১১.২ মূর্তিপূজাকে 'ইভোলিউশনারি রিলিজিয়ন' (Evolutionary Religion) প্রমাণের পশ্চিমা অপচেষ্টার থিওলজিক্যাল খণ্ডন
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ডারউইনীয় বিবর্তনবাদের উত্থান কেবল জীববিজ্ঞানের জগতে কোনো বৈজ্ঞানিক বিপ্লব হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি মানব সভ্যতার ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান এবং ধর্মতত্ত্বের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়ার এক বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে [1] । পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোতে একটি অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও সুপরিকল্পিত তত্ত্বের উদ্ভব ঘটে, যাকে 'ইভোলিউশনারি রিলিজিয়ন' বা 'বিবর্তনীয় ধর্মতত্ত্ব' হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই তত্ত্বের মূল নির্যাস হলো—ধর্ম কোনো ঐশ্বরিক ও অকাট্য সত্য (Revelation) নয়, বরং এটি মানুষের আদিম ও অবৈজ্ঞানিক মূর্তিপূজা থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে এক উন্নত ও জটিল একশ্বরবাদী কাঠামোতে উপনীত হয়েছে। পশ্চিমা ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা মূর্তিপূজাকে একটি 'প্রাগৈতিহাসিক স্তর' হিসেবে চিহ্নিত করে দাবি করেন যে, মানুষ প্রথমে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের পূজা করত এবং সময়ের বিবর্তনে বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতির সাথে সাথে তারা এক অদৃশ্য স্রষ্টার ধারণা লাভ করেছে।
এই তত্ত্বের মূলে রয়েছে ডারউইনীয় বিবর্তনবাদের সেই ধারণা, যেখানে বলা হয়েছে যে সকল জীবন্ত সত্তা কোষীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে বিবর্তিত হয়ে শৈবাল থেকে উন্নত প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছে [2] । পশ্চিমা চিন্তাবিদগণ এই জৈবিক বিবর্তনবাদকে ধর্মতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দাবি করেন যে, মূর্তিপূজা হলো ধর্মের 'শৈবাল স্তর' এবং একশ্বরবাদ হলো ধর্মের 'উন্নত প্রাণীর স্তর'। তারা এই প্রক্রিয়াটিকে একটি রৈখিক ও প্রগতিশীল উন্নয়ন হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে মূর্তিপূজা হলো মানুষের অজ্ঞতার প্রতীক এবং একশ্বরবাদ হলো তার বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরণ। তবে এই তাত্ত্বিক কাঠামোটি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি ইসলামের মৌলিক 'তাওহীদ' ও 'ফিতরাত' (মানুষের সহজাত প্রকৃতি) এর ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে।
ইসলামি ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্বের আলোকে এই 'ইভোলিউশনারি রিলিজিয়ন' তত্ত্বটি কেবল একটি ভুল ধারণা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক অপচেষ্টা, যার লক্ষ্য হলো ওহী বা ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশকে (Revelation) মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিবর্তনের একটি উপজাত (By-product) হিসেবে প্রমাণ করা। তারা ওহীর সত্যতাকে অস্বীকার করার জন্য এমন এক বৈজ্ঞানিক আবরণের ব্যবহার করে, যা মূলত ধর্মের ঐশ্বরিক উৎসকে খণ্ডন করার একটি কৌশল মাত্র [3] ।
ফিতরাত বনাম বিবর্তন: সত্যের অবিচলতা ও মানুষের বিচ্যুতি
পশ্চিমা তাত্ত্বিকদের 'ইভোলিউশনারি রিলিজিয়ন' তত্ত্বের প্রধানতম দুর্বলতা হলো এটি মানুষের 'ফিতরাত' বা সহজাত তাওহীদী প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। বিবর্তনবাদ দাবি করে যে, মানুষ তার পরিবেশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের মাধ্যমে ধর্মীয় ধারণা তৈরি করেছে। কিন্তু ইসলামি আকীদা অনুযায়ী, মানুষ সৃষ্টির আদিতেই একত্ববাদের (Tawhid) ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। আদম সা. থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল নবি ও রাসুলগণ মানুষকে মূর্তিপূজার অন্ধকার থেকে বের করে এনে সেই আদি ও অকৃত্রিম ফিতরাতের দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে আহ্বান জানিয়েছেন। সুতরাং, মূর্তিপূজা কোনো 'উন্নতির স্তর' নয়, বরং এটি হলো মানুষের আদি সত্য থেকে বিচ্যুতি বা পতন।
ডারউইনীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, জীবন্ত সত্তাগুলো কোষীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে বিবর্তিত হয়েছে [4] । পশ্চিমা তাত্ত্বিকরা এই যুক্তিকে ধর্মের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দাবি করেন যে, মূর্তিপূজা থেকে একশ্বরবাদে উত্তরণ একটি স্বাভাবিক বিবর্তন। কিন্তু এই যুক্তিতে একটি মৌলিক বৈপরীত্য রয়েছে। যদি ধর্ম বিবর্তিত হয়, তবে ধর্মের মূল ভিত্তি বা 'সত্য' কীভাবে অপরিবর্তিত থাকতে পারে? যদি ধর্ম মানুষের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনের ফসল হয়, তবে ওহীর অকাট্য ও চিরন্তন দাবি কীভাবে সম্ভব? প্রকৃতপক্ষে, মূর্তিপূজা কোনো বিবর্তন নয়, বরং এটি হলো মানুষের সেই সহজাত সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া।
ওহীর (Revelation) ক্ষেত্রে পশ্চিমা তাত্ত্বিকদের একটি প্রধান কৌশল হলো ওহীর সত্যতাকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করার অসম্ভবতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা। তারা দাবি করে যে, ওহী বা ঐশ্বরিক বাণী কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব নয়, তাই এটি কেবল মানুষের সামাজিক বিবর্তনের একটি কল্পনাপ্রসূত ধারণা [5] । কিন্তু এই দাবিটি অত্যন্ত ভ্রান্ত। ইসলামের ইতিহাস ও জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতি অনুযায়ী, ইতিহাস কেবল রৈখিক বিবর্তন নয়, বরং এটি ঐশ্বরিক নির্দেশনার প্রতিফলন এবং মানুষের অবাধ্যতার ইতিহাস। ইসলামি ঐতিহাসিক পদ্ধতি একটি সংশ্লেষণমূলক (Synthetic) পদ্ধতি, যা কেবল বস্তুগত পরিবর্তন নয়, বরং ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ ও মানুষের নৈতিক বিচ্যুতিকেও সমান গুরুত্ব দেয় [6] । অতএব, মূর্তিপূজাকে বিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা মানে হলো মানুষের নৈতিক পতনকে 'প্রগতি' হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা।
পশ্চিমা তাত্ত্বিকদের 'ইভোলিউশনারি রিলিজিয়ন' তত্ত্বটি মূলত 'তাহরিফ' বা সত্যের বিকৃতিকে 'বিবর্তন' হিসেবে রঞ্জিত করার একটি প্রচেষ্টা। ইসলামের দৃষ্টিতে, মূর্তিপূজা বা শিরক কোনো নতুন উদ্ভাবন বা বিবর্তিত ধারণা নয়; বরং এটি ছিল পূর্ববর্তী নবি ও রাসুলগণের প্রচারিত তাওহীদী বাণীর একটি বিকৃত রূপ। যখন মানুষ আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের তৈরি করা মূর্তির উপাসনা শুরু করল, তখন সেটি কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি ছিল না, বরং ছিল একটি ভয়াবহ আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অবক্ষয়। পশ্চিমা তাত্ত্বিকরা এই অবক্ষয়কে 'প্রগতি' বা 'বিবর্তন' হিসেবে অভিহিত করে ইতিহাসের প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করতে চায়।
ডারউইনীয় বিবর্তনবাদের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি জীবনের আণবিক বা মলিকুলার ভিত্তি (Molecular foundations of life) ব্যাখ্যা করতে অক্ষম [8] । ঠিক একইভাবে, 'ইভোলিউশনারি রিলিজিয়ন' তত্ত্বটিও ধর্মের আণবিক বা মূল ভিত্তি—অর্থাৎ 'তাওহীদ'—কে ব্যাখ্যা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তারা মূর্তিপূজাকে ধর্মের একটি প্রাথমিক স্তর হিসেবে দেখলেও, তারা এটি প্রমাণ করতে পারে না যে কেন মানুষ তার সহজাত তাওহীদী জ্ঞান হারিয়ে মূর্তিপূজার দিকে ধাবিত হলো। এই বিচ্যুতিটি কোনো বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ছিল ওহীর অবমাননা এবং সত্যের বিকৃতি (Tahrif)।
পশ্চিমা তাত্ত্বিকদের এই অপচেষ্টার একটি গভীর রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। যদি ধর্মকে একটি বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তবে ধর্মের ঐশ্বরিক ও অকাট্য কর্তৃত্বকে (Divine Authority) খণ্ডন করা সহজ হয়। তারা ওহীর সত্যতাকে অস্বীকার করার জন্য এমন সব যুক্তি উপস্থাপন করে যা মূলত বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক তথ্যের অপব্যবহার [9] । তারা দাবি করে যে, ধর্মের বিবর্তন মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে ঘটেছে। কিন্তু ইসলামি ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, প্রতিটি যুগে যখনই মানুষ সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তখনই ওহীর মাধ্যমে নতুন করে সত্যের আহ্বান জানানো হয়েছে। সুতরাং, মূর্তিপূজা হলো সত্যের অনুপস্থিতি, কোনো বিবর্তিত সত্য নয়।
এই তাত্ত্বিক লড়াইটি মূলত 'সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্ব' বনাম 'মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব' এর লড়াই। পশ্চিমা তাত্ত্বিকরা মানুষকে ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, যেখানে ধর্ম কেবল মানুষের প্রয়োজনে তৈরি একটি সামাজিক কাঠামো। কিন্তু ইসলামের মূল শিক্ষা হলো, মানুষ ইতিহাসের চালিকাশক্তি নয়, বরং আল্লাহ তাআলা ইতিহাসের নিয়ন্ত্রক এবং ওহী হলো সেই সত্যের মাপকাঠি যা মানুষের বিবর্তন নয়, বরং মানুষের বিচ্যুতি ও প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস বর্ণনা করে।
ডারউইনীয় বিবর্তনবাদ ও এর ধর্মতাত্ত্বিক প্রয়োগের এই ভ্রান্ত ধারণাটি মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই বস্তুবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারারই একটি অংশ, যা ওহীর সত্যতাকে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনের একটি উপজাত হিসেবে গণ্য করতে চায় [10] । মূর্তিপূজাকে বিবর্তনের একটি ধাপ হিসেবে দেখার এই পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের তাওহীদী দর্শনের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। মূর্তিপূজা কোনো বিবর্তনীয় স্তর নয়, বরং এটি হলো মানুষের সেই আদি ও অকৃত্রিম ফিতরাত থেকে বিচ্যুতি, যা কেবল ওহীর মাধ্যমেই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। ইতিহাসের প্রকৃত গতিধারা হলো সত্যের প্রচার এবং মানুষের সেই সত্য থেকে বিচ্যুতি ও পুনরায় প্রত্যাবর্তনের এক নিরন্তর সংগ্রাম, যা কোনো জৈবিক বিবর্তনবাদ দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।