খণ্ড 68
ফন্ট:100%
থিম:

১২.১০ মায়মুনার (রা.) বিবাহের পর মক্কার অভিজাতদের পলিটিক্যাল অ্যালাইনমেন্ট শিফট (Political Alignment Shift)

হিজরি সপ্তম শতকের জিলকদ মাসে অনুষ্ঠিত উমরাতুল কাযা বা কাযা উমরা কেবল একটি ধর্মীয় ইবাদতের আনুষ্ঠানিক সম্পাদন ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন আরবের ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) ও কূটনৈতিক মেরুকরণের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। এই উমরার সমান্তরালে উম্মুল মুমিনীন হযরত মায়মুনা বিনতুল হারিস রা.-এর সাথে রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিবাহ মক্কার কুরাইশ নেতৃত্বের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দেয়ালে এমন এক ফাটল সৃষ্টি করে, যা তাদের দীর্ঘদিনের ইসলামবিরোধী জোটকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দেয়। এই বৈবাহিক কূটনীতি (Marriage Diplomacy) মক্কার অভিজাতদের মধ্যে এক নজিরবিহীন পলিটিক্যাল অ্যালাইনমেন্ট শিফট বা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তন ঘটায়, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাবে মক্কা বিজয় ত্বরান্বিত হয়েছিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: উমরাতুল কাযা এবং মক্কার মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর


হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তানুযায়ী, ষষ্ঠ হিজরিতে উমরা না করেই মুসলমানদের মদিনায় ফিরে যেতে হয়েছিল। পরবর্তী বছর, অর্থাৎ সপ্তম হিজরিতে রাসুলুল্লাহ সা. দুই হাজার সাহাবি নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। সন্ধির চুক্তি মোতাবেক কুরাইশরা মুসলমানদের জন্য তিন দিনের জন্য মক্কা খালি করে দেয় এবং নিজেরা পার্শ্ববর্তী পাহাড়গুলোতে আশ্রয় নেয়। এই তিন দিন মক্কার শূন্য বুকে তাওহীদের যে আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, তা কুরাইশদের অহংকারের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেয়। বিশেষ করে কাবাঘরের ছাদে দাঁড়িয়ে হযরত বিলাল রা.-এর আযান মক্কার অভিজাতদের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়বোধের জন্ম দেয়।

ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন যে, কুরাইশরা পাহাড়ের চূড়া থেকে মুসলমানদের তাওয়াফ, সাঈ এবং তাদের সুশৃঙ্খল গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। এই দৃশ্য তাদের মনে একাধারে ভয় এবং শ্রদ্ধার মিশ্র অনুভূতি তৈরি করে। ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দিয়ে বর্ণনা করেছেন:

«فَلَمَّا دَخَلَ مَكَّةَ فِي عُمْرَةِ الْقَضَاءِ، جَعَلَ أَهْلُ مَكَّةَ يَنْظُرُونَ إِلَيْهِ وَإِلَى أَصْحَابِهِ...»

[1]

অর্থাৎ, "যখন তিনি উমরাতুল কাযার উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন মক্কাবাসী (কুরাইশরা) তাঁর এবং তাঁর সাহাবিদের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল..."। এই পর্যবেক্ষণ কেবল শারীরিক ছিল না, বরং এটি ছিল মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান শক্তির এক নীরব স্বীকৃতি। মক্কার অভিজাতরা বুঝতে পেরেছিল যে, তরবারি দিয়ে যে শক্তিকে দমন করা যায়নি, তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব এখন মক্কার সামাজিক কাঠামোকে গ্রাস করতে চলেছে [2] । এই মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের আবহেই রাসুলুল্লাহ সা. মক্কার অন্যতম প্রভাবশালী গোত্র বনু হিলালের কন্যা হযরত মায়মুনা রা.-কে বিবাহের সিদ্ধান্ত নেন, যা কুরাইশদের রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দেয় [3]

উম্মুল মুমিনীন মায়মুনা বিনতুল হারিস (রা.)-এর বংশীয় প্রভাব ও বৈবাহিক কূটনীতি


হযরত মায়মুনা বিনতুল হারিস রা.-এর বংশীয় সংযোগ ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত এবং প্রভাবশালী। তিনি ছিলেন বনু হিলাল গোত্রের কন্যা, যা আরবের নজদ ও হেজাজ অঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী ও যুদ্ধবাজ গোত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁর বোনদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল আরবের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বদের সাথে। তাঁর এক বোন উম্মুল ফাদল (লুবাবা আল-কুবরা) ছিলেন রাসুলুল্লাহ সা.-এর চাচা হযরত আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব রা.-এর স্ত্রী। আরেক বোন আসমা বিনতুল উমাইস (যিনি মায়মুনার মায়ের দিকের বোন ছিলেন) প্রথমে হযরত জাফর বিন আবি তালিব রা. এবং পরবর্তীতে হযরত আবু বকর রা.-এর স্ত্রী হন। অন্য এক বোন সালমা বিনতুল উমাইস বিবাহ করেছিলেন হযরত হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব রা.-কে। এছাড়া তাঁর আপন বোন লুবাবা আস-সুগরা ছিলেন কুরাইশদের প্রধান সামরিক সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-এর মাতা [4]

এই বিশাল পারিবারিক নেটওয়ার্কের কারণে হযরত মায়মুনা রা.-এর সাথে রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিবাহ কেবল একটি ব্যক্তিগত বন্ধন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি কৌশলগত মৈত্রী (Strategic Alliance)। হযরত আব্বাস রা. নিজেই এই বিবাহের মধ্যস্থতা করেছিলেন এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে চারশত দিরহাম মোহরানা পরিশোধ করে বিবাহের চুক্তি সম্পন্ন করেন। হাফেজ ইবনে আবদিল বার তাঁর 'আল-ইস্তিআব' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:

«تزوج رسول الله صلى الله عليه وسلم ميمونة بنت الحارث الهلالية في عمرة القضاء... وكانت أختها أم الفضل عند العباس بن عبد المطلب»

[5]

অর্থাৎ, "রাসুলুল্লাহ সা. উমরাতুল কাযার সফরে মায়মুনা বিনতুল হারিস আল-হিলালিয়াকে বিবাহ করেন... এবং তাঁর বোন উম্মুল ফাদল ছিলেন আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের স্ত্রী।" এই বিবাহের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. মক্কার কুরাইশদের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও পারিবারিক বৃত্তে সরাসরি প্রবেশাধিকার লাভ করেন। বনু হিলাল গোত্র, যারা এতদিন কুরাইশদের মিত্র হিসেবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তারা রাতারাতি মুসলমানদের আত্মীয় এবং মিত্রে পরিণত হয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে "কালেক্টিভ সিকিউরিটি" (Collective Security) বা যৌথ নিরাপত্তা বলয় তৈরির একটি চমৎকার উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা যায়, যা কুরাইশদের রাজনৈতিকভাবে চরম একাকী করে ফেলে [6]

কুরাইশ নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া এবং কূটনৈতিক প্রতিরোধ


রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই বৈবাহিক পদক্ষেপ কুরাইশ নেতৃত্বকে চরম আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেয়। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এই বিবাহের মাধ্যমে মক্কায় মুসলমানদের সামাজিক প্রভাব স্থায়ী রূপ নিতে পারে। উমরার তিন দিন শেষ হওয়ার সাথে সাথেই কুরাইশদের একটি প্রতিনিধি দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন হুয়ায়তিব বিন আব্দুল উযযা, রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মক্কা ত্যাগ করার দাবি জানায়। রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত ধীরস্থির ও কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে চাইলেন। তিনি কুরাইশদের প্রস্তাব দিলেন যে, তিনি মক্কাতেই তাঁর বিয়ের ওয়ালিমা (ভোজসভা) আয়োজন করতে চান, যেখানে কুরাইশদেরও আমন্ত্রণ জানানো হবে। তিনি কুরাইশদের বরফ গলাতে এবং তাদের সাথে একটি সামাজিক সেতু তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু কুরাইশরা এই প্রস্তাবের অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক ঝুঁকি বুঝতে পেরেছিল। তারা জানত, যদি রাসুলুল্লাহ সা. মক্কায় ওয়ালিমা করেন এবং মক্কার সাধারণ মানুষ ও অভিজাতরা সেই ভোজসভায় অংশ নেয়, তবে কুরাইশদের দীর্ঘদিনের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। তাই তারা অত্যন্ত রূঢ়ভাবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ইবনে হিশাম এই কথোপকথনটি তাঁর সীরাত গ্রন্থে এভাবে ধারণ করেছেন:

«فَقَالُوا لَهُ: قَدْ انْقَضَى أَجَلُكَ فَاخْرُجْ عَنَّا. فَقَالَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا عَلَيْكُمْ لَوْ تَرَكْتُمُونِي فَأَعْرَسْتُ بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ، وَصَنَعْنَا لَكُمْ طَعَامًا فَحَضَرْتُمُوهُ؟ قَالُوا: لَا حَاجَةَ لَنَا بِطَعَامِكَ، فَاخْرُجْ عَنَّا»

[7]

অর্থাৎ, "তারা বলল: আপনার নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেছে, অতএব আমাদের এখান থেকে চলে যান। রাসুলুল্লাহ সা. বললেন: তোমাদের কী ক্ষতি হবে যদি তোমরা আমাকে তোমাদের মাঝে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে দাও? আমি তোমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করব এবং তোমরা তাতে শরিক হবে। তারা বলল: আপনার খাবারের কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই, আপনি আমাদের এখান থেকে চলে যান।" [8]

কুরাইশদের এই রূঢ় প্রত্যাখ্যান তাদের কূটনৈতিক পরাজয় এবং চরম মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ ছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, মক্কার সাধারণ জনগণের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ছে। রাসুলুল্লাহ সা. কোনো প্রকার সংঘাত এড়াতে চুক্তি অনুযায়ী মক্কা থেকে বের হয়ে যান এবং মক্কা থেকে প্রায় দশ মাইল দূরে 'সারিফ' নামক স্থানে গিয়ে হযরত মায়মুনা রা.-এর সাথে বাসর সম্পন্ন করেন [9] । কুরাইশদের এই কূটনৈতিক প্রতিরোধ আসলে তাদের আসন্ন পতনেরই পূর্বাভাস ছিল।

মক্কার সামরিক ও রাজনৈতিক স্তম্ভের পতন: খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আসের ইসলাম গ্রহণ


হযরত মায়মুনা রা.-এর এই বিবাহের পর মক্কার অভিজাতদের মধ্যে যে পলিটিক্যাল অ্যালাইনমেন্ট শিফট ঘটে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো আরবের দুই শ্রেষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক প্রতিভা—খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং আমর ইবনুল আস-এর ইসলাম গ্রহণ। খালিদ বিন ওয়ালিদ ছিলেন হযরত মায়মুনা রা.-এর আপন ভাগ্নে। উমরাতুল কাযার সময় রাসুলুল্লাহ সা. যখন মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন খালিদ লজ্জায় ও দ্বিধায় মক্কা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ভাই ওয়ালিদ বিন ওয়ালিদ (যিনি আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন) রাসুলুল্লাহ সা.-এর একটি চিঠি খালিদের কাছে পৌঁছান, যেখানে রাসুলুল্লাহ সা. খালিদের মেধার প্রশংসা করেছিলেন এবং তাঁর ইসলাম গ্রহণ না করার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।

নিজের খালার সাথে রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই মর্যাদাপূর্ণ বিবাহ এবং ভাইয়ের চিঠি খালিদ বিন ওয়ালিদের মনের ভেতরের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে, কুরাইশদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার এবং ইসলামের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। ইমাম ইবনে কাসির তাঁর 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া' গ্রন্থে খালিদ বিন ওয়ালিদের নিজের জবানিতে এই পরিবর্তনের বিবরণ দিয়েছেন:

«قَالَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ: لَمَّا دَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهِ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَكَّةَ فِي عُمْرَةِ الْقَضَاءِ، تَغَيَّبْتُ وَلَمْ أَشْهَدْ دُخُولَهُ...»

[10]

খালিদ বিন ওয়ালিদ মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং পথিমধ্যে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয় মক্কার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব আমর ইবনুল আস এবং কাবাঘরের চাবির রক্ষক উসমান বিন তালহার সাথে। তাঁরা তিনজনই একসাথে মদিনায় গিয়ে রাসুলুল্লাহ সা.-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন [11] । এই ঘটনাটি ছিল কুরাইশদের জন্য এক মরণঘাতী আঘাত। যে খালিদ উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের প্রায় পরাজিত করে ফেলেছিলেন এবং যে আমর ইবনুল আস আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের কূটনৈতিক মিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের এই দলত্যাগ মক্কার সামরিক ও কূটনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয় [12]

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং মক্কার কুরাইশদের চূড়ান্ত একাকীত্ব


হযরত মায়মুনা রা.-এর বিবাহের পর মক্কার রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। কুরাইশরা তাদের সবচেয়ে দক্ষ সামরিক কমান্ডার (খালিদ বিন ওয়ালিদ), সবচেয়ে চতুর কূটনীতিক (আমর ইবনুল আস) এবং কাবার চাবির ঐতিহ্যবাহী রক্ষক (উসমান বিন তালহা)-কে হারায়। এর ফলে মক্কার কুরাইশ নেতৃত্ব সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীনতা ও একাকীত্বের মধ্যে পড়ে যায়। আবু সুফিয়ান, যিনি কুরাইশদের প্রধান নেতা ছিলেন, তিনি নিজেকে অত্যন্ত অসহায় আবিষ্কার করেন। কারণ তাঁর নিজের ঘরের লোক এবং আরবের প্রভাবশালী গোত্রগুলো একে একে মদিনার প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করতে শুরু করে।

ঐতিহাসিক তাবারী তাঁর ইতিহাসে উল্লেখ করেছেন যে, এই সময় মক্কার মিত্র গোত্রগুলো বুঝতে পেরেছিল যে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এখন মক্কা থেকে মদিনায় স্থানান্তরিত হয়েছে। আরবের গোত্রীয় রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য তারা কুরাইশদের সাথে তাদের দীর্ঘদিনের জোট ভেঙে মদিনার সাথে নতুন চুক্তি করতে শুরু করে। তাবারী লিখেছেন:

«فَلَمَّا قَدِمْنَا الْمَدِينَةَ، صَارَ الْمُسْلِمُونَ فِي عِزَّةٍ وَمَنَعَةٍ، وَتَسَاقَطَتْ رُؤُوسُ قُرَيْشٍ وَاحِدًا بَعْدَ وَاحِدٍ»

[13]

অর্থাৎ, "যখন আমরা মদিনায় ফিরে এলাম, তখন মুসলমানরা এক অনন্য মর্যাদা ও সুরক্ষার অধিকারী হলো এবং কুরাইশদের শীর্ষস্থানীয় নেতারা একে একে ইসলামের পতাকাতলে এসে লুটিয়ে পড়তে লাগল।" এই পলিটিক্যাল অ্যালাইনমেন্ট শিফট বা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তন কেবল মক্কার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা সমগ্র আরব উপদ্বীপে কুরাইশদের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে [14] । বনু খুযাআ গোত্র, যারা কুরাইশদের প্রতিবেশী ছিল, তারা মদিনার সাথে তাদের জোটকে আরও দৃঢ় করে। এর ফলে কুরাইশরা তাদের নিজস্ব ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে হিজরি অষ্টম শতকে মক্কা বিজয়ের পথকে সম্পূর্ণ রক্তপাতহীন ও মসৃণ করে তুলেছিল [15]

উম্মুল মুমিনীন হযরত মায়মুনা বিনতুল হারিস রা.-এর সাথে রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিবাহ কেবল একটি পারিবারিক বন্ধন ছিল না, বরং এটি ছিল এক মহিমান্বিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক। এই বিবাহের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. মক্কার কুরাইশদের সামাজিক ও গোত্রীয় আভিজাত্যের অহংকারকে ভেতর থেকে ভেঙে দেন। বনু হিলালের মতো শক্তিশালী গোত্রের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন এবং এর ফলশ্রুতিতে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আসের মতো মহাবীরদের ইসলাম গ্রহণ মক্কার কুরাইশদের রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। মক্কার অভিজাতদের এই পলিটিক্যাল অ্যালাইনমেন্ট শিফট প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ সা. কেবল একজন আধ্যাত্মিক নেতাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আরবের ইতিহাসের সবচেয়ে দূরদর্শী ভূ-রাজনৈতিক কৌশলবিদ (Geopolitical Strategist)। সারিফের নির্জন প্রান্তরে যে বৈবাহিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা আসলে মক্কার কুরাইশদের পতনের এবং ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়ের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

""
১২.১০ মায়মুনার (রা.) বিবাহের পর মক্কার অভিজাতদের পলিটিক্যাল অ্যালাইনমেন্ট শিফট (Political Alignment Shift)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১২.১০ মায়মুনার (রা.) বিবাহের পর মক্কার অভিজাতদের পলিটিক্যাল অ্যালাইনমেন্ট শিফট (Political Alignment Shift) কুইজ

1 / 5

মায়মুনা (রা.)-এর সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিবাহ কোন ঐতিহাসিক ঘটনার সময় সংঘটিত হয়?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...