের বাণিজ্য পরিচালনা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল ছিল [2] । প্রাক-ইসলামি মক্কার প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, যেমন আবু তালিব ও আল-আশআম, আবিসিনীয় রাজদরবারের সাথে বিশেষ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষা করতেন। অন্যদিকে, ইয়েমেনে হিময়ারীয় রাজাদের পতন এবং তদ্বলয়ে হাবশী প্রভাব বৃদ্ধির ফলে সমগ্র আরব উপদ্বীপে শক্তির যে নতুন ভারসাম্য গড়ে উঠেছিল, ইবনে ইসহাক তাঁর বর্ণনায় তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরেছেন [3] ।
ইবনে ইসহাকের রেওয়ায়েতে আবিসিনিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও নাজ্জাশীর শাসনতান্ত্রিক মর্যাদা
মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক তাঁর সীরাতগ্রন্থে প্রাচীন আবিসিনিয়ার রাজনৈতিক অবকাঠামো এবং বিশ্ব-রাজনীতিতে এর অবস্থানের এক অসামান্য চিত্র অঙ্কন করেছেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনানুসারে, আবিসিনিয়ার তৎকালীন শাসক নাজ্জাশী (আসহামা) কেবল একজন স্থানীয় নৃপতি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একাধারে ধর্মীয় ও সামরিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। ইবনে ইসহাক নাজ্জাশীর দরবারের প্রশাসনিক কাঠামোর যে বিবরণ দিয়েছেন, তাতে দেখা যায় যে সেখানে বিশিষ্ট পাদ্রী ও পাত্রিয়ার্কদের (بطارقة) সমন্বয়ে গঠিত একটি উপদেষ্টা পরিষদ ছিল, যা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা পালন করত [4] । নাজ্জাশীর এই ন্যায়পরায়ণতা ও প্রশাসনিক সার্বভৌমত্বই মক্কার শোষিত ও নির্যাতিত নবীন মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের প্রধান ভূ-রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
রাসুলুল্লাহ সা. মক্কার বৈরী পরিবেশের বিপরীতে হাবশাকে বেছে নেওয়ার মূল কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যে রাজনৈতিক মূল্যায়ন পেশ করেছিলেন, ইবনে ইসহাক তা অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে লিপিবদ্ধ করেছেন। সীরাতে উদ্ধৃত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সা. সাহাবিগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন:
«لو خرجتم إلى أرض الحبشة، فإن بها ملكا لا يظلم عنده أحد، وهي أرض صدق، حتى يجعل الله لكم فرجا مما أنتم فيه»
এই ঐতিহাসিক ঘোষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, আবিসিনিয়া তৎকালীন বিশ্বের চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যেও একটি শান্তিময় ও ন্যায়ভিত্তিক 'নিরাপদ অঞ্চল' (safe haven) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল [5] । রাজনৈতিক ভূ-সংস্থানের বিচারে লোহিত সাগরের ওপারে অবস্থিত একটি খ্রিস্টান অধ্যুষিত রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবে নির্বাচন করা রসূলুল্লাহ সা. এর এক অসাধারণ ভূ-রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ ছিল। ইবনে ইসহাকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, পারস্য ও রোমের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আবিসিনিয়া বাইজান্টাইনদের ধর্মীয় অক্ষে থাকলেও নাজ্জাশী নিজস্ব স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতেন, যা কুরাইশদের সামুদ্রিক ও আঞ্চলিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিশালী ছিল [6] ।
আবিসিনিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিশীলতা এবং রাজপরিবারের ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্বও ইবনে ইসহাকের সীরাতে গভীরভাবে স্থান পেয়েছে। নাজ্জাশীর সিংহাসনে আরোহণ, তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় অভিজাতদের বিদ্রোহ এবং সেই সংকটময় মুহূর্তে আবিসিনিয়ায় অবস্থানরত মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় যে, প্রাথমিক মুসলিম উম্মাহ কেবল রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবেই সেখানে অবস্থান করছিল না, বরং তারা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সাথেও নিজেদের মানসিকভাবে যুক্ত করেছিল [7] । নাজ্জাশীর রাজনৈতিক স্থায়িত্বের ওপর মদিনা-পূর্ববর্তী মুসলিম সমাজের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা প্রত্যক্ষভাবে নির্ভর করছিল, যা ইবনে ইসহাকের ঐতিহাসিক তথ্যাবলীতে প্রমানিত হয়।
আবিসিনিয়ায় হিজরত: মক্কার কুরাইশদের ভূ-রাজনৈতিক পরাভব ও নিরাপত্তা কৌশলের নতুন মাত্রা
নবুয়তের পঞ্চম ও ষষ্ঠ বর্ষে আবিসিনিয়ায় পরিচালিত প্রথম ও দ্বিতীয় হিজরত কেবল প্রাণরক্ষার উদ্দেশ্যে গৃহীত কোনো সাধারণ পলায়ন ছিল না; বরং তা ছিল মক্কার কুরাইশদের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক বেষ্টনীকে ছিন্ন করার একটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপ। কুরাইশরা মক্কার ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে যে 'হিলফ' ও সামাজিক আধিপত্য গড়ে তুলেছিল, মুসলমানদের আবিসিনিয়া গমন সেই আধিপত্যের ওপর এক বিরাট আঘাত হানে। ইবনে ইসহাকের বর্ণনানুসারে, মুসলমানরা মক্কা ত্যাগ করে লোহিত সাগরের শুয়াইবা (الشعيبة) বন্দরে উপস্থিত হন এবং সেখান থেকে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে চড়ে আবিসিনিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন [8] । এই সামুদ্রিক রুটের ব্যবহার প্রমাণ করে যে, তৎকালীন মুসলমানদের সামুদ্রিক ভূ-রাজনীতি ও বাণিজ্য পথ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল।
মুসলমানদের এই কৌশলগত পদক্ষেপে আতঙ্কিত হয়ে মক্কার কুরাইশ নেতৃত্ব অবিলম্বে তাদের সর্বাধুনিক কূটনৈতিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে আমর ইবনুল আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে আবি রবিআকে এক বিশাল কূটনৈতিক প্রতিনিধি দল হিসেবে আবিসিনিয়ার দরবারে প্রেরণ করে। ইবনে ইসহাক অত্যন্ত নাটকীয় ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এই কূটনৈতিক সংগ্রামের বিবরণ প্রদান করেছেন। কুরাইশরা নাজ্জাশী ও তাঁর দরবারের পাত্রিয়ার্কদের মন জয়ের জন্য মূল্যবান চামড়াজাত পণ্য ও উপহার সামগ্রী পাঠায়। তারা হস্তান্তরের পক্ষে প্রধান যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল যে, এই আশ্রয়প্রার্থীরা নিজেদের পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করেছে এবং খ্রিস্টধর্মও গ্রহণ করেনি, বরং তারা এক নতুন অরাজকীয় মতবাদের জন্ম দিয়েছে [9] । কুরাইশদের এই যুক্তি ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তির মতো একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম রাজনৈতিক শরণার্থীদের ভূ-রাজনৈতিক আশ্রয় বাতিল করা।
তবে ইথিওপিয়ান রাজদরবারে জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর আত্মপক্ষ সমর্থন এবং সূরা মারইয়াম তেলাওয়াত কুরাইশদের এই সুবিন্যস্ত কূটনৈতিক ষড়যন্ত্রকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেয়। জাফর রা. অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় ইসলামের তৌহিদবাদী দর্শন, সামাজিক বিচারপ্রক্রিয়া এবং ঈসা আ. ও মারইয়াম আ.-এর পবিত্রতার বিবরণ পেশ করেন। এর জবাবে নাজ্জাশীর ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া ইবনে ইসহাক সংকলন করেছেন:
«إن هذا والذي جاء به عيسى ليخرج من مشكاة واحدة، انطلقا، فلا والله لا أسلمهم إليكما أبدا»
এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে আবিসিনিয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলমানদের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রদান করে, যা কুরাইশদের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের মুখে এক চরম কূটনৈতিক পরাভব এনে দেয় [10] । কুরাইশরা তাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় নিরাপত্তা বলয় ও লোহিত সাগরীয় বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় নিপতিত হয়, যা পরবর্তীতে মদিনায় হিজরতের পটভূমি তৈরিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
সামুদ্রিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি: আবিসিনিয়ার ভূ-কৌশলগত ভারসাম্য এবং মদিনা রাষ্ট্রের উদয়
আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের অবস্থান মক্কার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড অর্থাৎ তাদের লোহিত সাগরভিত্তিক বাণিজ্য রুটের ওপর চরম মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। মক্কার অর্থনীতি মূলত গ্রীষ্মকালে শাম ও শীতকালে ইয়েমেন-আবিসিনিয়া বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। লোহিত সাগরের অপর তীরে শত শত সচেতন ও সুসংগঠিত মুসলিমের অবস্থান কুরাইশদের জন্য এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, যেকোনো সময় তাদের সামুদ্রিক বাণিজ্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। ইবনে ইসহাকের সীরাত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ সা. এই অবস্থানের মাধ্যমে কৌশলগত একটি 'ভারসাম্য ব্যবস্থা' (Balance of Power) গড়ে তুলেছিলেন।
মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও আবিসিনিয়ার এই ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি, বরং তা এক নতুন আন্তর্জাতিক মাত্রা লাভ করে। মদিনায় রসূলুল্লাহ সা. এর হিজরতের পরও দীর্ঘ সময় ধরে জাফর ইবনে আবি তালিব রা. এর নেতৃত্বে সাহাবিদের একটি বিরাট অংশ আবিসিনিয়াতেই অবস্থান করছিলেন। ইবনে ইসহাকের মতে, এটি ছিল রসূলুল্লাহ সা. এর এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ফসল। যদি মদিনার নতুন রাষ্ট্র কুরাইশ, বাহরাইন বা অন্যান্য নজদী গোত্রগুলোর যৌথ আক্রমণে সংকটাপন্ন হতো, তবে আবিসিনিয়া তখনও উন্মুক্ত দ্বিতীয় বিকল্প ঘাঁটি হিসেবে সংরক্ষিত ছিল [11] । অর্থাৎ, মদিনা ও হাবশার মধ্যে একটি অক্ষ গড়ে উঠেছিল যা তৎকালীন আরব উপদ্বীপের সামরিক সমীকরণকে প্রভাবিত করত।
অবশেষে খাইবার বিজয়ের পর সপ্তম হিজরিতে যখন মদিনা রাষ্ট্র আঞ্চলিকভাবে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হয়, তখন রসূলুল্লাহ সা. আমর ইবনে উমাইয়া আল-জমরী রা. কে বিশেষ দূত হিসেবে নাজ্জাশীর কাছে পাঠান এবং আবিসিনিয়ায় অবস্থানরত অবশিষ্ট মুসলমানদের মদিনায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন [12] । এই সময় নাজ্জাশীকে লেখা রসূলুল্লাহ সা. এর চিঠি এবং তার উত্তরে নাজ্জাশীর ইতিবাচক সাড়া ও ইসলাম গ্রহণ প্রমান করে যে, লোহিত সাগরীয় এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক অনন্য ভূ-রাজনৈতিক সাফল্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
দক্ষিণ আরব, আবিসিনিয়া ও পারস্য শক্তির ত্রিমুখী ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা: সীরাতের নিরিখে একটি বিশ্লেষণ
ইসলামের প্রাক-কালে এবং নবুয়তের প্রারম্ভিক যুগে দক্ষিণ আরব (ইয়েমেন) ছিল বাইজান্টাইন-আবিসিনীয় অক্ষ এবং সাসানীয় পারস্যের মধ্যকার তীব্র ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। ইবনে ইসহাক তাঁর সীরাতের প্রারম্ভিক অধ্যায়গুলোতে 'আসহাবুল ফিল' বা আবরাহার মক্কার কাবা ধ্বংসের ব্যর্থ অভিযান থেকে শুরু করে কীভাবে ইয়েমেনে হাবশী শাসনের সূচনা ও অবসান ঘটেছিল, তার এক বিস্তারিত ঐতিহাসিক ফ্রেমওয়ার্ক উপস্থাপন করেছেন [13] । আবরাহার অভিযানের মূল ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল মেসোপটেমিয়া ও আরবের বাণিজ্যিক পথকে আকসুমাইট-বাইজান্টাইন অক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং মক্কার অর্থনৈতিক গুরুত্বকে ধ্বংস করে সানআর 'আল-কুল্লৈস' গির্জাকে সমগ্র উপদ্বীপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করা [14] ।
আবরাহার এই দুঃসাহসিক সামরিক অভিযানের ব্যর্থতা কেবল কুরাইশদের সামাজিক মর্যাদাই বৃদ্ধি করেনি, বরং তা দক্ষিণ আরবে হাবশী সামরিক আধিপত্যেরও পতন ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, কীভাবে পরবর্তীকালে ইয়েমেনের হিময়ারীয় রাজপুত্র সাইফ ইবনে দি-ইয়াজান হাবশী শাসনের বিরুদ্ধে পারস্যের শানশাওয়ান কিসরা (খসরু পারভেজ)-এর সাহায্য প্রার্থনা করেন [15] । পারস্য সম্রাট ওয়াহরিজের নেতৃত্বে এক অশ্বারোহী বাহিনী প্রেরণ করে ইয়েমেন থেকে আবিসিনীয় বাহিনীদের বিতাড়িত করে এবং ইয়েমেন পারস্যের একটি সুরক্ষিত প্রদেশে পরিণত হয়। এর ফলে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সমীকরণে চরম পরিবর্তন আসে এবং পারস্য শক্তি সরাসরি আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত ঘিরে ফেলে।
সীরাত শাস্ত্রের এই গভীর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত নির্দেশ করে যে, রসূলুল্লাহ সা. যখন মক্কায় তাঁর নবুয়তের দাওয়াত বিস্তার করছিলেন, তখন একদিকে পারস্যের ছায়াতলে ইয়েমেন, অন্যদিকে লোহিত সাগরের ওপারে বাইজান্টাইন ঘেঁষা কিন্তু স্বতন্ত্র আবিসিনিয়া—এই দুই শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পরাশক্তির মাঝখানে হিজাজ অঞ্চলটি একটি ভূ-রাজনৈতিক শূন্যতা (Geopolitical Vacuum) উপভোগ করছিল। রসূলুল্লাহ সা. এই আঞ্চলিক শক্তিপরীক্ষার জটিল গতিপ্রকৃতিকে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবন করেছিলেন। পারস্যের বিস্তারবাদী নীতি এবং বাইজান্টাইন-হাবশী অক্ষের ঐতিহাসিক ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটেই ইসলামি দাওয়াত মক্কা থেকে মদিনায় প্রসারিত হয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ ঘটে। ইবনে ইসহাকের সীরাতে আরব-আবিসিনীয় সম্পর্কের এই সূক্ষ্ম জিও-স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষণটি ইসলামি ইতিহাসের সামরিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব নির্মাণের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত [16] ।